কবি কালিদাস রায়ের কবিতা
*
শ্রমিকের গান
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

কামারশালে আগুনতাত ঐ নিভল ধীরে,
নেহাই পেল রেহাই আজ এ দিনের মত।
ধূলোয় ঝুলে ভূত সেজে সব চলছি ফিরে,
বিশ সারিতে বিশ কর্মার সেবক যত।
বাজাও বাঁশী জোরসে বহুৎ বাজাও বাঁশী,
ফেরার বেলায় এলায় শরীর চরণ-রথে।
বাজাও তবু বাঁশের বাঁশী ছড়াও হাসি,
নাচব তাহার তালে তালে নগর-পথে।

তাঁতগুলোতে থামল এখন ঠকঠকানি,
ঘূর্ণি হতে রেহাই পেল নাটাই টাকু।
টানা-পড়েন থামায় তাদের টানাটানি,
আসা যাওয়ার পথে এখন ঘুমায় মাকু।
বাজাও বাঁশী বাজাও সানাই সানাইদারও
চুলের গেছো দুলিয়ে নাচো বালিকারা।
রাজা উজীর ধার ধারি না এখন কারো,
ধূলায় ঘামে যদিও সব ভূতের পারা।

হাফাচ্ছিল ময়লা বাতাস ধোঁয়ায় তাতে,
মোদের মত একটুখানি জুড়াক আহা।
শ্রান্ত আকাশ সেও ছুটি পাক মোদের সাথে,
গাঙের বুকে একটু থামুক নৌক বাহা।
বাজাও বাঁশী, মাৎ করে দাও চাঁদের গানে,
খাটনি কেলেশ তুড়ির চোড়ে যাকগে উড়ে।
সূর্য্যটাকে অস্তে নামাও প্রাণের টানে,
গলাও তারে মন-মাতানো প্রাণের সুরে।

নেহাৎ ছোট গরীব মোরা, নেহাৎ হেয়,
সাধ মিটিয়ে নাচতে তবু হাসতে পারি।
কেউবা পিতা, কেউবা ভ্রাতা, প্রেমিক কেহ,
প্রাণভরে-ত মোরাও ভালবাসতে পারি।
বাজাও বাঁশী মাতাও ভালবাসার গানে
সে গান যেন জাগায় প্রাণে নতুন আশা,
সে গান যেন চোখের জলে পাথার আনে,
জাগায় গলায় দরদ-রাঙা প্রাণের ভাষা।

আশমানে ঐ নাম-না-জানা তারার মালা,
তাদের মতই তবু বহুৎ শক্তি ধরি,
আমরা দেশের ভাঁড়ার-ঘরের চাবি তালা,
সমাজ-দেহে ফুসফুসেরই কাজটি করি।
বাজাও বাঁশী রাত্রি আসে দিনের পরে,
বিধির এমন কড়া আইন বারো মাসই,
খাটনি শেষে খেলার মাতন মোদের তরে,
কাজের শেষে পেলাম ছুটি, বাজাও বাঁশী।

.         ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
আর্য্যাবর্ত্ত
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

‘নিম্নে’ অই মহাসিন্ধু সর্ব্বরত্ন-খনি,
বরুণের কোষাগার লক্ষ্মীর নিবাস,
ঐহিক তৃষ্ণার পরিতৃপ্তির আশ্বাস,
অনন্তের শীর্ষে যথা জ্বলে কোটি মণি।
‘ঊর্দ্ধে’ অই ভারতের দৃষ্টি সনাতনী।
হিমাদ্রির শৃঙ্গরূপে বিদরে আকাশ,
নামে তাহে পুণ্য ব্রহ্মধারা বার মাস,
অই মন্দাকিনী শুভ ধ্রুবের জননী,
মহাযোগ-ধারা, এই ভস্ম-সঞ্জীবনী
স্বর্গে মর্ত্তে, অনিত্যে ও নিত্যসত্তা সনে,
শ্রেয়ে প্রেয়ে, গৌরী-হরে, লক্ষ্মী-নারায়ণে,
শক্তি-কর্মে, ভক্তি-জ্ঞানে যোগ-সম্মিলনী!
ইহ-পরত্রের মহা মিলন-নিলয়
এই আর্য্যাবর্ত্তে সর্ব্ব দ্বন্দ্ব-সমন্বয়!

