কবি চন্দন ভট্টাচার্য্যর কবিতা ও ছড়া
মিলন
কবি চন্দন ভট্টাচার্য্য


আশা ভাষা নিয়ে এল
মিলনের এলোমেলো
কল্পিত মন্থিত দিন ,
সচেতন সম্ভারে
সঙ্গীরা উকি মারে
প্রতিক্ষা স্বপ্নে বিলীন –
দুর্গত অনাগত
বিস্তর আশাহত ,
শঙ্কুল সন্ধির পথ –
সেই পথে বেয়ে চলা
রক্ত ঝরার খেলা
আগুন-নেশায় ছোটা মথ ।

.     ************
    
.                                                                                  
সূচী . . .    




মিলনসাগর
*.
একলা দু’জনা
কবি চন্দন ভট্টাচার্য্য


আকাশ হেথায় একলা পোড়ে,
বাতাস বড় গুমটি,
একটু এস- তোমায় দেব
ঝিলিক তারার চুমটি –

মরার মত নিশ্চুপেতে
গাছরা কেমন থম্‌থমেতে –
একটু এস মনের দ্বিধায়
ভরাও আমায় জীবন সুধায়—

পথটা বড়ই একলা তাই
তোমায় আমার সঙ্গী চাই,
হাঁটব দু’জন একলাতে
চাই না কিছুই এই রাতে-
অন্ধকারে চলব তাই
তোমার হাতের স্পর্শ চাই---

.     ************     
.                                                                                  
সূচী . . .    




মিলনসাগর
*.
বাঁচবার অধিকার
কবি চন্দন ভট্টাচার্য্য
(ধর্ষিতা নারীর আত্মহত্যার করুণ পরিণতির বর্বরতা দর্শনে সমাজকে পরিনত হওয়ার আবেদন)


তুমি মরে বেঁচে গেলে,
আমাদের এই সমাজের পচা গলিত শবেরে খেলে;
শাসক, নাশক করে যারা শোক তোমার জন্যে তাই
শকুনের মত দেহ ছিঁড়ে খায় আশ্রয় কোথা নাই।
একদিন তুমি ধর্ষিতা হয়ে ধর্ষন রোজ পেলে,
সভ্য সমাজে অসভ্য সেজে তুমি তাই চলে গেলে।

করেছিলে অপরাধ,
ভদ্রলোকের সমাজেতে তুমি প্রপাত সন্নিপাত।
সহজ ভাবেতে হেঁটেছিলে তুমি নির্জন এক পথে,
যেখানে হিস্র মানব হায়না শিকার খেলায় মাতে-
একসাথে ওরা ছিঁড়ে তো খাবেই দোষ দেবে তুমি কার?
তোমার দোষেই তুমি ধর্ষিতা- ধর্ষন অধিকার।

তুমি খুব বেঁচে গেলে-
পিছনে তোমার কত শত মা’র শত মেয়েকে গেলে ফেলে;
ওরা তো তোমার মনের বারুদ আগুন পাবে না আর,
শত স্ফুলিঙ্গ জ্বালালে না কেন তমসারে ঘুচিবার?
তুমি বুঝেছিলে সমাজের পাপ, পাপীরে না করি লয়
তুমি পাপ লয়ে স্রোতে গেলে বয়ে কিচকের হল জয়।

রামায়ণে যদি যাই,
দেখি সীতা সতি পাপ পরখেতে ধরণীতে নিল ঠাঁই;
ধর্ম সেথায় বর্ম পরেছে নিস্পাপ হয়ে তাই
পরমেশ্বর রামের সামনে সতিত্ব যাচা চাই।
কৃষ্ণ ভজিলে বিষ পায় মীরা, সমাজের বিধি তাই-
বেঁচে ছিল বলে ভক্তিতে নারী অধিকার আজ পাই।
কৃষ্ণারা যদি মরিয়া বাঁচিত বস্ত্রহরণ লাজে,
প্রতিজ্ঞা ভীমে জাগাইত কেবা এলো-কুন্তল সাজে।  

তোমার বুকেতে বদলের ভিত শানিত অস্ত্রধার,
শোনিত শুষিয়া নিদ্রিত শিবে জাগাইবে না’ক আর।
বাঁচ দৃঢ় মনে- তোমার আগুনে শত কোটি নারী সেনা
ভেঙে দিক এই সমাজের ভিত, শুধুক সকল দেনা।
তোমার মতই পীড়িতের হাতে তুলে দাও হাতিয়ার,
বন্ধুর পথে জাগাও শপথে বাঁচবার অধিকার।

.     ************     
.                                                                                  
সূচী . . .    




