--- গেরুয়া পাঞ্জাবী আর পাজামায় আপাদমস্তক কাক ভেজা হয়ে দরজা ঠেলে যিনি এই আর্জি নিয়ে উপস্থিত হলেন ---- তিনি সবার ‘বটুকদা’, --- আমাদের ‘বটুক জ্যেঠু’, --- স্বনামধন্য জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র |
---- ৭০-৭১ সাল হবে, --- সারা দিল্লী শহর ভেসে যাচ্ছে ---- বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি | বেলা প্রায় একটা | দুপুরের সংক্ষিপ্ত রান্না অনেকক্ষণ আগেই শেষ --- কারণ রান্নাঘরে জল থৈ-থৈ | সে জলের জাত বিচার করতে করতে আর তাকে ঝেঁটিয়ে বাইরে পাঠাবার বৃথা পরিশ্রম করতে করতে এমনিতেই মামনির মেজাজ সপ্তমে ; তার উপর বেলা একটায় এরকম খিচুড়ির আবদার স্বভাবতই মামনির কানে খুব শ্রুতিমধুর ঠেকে নি ; কিন্তু কিছু করারও নেই যে | ---মানুষটা যে ‘বটুকদা’ ! অতএব পায়ের তলায় জল বাড়লেও উপরে গ্যাসে হাঁড়িতে খিচুড়িও চাপল ! তার পর রাত পর্যন্ত বটুকজ্যেঠু , গান, আড্ডা আর আমরা সবাই |
তা এই বটুকজ্যেঠুর কাছেই আমার গানের হাতেখড়ি | তখন কতই বা বয়স আমার---- এগারো --বারো বছর ! তখনও বটুকজ্যেঠুর কর্মব্যাপ্তি, তাঁর পরিচিতির জগত সম্পর্কে কোনও ধারনাই ছিল না | গণনাট্য, আই.পি,টি.এ ইত্যাদি শব্দবন্ধ তখনও পর্যন্ত আমাদের মানসচেতনায় তেমন নাড়া দিয়ে উঠতে পারে নি |আমার বড়কাকা ডঃ নীলরতন সেন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত, ছোটকাকু ডঃ নবেন্দু সেনও দিল্লী সান্ধ্য কলেজে অধ্যাপনা করেন | সেই সূত্রে বাড়ীতে প্রচুর বড় বড় মানুষের আনাগোনা | কিন্তু তাঁরা সবাই তো আমাদের কাছে সাধারণ কাকু জ্যেঠু হিসাবেই পরিচিত ছিলেন | এই রকম ঘরোয়া পরিবেশেই আমি ও আমার খুড়তুতো ভাই ( শ্রীমান নীলাঞ্জন --বর্তমানে কুয়েতে কর্মরত ) এই জ্যেঠুকে পেয়েছি নানাভাবে |
ছোট বয়সে আমাকে গান শেখানোর ব্যাপারে বাবা-কাকাদের কখনও চিন্তার প্রয়োজনই পড়ে নি----কারণ তাঁদের হাতের কাছে তাঁদের শ্রদ্ধেয় ‘বটুকদা’ সদাই হাজির | অতএব জ্যেঠুর গানের স্কুলে অবারিত দ্বার | বাবা কাকাকে বহুবার বলতে শুনেছি ‘রবীন্দ্র সঙ্গীতে বটুকদার মতো “অথেন্টিক” মানুষ খুব কমই আছেন’ | তখন তো জানতাম না, পরে জেনে ‘শিহরিত’ই হয়েছি বলা যায় যে ইন্দিরা দেবী, সরলা দেবী ও দিনুঠাকুরকে বটুকজ্যেঠু পেয়েছেন তাঁর রবীন্দ্র সঙ্গীত গুরু হিসাবে | প্রচার বিমুখ এই মানুষটির সম্ভবতঃ মাত্র একখানি রেকর্ড বেরিয়েছিল রবীন্দ্র সঙ্গীতের --- একপিঠে “জগতে আনন্দযজ্ঞে” ও অপরপিঠে “এ ভারতে রাখো নিত্য” | যাই হোক,স্থায়ী কোন আস্তানার অভাবে নানান জনের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে জ্যেঠুর গানের ক্লাস চলত | বড়দের ও ছোটদের --- দুটি গ্রুপে গান শেখাতেন | অপেক্ষাকৃত কঠিন গানগুলি বড়দের দেওয়া হত | স্বাভাবিক কারণেই আমরা ওগুলি শিখতে চাইলেও পেতাম না | তখন তো অত বুঝতাম না-গাওয়ার আনন্দেই গান গাইতাম | মাঝে মাঝে অভিমানও হত |
ওঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিমও যে সব বড় বড় গুণীজনদের আশীর্বাদধন্য--- তাঁদের মধ্যে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অন্যতম | এসব তথ্য অনেক পরে জেনেছি | একবার, মনে পড়ে এই বর্ষার দিনেই কোনও বড় একটা অনুষ্ঠান যার পরিচালনার ভার ছিল স্বয়ং জ্যেঠুর হাতেই ; --- সম্ভবত দীপালী নাগ--এরই সম্বর্ধনা (মূল অনুষ্ঠানটির কথা ঠিক মনে পড়ে না) ছিল, সেখানে আমাদের বালখিল্যর দল একটা সুযোগ পেয়েছিলাম---- সমবেত সঙ্গীতে--- “ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে” গানটি গাওয়া হয়েছিল | ওঁর ছোট মেয়ে “মিতু”, ভাল নাম সুস্মিতা-ও আমাদের সঙ্গে গেয়েছিল ; সেও আমারই সমবয়সী হবে |
এই গান পাগল মানুষটি আবার দরুণ মজারও ছিলেন | একবার করোলবাগ থেকে (বঙ্গীয়সংসদ থেকেই কিনা মনে নেই ) বাস ভাড়া করে “সূরযকুন্ডে” পিক্ নিকে যাওয়া হ’ল | সারা বাস উনি নানা রসিকতায় ও হুল্লোড়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন ---“ কে রে বাগানে”--- গানটা এখনও মনে পড়ে! সে সব গান যা ছিল --- শুনলে এখন অশ্লীলতার দায়ে বোধকরি ধরা পড়তে হত | কিন্তু এইসব গান গুলির জন্যই যেন সেই পিকনিক চিরস্মরণীয় হয়ে রয়ে গেছে |
দিল্লীতে ওঁর প্রভূত কর্মকান্ডের একটি ছিল বিখ্যাত “রামলীলা” ব্যালে | ভারতীয় কলাকেন্দ্রের তরফে ওঁর এই প্রযোজনার খ্যাতি লোকের মুখে মুখে ফিরত |
একটি ঘটনার (ঘটনা না বলে দুর্ঘটনা বলাই ভাল) জন্য আজও আমাদের আফশোষের শেষ নেই | আমার কাকার কাছে তখনকার দিনের বড় বড় স্পুলঅলা একটা বিদেশী টেপ রেকর্ডার ছিল | সেটা চালিয়ে বহুবার আমরা জ্যেঠুর বিখ্যাত “মধুবংশীর গলি” র স্বকন্ঠে আবৃত্তি শুনতাম | তখন ঐ বয়সে সব বোঝার ক্ষমতা না হলেও ওটার যে একটা মাদকতা আছে ---সেটা খুব টের পেতাম | কাকা ওটা চালালেই আমরা অন্য সব ছেড়ে দৌড়ে এসে বসে পড়তাম | কিন্তু আমরা যখন কল্যাণীতে, তখন সেখানে একবার বড়সড় চুরি হয়ে গেল | সেই সঙ্গে কাকার বেশীর ভাগ প্রয়োজনীয় রেকর্ডিং সহ রেকর্ডারটি চোরের খপ্পরে চলে গেল | চোরের তাতে কী লাভ হয়েছিল বলতে পারি না, আমাদের ক্ষতি হয়েছিল অপরিমেয় | তবে যতদূর মনে পড়ে তার আগেই একবার আকাশবাণীর অনুরোধে বোধকরি ঐ রেকর্ডিং তাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল ; হয়তো তাদের কাছে থাকলেও থাকতে পারে সেই দুর্মূল্য সংগ্রহ !
এই কর্মনিষ্ঠ, প্রাণোচ্ছল পরিহাসপ্রিয় মানুষটির ভিতর যে এক আদিম অরণ্যের টান ছিল, যে মুক্তির ব্যাকুলতা ছিল, তার আভাস পেয়েছিল আমার ভাই নীলাঞ্জন --- তাঁর বড় আদরের ‘নাইটজার’ | প্রায় প্রতি রবিবার সকালে জ্যেঠু চলে আসতেন আমাদের বাড়ী | ওকে নিয়ে দিল্লীর ‘রিজ’ এ চলে যেতেন | সেখানে একবার ‘নাইটজার’ পাখী দেখে ভাই খুব মজা পায়| দেখতে নাকি তেমন সুন্দর ছিল না, তবু এক অজ্ঞাত কারণে ও বারে বারে ঐ পাখীটিকে দেখতে চাইত | সেই থেকে ওকে উনি ‘নাইটজার’ নামে ডাকতেন | ওকে নিয়ে নিয়ে জ্যেঠু যে কত জায়গায় কত পাখী দেখে (বার্ড ওয়াচিং) এবং চিনিয়ে বেড়াতেন তার ঠিক নেই | ভাই ও নানান পাখীর পালক কুড়িয়ে কুড়িয়ে এনে এনে জমা করত | জ্যেঠু তো রীতিমত একজন পক্ষী-বিশারদ ছিলেন | তাঁর এই পক্ষী প্রেম ছায়া ফেলেছে তাঁর ‘কোতোয়াল’ গল্পটিতে | পাখীর ডানার মুক্তির ডাক তাঁকে সত্যিই মাঝে মাঝে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত | থেকে থেকেই জ্যেঠু উধাও হয়ে যেতেন কয়েকদিনের জন্য | কারও কাছে কোনও খবর থাকত না | প্রথমদিকে জ্যেঠিমা উদ্বিগ্ন হতেন ; শেষ দিকে বোধকরি হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন | তিন- চারদিন পরে জ্যেঠু নিজেই ফিরে আসতেন |
কিন্তু এই বাঁধন-ছেড়ার ডাক যে তাঁর জীবনে কতখানি অমোঘ ছিল ; তা তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে গেলেন সবাইকে | ১৯৭৭ সালে হায়দ্রাবাদে তাঁর ছেলের কাছ থেকে ফেরার পথে ট্রেনের বার্থেই তাঁর মৃত্যু ঘটে | এবারে আর ফেরা হ’ল না ; সত্যিই এ জগতের বাঁধন ছিঁড়লেন | গণমুক্তির সাধক হয়তো এমন মুক্তিই চেয়েছিলেন !
************
সাগরিকা সেনগুপ্তর গানের হাতেখড়ি হয় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর হাতে। পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় এসে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখেন "রবিতীর্থ"-এ সুচিত্রা মিত্র এবং সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। মিলনসাগরে সাগরিকা সেনগুপ্তর গানের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।