কবি জ্যোতির্ময় পোদ্দারের কবিতা
অসময়
কবি জ্যোতির্ময় পোদ্দার

প্রখর রোদ, গলির মোড়ে পাঁচিলের গা-ঘেষা একটু ছাওয়ায়-
টানা রিক্সার উপর ঘুমোচ্ছে তার চালক,
রাস্তা জনবিরল, বেতো পায়ে লাঠি ভর করে চলা-
ধুতির খুঁটে মুছি কপালের ঘাম |

ক্লাস ভর্তি ছাএ, গ্রীষ্মের নিঃসার দুপুর সিলিংএ  স্তব্ধ   প্রাণহীন ফ্যান-
বোর্ডে জ্যামিতির অনুশীলন,
চিল চিত্কারে বলি ফিনিশ ইট ফাস্ট !
ধুতির খুঁটে মুছি কপালের ঘাম |

জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে যৌবন, এবং বহু প্রিয়জন
স্কুলে যেতে হয় না আর,
নিয়ে আছি কিছু স্মৃতি, কিছু মুখ আর টিউশন |
সুভাশীষ, অমল, সত্যেন, অভিজিত্ ও আরো অনেকের
উজ্জ্বল মুখ, জীবনের সুখ-নারী বাড়ী ও ঐশ্বর্য |

একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায় গলির অন্যদিকে
কমলিকাদের বাড়ীর গেট ছাড়িয়ে অল্প দূরে-
নেমে আসে পাঁচ যুবক, সুভদ্র-সুবেশী বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশ, বড়জোর
দুপায়ে ভর দিয়ে পাঁচিল টপকে একজন ঢুকে যায় কমলিকাদের বাড়ী-
কমলিকা আমার প্রিয়, কলেজ ছাত্রী |

মৃদু পায়ে, ধীর লয়ে প্রবেশ করি আমি,
ক্ষিপ্র যুবকদের হাতে উদ্যত বন্দুক, চায় অবারিত দ্বারে সিন্দুক
মুখ ভর্তি দাড়ি, শান্ত চোখ, দৃঢ় চোয়াল -
এ মুখ আমার চেনা, কৌশিক -
আমাদের স্কুলের চুরানব্বই-এর মাধ্যমিকের সেরা ছাত্র |
ধুতির খুঁটে মুছি কপালের ঘাম |

গ্রীষ্মের দ্বিপাহরিক নিদ্রালু গৃহে হঠাত্ অনাহুত অতিথির প্রবেশ,
বর্ধিত রক্ত চাপ, অনাবশ্যক বৃদ্ধ চরিত্রকে সতর্ক বেষ্টন -
দীর্ঘশ্বাস ঘুরপাক খায় গ্রীষ্মের গরম বাতাসে,
শেষ পর্যন্ত কৌশিকও...
চিল চিত্কার কানে আসে- ফিনিশ হিম ফাস্ট !
ধুতির খুঁটে মুছি কপালের ঘাম |

.            ****************               
.                                                                                    
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
শেষ নেই
কবি জ্যোতির্ময় পোদ্দার

বৃষ্টি তোমাকে দিলাম, আমার যত ব্যর্থ ভালবাসা
ফোঁটায় ফোঁটায় ধুয়ে নাও, এই ভালবাসার গ্লানি |
পরিশুদ্ধ করে বয়ে নিয়ে যাও সমুদ্রের বুকে, তারপর,
...তারপর আবার পৃথিবীর নিয়মে-
অঝোর ধারায় ঝরিয়ে দাও তাদের বুকে
যারা ব্যর্থ ও অপসৃত...
তাদের শক্তি দাও আবার উঠে দাঁড়াবার-
আবার ভালবসার |
বৃষ্টি তোমাকে দিলাম . . .

.       ****************               
.                                                                                    
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অনেক দিন বাদে
কবি জ্যোতির্ময় পোদ্দার

মনে আছে রাই
শেষ কবে কেঁদেছিলে আমার জন্য ?
না, আজ তোমার মনে পড়ার কথা নয় -
সময়ের পথের বাঁকে, বাস্তবের প্রয়োজনে,
অন্য কারোর ভালোবাসায় তুমি আজ আত্মবিস্মৃত |

মনে আছে
বালিকা রাই, কৈশোরের রাই, প্রথম যৌবনের রাই,
আজ শুধুই আমার স্মৃতিতে বিধৃত...
এখন আমি শুয়ে আছি শ্বেত ফুল, মালা সজ্জিত খাটে,
চারিদিকে শুধু উগ্র ধূপ আর রজনীগন্ধার ঘ্রাণ |

রাই আজ -
চোখ বুজেও দেখতে পাচ্ছি চারিদিক -
সূর্য মধ্য গগনে, চার বেহারার পাল্কীতে এর আগে চড়িনি কখনো
এত ফুল, এত গন্ধ, এত কলরব, এত চঞ্চলতা, তবু এর-ই মাঝে
কাঁদে দু-এক জন........ইহজীবনের সম্পর্ক |
বেলা শেষ হয়ে এল...চোখের জলও...

রাই আজ -
তুমি কি একবারও কাঁদবে না ?
নগর প্রান্তরের, গোধূলির শ্মশানের চিতা থেকে -
কুন্ডলি পাকানো ধোঁয়া হয়ে
বাতাসের হাত ধরে, পৌঁছে যাবো তোমার কাছে |
তোমাকে আবার কাঁদাবো বলে...
.       ****************               
.                                                                                    
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
রোববার
কবি জ্যোতির্ময় পোদ্দার

সাড়ে ছটা, অস্তমিত সূর্য,
লেকের ধারে একা -
জলে ঢেউ নেই, লোকও নেই
হাতে জ্বলে সিগারেট, ভিতরে মনও |

সকালে বাজারে, থলি হাতে,
ভোরের বাতাসে দোকানির খিঁচমিচ -
দোকানে পসার আছে, পকেটে টাকাও
শুধু মনে পড়ে আজ বড় একা |

অলস দুপুর বর্ষার শুরু,
মেঘরোদ্দুরের লুকোচুরির সাথে টিভিতে চোখ,
খেলা, স্বল্পবাসে নাচ, হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিতা,
এদের মাঝে খুঁজে দেখি -
সবই বড় একা |

রাত নামে সিরিয়ালে, টিভির পর্দায়
চলে যায় একটা রোববার |
কি কি যেন সব করব ভেবেছিলাম -
কাকে যেন ভালবাসবো ভেবেছিলাম -
খোথায় যেন যাব ভেবেছিলাম |

কিন্তু দিনের শেষে,
একা আমি -
রাতের আঁধারে পড়ে থাকে শুধু শূন্যতা
হাতে জ্বলে সিগারেট, ভিতরে মনও |

.           ****************               
.                                                                                    
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*