| কবি কালিদাস রায়ের কবিতা |
| শরতে কবি কালিদাস রায় ছুটির খবর এসেছে আজ নীল আকাশের পথে ! ও ভাই ছুটী - ছুটী - ছুটী, আয়না - চোখে দেখনা - ওকে অরুণ আলোর রথে সোনা - ছড়ায় মুঠি - মুঠি ! তরু লতায়, পাখীর নীড়ে, হর্ষে জড়াজড়ি সারং - বাজছে বনে বনে, নূতন নূতন পোষাক পরে' মেঘ আকাশের পরী কেমন - সাজছে খনে খনে | খবর আসার আগেই এল গুপ্ত সুড়ং ধরি' ছুটী - আজ যে মনে মনে, কে জানালো ফুলকলিদের, ফুট্ ল কানন ভরি' যারা-করত ফুটি-ফুটি-- ও ভাই - ছুটী - ছুটী - ছুটী | কোণা হতে আয় বেরিয়ে সোনা কুড়াই ভাই, আয় - গায়ে মাঠে মাঠে, বাতাবি-বন মাতাবি-কে ? শিউলি বোঁটা চাই ? আয়-বনের বাটে বাটে | ঢেউয়ের তালে দুবল আজি, কলার ভেলা বাই, আয় - নদীর ঘাটে ঘাটে, কাশের বনে হাঁসেন সনে কণ্ঠ ছেড়ে গাই, আয় - করব লুটোপুটি ও ভাই - ছুটী - ছুটী - ছুটী | চাইনা মোরা পায়ে জুতো - চাইনা মাথায় ছাতা, বনে - ঘুরবো ছায়ে ছায়ে, সাঁতার কেটে দীঘির জলে মুছব না আজ মাথা, রোদে - শুকাক্ বায়ে বায়ে | ফেলবো ছুঁড়ে আজকে শেলেট অঙ্ক কষার খাতা তারা - লুটুক পায়ে পায়ে, সরল-ভূগোল, নীতিকুসুম, ধারাপাতের পাতা ছিঁড়ে - করব কুটি কুটি ও ভাই - ছুটী - ছুটী - ছুটী | আয়না সবাই দেখনা ও ভাই কে ওই অরুণ রথে সোনা - ছড়ায় মুঠি - মুঠি | ছুটির খবর পেয়েছি আজ নীল আকাশের পথে ও ভাই - করব ছুটোছুটি -- | . *********************** সূচিতে . . . মিলনসাগর |
| দু-দিন একত্রে মাতে, মেলে-মেশে, বসে গাঁথে নীতি-হার আর কথা-মালা | রাজপথে দেখা হলে কেহ যদি গুরু বলে হাত তুলে করে নমস্কার, বলি তবে হাসিমুখে--- "বেঁচে-বর্তে থাকো সুখে," স্পর্শ করি কেশগুলি তার | ভাবিতে-ভাবিতে যাই--- কি নাম? মনে তো নাই, ছাত্র ছিল কত দিন আগে ; স্মৃতি সূত্র ধরি টানি, কৈশোরের মুখখানি দেখি মনে জাগে কি না জাগে | ঘন-ঘন আনাগোনা কতদিন দোখাশোনা, তবু কেন মনে নাহি থাকে? "ব্যক্তি" ডুবে যায় "দলে", মালিকা পরিলে গলে প্রতি ফুলে কে বা মনে রাখে? এ জীবন ভেঙে-গড়ে শ্যামল-সরস করে ছাত্রধারা বয়ে চলে যায়, ফেনিলতা-উচ্ছলতা হয়ে যায় তুচ্ছ কথা, উত্তালতা সকলি মিলায় | স্বচ্ছতায় শুধু হেরি আমার জীবন ঘেরি ভাসে শুধু ম্লান মুখগুলি ; ভুলে যাই হট্টগোল অট্টহাসি-কলরোল, ম্লান মুখ কখনো না ভুলি | কেহ বা ক্ষুধায় ম্লান, কেহ রোগে ম্রিয়মান, শ্রমে কারো চাহনি করুণ, কেহ বা বেত্রের ডরে বন্দী হয়ে রয় ঘরে, নেত্র কারো তন্দ্রায় অরুণ | কেহ বাতায়ন-পাশে চেয়ে রয় নীলাকাশে যেন বদ্ধ পিঞ্জরের পাখি, আকাশে হেরিয়া ঘুড়ি মন তার যায় উড়ি, মুখে কালো ছায়াখানি রাখি | স্মরিয়া খেলার মাঠ কেউ ভুলে যায় পাঠ, বুদ্ধিতে বা কারো না কুলায়, কেহ স্মরে গেহকোণ, স্নেহময় ভাইবোন--- ঘড়ি-পানে ঘন-ঘন চায় | ডাকিছে উদার বায়ু লয়ে সাস্থ লয়ে আয়ু, ডাক শোনে বসে রুদ্ধ ঘরে, হাতে মসী, মুখে মসী, মেঘে ঢাকা শিশু-শশী--- প্রতিবিম্বে মোর স্মৃতি ভরে | আর সবি গেছি ভুলি, ভুলিনি এ মুখগুলি, একবার মুদিলে নয়ন আঁখিপাতা ভারি-ভারি, ম্লান মুখ সারি-সারি আকুল করিয়া তোলে মন | . *********************** সূচিতে . . . মিলনসাগর |
| হাফেজের আত্মদান কবি কালিদাস রায় “আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে বাঁধিতে হরিণ হিয়া কোথা হতে এলো প্রিয়া তোমার অলকে এত ফাঁস, তোমার নয়ন-কূপে স্বপনেরা বাধ্যরূপে নীরবে গোপনে করে বাস। তব---চিকন চাঁচর চুলে চামেলি চমকি উঠে, ‘আদিন’ –প্রবাল গুলি ও-অধরতটে লুটে, সুরার সুরভি সুর শিরায় শোণিতে ছুটে মদালস তব মৃদুহাস। শীত বায়ু-চঞ্চল তব পীত অঞ্চল বিতরিছে আতরে বাস। প্রিয়ে---তব রূপ রশনিতে সবার গরব গুঁড়া, হুরী পরী গড়াগড়ি লুটায় হীরার চূড়া। লাজে হেম ঊষা ম্লান জ্যোছনা শ্যামায়মান, বাগে বাগে গোলাপ হতাশ, মিছে আভরণ ফেলি পিছে আভরণ ঠেলি, কর যদি সুষমা প্রকাশ। তব---গমন-পথের ’পরে পাতি’ দেই এই হিয়া, ঘুমালে চরণরেণু রুমালে মুছাই প্রিয়া। ও স্মিত কপোল-কূপে পরাণ সঁপিয়া দিয়া, নিবারিত মরুভূ-পিয়াস, তব তনু লতিকার ছোঁয়া পেতে একবার হ’তে পারি চির ক্রীতদাস। . *********************** . সূচিতে . . . মিলনসাগর |
| অপূর্ব আগমনী কবি কালিদাস রায় “আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে দোলায় চড়ে’ আয় জননী রোদনে তোর বোধন বাজে, অট্টহাসির কোলাহলে আয় এ ভীষণ শ্মশানমাঝে। শ্মশান ভালবাসিস বলি’ করলি এ দেশ শ্মশানস্থলী মানুষ কোথায় ? কুকুরশৃগাল পিশাচবেতাল হেথায় রাজে॥ মড়ার কাঁথায় আসন রচি, ভাঙ্গা কলস নেচে বাজাই, গাঁথি মহাশঙ্খমালা করোটিতেই সাজাই। শ্মশানভরা শবের ’পরি রুদ্রাণী তোর বরণ করি, আয় মা তারা মহাকালী আয় মা শবাসনার সাজে। . *********************** . উপরে মিলনসাগর |
| গোলামের তেজ কবি কালিদাস রায় “আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে ঘুড়ি ডেকে কয় “ওরে প্রজাপতি, যোজন খানেক তলে, রোস্ তুই, তবু দেখি তোরে শুধু দিব্য দৃষ্টি-বলে। আচ্ছা বলত,---গ্রহমণ্ডলে চলা-ফেরা দেখে মোর, অবাক হ’য়ে কি রোসনাক চেয়ে হিংসা হয় না তোর?” প্রজাপতি কয় “মর, কি বুদ্ধি, কাগুজে চিড়িয়া ঘুড়ি, আমি কেন তোরে হিংসে করব ? মধু খেয়ে খেয়ে উড়ি। তুইত বন্দী, কর না বড়াই যতই উপরে থেকে, স্বাধীন কখনো হিংসে করে কি গোলামের তেজ দেখে ?” . *********************** . উপরে মিলনসাগর |