মিলনসাগর
*.
গীতি চন্দ্রিমা
কবি চন্দন ভট্টাচার্য্য



মায়ের নাম রত্নাবলী,  রত্ন আকর থেকে
বিচ্ছুরিত স্নিগ্ধ আলো ছড়ায় দিকে দিকে।
তারই মেয়ে ‘চন্দ্রিমা’ তাই নাম রেখেছে ঠা’মা,
উজ্বল বরণ হাসির ধরন চাঁদের আলোয় জমা।

ঠা’মার তখন অসুখ ভারি - চলাফেরা বন্ধ ছিলো,
ঘরের কোণে নিজের মনে একলা অবসন্ন ছিলো।
এমন সময় ছোট্ট পরি মেয়েকে যদি সামনে রাখে,
নিজের ভাষায় বলার নেশায় কত কথাই বলত তাকে।
সে সব কথা বুঝত না কেউ, বুঝত ঠা’মার স্নেহের ধারা,
খুশীর জোয়ার আনত মনে স্ফুর্তি প্রাণে পাগল-পারা।

একটু বড় হল যখন বুঝতে শিখে কথার মাঝে
পথ চলতে আদুরে জেদ কোলে চড়ার বায়না যাচে।
বাবার কোলে সকল ভোলে, বাবার কাঁধে মাথা রাখে,
কোথাও গিয়ে ফিরলে- ‘বাবা কেন গেলে?’ সওয়াল রাখে।
‘কেন বাবা দিয়েছিলে রিসকা করে দুরে পারি?’
অনেক কথার নেইকো জবাব, কি বা জবাব দিতে পারি?
কেজো লোকের কঠোর ভুবন, জটিল জালের কুটিল ফাঁদে
তোর বাবা যে আটকে আছে, ফেরারি মন যতই কাঁদে।
তবু যখন ঘরে ফিরি চন্দ্রিমার ওই মিষ্টি বুলি
সাজায় ওকে রাজকণ্যা, নিজেকে তাই রাজা বলি।

মা যখনি টিফিন সাজায় দৌড়ে এসে বাবার হাতে
বলত দিয়ে- ‘খেও বাবা, ঠিক সময়ে ফিরবে রাতে।’
ভুলো মনে কাজের ভুলে বেভুল জগৎ বেনোর জলে
টুকিটাকি কত ফাঁকি শুধরে নেওয়ার হিসাব বলে-
বাবার ছাতা, কাজের খাতা, চশমা, ব্যাগে, মোবাইলে,
চলার হিসাব, কাজের কিতাব ঠিক খুঁজে দেয় গন্ডোগোলে।
‘বাবা নাকি বই লেখে মা? মস্ত বড় লেখক বুঝি?’
লোকের যত তুচ্ছতাকে তুচ্ছ করে ব্যর্থ পুঁজি-
হতে পারি খুব সাধারণ, হতে পারি বিফল, বিমন,
কিন্তু যখন মেয়ের সাথে রাজা হতে নেই কো বারণ।

কত বছর পেরিয়ে গেল বাবা মায়ের শাসন, স্নেহে
রাজকণ্যা হল বড় বাঁধন ঘেরা যতন গেঁহে।
দি’মা, মাসি, মায়ের হাসি, পরিপাটি জীবন ভালো,
সুখে দুঃখে শান্ত মুখে আড়াল ছিল বিষাদ কালো।
জীবন স্রোতে নাওয়ের পোতে নতুন পথে চলবি যবে
চলার পথে আঁধার রাতে তোর বাবা তোর সঙ্গে রবে।
স্খলিত চরণ বাঁচন মরণ জীবন জোয়াল জীর্ণ- তবে
মেয়ে হবে মা, বাবা ছেলে বৃদ্ধ দশায় দীর্ণ ভবে।
তবুও বাবা মনের থেকে সেই রাজা তোর ‘বাবা’ই কবে,
যতই বড় হোস না কেন বাবারও কাঁধ চওড়া হবে।
আজকে দিনে নাও গো জিনে ‘সঙ্গীতে’ মন সহজ গানে,
মনের জোয়ার প্রাণের ছোঁয়ার চাঁদের মায়ার অলখ টানে।

(কণ্যা চন্দ্রিমার বিবাহ পূর্বে সঙ্গীত অনুষ্ঠানে লেখা)

.     ************     
.                                                                                  
সূচী . . .    




মিলনসাগর
*.
জীবন ও নদী
কবি চন্দন ভট্টাচার্য্য



ছন্দ বারি উৎস ছাড়ি রূদ্রদেবের জটা
ছুটল বেগে পাগল রেগে - চূর্ণ শিলা ছাটা
অস্থি বাটি বন্ধ্যা মাটি উর্বরিনী ধরা –
মন্দাকিনী স্বর্গ জিনি মর্তে আনে ধারা ;
চলার নেশায় উন্মাদ প্রায় ধরিত্রী দেয় নাড়া
কল্লোলিনী স্রোতোস্বিনী সমুদ্রে হয় হারা ।
আবার সেথায় পৌছে ব্যাথায় অভিমানের ভারে
বাস্পভূতে মেঘের দূতে ফিরবে বলে ঘরে -
বাঁধল যে দল হয়ে বাদল পাহাড় পানে ধায়,
পাষান পাহাড় ধাক্কা তাহার ফেরায় নদীর গায় ।
কত পথের হদিস যে দেয় কালযাত্রার ধারা
মোদের জীবন সবার এমন ছুটছে পাগল-পারা ।

.     ************     
.                                                                                  
সূচী . . .    




মিলনসাগর
*.