দীপালী সেনগুপ্তর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
তোমার জন্য
দীপালী সেনগুপ্তা

সূর্য্যি যখন ডোবে ডোবে
পরন্ত বিকেলে,
ঘরের পাখাটা ঘুরেই চলে আপন মনে
ঘুরেই চলে আর চলে।
পর্দাগুলো হাওয়ায় শুধু দোলে আর দোলে,
আসবে তুমি ঘরের পানে ক্লান্ত চরণ ফেলে ফেলে।
সারাদিনের ক্লান্তি তোমার মুছিয়ে  দেব আঁচল ফেলে।
ঘরের নেশায় মাতবে তুমি  নতুন করে ক্লান্তি ভুলে।
নারীই জানে কোন সে মায়ায় বিশ্বভূবন দোদুল দোলে,
স্বপ্ন আনে আশার সুখে দুঃখ বেদন সবই ভোলে।
(হয়ে) নারী পুরুষ একই হৃদয়, দুইটি হাতে চাকা ঠেলে,
সংসারেরি রথের চাকা শান্তি সুখখে আপনি চলে।

.  *************   
.                                                                                     সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
দেখেছি নীলের মুখ দীপালির আলোতে
দীপালী সেনগুপ্তা

নীল, দেখেছি দীপালির উজ্জল আলোতে মুখ তোমার,
সয়েছ, সাগরের উদ্দাম তরঙ্গভঙ্গের মত কর্ম উন্মাদনার ভার।
যাওনি কোথাও থেমে, নির্বিবাদে গেছ সব সয়ে,
যত অশান্তি শোক-ব্যথা-বেদনার ভার বয়ে।
ভারবাহী চারপেয়েটির মত, বয়ে গেছ ভার সংসারের,
শত অনুযোগ আভিযোগেও অবহেলা হয়নি পঠন পাঠনের।
প্রভাতের ফোঁটা ফুলটির মত অমলিন হাসি ভরা মুখে
প্রেয়সীর ক্ষুব্ ধ চিতে শান্তির বারিধারা ঢেলে দেছ সুখে।
আচমকা চলে গেলেন বড়ভাতৃবধু বড় অসময়ে,
হঠাৎ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে।
অবোধ দুটি শিশু আর অকালে এক যুবককে
প্রৌঢ়ত্বের দোর গোড়ায় পৌঁছে রেখে গেলেন চলে।
দুটি শিশু, বৃদ্ধা মা আর অসহায় এক অকালবৃদ্ধের
দুর্ভর ভার অম্লান বদনে হাসিমুখে কাঁধে নিলে তুলে
তোমার সহধর্মিনী দীপালির উজ্জল আলো জ্বেলে দাঁড়াল এসে পাশে
নিজের চাওয়া পাওয়া ভুলে।
তারপর:- সব দায়িত্বভার হলে সমাপন
নীরবে নিলে বিদায়, ক্রন্দসী প্রেয়সীরে পুত্রহস্তে করে সমর্পন।
কর্মবীর ক্লান্ত তুমি সংসার ভবনে ?
কর বিশ্রাম সেই অচিন্তের শ্রীচরণে।

*********************
( ছান্দসিক ডঃ নীলরতন সেন এর প্রয়াণে শ্রদ্ধার্ঘ্য )   



.                                                                                              সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
সাগরের নাম
দীপালী সেনগুপ্তা

অসীম আকাশ আর অতলান্ত সাগর
ও-ই দূর দিগন্তে, দুইয়ে মিলে করছে দোঁহে আদর
সেথায় নেই কোন মাটির ভালবাসা
নেইকো মাটির চাওয়া পাওয়ার আশা।
তাইতো সাগর বুঝতে পারে না যে,
মাটির ভালবাসা কোন সে মধুর সুরে বাজে।
হঠাত্ এক মিষ্টি মধুর প্রভাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখতে পেল সাগর,
তাকে নিয়েই চলছে প্রাণীর ইচ্ছে মত আদর।
করতে তুচ্ছ প্রাণের ভালবাসা, ধেয়ে এল সাগর
ভাঙ্গতে মানুষের আশা আকাঙ্খা ভালবাসার ঘর।
কী ভীষণ ভয়ঙ্কর এক নাম সুনামি
অপরূপ সাগর তার নিজের নামেই করে দিল বদনামি !
কতশত মানুষের সুখি গৃহকোণ আনন্দ নিকেতন
সাগর তার তরঙ্গ তাণ্ডবে ভেঙ্গে চুড়ে করে দিল সমকোন।
অসহায় মানুষের কাতর ক্রন্দনে ভরে গেল দশদিক হাহাকারে।
প্রিয়জন হারা ব্যথা বুকে নিয়ে, ভগবান-আল্লা-যীশুকে ডাকে মানুষ কাতরে।
ছিলাম সুখে মহানন্দে প্রিয় সাগর বুকে,
এ কোন পাপে বঞ্চিত আজ সেই পরম সুখ ?
মহাসিন্ধু ধেয়ে এলো, কোন এক আক্রোশে
কত প্রাণ হরে নিল অজানা কোন রোষে।
হায় অর্ণব ! হায় জলনিধি ! এত মিষ্টি নাম
মানুষই তো দিয়েছে তোমায়,
মাটির প্রাণের হারায়ে ভালবাসা আজ
নিয়েছ নাম 'ভয়ঙ্কর ভয়' ।

