তাদের একহাতে কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
এখানে পৃথিবী কবে শিকড়হীন হয়ে পড়েছে বৃষ্টির অলি-গলি দিয়ে ছুটছে জীবনের ঝরা-পাতা শুকনো পাতার ওপর জল এবং স্থলের মানচিত্র কোনো ভয় নেই সবরকম ভয়ের দুয়োর তারা এক এক করে খুলে দেখেছে |
হাত পা এমন কি গর্দান ছাড়াও তারা পৃথিবীর জলের ওপর ঘুরে বেড়ায় খোঁজে জলের প্রাচীন রূপ সূর্যের নানা রঙের মধ্যে বিরামহীন বাতাস শব্দের গভীর ভাষা |
ঘরমুখো মানুষগুলো সমুদ্র পার হয় বালির ওপর দিয়ে হাঁটে, বালির ওপর রাখে পায়ের যাদুকরী ছাপ |
যারা তাদের পেছনে আসছে তারা জানবে এখানে একদিন জেলেদের শহর ছিল মাছের গন্ধ হয়তো তখন ম ম করবে না বালির ওপর শুকোবে না হাঙর সামান মাছর গা থেকে ঝরে-পড়া নোনা জল |
এত দুঃখের মধ্যেও এখানে মানুষ জলকে প্রণাম করে আগুন দিয়ে সেঁকে মাছের শরীর |
মাছের দেশে সমুদ্রকে চোখের মধ্যে ধরে রাখে কোন কালের শুভ রাত্রি |
কারা এই রাতে মাছের জন্যে সমুদ্রকে খুন করে সমুদ্রের পায়ের নীচ থেকে টেনে নিয়ে যায় ক্রোধের বয়স |
এই রক্তাক্ত খুনের মধ্যেও মানুষ চোখ খুলে মানুষের চোখের দিকে তাকায় খোঁজে বালির উপর উলঙ্গ শিশুদের ইজেরের দড়ি | তাদের একহাতে স্বপ্ন জল একহাতে নুনের পরম আকাশ |
আল্লার দেশের প্রেসিডেন্টের জন্যে কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
এই লতাগুল্ম আর অতল জলের দেশে, যেখানে নিয়ত ধ্বংস এবং জন্মের ভীষণ আপত্য খেলা চলে, সেখানে আমি আর খলিল চাচা প্রতিদিন ডাহুক-ডাকা জ্যোত্স্না রাতে সমুদ্রকে ডাকি \ সমুদ্র বড় আবেগে খলিল চাচার উঠোনে উঠে আসে | খলিল চাচার পায়ের কাছে স্থির পড়ে থাকে | যেন ঝরা অতসী ফুল |
চাচি সেই স্থির নীল পানিতে দমকা-হাওয়ায় হাতের গোছা ধোয় | পা-ভেজানোর আগে, মুহূর্তে চোখের পলক তুলে চাচাকে ফিসফিস করে বলে, এ-পানি আমাগোর দ্যাশকে বারবার ভাইস্যা দিতাছে | আর এখন দ্যাখছো পোলাপাইনের বাড়বাড়ন্ত বয়সের মতো কেমনডা শান্ত | য্যান ছ্যামড়া কিচ্ছুডা জানে না |
চাচির হাতের কাচের চুড়ি নোনা জলের নীচে ঠুনঠুন বেজে ওঠে | যেন বুকের মাঝখানে বাজছে ছেলেভুলানো বাঁশের ঝুনঝুনি | শব্দে উঠোনের জ্যোত্স্নাময় সমুদ্র চাচার কোল ভাসিয়ে ছলাৎ ছলাৎ চোখের কাছে উঠে আসে | লোনা জলের মধ্যে কেমন একটা শিহরণ সারা শরীর মনে খেলে যায় | চাচা মুঠো করে ধরে রাখতে চায় সেই শিহরণ |
চাচা চোখ বুজে আল্লার দরবারে সটান চলে যায় | মাথার গোল নকশা-কাটা টুপি খুলে কোলের ওপর সযত্নে রাখে | এভাবে প্রতিদিন দামাল সমুদ্রকে উঠোনে খোকা-চাঁদের মতো ধরে রাখলে কেমন হয় !
আমি খলিল চাচার ভেজা-ভেজা উঁচু দাওয়ায় বসে সারা বাংলাদেশের নীল মুখের ওপর চোখ ফেরাই | সারা দেশ নমকে পুড়ে ইটের মেহেদি রঙ নিয়েছে | একমুঠো গতরের ধান নেই যে, দেশের মানুষ মুখে তোলে | পেটের জ্বালার নীচে তলানি দেয় | এদেশে এমন একজনও প্রেসিডেন্ট আসেননি, যিনি পোড়া ধান মুখে তুলেছেন | কিম্বা সমুদ্রের ঘন পানি দিয়ে আল্লাকে সেজদা করেছেন |
মুসলমানের দেশে মুসমানের লাশ পাটখড়ির মতো ভাসে | মুসলমানের মোমিন প্রেসিডেন্ট মুসলমানের কবরের জন্যে মুঠিভর মাটিও রাখেননি | বলেছেন, সবই আল্লার কুদরত | আল্লার কুদরতের ওপর তো কোনো প্রেসিডেন্ট হাত দিতে পারেন না | আল্লার গজব আল্লাই সয়ে নিবেন তাঁর নিরাকার শরীরে |
ভোর হওয়ার আগে তিনিসমস্ত লাশ ভাসিয়ে দেন সমুদ্রের ঘন নুনে | সমুদ্র সমস্ত লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যায় বেহেশতে | হুর পরীর দেশে | আল্লার নূর তাদের পবিত্র করে তোলে |
খলিল চাচা সমুদ্রের ঢল-জ্যোত্স্নায় বাংলাদেশের দশকোটি বেওয়ারিশ মানুষের মুখ দেখে | তাদের চোখে লোনা জল | কোন জল সমুদ্রের আর কোন জল চোখের খলিল চাচার বিজ্ঞ চোখ ঠিক ঠাহর করতে পারে না |
প্রতি বছর দু’লাখ মানুষের নুন-মাখা লাশ ভেসে গেলে দশ কোটি মানুষের দেশে আর কতো মানুষ হাটু মুড়ে আল্লাকে মোনাজাত করে ? কতো চাল প্রতিবছর উদ্ বৃত্ত হয় !
প্রেসিডেন্ট আল্লা আপনাকে চাঁদের মতো নসিব দিয়েছেন | আপনি দুবেলা গোস্ত-ভাত খেয়ে পেট থেকে তৃপ্তির ঢেকুর তুলুন | আপনার বুকের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমাক প্রহরের রূপ, ছায়া |
খলিল চাচা তার খোলা উঠোনের সমুদ্রে মরা মাছের মতো চিৎ-শুয়ে আল্লার কুদরত দেখে | এমন গরীব দেশের যিনি আল্লা তিনি দশকোটি মানুষের জন্যে কীভাবে গোষা জোগাবেন |
আমি জানি না খলিল চাচার উঠোনের সমুদ্র খলিল চাচার খোলতাই দাড়ি খলিল চাচার নসিব গোষা খলিল চাচার আলনী নিদ বাংলাদেশের কোন ইতিহাস কেতাবে লেখা আছে | খলিল চাচার বুকের ভেজা-কবুতর খড়ের চালের ওপর শূন্য আকাশের মতো ভাসে |
আমরা তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছি কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
কোনো মোহমুক্তি ঘটাতে আমি চাইনি যা কিছু ঘটেছে তার একটা যুক্তি আমি দাঁড় করাতে চেয়েছি আয়নার সামনে নিজেকে ধরে রাখতে গিয়ে পেছন থেকে আর্শির মধ্যে ফেলেছি পেছনে কী ঘটেছে কী ঘটছে |
ঘাড় বেয়ে বেয়ে নামছে চুল কেউ এ-চুলকে বলে বাবরি কেউ বা বলে মেঘের কালো ঢল গাছের ডালে ডালে জীবনের প্রবাহ একহাত আর একহাতের মধ্যে নিচ্ছে উষ্ণতার আবেগ, সবাই যে-যার মতো কথা বলেছে সব কথার খেই ধরে আমরা দাঁড়াতে পারি এমন সত্যের কাছে যেখানে মাটি ফুঁড়ে ঝরনা জলের মতো উঠছে, মাটিকে ভেজাচ্ছে আর এক সত্য কথা |
মোহমুক্ত ঘটাতে যেয়ে যারা আকাশকে পাতালে চালান দিয়েছে বুকের সভ্যতার ওপর দিয়েছে হানা তাদের মুখের দিকে স্তব্ধ চেয়ে আছে মানুষ |
দিনক্ষণ গুনে আমি বলতে চাই না সবকিছু মিথ্যার একটা সীমা আছে |
বুকের মধ্যে ছলকে উঠছে নদী, নদী-মাতৃকার দেশে চিরপরিচিত নদীর কাছেই আমরা সমস্ত নালিশ জানাই |
নদী, ওদের ভরা-ডুবির জন্য আমরা তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছি |