কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতা
*
হাফিজের স্বপ্ন
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অমা-যামিনীর গহন আঁধারে চুপি চুপি এল প্রিয়া,
দ্বিগুণ-আঁধার খর্জ্জুর বীথি, তাহারি আড়াল দিয়া !
আঙুরের মত অলকগুচ্ছে গোলাপের মালা পরি’,
মৃদু উশীরের মদির গন্ধে নিশীথ আকাশ ভরি’
কাজল-উজল কালো কটাক্ষে হানিয়া বিজলী-হাসি,
ফেরোজা রঙের বসন পরিয়া শিথানে দাঁড়া’ল আসি’ !----
বীণানিন্দিত মধুরকন্ঠে কহিল ---রে অনুরাগী,
শূন্যশয়নে আমারে মাগিয়া জাগিয়া কিসের লাগি ?
করুণা তাহার হৃদয়ে হানিল সুখের মতন ব্যথা,
যুড়ি’ যোড় পাণি বিগলিত-বাণী কন্ঠে কহিনু কথা,----
তব অঞ্চল বসন্তবায়ে হৃদয়ে যে ফুল ফুটে,
তব মঞ্জীরসঙ্গীতরবে হৃদয়ে যে ধ্বনি উঠে,-----
তাহারি গন্ধে, তাহারি ছন্দে রচিয়া গজল-গীতি
তোমারি কুঞ্জ-দুয়ারে গাহিয়া শুনাইব নিতি নিতি ;
নাহি চাই খ্যাতি, যশে কাজ নাই, চাহিনাক ধনমান,
তোমার স্তবের যোগ্য করিয়া শিখাইয়া দাও গান |
না কহিয়া কথা, না বলিয়া কিছু----- লীলায়িত হেলাভরে
সেতারটি শুধু লইল টানিয়া কোমল বুকের পরে ;
অঙ্গুলিঘাতে তারগুলি তা’র সঙ্গীতে ভরি’ দিয়া
আমার কোলের সঙ্গীটি মোরে ফিরাইয়া দিল প্রিয়া !
গোলাপের কুঁড়ি তখনো ভাবেনি ফুটিতে হইবে কিনা,
ডানার মাঝারে মাথাটি গুঁজিয়া চাতকী চেতনাহীনা  ;
অমা যামিনীর গভীর আঁধারে মিলাইয়া গেল প্রিয়া-----
শিশির-শীতল খর্জ্জুর-বীথি,  তাহারি ভিতর দিয়া !
তার পর হ’তে বাজিছে সাহানা সোহিনী সিন্ধু কাফি,
সাথে সাথে সেই পরম পরশ উঠিতেছে কাঁপি’ কাঁপি’ ;
তালে তালে উঠে দুলে , দুলে’ তারি হৃদয়েরি আকুলতা,
সুরে সুরে সদা ঘুরে’ ঘুরে’ ফিরে তাহারি গোপন কথা !


.                    ***********           
.                                                                                            
উপরে    




মিলনসাগর
*
নাগকেশর
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী


চিত্ততলে যে নাগবালা ছড়িয়ে ছিঁড়ে কেশের কেশর কাঁদছে-----
অফুরন্ত অশ্রুধারা সহস্রবার নাসার বেশর বাঁধছে ;
মানিক-হারা পাগল-পারা যে বেদনা বাজছে তাহার বক্ষে,
পলে-পলে পলক বেয়ে অলক ছেয়ে ঝরছে যাহা চক্ষে ;
দুঃখে-ভাঙা বক্ষে যাহা নিশ্বসিয়া সকাল-সাঁঝে টুটছে----
মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে !

মন-পাতালে যে নাগবালা রতন-জ্বালা কক্ষে ব’সে হাসছে----
দীপ্তি যাহার নেত্রপথে শুভ্র-শুচি দৃষ্টি হয়ে আসছে ;
মুক্তামানিক সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে উল্লাসে যে চঞ্চল,
উদ্বেলিত সিন্ধুসম দুলছে যাহার উচ্ছৃসিত অঞ্চল ;
বিশ্বভুবন পূর্ণ ক’রে যে আনন্দ শঙ্খস্বরে উঠছে-----
মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে |

.                    ***********           
.                                                                                            
উপরে    




মিলনসাগর
*
কলঙ্ক
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর------
কলঙ্কী মন, চেয়ে দেখ্ আজি সঙ্গী মিলেছে তোর |
.           দিবা অবসান, রবি হ’ল রাঙা,
.           পশ্চিমাকাশে নট্ কনা -ভাঙা ;
সঙ্গহীনের যাহা কিছু কাজ সাঙ্গ করেছি মোর,
কুঞ্জদুয়ারে ব’সে আছি একা কুসুমগন্ধে ভোর !

আধফুটন্ত বাতাবিকুসুমে কানন ভরিয়া আছে,----
কি গোপন কথা গুঞ্জরি’ অলি ফিরিছে ফুলের কাছে !
.            ফুটনোন্মুখ ফুলদলগুলি
.            পুলক-পরশে উঠে দুলিদুলি
গন্ধভিখারী সন্ধ্যার বায় ফুলপরিমল যাচে-----
সঙ্কোচে নত পুষ্পবালিকা---অতিথি ফিরে বা পাছে !

বেলা বয়ে যায়, সন্ধ্যার বায় আসি’ কহে বার বার,
সন্ধ্যা হয় যে অন্ধ কুসুম-----খোলো অন্তর-দ্বার !
.               মুকুলগন্ধ অন্ধ ব্যথায়
.            কুঁড়ির বন্ধ টুটিবারে চায়,
লুটাইতে চায় সন্ধ্যার পায় রুদ্ধ আবেগভার,
বিকাইতে চায় চরণের পরে কৌমার সুকুমার |

মন্থরপদে সন্ধ্যা নামিছে কাজলতিমিরে আঁকা,
দুয়ারে অতিথি, অন্তরে ব্যথা--- সম্ভব সে কি থাকা ?
.              গন্ধে পাগল অন্তর যার,
.              আবরণ মাঝে থাকে সে কি আর,
খুলি’ দিল দ্বার, পরান তাহার পরাগে-শিশিরে মাখা ;
কুঞ্জ ঘিরিয়া আঁধারে ছাইল স্বপ্নপাখীর পাখা |

বাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর----
হা রে কলঙ্কী হৃদয় আমার, সঙ্গী মিলেছে তোর |
.              দূরদিগন্তে দিবা হল সারা ;
.              অন্তর ভরি ফুটে’ উঠে তারা,
নব-ফুটন্ত নেবুর গন্ধে আসিল তন্দ্রাঘোর-----
কলঙ্কী প্রেম, মুগ্ধ হৃদয়-----একই পরিণাম তোর ||



.                    ***********           
.                                                                                            
উপরে    




মিলনসাগর
*
অন্ধ বধূ
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী


পায়ের তলায় নরম ঠেকল কি!
আস্তে একটু চল না ঠাকুর-ঝি---
.        ওমা, এযে ঝরা-বকুল! নয়?
তাইত বলি, বসে' দোরের পাশে,
রাত্তিরে কাল---মধুমদির বাসে
.        আকাশ-পাতাল কতই মনে হয় |

জ্যৈষ্ঠ আসতে কদিন দেরী ভাই---
আমের গায়ে বরণ দেখা যায়?



---অনেক দেরী? কেমন করে' হবে!
কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে,
.        দখিণ হাওয়া---বন্দ কবে ভাই ;
দীঘির ঘটে নতুন সিঁড়ি জাগে---
শেওলা-পিছল---এমনি শঙ্কা লাগে,
.        পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই!

মন্দ নেহাৎ হয় না কিন্তু তায়---
অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে' যায়!



দুঃখ নাইক সত্যি কথা শোন্,
অন্ধ গেলে কি আর হবে বোন?
.        বাঁচবি তোরা---দাদা ত তোর আগে ;
এই আষাঢ়েই আবার বিয়ে হবে,
বাড়ী আসার পথ খুঁজে' না পাবে---
.        দেখবি তখন প্রবাস কেমন লাগে?

---কি বল্লি ভাই, কাঁদবে সন্ধ্যা-সকাল?
হা অদৃষ্ট, হায়রে আমার কপাল!



কত লোকেই যায় ত পরবাসে---
কাল-বোশেখে কে না বাড়ী আসে?
.        চৈতালি কাজ, কবে যে সেই শেষ!
পাড়ার মানুষ ফিরল সবাই ঘর,
তোমার ভাইয়ের সবই স্বতন্তর---
.        ফিরে' আসার নাই কোন উদ্দেশ!

---ঐ য়ে হেথায় ঘরের কাঁটা আছে---
ফিরে' আসতে হবে ত তার কাছে!



এইখানেতে একটু ধরিস ভাই,
পিছল ভারি --- ফস্ কে যদি যাই---
.        এ অক্ষমার রক্ষা কি আর আছে!
আসুন ফিরে'---অনেক দিনের আশা,
থাকুন ঘরে, না থাক্ ভালবাসা---
.        তবু দুদিন অভাগিনীর কাছে!

জন্মশোধের বিদায় নিয়ে ফিরে'---
সেদিন তখন আসব দীঘির তীরে |



"চোখ গেল" ঐ চেঁচিয়ে হ'ল সারা!
আচ্ছা দিদি, কি করবে ভাই তারা---
.        জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ!
কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার---ছাই!
কাঁদতে পেলে বাঁচত সে যে ভাই,
.        কতক তবু কমত যে তার শোক!

"চোখ গেল" ---তার ভরসা তবু আছে---
চক্ষুহীনার কি কথা কার কাছে!



টানিস কেন? কিসের তাড়াতাডি---
সেই ত ফিরে' যাব আবার বাড়ী,
.        একলা থাকা সেই ত গৃহকোণ---
তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে
দুটো যেন প্রাণের কথা বলে---
.        দরদ-ভরা দুখের আলাপন ;

পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মত
ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত!



এবার এলে, হাতটি দিয়ে গায়ে
অন্ধ আঁখি বুলিয়ে বারেক পায়ে---
.        বন্দ চোখের অশ্রু রুধি' পাতায়,
জন্ম-দুখীর দীর্ঘ আয়ু দিয়ে
চিরবিদায় ভিক্ষা যাব নিয়ে---
.        সকল বালাই বহি আপন মাথায়!

দেখিস তখন, কাণার জন্য আর
কষ্ট কিছু হয়না যেন তাঁর |


তার পরে---এই শেওলা-দীঘির ধার---
সঙ্গে আসতে বলবো নাক আর,
.        শেষের পথে কিসের বল' ভয়---
এইখানে এই বেতের বনের ধারে,
ডাহুক-ডাকা সন্ধ্যা-অন্ধকারে---
.        সবার সঙ্গে সাঙ্গ পরিচয়!

শেওলা-দীঘির শীতল অতল নীরে---
মায়ের কোলটি পাই যেন ভাই ফিরে'!


.              ***********           
.                                                                                            
উপরে    




মিলনসাগর
*
সরোবরে সন্ধ্যা
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শরাস্তৃত সরোবর ; তীরে তীরে তারি তালিবনশ্রেণী ;
শ্যামল-সরসী-শিরে পদ্ম-বিভূষণা শৈবালের বেণী।
ধীরে নামে সন্ধ্যাসতী ধূসর অম্বর অঞ্চলে লুটায়ে,
ঝিল্লীর মঞ্জীর-মালা ঝিম-ঝিম বাজে পায়ে-পায়ে!


জনশুন্য দুটি তীর---ধীবর-সন্তান গেছে ঘরে ফিরে,
ডোঙাগুলি কুলে-বাঁধা শিহরিয়া কাঁপে সন্ধ্যার সমীরে ;
গোধন গুছায়ে লয়ে নিভ-নিভ হ’তে গোধূলি-আলোক,
ফেলিয়া কলার ভেলা, ঘরে ফিরে’ গেছে রাখাল বালক।


নিভৃত কুলায়ে দিল মরালের দল শেষ-পাখাঝাড়া,
নিঃসঙ্গ মরাল শিশু চিত্কারিছে দূরে হ’য়ে দলছাড়া ;
ধূসর আকাশপটে তরঙ্গিয়া দিয়া ভ্রূবঙ্কিম রেখা---
অস্পষ্ট নক্ষত্রালোকে বাদুড়ের শ্রেণী ঊর্ধ্বে দিল দেখা।


সিক্ত শৈবালের গন্ধে পূর্ণ হ’য়ে উঠে সন্ধ্যার বাতাস ;
হিমসিক্ত শস্যক্ষেত্র তারি সাথে ফেলে দিনান্ত-নিশ্বাস।
জলে স্থলে নভস্তলে মোহিনী সন্ধ্যার নির্বাক মন্তরে---
অশরীরী কল্পযন্ত্রে শান্তিরসধারা ঝর-ঝর করে।


.                    ***********           
.                                                                                            
উপরে    




মিলনসাগর