পায়ে পায়ে হারিয়ে গেছে যে জলরঙ-স্বপ্ন কি হবে তার মুখে অক্ষর-আলো এনে ? ঢেকে গেছে যে চাঁদ ছাই-ছাই মেঘে তাকে নীল ওড়না কেন আর ? যে হলুদ ফুল উড়ে গেছে মখমল কি হবে অক্ষর-বৃষ্টিতে ভিজে তার ? ফিরে গেছে যে নদী পাড় থেকে দূরে বৈশৈখী মেঘ কি দেবে তাকে আর ? অস্পষ্ট কুয়াশায় হেঁটে গেছে যে সকাল শিশিরপাতের শব্দে সে কি উঠবে আর জেগে ?
এন্ট্রান্স ডোরের নিচে আধ ইঞ্চি ফাঁক দিয়ে কখন ঢুকে পড়েছে ঘরে একেকজন একেক দিকে | সিলিং ফ্যানের পাশে ছাদে শুয়ে সার্কাস দেখায় সারাক্ষণ কেউ, কেউ বা দেওয়াল বেয়ে তরতর ছুটে চলে আড়ালে অন্য দিকে | বইএর আলমারি বা টিভির পেছনে কখনো | কখনো জানালার কাচে, যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি | ঘরময় একটি টিকটিকি ও তার পরিবার |
তিন কামরার ফ্ল্যাট কবে কখন কিভাবে যেন চলে গেছে দখলে তাদের | সারা ঘর অবাধ চলাফেরা, মাঝরাতে দেওয়ালে ফিসফাস, লফ্ ট-স্ল্যাবে হুটোপুটি | উদ্দাম সোনালি জীবন প্রতিদিন বাড়ছে তাদের | আর, আমি ভয়ে গুটিসুটি একপাশে একা, ঢুকে যাচ্ছি ডিপ ব্ল্যাকহোলে |
তোমার গন্ধে ভরে ওঠে আকাশ তোমার স্বপ্নে দেবদারু গাছ তোমাকে আমি নক্ষত্র দেখি তোমায় আমি রোদের মতো তুমি আমার হিরন্ময় আলো তুমি আমার হলুদ ভালোবাসা তুমি বৃষ্টি হতে পারো তুমি মেঘও হতে পারো তুমি জোনাকি হও যখন তুমি রোদ্দুর হও যখন তোমাকে দেবো আমি গন্ধরাজ-সন্ধ্যা তোমাকে দেবো আমি রাত্রিভর কবিতা
বৃষ্টিতে ভিজে যায় ঘর সেই ঘরে জ্যোত্স্না-রঙ ভালোবাসা তোমাকে আমি সূর্য দেখি তোমায় আমি ঢেউ-এর মতো তুমি আমার নীল দিগন্ত তুমি আমার অবিরাম জলপ্রপাত তুমি সমুদ্র হতে পারো তুমি নদীও হতে পারো তুমি পর্বত হও যখন তুমি অরণ্য হও যখন তোমাকে দেবো আমি অপেক্ষার ঝড় তোমাকে দেবো আমি উচ্ছল ঝর্ণা তোমাকে আমি আগুন হতে দেবো তোমাকে আমি দোয়েল হতে দেবো তোমাকে নিয়ে ভেসে যাবো আমি মেঘপাহাড়ে তোমাকে নিয়ে হেমবর্ণ বিকেল আমার
এভাবেই উলঙ্গ অক্ষরেরা ঈশিতা ভাদুড়ী ( শ্রদ্ধেয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্যে )
তোমার হাতের তালুতে . উলঙ্গ অক্ষরেরা . করে বসবাস-----
তুমি তাদের নিয়ে স্নানঘরে যাও, . মাখাও নতুন সাবান, . জামা পড়াও তাদের গায়ে, . তারপর তুমি ওড়াও ঘুড়ি----- আর, হাওয়াতে উড়তে উড়তে . অমলকান্তি . এসে পড়ে আমার ঘরে, . যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল |
তোমার হাতের তালুতে . উলঙ্গ অক্ষরেরা . করে বসবাস----
যে সব নির্ভুল সমীকরণে পেয়েছো . পুষ্পস্তবক সেই নির্ভুল অঙ্কের ব্যাখ্যা জানে . আরও কেউ কেউ, কিভাবে নিমগাছে কৃত্রিম বকুল-গন্ধ ----- কিভাবে প্রখর সূর্যতাপেও আনা যায় . দুরন্ত বৃষ্টি------ কিভাবে মরা নদীতে বানের ছবি------ সেই সব নির্ভুল সমীকরণের . একটা অন্য অঙ্ক আজ |
যে তোমাকে দিয়েছে পুষ্পস্তবক, যে তোমাকে দিয়েছে মানুষের ভুল ছবি, সেই নির্ভুল গণিত কোনোদিন যদি হারিয়ে যায় নির্জন নদী-পাড়ে, যদি প্রবাসী হয় কোনো গভীর অরণ্যে, সেইদিন নিমগাছে নিমফুল আর, মরা নদীতে শুষ্ক চর সেইদিন কোনো সমীকরণ, অথবা, কোনো গুণ-ভাগ ছাড়াই কবিরা কবি হয়ে উঠবে,
সেইদিন গ্রন্থে বিশুদ্ধ ধারাপাত, সেইদিন রামধনুর নিজস্ব রঙ----
মৃত্যুর পরে প্রিয়জনের মুখও যেভাবে ভুলে যাওয়া যায় ঠিক সেইভাবে, কি তার চেয়েও আরো সহজভাবে আমি একটি শহরকে ভুলে যেতে চাই | সেই শহরের মানুষজন, প্রত্যেকটা গলি, মোড়ে মোড়ে বাতিস্তম্ভ------ কোলকাতার সমস্ত খুঁটিনাটি আমিও ভুলে যেতে চাই |
সদ্য কিশোরটি সুন্দর আঙুলে তার ঠিকানা লিখে বলেছিলো : যমুনাদি চিঠি লিখো ; হাসপাতালের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সেই কিশোর তাকিয়েছিল এক নিমেষে, পরমুহূর্ত্তেই স্বপ্নে হাহাকার চাহনি জানালার বাইরে----------- হয়তো সে ভেবেছিল, হাসপাতালের দরোজা পার হয়ে যমুনাদি তার কথা রাখবে না | হয়তো সে ভেবেছিল------ কিন্তু সেই কিশোর নিজেই কথা রাখে নি | সবুজ-পালক চিঠির জন্যে না দাঁড়িয়ে হাসপাতালের জানালা ভেঙ্গে সেই তাজা কিশোর এক লাফে আকাশে উঠে গেছে |
চাঁদ আর নক্ষত্রেরা কি পৃথিবীর চেয়েও বেশী স্নেহ দিতে জানে ?
তবে কেন ‘য়মুনাদি চিঠি লিখো’ বলে অন্য ঠিকানায় চলে গেল সেই উজ্জ্বল কিশোরটি ?