*************


.                                                                                     
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
ভাল ছেলে
দীপালী সেনগুপ্তা

তিনটি মাথা তিটি গ্লাস
ছয়টি হাতে খেলছে তাস
নির্দোষ আনন্দ।
ঘরে বসে করছে ঠাট্
করছে পান চাট্ ছে চাট্
কেন কর মন্দ ?
এরা, মাতলামি তো করছে না,
তোমার ঘরের দরজা ধরে
ওরা তো আর ঠেলছে না !
অপবাদের বোঝা তোমরা
ওদের ঘাড়ে দিও না।
মনে কেন ধন্দ ?
ভাল ছেলের ডেফিনেশন
তোমরা ভাব যার যাহা মন
এটাই ওদের আনন্দ
এরা তো কেউ বেকার নয়
মস্তানিকে পেছনে থোয়
মনে মনে সবাই এরা
হয় বিবেকানন্দ !

********

.                                                            
                               সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
আমিত্বের অহঙ্কার
দীপালী সেনগুপ্তা

এই সসাগরা ধরনীর
অরণ্যের নিভৃত এক কোণে
ফুটেছিনু, ক্ষুদ্র এক বনফুল আমি।
প্রভাত সূর্য রশ্মি যখন
পড়েছিল মোর প্রথম দৃষ্টিপাতে
ভেবেছিলেম, সার্থক জনম মোর,
পেরেছি শরিক হতে, এই ধরিত্রীর,
এই পৃথিবীর আনন্দ বেদনা ভাগ করে লব,
হব সুখ দুঃখের অংশিদার
সবাকার।
গর্ব্বে ভরে বুক, ভাবি, আমি বিনা
ব্যর্থ হোতো ভোরের ফুল ফোঁটা, ব্যর্থ হোতো সৃষ্টির সৃজন,
আমি বিনা হোত বুঝি সৃষ্টির বিলয় !
বক্ষে ধরি মোরে
ধন্য আজি হয়েছে এ ধরা,
হায়রে ! অবোধ মূর্খ আমি
সূর্য যবে হ'ল অস্তাচল গামী
গর্ব্বের পতাকা পাপ্ ড়ি মোর
একটি একটি করে ধরাতলে যায় ঝরে,
ধিক্কারে হৃদয় পূর্ণ, চূর্ণ হয় আমিত্বের অহংকার
কত ক্ষুদ্র কত দীন সেই ক্ষণে
বুঝিলাম আমি।

********

.                                                         
                                         সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
পাপুর ব্যাথা
দীপালী সেনগুপ্তা

মাগো! তোমার পাপু কাঁদে
          কোথায় চলে গেলে?
বাপী তোমায় নিয়ে গেল একলা আমায় ফেলে |
কি যে কঠিন ব্যাধি তোমায়, ধরেছিল মাগো,
নাইতে খেতে, বসতে শুতে, বলতে শুধু
          আর তো পারি না গো!
ইচেছে হতো মাগো তোমার, কোলে শুধু চড়ি,
পারতে নাতো কোলে নিতে, কাঁদতে আমায় ধরি |
আমার দুটো ছোট্ট হাতে, মুছিয়ে তোমার চোখের জল,
বলেছি "মাগো আর কেঁদো না, বুঝছো নাকি কোলে
চড়া এতো আমার ছল!"

মাগো! তুমি চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে গাল,
হেসে কেঁদে ভালবেসে, মুখটি করে লাল |
 সবাই বলে পাপুরে তোর
           মা গেছে মাদ্রাজে
অসুখ সেরে ভাল হয়ে, ফিরবে নতুন সাজে |

মাগো! ঘরের জানালা দিয়ে
          তাকিয়ে থাকি পথের পানে চেয়ে,
আসবে তুমি কবে আবার
          ভাবছে বসে পাপু তোমার---
কোন পুতুলটা আনবে তুমি
          বারবি ডল্ না কুকুর টমি?
সেদিন মামা কোলে নিয়ে
          আমায় ক'রে আদর---
বল্লে - পাপু আজকে তোমার
          মা কে নিয়ে ফিরবে বাপি আবার |
আনন্দেতে লাফিয়ে উঠে মামুর গালে
          চুমো খেয়ে বলি,
কিসে ক'রে ফিরবে আমার মা?
চলো মামা আমরা সেথায় চলি |
বলেন মামা দুচোখে জল ভরে---
---বাপি তোমার ফিরবে প্লেনে চড়ে,
মা'কে আনবে কাঠের বাক্সে ক'রে |

সাত বছরের ছোট্ট পাপু কিছুই বুঝলো না,
জীবন থেকে হারিয়ে গেছে পাপুর সোনা মা |
পাপুর মা আর ফিরবে নাগো, আর নেবে না কোলে,
ছোট্ট পাপু হাসি ভুলে ভাসে নয়ন জলে ||

      ******** ১৮ই জানুয়ারী ২০০১, বৃহস্পতিবার

.                                                                                     
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
অন্ধকারে একা
দীপালী সেনগুপ্তা


মাগো তুমি তখন আমায়
.             দাওনি কেন দেখা
যখন আমি ব্রহ্মমাঝে
.             ঘুরতেছিলেম একা ?
জানি না কোন্ পাহাড়চূড়ায়,
.             কোন্ সে মধুর স্বপ্নমায়ার
পাহাড়ী বাপমায়ের কোলে
.              জন্মেছিলেম কবে !
সেথায়, দিন কেটেছে হেসেখেলে,
.               মানুষ ছিলেম যবে |
আবার কখন দিন ফুরোলে,
.               আঁধার পথে ফিরতেছিলেম একা
তখন তুমি কেন মাগো
.                দাওনি আমায় দেখা ?
জানি না কোন্ সাগরমাঝে
.                সাগরকন্যা সাজে,
আপনমনে খেলতেছিলেম
.                অতল জলের মাঝে |
আবার কখন খেলার শেষে
.                ব্রহ্মান্ডের স্তরে স্তরে
পথ চলেছি অশরীরী একা |
তখন তুমি কেন মাগো
.                দাওনি আমায় দেখা ?
এই ধরণীর পথের ধারে
.                ঠিক জানা নেই জন্মেছিলাম
.                    কোন্ সে প্রাণীর ঘরে !
জনম মরণ দুয়ের খেলা
.                বিধির বিধান মেনেই চলা,
কর্মফলের কুম্ভীপাকে
.                শুধুই ঘুরে চলা |
মাগো তুমি তখন আমায়
.                দাওনি কেন দেখা,
ভ্রমের ঘোরে যখন আমি
.                ঘুরতেছিলেম একা ?
তোমার পূজার মন্ত্র আমার
.                হয়নি যে গো বলা,
হয়নি তোমার চরণতলে
.                ভক্তির ফুল ঢালা  |
আকুল পরাণ তোমায় খোঁজে
.                 কোথায় পাব দেখা,
বিশ্বমাঝে আর কতকাল
.                 থাকব মাগো একা ?
হাজার বছর আঁধার ঘরে
.                হঠাৎ আলোর ঝলক পড়ে
.                  আঁধার ঘুচায় যেমন
তেমনি করে হঠাৎ আজি
.                 পড়লে মনে এখন !
মাগো আমার শেষকথাটি
.                 যাও গো তুমি শুনে
কবে আমার ঘুচবে বাঁধন
.                 মুক্তি পাব কবে ?
কবে তোমার চরণতলে
.                  এই ‘আমি’ লয় হবে ?
মা সারদা সরস্বতী,
.                  হৃদে জ্বালাও  জ্ঞানের জ্যোতি,
( আমার ) অন্ধকারে পথ চলাতে
.                  দাও টেনে দাও যতি !


