কবি কমলেশ সেন-এর কবিতা
*
এই পদ্যের শেষ ভাগ
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


ঝিঁ ঝিঁ পোকাদেরও নাকি একদিন রাজার মতো রাজা ছিল |

পাগলা-হাওয়ার দাপটে সেই সাম্রাজ্য কবে তলিয়ে গিয়েছে
ভূগোলের কোন গোল রহস্যে –

বালক রাজা হাতের মুঠোয় তর্জনী খুলেছে
শাসনের ভার সে নিতে চায় না বুঝিয়ে দিতে চায়

তুমি প্রেম করেছিলে বালক-রাজা রাত্রির স্তব্ধতায়
ঝিঁ ঝিঁ পোকার কন্ঠস্বরে তুমি রেখেছিলে
মুক্তোর বিন্দুর মতো তোমার ফটিক চোখ ভরা-বুক |

ভরা-বুক ভালোবাসা নিয়ে খোকা-রাজা তুমি
কোন নিশানে উড়বে পতপত,
কোন রণে সাম্রাজ্য ফিরে পাবে ?

পাগল তুমি !

এই নাও শাসনের নিটোল তর্জনী
মুঠোর মধ্যে গুটিয়ে রাখ অনন্ত সময় কাল

একদিন আমরা দু’জনে মিলে অন্ত টানব
এই পদ্যের শেষ ভাগ |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমি মানুষটা
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


আমি কিজন্যে মাঝে মাঝে দম্ভ করি
পাগলা-হাওয়ার মধ্যে উড়িয়ে দিই পতাকার মতো চুল
ঝুলে-পড়া শার্টের আস্তিন থেকে ছুঁড়ে ফেলি
চোখের ঘুম |

মগজে অনেক কিছু ঘোরে
পকেটে হাত রেখে রাস্তা দিয়ে আবোল-তাবোল ঘুরি
কোথায় বসব, এমন একটা গাছও আমার মনে ধরে না |

এক চোখ থেকে আর এক চোখের মধ্যে
হাওয়ার চরকির মতো ঘোরাই-ফেরাই
শহরকে,
শহরের বুকের মধ্যে কে যেন বাজায়
ধূসর শঙ্খ !

পান থেকে চুন খসলে আমার মেজাজ
কোনোদিন তেমন গরম হয়ে ওঠে না,
অথচ এই দুপুরে
গা থেকে রোদ ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে
দেখি,
আমার মেজাজটা তেমন নেই |

পায়ের নীচ থেকে তুলে আনি
সাপের মাথার মণি,
কোথায় রাখব ভেবে না পেয়ে
বুকের মধ্যে আলো ছড়াই |

বুঝি, আমি মানুষটা নিজেকে যা ভেবেছিলাম
তা নই

একেবারেই তা নই |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমি যে একটা দেশের শুধু অবাক শব্দ
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


এপার থেকে ওপার ছড়ানো সুতো
গুটিশুটি মেরে পড়ে আছে এক ছায়ার মানুষ
যেন গলাকাটা ছুরির ভেতর কী ভীষণ যুদ্ধের শব্দ |

কেউ বলে এ-যে পলার হৃদয় ছলকে-ওঠা প্রবাল-রঙ
চোখের গভীরে সবুজ-দ্বীপ অন্ধ-রাজার শিরস্ত্রাণ |

হায় আমার কী দুঃখের দেশ
স্বপ্নের ভাঙা-গিটার |

পলাকাটা শতসহস্র ছুরির অবাক শব্দ
আমার হৃদয় জুড়ে বিস্ময় কান্না শোক |

আমি যে সর্পগন্ধার দেশ পাখির ঝরা-পালক
ভাঙা-কপাল

আমি যে একটা দেশের শুধু অবাক শব্দ |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আজকের শেষ রোদ্দুর
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কার লাশ জানতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল সবুজ নির্জন-গাড়ি
পা দেখে বোঝা যায় কী
মুখের ঠিক আদল !

কোন বাডডির ছেলে, আহা এ-বয়সে পাড়ি জমাল
উদোম হয়ে ঢুকে পড়ল আগুনের বিষণ্ণতায়
শুদ্ধ করবে বলে উষ্ণ করতল !

চেরি ফুলের মতো যার চোখের ভাষা, সে এমনভাবে
চোখ বুজে আছে
যেন হঠাৎ জেগে উঠে বন্ধুদের শোনাবে
লোরকার স্পানিশ কবিতা |

এ-ধূসর বিকালে এখানে কোনো ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে
মেতে ওঠে না ছেলেরা
লাল-সিল্কের কোনো রুমাল হাওয়ায় ওড়ে না |

খন্ড খন্ড মেঘের নীচে ভারতবর্যের নব্বই কোটি
স্নিগ্ধ মানুষ
বুকের ভেতর বয়ে নিয়ে চলেছে শোকের জল |

এমন দিনে সবুজ নির্জন-গাড়ি হর্ন বাজিয়ে
সারা অরণ্যকে জাগিয়ে তোলে
কোন মেয়ের বুকের ভেতর ধর্না দেবে
ভর নির্জন দুপুর !

ছবির মতো মুখ
খালি পায়ের ওপর খেলছে আজকের শেষ রোদ্দুর |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কথা হয়ে ওঠে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


অসম্ভব ভালো লাগে আমার
নিজের সঙ্গে কথা বলতে |

এক হাত থেকে আর এক হাতে
আমি কথার ঝনঝন শব্দ তুলে দিই,
বিশ্বের চোখ বেয়ে বেয়ে পড়ছে
জল,
বুকের মধ্যে এক অদ্ভূত মন |

মন বুঝি দেশ |
একটুকরো ছেঁড়া কাপড়ের মধ্যে
আমরা জড়িয়ে নিই চোখের জল,
কেউ যেন ভেজা বুকের দিকে চোখ না নামায় |

মাটি থেকে উঠে আসছে সোঁদা গন্ধ
গন্ধের মধ্যে ডুবে আছে ধরাতল
একটা শব্দের মধ্যে যেমন থাকে
আর একটা শব্দের হৃদয় |

আমরা এখন কোনো কথা বলার আগে
ভেবে নিই
কতোটুকু কথা আমার সঙ্গী
আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলবে,
ঠিক আছে কমরেড, আমি আছি |

আমার বুকের মধ্যে অরণ্যের যে গভীরতা
তা আমি ছুঁড়ে ফেলে দিই
আমার বাইরে,
পাথরের ওপর ধরে রাখি জল
আগুনের নীচ থেকে উঠে-আসা
হরিণের গন্ধ
চিতাবাঘের ডোরাকাটা রঙ |

বৃষ্টির মধ্যে তৈরি হয় মানুষের মন
মানুষ কথা দেয়

কথা হয়ে ওঠে |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার মধ্যে ছেলেবেলার শহর
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


বিষাদ নিয়ে আমার কারবার দর কষাকষি
বুক থেকে নামাতে চাইছি ক্রোধ
ছেলেবেলাকে পকেটে নিয়ে হাঁটতে গিয়ে
মাটির গুলি গড়ালে জেগে ওঠে আমার
হাতের টিপ |

কী-সাহস যে ছিল আমার সে-বয়সে
ভাবলে হাসি পায়,
পায়ে খিল ধরে |

একটা রুপোর টাকা আকাশে ছুঁড়ে
বাজি ধরতাম,
হাতের তেলোর ওপর আকাশ ভাঙার শব্দ হলে
বলতাম, আর এক বাজি |

পেছন ফিরে তাকালেই দেখতাম
আমার শহরের নদী আমাকে ডাকছে |

আমি নদীর সাথে ছুটতাম
মাঝ-পথে নদী নেই |

আমি মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে নদীকে হাঁক দিয়ে ডাকতাম
বলতাম, থাম |

আমি তোমার সাথে ছুটতে পারি কই
আমার বুকে যে বিষাদের ভার !

আমি বিষাদ নিয়ে বড় হয়ে উঠলাম
আমার মধ্যে ছেলেবেলার শহর |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তুই চাইলে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


আমার দুপাশে ডানা জাগিয়ে আমি উড়তে চাই না
নীল আকাশের নীচে পাখিদের দেশ
আমাকে মনে করিয়ে দেয়
কোথায় আছে সমুদ্র, বৃক্ষের সমাধি |

তোর পৃথিবীতে তুই আমাকে নিয়ে মেঘের মতো খেলা কর
বৃষ্টি চাইলে, আমাকে ঘিরে তোল
বৃষ্টির শব্দ |

আমার পোড়া-কপালের ছাঁচ কবে পালটে গেছে
পৃথিবীর হৃদ্ পিন্ড জুড়ে এখন
মৌসুমী হাওয়া,
নদীর জলে সারাটা জীবন বৈঠার মতো
সপাৎ সপাৎ ফেলছি হাত,
জলের অরণ্যের মধ্যে ভাসিয়ে দিয়েছি
বাঁশের কেল্লা |

পৃথিবীর মানচিত্রের মধ্যে শুধু ধরে রেখেছি
মানুষ আর পাখির দেশ |

পাখির চোখে পৃথিবীর ধানের বয়স |

পাথির পৃথিবীতে মিথ্যের কোনো পল্লব নেই |

তুই যদি আমাকে ঠিক ঠিক বুঝে থাকিস
একটুকরো আগুন আমার মুখে তুলে দিস |

বাকিটা রেখে দিস নিজের জিম্মায় |
তুই চাইলে কবিতার অক্ষরগুলো আগুনে পুড়িয়ে
নিজের মতো করে নিস |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কপাট খোল হে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাই তোকে ছোঁ

ছেলেবেলার এ-খেলা খেলতে খেলতে
একদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম চোখের জলের সাথে
কথার আঙুল |

আমাকে সেই আঙুল কোনেদিন মাটির নীচে
পুঁতে দিতে পারেনি
বলেনি, বাছা মাটি ফাটিয়ে গাছ হয়ে ওঠ |

গাছের মতো আবাল্য আমি মাটিকে
কদর করেছি
বুকের ডালপালার মধ্যে রেখেছি
শব্দের গভীর ছিলা |

আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, কথার আঙুল
আমাকে বড় হতে দেয়নি
ঝড়-তুফান ধরতে দেয়নি মাথার ওপর |

পায়ের গোড়ায় জল জমলে খুলে দিয়েছি
বুকের ঝিনুক বোতাম
হাওয়া লাগুক রোদ লাগুক কথার শব্দ
গড়িয়ে পড়ুক,

বুকের মধ্যে শুকোক ভিজে কথা |

আমি এই বয়সে কোন ভাষা জোগান দিই
কাজের মানুষের হাতে |

বুঝতে বুঝতেই বেলা হল আকাল পড়ল
কথার পিঠে গজিয়ে উঠল হা-কথা |

কপাট খোল হে, চুপ করে রইলে কেন
পরাণের নীচে হাত দিয়ে তুলে আনো
মেঘের করমচা, কথার কথা |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পা বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


এ-বয়সেই ও ভেঙে পড়েছিল

হাঁটুর নীচ থেকে উঠে এসেছিল শীতের রোদ
পা জড়িয়ে জড়িয়ে যেন দ্রাক্ষালতার মর্মরধ্বনি

চোখ দুটো টানছিল এই শীতের মায়াবী রোদ
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত সে কী চোখের টান |

এই বয়স পার হওয়ার জন্যে রোদের সঙ্গে মাটির সঙ্গে
সে কী ভীষণ লড়াই !

বাপু, বয়সটা পার হতে দাও |

পা বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে শীতের রোদ
লতাপাতার মর্মরধ্বনি যেন ওকে জাগিয়ে রাখছে

পায়ের নীচে সময় কাত হয়ে মাটিতে শিকড় হয়ে উঠছে
নতুন গাছ নতুন পাতার হাওয়া প্রাণভরে টানছে |

এ—বয়স পার হওয়ার জন্যে এতো লড়াই

বাপু, পার হতে দাও |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সারা দুনিয়ার লেনিন
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


সারাটা রাত
তিনি জেগে লেনিনকে স্পর্শ করে আছেন
সারাটা দিন
তিনি স্থির রৌদ্রে দাঁড়িয়ে

পিঠের ওপর নিচ্ছেন পোড়া-মাটির ভার
জলের চিহ্ন |

যতোদিন তিনি ছিলেন
রাশিয়ার কফিনবাহকেরা রাশিয়াকে কফন দিতে
সাহস করেনি |

তিনি ছিলেন বলেই লেনিনের রাশিয়া
লেনিনের দুনিয়া
লেনিনকে অসংখ্য লেনিন দিয়েছে |

সারা দুনিয়ার লেনিনের কমরেডরা
লেনিনকে ঘিরে আছেন,
লেনিনের স্তালিন আছেন |

রাশিয়ার পাভেল তাঁর পিটার্সবুর্গে
আবার আত্মগোপন করেছেন |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর