ছড়া কবি দিলীপ কুমার বসু ভাঙা ছন্দ পঙ্ ক্তি পদ কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনাকাল ১৯৯১-২০০৮।
খবর আসে ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিতে আরেকরকম খবর আসে গোপনে, নিভৃতে ; দুই খবর মেলাই কীসে, সমস্যাটা তাই, দুধের সর ও মেঘের স্বর কীভাবে মেলাই |
মাইনে পেয়ে একটি মেয়ে দেখায় রৌদ্র, মেঘ, সারাটা দিন দেশ-বিদেশে কী করবে, উদ্বেগে ; মেক-আপ তার নির্ভুল সব ; খবর-পড়ার লোকের কালঘাম দেখা যায় না সেই চেষ্টাই চলছে অবিশ্রাম |
এখন ‘দুঃখজনক খবর’, তাই পেঁচার হেন মুখ ; পরের খবর ক্রিকেট জেতার---মুখখানি উত্সুক ; উন্নতিতে সিঙ্গুর ছায়, গাঁজিয়ে ওঠে নতুন নন্দীগ্রাম ; অবতাররা দেবতা হয়--- জন্মে ‘জয় শ্রীরাম’ | দিব্যি কেমন ঘরে-বাইরে গাড়ি নতুন হয়, আপনারা সব বুদ্ধি দিয়েন, মহান সদাশয়, কেমন করে রক্তমেঘে রক্তপাতের খেলা মেলাই, মেশাই, আপনারা সাঁই, বোঝান্ এই বেলা |
মেঘ বাড়ছে, ঝড় উঠছে, সমুদ্র উত্তাল, হাবার মতো ঘরে বসে মৃদং-এ দেই তাল ; এমন করে চলবে না তো, টলবে, টলবে না, ভবের হাটে বাণিজ্য খুব, মানুষ বেচাকেনা |
সনেট কবি দিলীপ কুমার বসু ভাঙা ছন্দ পঙ্ ক্তি পদ কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনাকাল ১৯৯১-২০০৮।
আকাঙ্খাহীন সুখানুভবের নৌকা বাওয়ার কথা কাকে বলে যাই, কীভাবে বোঝাই, মোহনায় নীল জল সেখানে কলম ডুবিয়ে লিখতে এগোই ; শান্ত পল, যদিও ঢেউ ও বাঘ, বন, মধু চঞ্চল | মধু বাতা---- ঋতায়তে সেটা অনুভব ছেয়ে , মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ, পাল তুলে দিয়ে সাগরে ভাসান ভাগ্যই মেনে নেব |
মেঘে মেঘে কথা বলাবলি হয়, বিদ্যুৎ বিদ্রূপ আঘাত করতে গিয়েও করে না | তারপর সব চুপ | ঝোড়ো হাওয়া দূরে উড়ে চলে যায়, মেঘ কত যেন দূরে, নৌকা অল্প দোলে আর চলে ; গুঁড়ি গুঁড়ি জল ছুঁড়ে গা ভিজিয়ে দিয়ে সাগর টানছে কী এক বোধের দিকে ধীরে, অতি ধীরে তটের আভাস, অভিজ্ঞতারা ফিকে হয়ে গেলে পর নৌকা বাওয়াতেঅজানা যে অনুভব তা কেমন হবে, কী দেখতে পাবো, এখন জানি কি সব ?
চতুষ্কোণ কবি দিলীপ কুমার বসু ভাঙা ছন্দ পঙ্ ক্তি পদ কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনাকাল ১৯৯১-২০০৮।
সংলাপ ১ : পাখি
কি করে যেন রক্তে বাজে আশ্চর্যের স্বর, গোপনে দূত পাঠিয়েছে কে, আজকে স্বয়ংবর, কাজেই আমার আসতে হবে পাখির বেশে সেজে, জলে আমার ছায়া দেখে করবে ধানুকী যে আমার বুকে শরসন্ধান, লক্ষ্য থাকলে ঠিক রক্ত-ফোঁটা ছিটকে যাবে এদিক ও ওদিক | একটি ফোঁটা কপালেতে , কন্যা লাজে মরে, বর এসেছে, পা ফেলবে হৃদয়বাসরঘরে | অসংবৃত পায়ে হেঁটে মালা হাতে এগোয়, মুখটি লাল, দিব্য সে এক গোধূলিতে রাঙানো তার গাল মধুর লাগে, সেই সেখানে অপলক তাই দৃষ্টি ধানুকীর, হৃদয়ে তার ডানা মেলে অনুভব এক সুখের সুগভীর |
সংলাপ ২ : কন্যা
সে আমাকে কী যে ভাবে, দুঃখ দিতে মায়া লাগে তাকে, পাহাড়পথে মেঘ উড়ছে, আমার দৃষ্টি নীল আকাশের ফাঁকে | আমি আমার নিজের বেগে, খুশিতে বা হয়ত রেগে, চলি নানান সময় | পায়ের দ্রুতি স্বভাবে, তাই কথা বলাবলি ঝর্ণা, পাথর, পাখির সাথে ; উড়ন মেঘে ইচ্ছে পাতি ঘর | প্রতি নতুন দিনের বাঁকে, ইচ্ছে-খোঁজার ফাঁকে ফাঁকে স্বর শুনছি রোজই কী এক বাঁশীর, কান্ড দেখে কষ্টে হাসি পায় | নতুন দিনের আলোয় কত রডোডেনড্রন ফুলের মতো গায়ে মেঘ লাগিয়ে ভিজে উঠব এমন ভেবে রোজ সকালে টানি চোখের নিচে কাজলরেখা, বাকি দিনটা আলোয়-মেঘে জানি স্বাধীন চলার সুখে কাটবে, বেঁচে থাকার আনন্দ তাই খুব | অল্প একটু খারাপ লাগে বাঁশি যখন নীল গহনে ডুব দিতে বলে ডেকে ডেকে, আমি তখন সেখান থেকে দূরে হাঁটতে থাকি আমার পথে নতুন আলোয় মাখা পাহাড়চূড়ে |
সংলাপ ৩ : ধানুকী
শুনেছি এখানে পৃথিবী চাইলে পাওয়া যাচ্ছে | যদিও, বাজারে ওঠানামা আছে জানি | চেষ্টা-চরিত করে শিখে নেব কীভাবে মেশালে সবুজ-হরিৎ রঙে বন ফোটে | আমি এমন কয়েক ছবি আঁকবই যার জটিলতা পরতে পরতে অসহায়তার বাঁকা দুঃখ, মানুষ যা বহন করে, তার সংবাদ দেগে দেবে চোখে, বুকে হয়ে যাবে আঁকা | সফল হলেই হীরকদ্যূতির মতো স্বাক্ষর পরবর্তী বিভাও ছড়াবে রোজ | তাই প্রতিজ্ঞা, পরিশ্রমের আয়ুধসজ্জা ; তুলির নিষ্ঠা, কালো বা লালের খোঁজ, প্রতিভায় দেয়া শান বারবার যাতে তার ধার এতটাই হয় যে সে অনায়াসে কাটে প্রতিযোগীদের সকল প্রয়াস , মূল্য কমার যে কোনো আভাস, এই ভুবনের হাটে | তাই আমি এই নবযৌবনে শরসন্ধান করছি ধানুকী, একই লক্ষ্য---চোখ ; কটাক্ষ থাক, বা সরল ব্রীড়া, কিম্বা বেদনা, তীর ছুটে গেলে আমার পায়েই হোক্ রক্তিম আভা হৃদয়মথিত, তখন আমিও মমতাবিধুর হাতে তুলে নেব তাকে, ‘আমার পৃথিবী, শুধুই আমার, আর কারো নয়’, আদরে আদরে জানাব সে পাখিটাকে
সংলাপ ৪ : কবি
কর্ণাভরণ, সব আবরণ, এসব ছাড়াও মানুষের মন জড়িয়ে, দুলিয়ে রেখে দেয় কিছু, পৃথিবীর কাছে স্বর অতি নিচু . ক’রে বলে ‘ আমি আছি’ | তাই খুঁজি আমি প্রতি ধানুকীর , শরসন্ধানে আহত পাখির, আলো-হাসি ভরা তরঙ্গময় বহতা নদীর মতন যে হয়, . ---সকলে কীভাবে বাঁচি | এর উত্তর ইন্টারনেটে অথবা পুরানো কোনো হল্ দেটে দলিলে যেহেতু যায় না পাওয়া বিশ্রামহীন এ গান গাওয়া . যদি চোখে পড়ে যায় ! সব তবু দেখি বৃথাই আয়াস, যা কিছু নিষ্ঠা, যত উপবাস সব নিষ্ফলা : রূপ, বিভঙ্গ নির্মাণ হয় ; প্রাণের সঙ্গ . কিছুতে পাই না, হায় |
সে ভূমিকা কবি দিলীপ কুমার বসু যাওন-আসন কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনাকাল ২০১০-২০১৩।
চলে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি পরান সহিত মোর, কেউ বলেছিল , বাংলা কবিতা তখন মাত্র ভোর হয়ে জেগেছিল, তারপর আরো কত রঙ লেগে গেল সকল শরীরে দিনের যেন সে দোল খেলে উঠে এল | এখন এসব অভিশার শেষে বাড়ি ফেরা বিপদের আজ হয়ে ঘেছে, পায়ের চলার মত্ততা মৃদু , ফের , নখের দাগও লুকানো যায় না, চোখের মদিরা সেও বলে দেয় সাথে ছিল তার, অন্তরঙ্গ কেহ |
তাই পথে এসে দুপুরে শারং দুই কান ভরে ভারে কী ক’রে এখন , অথবা কখনো, ঘরে ফিরতে পাবে | পথ হয়ে যায় অবিরত ঘর, বারান্দা জেলখানা ; বাঁশির সঙ্গে পাগলা ঘন্টি, হুল্লোড় ওঠে নানা, ঘর গুলি যায় ছড়িয়ে, গুটিয়ে, আবার সামনে ছোটে, মধ্যদিনের রবীন্দ্র গান, মাথায় সূর্য ওঠে, গাড়ি ছোটে, ষ্টেশনে ব্যস্ত মানুষ দু’চোখের কোণে দেখা, বাড়ি আর পথ ভেদ করে জাগে কন্ঠ--শঙ্খ রেখা, আলিঙ্গনে সে আবৃত করে , বুকের উষ্ণতায় জেলখানা, ঘর, পথ, সবকিছু নূতন চেহারা পায় |
যদি আজ ধ্বংস করে দাও, . জেনো, আগেই করেছ | যত ধ্বংস কর না কো, . শব্দে আমি তোমায় গড়েছি তুমি আমায় গড়ছ |
(২)
আসলে এ অন্য মিছে, . তুমি কিছু ধ্বংস কর নি | দংশনেতে শুধু . আজ হ’লে কি ঘরনী ? তুমি তো গড়েই চল, . কাঁধ হয় গড়িয়ে বাহু, . সে এক গড়ার স্রোত | আমার চোখে পলে, ত্বকের রঙে জ্বলে . নীল ছোট্ট ফোঁটায় মধু ; বনে আজ আগুন লেগে . যা কিছু পুড়েও যাক্----- জীবন কিছু দিনের . সেটুকু স্মৃতি থাক |
(৩)
সকল তাল মিল . হিসাব হ’তে দূরে মিথ্যা শুয়ে আছে . আপন অন্তঃপুরে |
তাদের অনন্ত দুঃখ, আমার বিষাদ নিয়ে পৃথিবীতে ফাটল ধরেছে সমুদ্রে সমরপোত, সন্ন্যাসীও হেঁটে যায়, এ দুয়েরই ছবি দেখা গেছে, তাই সব গোলমাল, এত ছবি মেলাবে কীভাবে বলো অসহায় সামান্য মানুষ, কোন্ অঙ্গুরীয় আছে যার রত্নে চোখের অজস্র জল, কাজল, বার্নিস . দেয়া-নেয়া জীবনের সমস্ত বঞ্চনা, আর উদ্দীপনা আলোকের, বিকালের খোঁজ, সবই ধরা পড়বে আর বিকীর্ণ ছটায় তার সূর্যেরও ধাঁধাবে চোখ রোজ
একটা SMS কবি দিলীপ কুমার বসু ২৩ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত, “জ়াওন-আসন” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া
সকাল, বিকেল, দুপুর, সন্ধে কিছু--চেনা এক ফুলের গন্ধে কেটে গেলে তুমি গন্ধমাতাল চেন নি স্বর্গ, চেন নি পাতাল, . রয়ে গেছে এক মুগ্ধ বন্দী, . ওদিকে যখন হাজার . বাজারে বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী, . আগুন জ্বলছে চোখে ও মাথায়, . পান্তার বাটি, গায়ের কাঁথায়, ভুট্টার ক্ষেতে, সর্ষে শাকের ফুলকারি ঘেঁষে
জ্বলছে যেসব বাঁচার চেষ্টা আমার দেশটা, তাদের দেশটা, মাছধরা সব সমুদ্রেফেরা, ট্রাকচালকের শাম ও সবেরা, নুলো শরীরের চারপাশ ঘেরা . হাসপাতালের ভাঙা চিকিত্সা, . অন্ধ গ্রামের তাকেই ঈর্ষা, . ধর্মকাটারি, ত্রিশূলের ত্রাস, . বন্দুক, বোমা, সর্বনাশ, আর এরি মাঝে মানুষ বাঁচছে সহজেই হেসে |
ফুলের গন্ধ সরাও গোপনে তালা এঁটে রাখ সে সুখ--স্বপনে অধিকার নেই, অধিকার নেই, একথা তুমি তো রোজ জানতেই | . অসমাপ্ত যা তাই শুধু বলে . সময়ের কথা শেষে |