.         ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
জুতা-বদল
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

দিলীপ রায়ের গান শুনতে সুধীন ভায়ার বাড়ী,
গগিয়েছিলাম। ফেরার সময় পরতে তাড়াতাড়ি
বদলে গেল জুতো অর্থাৎ একপাট হলো আমার
আর একপাট রামার শ্যামার কিংবা কারো মামার
পরের পাটি পায়ে পায়ে জানায় অসন্তোষ
একপাটি কয় ক্যাঁচর এবং অন্য পাটি ফোঁস।
আগন্তুকের বয়স বেশী এবং বেজায় ঢিলে,
নৌকো হয়ে ঝুল্ল পায়ে একবারে না মিলে।
এ যে হলো বৃদ্ধজনের বালাবধূর প্রায়
কোন ঘটকে এমন অঘটন ঘটালে হায়।
পড়েছিলাম ডি এল রায়ের ‘আষাঢ়ে’ যৌবনে,
বৌ-বদলের রসের কথা কেবল পড়ে মনে।
কে ঘটালে এমন বিপদ কোথায় তুমি ভাই
তোমার কি ভাই একেবারেই হুঁস কি হদিস নাই ?
আমার পাটি তোমার পায়ে ঢুকল কেমন ক’রে ?
তুমি কি ভাই নিয়ে গেছ বগল দেবে ওরে ?
তোমার চরণ চালাও যদি আমার পাটির পেটে
গোচর্ম্ম যে তোমার পায়ের চর্ম্ম হবে এঁটে।
এই পাটিটির হাম্বা রোদন পশছে নাকি কাণে
প্রাচীন প্রণয় তোমার পাটির কেমন কে বা জানে!
হয়ত অনেক জোড়া জুতো আছে তোমার ঘরে,
নয়ত জুলুম করছ তুমি ভাইএর জুতো পরে।
তা যদি হয় বিপদ আমার ভাবনা তোমার কিসে ?
বদল ভাঙার নেইক আশা দ্বিতীয় মজলিসে।
আস্তাকুঁড়ের পাশ হতে ভাই জীর্ণ জোড়া এনে
কাঁটির বিঁধন সহ্য ক’রে বেড়াচ্ছি তাই টেনে।
কেমন ক’রে বেরুই আমি অমিল পায়ে পথে ?
বদল ভাঙো, জানাই আমি মাসিকের মারফতে।   

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
একলব্য
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

হে অনার্য্য, একদিন গুরুকুলে পাওনিক স্থান,
যুগে যুগে তাই তুমি আর্য্যদম্ভে কর লজ্জা দান।
নিঃস্ব বনবাসী তুমি মহাসত্য-ধনের ভাণ্ডারী,
যাহারা সর্ব্বগ্রাসী তাহারাই এ বিশ্বে ভিখারী।
চাহনিক রাজছত্র, দিগ্বিজয়, রত্নের ভাণ্ডার,
সত্যের প্রতিষ্ঠা করি সমাপিত সাধনা তোমার।
দেখায়েছ কভু নহে একনিষ্ঠ সাধনা বিফল,
শোণিতে বুদ্বুদসম জনমে না তপস্যার বল।
কাম্য কিছু নাহি তব যোগ্যতারই করেছ প্রমাণ,
মহাভারতের পীঠে দর্ভাসনে লভিয়াছ স্থান।

শক্তি সে ব্রহ্মময়ী, ত্যাগ সে যে পরমার্থময়,
আর্য্যের নাহিক লজ্জা তার কাছে লভি পরাজয়।
সত্য চির হোক প্রিয়, মিথ্যা হোক চির তিরস্কৃত,
মহাভারতের কথা তাই গেয়ে হইল অমৃত।

বিশ্বব্যাপী জ্ঞান-ব্রহ্ম, অংশ তার প্রজ্ঞাবীজময়
কানন-কান্তার-গিরি যথা রোক্ হবে অভ্যুদয়
সৃষ্টির বিধান-সূত্রে। কে রোধিবে তাহার উন্মেষ ?
অক্ষয় জীবনধর্ম্ম, কি করিবে অসূয়া-বিদ্বেষ ?
কে পারে রোধিতে বিশ্বে পঙ্কমাঝে পঙ্কজবিকাশ,
খনির তিমির গর্ভে অঙ্গারকে মণির নিবাস ?

যে শক্তি ছুটিবে বিশ্বে ব্যোমমার্গে পুষ্পকের রথে
কে রাখিবে তারে বাঁধি দ্বিজত্বের বাঁধা রাজপথে ?
জহ্নবী চলিবে ছুটি অবিচারে গিরি বনে মাঠে,
কে তারে রোধিতে পারে বারাণসী-প্রয়াগের ঘাটে ?
মানব-সমুদ্র মাঝে কে করিবে শাশ্বত বিভাগ
বাঁধ বাঁধি ? বিরাটের অঙ্গে অঙ্গে কে কাটিবে দাগ ?
যে শক্তি নিহিত মূলে কেমনে তা করিবে উচ্ছেদ
শাখার ছেদনে বলো ? অখণ্ড সেই মূলে কই ভেদ ?
যেখানে জীবাত্মা রাজে সেইখানে শিবত্ব বিরাজে,
শিবত্ব আবদ্ধ নহে আভিজাত্য-পাষাণের মাঝে।

দীক্ষার দক্ষিণা ছলে করিয়াছ সর্ব্বস্ব প্রদান,
এর কাছে অশ্বমেধ বিশ্বজিৎ হয়ে যায় ম্লান!
লক্ষ গুণ প্রতিশোধ, হে বীরেন্দ্র, দিয়াছ ঘৃণার,
অক্লেশে বর্জ্জিয়া বর চিরার্জ্জিত জীবনের সার।
আর্য্য সে করুক গর্ব্ব দন্তে কাটি অঙ্গুলিটি তব,
অনার্য্য নিষাদ, তবু তোমারেই আর্য্য মোরা ক’বো।
জাগো তুমি হে নিষাদ, ভারতের গুরুকুলমাঝে
পশু-মাংস-পুষ্ট দেহে রক্তসিক্ত কৃষ্ণাজিন সাজে।
জ্বলন্ত সত্যের মূর্ত্তি---আগে আগে চল ত্যাগ-বীর,
নত হোক পদে যত রক্তগর্ব্বী ভ্রান্তজন-শির।

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
কৃষাণীর ব্যথা
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

সুখের এ ঘর গড়িয়া তুলিয়া বুকের রক্ত দিয়া,
আজ কোথা তুমি চলে গেলে হায় সংসার আঁধারিয়া ?
ধানে ধানে আজ উঠোন ভরেছে, ঠাঁইটুকু নাই আর,
মঙ্গলা আজি ঢালিতেছে দুধ বাছুর হয়েছে তার।
মাচান ছাপিয়ে লাউলতাগুলি ভূঁয়ে লুটে লুটে পড়ে
পালঙের শীষে শাকের চাকড়া আগাগোড়া আজ ভরে।
সন্ধ্যামণিতে আলো হয়ে আছে সারা আঙিনাটি ঐ,
আজ সংসারে সবি ভরপুর, হেন দিনে তুমি কই ?

দুবেলা পাওনি পেট ভ’রে খেতে গিয়েছিল দেহ ভেঙে,
লুকিয়ে চোখের জল মুছে তুমি ভিক্ষা এনেছ মেঙে।
একমুঠো চাল চিবাতে চিবাতে রুইতে গিয়েছ চলি’,
উপোষ করিয়া রাত কাটায়েছ ক্ষুধা নাই মোরে বলি’।
দুপুরের তাতে বাদলের ছোটে খেটে খেটে দিনরাত,
মাঠে মাঠে ঘুরে কনকনে জাড়ে করেছ পরাণপাত।
সাঁঝের বেলায় হেঁটে হুঁটে এসে এলায়ে পড়েছ ঘুমে,
রাত্রি কাবার না হ’তে আবার চলেছ খোকারে চুমে।

বাকী খাজনার লাগি জমিদার দিয়েছে যাতনা কত,
মহাজন, দেনা সুদের জন্য গঞ্জনা দেছে শত।
চুপ করে সবি সয়েছ, আহা রে! দুটি হাত জোড় করে’
সকলের কাছে সময় নিয়েছ হাতে পায়ে ধ’রে প’ড়ে।
রোগে প’ড়ে থেকে সংসার নিয়ে কতই দিয়েছি জ্বালা,
ক্ষুধায় কাঁদিয়ে করেছে ছেলেরা কানদুটো ঝালাপালা।
যাতনা দুঃখ কত না সয়েছ তথাটি ছিল না মুখে
ফিরে এস আজ ঘরটি তোমার ভরিবে সোনার সুখে।

ঘনায়ে আসিছে সাঁঝের আঁধার নাহি মোর কোন’ কাজ
এ ঘর দুয়ারে পড়েনিক ঝাঁট জ্বলেনি এখনো সাঁজ।
চালের বাতায় ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো বুক চিরে চিরে ডাকে,
উঠিতে বসিতে টিকটিকি পড়ে যাটা দেওয়ালের ফাঁকে।
ঐখানে আহা পীঁড়ের উপর শুইতে গামছা পাতি’,
ঝুলিতেছে ঐ লাঠি, চোঙ, মই, মাথালী, তালের ছাতি।
ঘাটের ধারে বাঁশবন পানে সারারাত চেয়ে কাঁদি,
ঐখান হতে নিঠুর বাঁধনে লয়ে গেছে তোমা বাঁধি।

তেমনি পড়েগো কাল ছায়া ঐ ভরিয়া বকুল তল,
বৈকালে যেথা এলানো শরীরে চাহিতে ঠাণ্ডা জল!
সাঁজে ভোরে সেই পাখীগুলো ডাকে প্রাণ আনচান করে,
বেলা হয় তবু গোরুগুলো সব বাঁধা র’য়ে যায় ঘরে।
পথ চেয়ে হায় বসে থাকি ঠায়, জ্বলে না দুপুরে চুলো।
আপন ছেলেরো নাম ভুলে যাই মনটা হয়েছে ভুলো।
মালতী তোমার এসেছে ফিরিয়া শ্বশুরের ঘর থেকে,
খোকা যে তোমার হাঁটিতে শিখেছে ; একবার যাও দেখে।

এত সব ফেলি জনমের মত চ’লে যাওয়া কিগো সাজে ?
তবে কিগো তুমি ‘প্রবাস’ গিয়েছ আমাদেরই কোন’তাই  কাজে ?
বাবুদের আর গদাইপালের অত্যাচারের ভয়ে,
চ’লে গেলে কিগো মনের দুঃখে কিছুই না ব’লে ক’য়ে ?
তাই যদি হয় ফিরে এস তুমি তোমারে সঙ্গে পেলে,
খোকারে লইয়া পালাই কোথাও ঘর সংসার ফেলে,
ভিক্ষা মাগিব, কাঠ কুড়াইব, ফিরিব না আর বাড়ী,
আঁচলের গিঁঠে বাঁধিয়া রাখিব তিলেক দিব না ছাড়ি’।

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
শুর্দ্ধ কথা
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

শুর্দ্ধ করে’ কথা বলার আমার সদাই চেষ্টা,
আমি বলি কেষ্টপ্রসাদ লোকে বলে কেষ্টা।
মাছেরে তাই কহি মচ্ছ,                কাছারে তাই বলি কচ্ছ
কোটেরে তাই কোষ্ট কহি পিপাসারে তেষ্টা।

আমেরে কই আম্র, যেমন জামেরে কই জাম্র,
তামায় যেমন তাম্র কহি মামায় কহি মাম্র।
পাঠশালাকে পট্টশ্যালক,                আটচালাকে অষ্টচালক,
কম্বলে কই অল্প-শক্তি ভেবে ভেব শেষটা।

চিত্র কলায় চিত্তরম্ভা, কাঁচিরে কই কাঞ্চী,
কাসিরে কই বারাণসী,                হাঁচীরে কই হাঞ্চী।
আলুরে কই অলাবু তাই শ্বশুরে কই শ্বশ্রূ-মশাই,
অবাক হয়ে চেয়ে রহে মু-মুক্ষু এই দেশটা।

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
বদান্যতা
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

যাহা কিছু কামাই সবি চ্যারিটিতেই যায়,
দানের পুণ্য ছাড়া আমার কিছুই নাহি হায়।
বড় ছেলেয় দিচ্ছি পঁচিশ,                মাসে বাইশ নিচ্ছে শচীশ,
দুধের রোজও আছে খোকার, গয়লা টাকা চায়।
গয়লা পালন হচ্ছে, কাজেই দানই বলা যায়।

পাঁচশ’ টাকার গয়না দিয়ে দিলাম মেয়ের বিয়ে,
ফেরত ত আর দিলনাক, বেহাই গেল নিয়ে,
তা’ ছাড়া এই পূজার সময়                কাপড় চোপড় তা’ও দিতে হয়,
মুল্যটা তার রাখছি লিখে খয়রাতী খাতায়।
বাধ্য নহি দিতে, কাজেই দানই বলা যায়।

ভায়ের মায়ের ( আমারো তাই, তার-ও হলো যা।
ভায়ের কাছেই থাকে তাইতে বলছি ভায়ের মা ),
কাশী যাওয়ার সময় যখন,                টাকার জন্য লিখল মাখন,
দশটি টাকা---দুইটি আনা খরচ হলো তায়,
ভায়ের দেওয়ার কথা,---তাই তা দানই বলা যায়।

গিন্নীকে দেই দু’দশ টাকা প্রায়ই মাঝে মাঝে,
তিনি তাতে গয়না গড়ান, একোবারেই বাজে।
মায়ের শ্রাদ্ধে ভাগনে বেচু                চাইলে টাকা, দিলাম কিছু
বাবার মেয়ের শ্রাদ্ধ, তা’ত আমার নহে দায়,
দেখলে ভেবে এরে নিছক দানই বলা যায়।

গিন্নী আমার রাঁধতে জানেন, তবু ঠাকুর পুষি,
গরীব বামুন পাচ্ছে খেতে তাতেই আমি খুসি।
যেদিন আমি যাইনা বাজার                ঝি-চাকরের জয়জয়কার।
চুরি ক’রে নিশ্চয়ই ত বেশীর ভাগই খায়,
প্রকার-ভেদে পরোক্ষে তায় দানই বলা যায়।

তা’ছাড়া প্রায় সকল জিনিষ পয়সা দিয়েই কিনি,
দেখতে গেলে পয়সা নিয়ে খেলছি ছিনি মিনি।
পাঁচটা লোককে কোনরূপে                পালন করি চুপে চুপে।
কোনো রূপে পরোপকার একটা অছিলায়,
ঢাক পেটাতে কিন্তু ভায়া দেখবে না আমায়।

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর
*
পাঁচ মিনিটের কর্ত্তা
কবি কালিদাস রায়
“আহরণী” কাব্যগ্রন্থ থেকে

আজকে বসি’ ঠাকুরদাদার কেদারায়
.                খোকা আমি গিয়াছি তা ভুলিয়া।
ছোঁয়না মাটি দুলাচ্ছি তাই দুটি পায়
.                খবরের এই কাগজখানা খুলিয়া।
চশমাটা তাঁর কাণে দিছি লাগিয়ে
.                চোখ ছাড়িয়ে নাকের পরে ঝোলে যে।
গুড়গুড়িটার নলটা নিছি বাগিয়ে
.                লাগছে নাকি ঠাকুরদাদা বোলে হে ?
কে আছ হে এস দেখি এদিকে
তামাক দিতে বল না রামনিধিকে।

সাদা কাগজ সামনে এত কি লিখি!
.                পটলা কেন জটলা করিস ওখানে।
রোকা নে যা পান্তুয়া আর জিলিপি
.                গামলা ভরে আনত গিয়ে দোকানে।
হাসছ মাখন ? মেজাজ আমার বোঝ না
.                চামড়া পিঠের তুলব সবার চাবুকে,
দাঁড়িয়ে আছ ? চাবি কোথায় খোঁজ না
.                গ্রাহ্য তোমার হচ্ছে না যে বাবুকে।
চালাও আজি ঢালাো পোলাও খিঁচুড়ি,
হবেনাক অভাব কোন কিছুরি।

ডাকের চিঠি রাখবে আমার দেরাজে
.                জবাব টবাব লিখব আমি দুপুরে,
[ গ্রাহ্য মোটেই কচ্ছে নাক এরা যো
.                কড়া শাসন চাই ইহাদের উপরে! ]
অবাক হ’য়ে দাঁড়িয়ে কেন হাঁ করে
.                ডাকবে মোরে মোটর গাড়ী থামায়ে,
চাদর লাঠি আন্ দেখি রাম ধাঁ করে
.                নাপিতো ডাক গোঁপদাড়ী নিই কামায়ে।
যাচ্ছ কোথা ? হয়না বুঝি কেয়ার-এঃ
দেখছনা যে বাবু তোমার চেয়ারে।

ঠাকুর দাদা যদিই পড়ে আসিয়া
.                ভাবছো বুঝি, হব বেকুব বোকাটি ?
হাত বুলিয়ে বলবো আমি হাসিয়া,---
.                “এ-ঘরেতে গোল করো না খোকাটি।
একশতবার মকসো কর লোখাটা
.                মাধব খুড়ো আসবে তোমায় পড়া’তে
আজকে যে চাই নামতা-ঘোষা-শেখাটা
.                নইলে প্রহার আছে তোমার বরাতে।
পাকা চুল মোর তুলতে বাবার মামাকে
ডাকতে না হয় পাঠিয়ে দিও রামাকে।

রোদে রোদে আজ হবে না বেড়ানো,
.                ঘরে বসে ছবিই আঁকো শেলেটে।
হবে না আম কুড়ানো, নাই এড়ানো
.                দুধ খাবে আজ ঢেলে চায়ের পেলেটে।
পাড়ার যত দুষ্ট ছেলে বকাটে
.                সঙ্গে মিশে বদমায়েসী শিখালে।
দুপুর বোলা বন্ধ রবে কপাটে।
.                ছুটি পেলে পড়লে বেলা বিকালে,
ছাদের পরে উড়িয়ে দিবে ঘুড়িটি
সঙ্গে শুধু থাকবে দিদি-বুড়িটি।”

.                ***********************           
.                                                                                        
সূচিতে . . .   




মিলনসাগর