********                *******                *********
এই কবিতাটি বেলুড় শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের পত্রিকা “উদ্বোধন”-এর ৯৮তম বর্ষ শ্রাবণ ৭ম সংখ্যায়
(১৪০৩, জুলাই ১৯৯৬), এ প্রকাশিত হয়েছিল

.                                                                                          সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
অকূল পথের যাত্রী    
দীপালী সেনগুপ্তা

ওরে পাখী যা নে রে তুই কূলা ছড়ি একা
এখনও যে সন্ধ্যারাণী দেয়নি তোরে দেখা ||
সন্ধ্যাতারা যে হয়নি উদয় পূব গগনের ভালে
পৃথ্বী ফাঁদে ভানুর ভালে কিরণরাজীর রশ্মীজালে ||
ঘুমিয়ে আছে মল্লিকা যুঁই পাতার আড়াল ঘিরে
চাঁদের আলোয় হাসলে ভূবন জাগবে ধীরে ধীরে ||
রাখাল ছেলের বাঁশীতে যে দিন হারানর সুর
সন্ধ্যারাগের সুর তোলেনি, সাঁঝ হয়নি যে ভরপুর ||
ধরার হাসি হয়নি যে রে বাতাস সুরভিত,
হাস্নাহানার গন্ধে পরাণ হয়নি আমোদিত ||
ধেনুর দল যাবে ধীরে আপন ঘরে ফিরে
যাবিরে তুই কেমনে হায় মায়ার ডোরে ছিঁড়ে ||
অবুঝ ওরে কোন পথে তুই জমাবিরে পাড়ি
অজানা ওই পথের পারে কে তোর দিশারী ?
ও বিহগী, বিহগ যে তোর কূলায় কাঁদে বসি
সংসারের এই মায়ার বাঁধন সব যাবে কী খসি ?

            
.               **************************               
এই কবিতাটি কবি, প্রিয় দিদি ( মায়া সেন ) এর  চির বিদায়ের পর ভারাক্রান্ত মনে
লিখেছিলেন |

.                                                                                     সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
সহস্রাব্দের অসি    
দীপালী সেনগুপ্তা

বন্ধু, চেয়েছ কেন "সহস্রাব্দের অসি"?
হে বন্ধু কেন? শতবর্ষের শত জটিলতার
ঘর্ষণে, ঘষে ঘষে হয়ে গেছে ক্ষয়,
কেন তারে চাও পেতে সহস্রাব্দেতে?
শত বরষের যুদ্ধের কত রক্তক্ষয়ের
করেছে রচনা | যুদ্ধের পরিণাম ধ্বংস লুণ্ঠন
ব্যাভিচার! তৈমুরলঙ্গের অসিরে ফিরিয়ে
আবার কেন চাও আনতে? যে দিয়েছে
শুধুই ধ্বংস লুণ্ঠন ব্যাধিচার |
নরপশু যত নৃশংসতায় শৃগাল গৃধিনী সম,
করেছে রচনা রক্তের আল্পনা |
নারী ধর্ষণে, মাতৃজঠরে ভ্রুণকে করেছে হত্যা |
চেওনা বন্ধু চেওনা সে "অসি" |
শ্মশানের বুকে শ্মশান-কালীর নৃত্যেরে কর স্তব্ধ |
শবের বুকে শিবেরে জাগাও, রুদ্রের রথ থামাও |
ধ্যানের মন্ত্রে কর সচেতন, অচেতন মূঢ় প্রাণ |
নরকাগ্নীর নিভাও আগুন, আগুনে ফুটুক ফুল |
দাও খুলে দাও স্বর্গের দ্বার, লয়ে স্বর্গের ফুল পারিজাতের
মৃত্যুঞ্জয়ী আশির্বাদ | "সহস্রাব্দের অসি"
হোক আজি অরিফিউসের বাঁশী!
মৃত্যুর পার হতে জীবনকে আনতে যে পারে ফিরায়ে |
সত্যম্ শিবম্ সুন্দরমের মন্ত্রে
উজ্জীবিত করতে পারে ধরিত্রীরে |
সে যে "অরিফিউসের" বাঁশী,
"সহস্রাব্দের অসি" নয়, অসি নয় |
         
.         **************************               
এই কবিতাটি শুভঙ্কর সম্পাদিত ১৪০৭ এর "সহস্রাব্দের অসি" নামক কবিতা সংকলনে
প্রকাশিত হয়েছিল |

.                                                                                     সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
.                                                                                     সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
.                                                                                     সূচিতে . . .   


মিলনসাগর