কবি কমলেশ সেন-এর কবিতা
*
এক থোকা আঙুর এবং হৃদয়কে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কার কাছে নালিশ জানাবে মানুষের পরম জীবন ?

পকেট ছিঁড়ে পড়ছে অশ্রু,
কে ভাসাবে নৌকো অশ্রুর কোটাল নদীতে
হাতের পৈঠায় বহুদিনের জমানো ক্রোধ |

বিস্মরণের দ্যুলোক-ভূলোকে
চষা মাটিতে
মানুষ চাষ করে আঙুর
এবং মানুষের হৃদয় |

একথোকা আঙুর এবং হৃদয়কে
আমি উপহার দেব
বৃক্ষের চরণে,
যে-চরণ ক্ষোভে মাটিকে ভেঙে
জীবন্ত করে তোলে |

হেই, কথা বল না
মনের রাগ মনেই ধরে রাখ |

যেন আয়নায় তার ফলন না হয় |

সময় এলে ছুঁড়ে দিও
বেইমানদের উলঙ্গ পায়ের তলায়,
যেখানে মাটি পাষাণ হয়ে আছে |

ধস হয়ে যেন নেমে যায় মাটি
তার নিজের অন্তরে |
মাটি কখনও ক্ষমা করেনি
মিথ্যাচার,
স্বেচ্ছাচারী সম্রাটের অহংকে |

মাটির ওপরই মানুষ তার পরম জীবন নিয়ে দাঁড়াবে |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বুকের নীচে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কেউ কারো দিকে আজকাল আর তাকায় না !

আমরা কী তবে নির্বিকার ?

আমাদের স্বার্থপর হাত মনের সঙ্গে
কী ভীষণ যুঝে যায় |

বাসের ভাড়া বেড়েছে,
লাঠির নীচে আমাদের এক মাথা চুল
আমাদের বেদনার পিঠ |

পিঠের জমা-রক্ত নিয়ে তোমাদের অবাক দেখি |

বাজার যে আগুন
আকাশ ছুঁই ছুঁই |

জল ঢালবে কোথায় ?

মানুষের পায়ের নিহত গোড়ায়
না, চোখের অশ্রু গভীরে !

জলের মধ্যে সত্যকে পরখ করতে হলে চাই
তেমন সাহস
তেমন ভালোবাসা |

জলের নীচে আগুনের যে পাহাড়,
সে পাহাড় মনের সাহস দিয়ে স্পর্শ করতে হয় |

হায় পোড়া কপাল
কাদের হাতে মনের সাহস দিয়ে স্পর্শ করতে হয় |
আমাদের রুগ্ন স্বপ্ন |

জবাব দিতে যারা লাঠি
আর পেয়াদা পাঠায় |

গুম খুন করে দেয় মানুষের উজ্জ্বল বিবেক |

আমরা শুধু একমুঠো চাল চাই না |
বুকের নীচে সাহসের মধ্যে পুষি
আমাদের রাগ |

রাগ না থাকলে কী মানুষ হওয়া যায় |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চোখের মধ্যে নগন্য জল
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


সমস্ত দিনমান হাতের মুঠোর মধ্যে খুলে যাচ্ছে
একটা ক্ষতের মধ্যে জীবন মেলে ধরছে
আর এক জীবন,
মানুষ কিছু বোঝার আগে কিছু ভাবার আগে
পা দুটো মাটির মধ্যে গাছের শিকড় হয়ে উঠছে |

আমাদের সবার চোখ হাত বুক থেকে নেমে গেছে
বট-পাকুড়ের ঝুরি,
মাটিকে বাঁধতে চাইছে নিজের মধ্যে |

আমাদের হাতের নীচে মাটির পৃথিবী
কেউ বলে, খিদের বীজ থেকে আমাদের জন্ম |

পৃথিবীর এতো মাটি এতো জল এতো খাবার
কার জন্য !

সমস্ত দিনমান যে হাতের মুঠোর মধ্যে খুলে যাচ্ছে |

চোখের মধ্যে নগন্য জল |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমি এভাবেই গুছিয়ে নিচ্ছি কথা
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


এমনি ভাবেই সময়ের হাত ধরে
আমি চলে গিয়েছি বুকের ব্যথার ভেতর
যেখানে সহজেই চেনা যায় মানুষকে |

বুকের ভেতর কবে গড়ে উঠেছে
পাথরের এক অদৃশ্য বন্দর
নদীর জলের ওপর ভাসছে চিরপরিচিত এক আকাশ
গর্জনের মধ্যে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে তৈরি হচ্ছে
জীবনের প্রভাত |

ফসল তোলার আগে
আজকাল একই ফসলের অনেক ভাগীদার
কে যে পেছন থেকে উসকায়
কেউ জানে না |

গরিব মানুষগুলো
নিজেদের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরে |

সাত বাও জলের নীচে
মানুষ এভাবেই খুন-জখমে মেতে ওঠে,
ভালোবাসার ওপর পড়ে জখমের পরান্ত ছায়া |

ব্যাপারটা এমন কিছু নয়,
চাষা-ভুষো মানুষের পাতে
একটু নুন আর ভাত পড়লেই হল |

কাঁধের ওপর লটকে নাও জোয়ান বয়েস
দেখবে, ভেতরে ভেতরে সবাই কেমন মুষড়ে পড়েছে |

দু’কাঁধের মাঝখানে যে-জায়গা
সেখান থেকে পৃথিবীটাকে ঠিক ঠিক দেখা চাই |

দেখবে, নদীর জলের ওপর ঠিক তেমনি ভাসছে
আসমান,
বুকের নীচে পাথরের অদৃশ্য বন্দর
তোমাকে চোখ মেলে দেখছে |

তুমি আমার মতো কন্ঠের মধ্যে অনায়াসে তুলে নাও
ভীষণ কান্না,
সারা দেশ জুড়ে কান্নার বোবা শব্দ |

আমি বুকের পাশে নামিয়ে রেখেছি
আমার চির-কলম,
কিছু লেখার আগে একবার ভেবে নিতে চাই |

আমি এভাবেই গুছিয়ে নিচ্ছি কথা---
আমার বুকের গাছ-গাছালির মধ্যে অবুঝের মতো
উঁকি মারল
ধরিত্রীর রঙ |

মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে এই অস্ত্রের কারখানা |

বুকের মধ্যে নিমেষে তৈরি হল
খিদে অনাহারের এক বিরাট মাতৃভূমি |

এভাবে মরার চেয়ে যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা ভালো |

আমার বুকের মধ্যে মানুষ-মারা ভারী সিসের টোটা
হাতে মেশিনগান স্টেনগান |

চোখে নীল ফ্রেমের চশমা
সারা পৃথিবীর রঙ চোখের মধ্যে রাখার
আপ্রাণ চেষ্টা করছে |

যদি তুমি আমার সবকিছুকে খুন করতে চাও
তবে খুনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আস |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাপ করবেন
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


দেশ বলতে আমার কিছুই নেই

সীমানা
পতাকা দিয়ে কি
দেশের খিদেকে জরিপ করা যায় !

লাঙলের ফলার নীচে অশ্রু
এবং বীজও নয় |

মাপ করবেন, দেশের জন্যে আমি ঘাম ঝরাতে
রাজি নই |

আমার চোখের আগুন পায়ের নীচে
মৃত্তিকা হয়ে থাক |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চিরটা কাল মানুষ
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


চিরটা কাল সময়ের অঙ্কুরের পাশে খেলা করেছিল
বৃষ্টির যুগল পা
জন্ম নিতে গিয়ে কেঁদে উঠেছিল
বলেছিল, জানি না কী ধাতব দিয়ে তৈরি হয়
পৃথিবীর অসংখ্য মানুষজন |

চিরটা সময় মানুষ এমনিভাবে জীবন-যাপন করছে
খুঁজেছে নিজের ঘন-অলকদামে বৃষ্টির
প্রাচীন গন্ধ,
বুকের জমাট ভয় নিয়ে বলেছে,
এতো ভয় কোথায় রাখি
কাকে দিই চুলের এতো ঘন ঢেউ |

ফসল ফলাতে গিয়ে অনুভব করেছে মামুষের পবিত্র ছবি
জল ছাড়া ফসল ফলানো যায় না কখনও
এক ফোঁটা রক্তও যদি পড়ে বীজের গোড়ায়
মানুষের মতো প্রসব করে মাটি |

হায়, বৃষ্টির কপালে এই লেখা ছিল তবে |

না হয়, মানুষ বৃষ্টির কাছ থেকে শিখে নিক
নিজের উলঙ্গ আদলে কীভাবে পরাতে হয়
ঝাঁঝালো বসন |

চিরটা কাল মানুষ বৃষ্টির জন্যে এমন আকুল থেকেছে
নিজের বুকের মধ্যে পাখির ভীষণ শব্দে
চমকে উঠেছে |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমরা কাঁদি
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


বুঝলেন মশাই, এই হাঁড়-কাঁপানো শীতে ভূপাতিত হচ্ছে
নক্ষত্রের মতো কোনো দেবশিশু,
একটা অজানা ভয় সবাই জানে কোথায় কীভাবে
গুড়ি মেরে বসে আছে,
বাপ-দাদার কাল থেকে চলে-আসা প্রবাদ-টবাদে
এখনও এতোবছর পরেও
নতুন করে ডালপালা গজিয়ে তোলে |

পতিত জমি নিয়ে আমরা খুনোখুনি করে মরছি
বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ঘুনে-ধরা লাঙল
আর কতদিন মাটিকে ভাঙবে
নিজেরাই যে ভেঙে যাচ্ছি মাটির সাথে |

অবাক জল মাটি আমাদের কাছে রূপ ধরে
রূপের কোনো জানা সংজ্ঞা নেই
আমাদের বুকের ভাঙন রুখতে গিয়ে
বুকের মধ্যে চর জাগাই |

আমরা দু’চোখ জাগিয়ে রেখে
নক্ষত্রের মতো দেবশিশুর পতন দেখি |
পতিত জমিতে কান্নার শব্দ ওঠে,
আমরা কান্নাকে নিয়ে বানাই জগৎ-সংসার |

আকাশ কোন পতিত জমিতে ফেলবে তার ছায়া !

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমাদের সবার ভালোবাসা
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


ভোর না হতেই ফুলবাগানের ওপর নেমে আসে আলিশান-প্রহর
শতচ্ছিন্ন মাটি নিজেকে ধরে রাখতে গিয়ে
প্রতিটি মুহূর্তে ঘেমে উঠছে |

আমি কাকে ভালোবাসতে গিয়ে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিই
চোখের নীচে জমাট বহুদিনের লাল জড়ুল,
দূরে অবিস্মরণীয় রাত মেপে চলেছে
আমাদের প্রতেকের জন্যে ততটুকু আকাশ,
আমি ধন-ধান্য সুজলা-সুফলা পৃথিবীর কথা
এখন বলতে চাই না,
গোপনে সরিয়ে রাখি একদিন বলব বলে |

এসব বলা এখন ধর্মের কথা নয় |

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি নানাভাবে উল্টে-পাল্টে দেখেছি
এক-একটা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে দেখি
আর আগের মতো মানুষের চোখে আলো নেই
সবাই গভীর হয়ে গুনছে প্রহর
দিনটা কোনোমতে কেটে গেলেই যেন বেঁচে যায় |

ভালোবাসা এখন মানুষের কাছে স্বপ্নের অতীত
বুকজোড়া ভয় উদ্বেগ নিয়ে মানুষ আর কতোদিন টানবে
নিজের গতরের জামা |

ফুলবাগানের মাটি ধরছে আগলাচ্ছে সন্তানের মতো
প্রতিটি মুহূর্তের আলো,
ছায়া |

মহীরূহের মতো আমার দুটি হাত মাটির নীচে ধরে রাখতে চাইছে
বোধহয় চোখের নীচে জমাট বহুদিনের লাল জড়ুল |

তুমি বলতে পার আমাদের সবার ভালোবাসা |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুহূর্তের আর্তনাদ
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


সুন্দর একটা দিন আমার হাতের মুঠোর মধ্যে
ভোর হয়ে ওঠার আগে আবিষ্কার করল
তার কোনো প্রসব ক্ষমতা নেই |

আমাদের বাঁজা দিন করতালি দেয় হেসে গড়িয়ে পড়ে
কী মজা কী মজা !

আমি চোখ ঘুরিয়ে চতুর্দিকে তাকাই
নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁড়ে চলি,
যেমন সাঁওতাল রমণীরা মাটির নীচ থেকে খুঁড়ে তোলে
কেঁচো পিঁপড়ের ডিম সবজির শিকড়মূল |

ভোরের চোখে সাদা ফুলের রহস্য হিংয়ের গন্ধ আমাকে ভাবায়
যেন আগুন ফোটার আগে মুহূর্তের আর্তনাদ |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চল্লিশ বছর ধরে আমি দেখছি
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


আমি স্মৃতির বৃক্ষে টানিয়ে এসেছি
আমার ডোরাকাটা জামার লাশ
আমার পকেটে ভরা আছে এই বসন্তের গৌরব |

আমি কোনোদিন ভাতের সাথে একটি পেঁয়াজের
চেহারাও দেখিনি,
অথচ ফলাও করে চল্লিশ বছর ধরে বলা হচ্ছে
তোমাদের জন্যে মরশুম আসছে |

আসুক, ধন্বন্তরির চোখে বছরের প্রথম ফাগুন |

আমি যেমন আছি তেমনি ঝুলব
স্মৃতির সবুজ বৃক্ষে |

খিদে নিয়ে আমার সঙ্গে ঝকমারি কর না |
চল্লিশ বছর ধরে আমি দেখছি
মায়ের বুরে দুধের কোনো প্রস্রবন নেই |

আমার যদি কোনো দেশ থাকে
আমি খুঁজে নেব,
এক আউন্স ওজনের হৃদয়ের মধ্যে পেরেক ঠুকে বলব
তোমার দেশ নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই

এই রইল, তোমার দেশ তোমার জিম্মায় |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর