কবি কমলেশ সেন-এর কবিতা
*
লেনিনের রাশিয়া
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কী না তুলকামাল করেই বৃষ্টি এসেছিল কাল
ঘরের মধ্যে দাপাদাপি করেছিল
.                             মেঘ
বৃষ্টির শব্দ
ঝড়ের শব্দ
ঘুমোতে দেয়নি কাল সকাল-বিকাল |

সারা রাত ধরে কাল পৃথিবী হয়েছে বিদীর্ণ
হাঁ-মুখ মাটি গ্রাস করেছে
.          আমাদের সকল সোনালি ফসল |

আমরা কোনো প্রতিবাদ করিনি
.                          বৃষ্টির মধ্যে
.                           ঝড়ের মধ্যে
.          গুটিয়ে নিয়েছি নিজের সম্বিৎ |

একফোঁটা রক্ত পতনের জন্যে এতো ভয় !

তিনি তো সারা পৃথিবীর মানুষের দিকে পেতে দিয়েছিলেন
.                                           দুই বর্ণময় হাত
এই হাত একদিন গর্বে পৃথিবীকে করেছিল
.                                টালমাটাল
.                রুশভূমির ওপর গড়েছিল
.                                    জীবন,
.                         পৃথিবীর পূর্ণ চাঁদ |

লেনিনের পাশে ছিলেন সারা দেশের জোসেফ স্তালিন
.                                       পৃথিবীর গোর্কি
.                                 নিকোলাস অস্ত্রভস্কি

বিদ্যুতের পাশে ছিল জ্বলন্ত কলম |

কালরাতে গভীর ঘুমে কেউ
.           ঘুমোতে পারেনি
সারা পৃথিবীর কলম খুঁজছে
.              মানুষের হাত,
এ তখত্-তাউশের নীচে পুঁতে দিতে চেয়েছে
.                               অগণিত চোখ
.                           খিদের লাঞ্ছিত ভাত !

দস্যু সর্দার ইয়েলেৎসিন ভীরু চোখে খোঁজে
.   কোন বুকের মধ্যে আজও অবশিষ্ট আছ
.                                ঘূর্ণি তান্ডব,
.                                        রোদ
.                                        বৃষ্টি
.                                          ঝড়

লেনিনের স্বপ্নের রাশিয়া দুর্ভিক্ষ নিয়ে আর
.                            বাঁচতে পারে না
.                             বাঁচতে চায় না |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বালক বয়সের দিকে ছুটতে ছুটতে
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


আমি ছুটছিলাম
আমার বয়সের ঢাল ধরে পিছনের দিকে
যেখানে আমার ছেলেবেলার বালকরা
এখনও চিত্কার করে,
চিত্কার করে বলে আমরা স্বাধীনতা নামে
শব্দের কোনো অলঙ্কার চাই না

চাল গমের দেশে স্বাধীনতা এতো কটু হতে পারে
আমি কোনদিন ভাবিনি

চারটি রাস্তা যেখানে চারদিক থেকে এসে
হাত ধরাধরি করেছে
সেখানে আমরা বালক বয়সে উড়িয়ে দিয়েছিলাম
রাষ্ট্র-পতাকা

তিনি কোহিমা থেকে কদম কদম এগিয়ে আসছিলেন
তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে

আমার বাবা আমাকে বলতেন
আমাদের তরবারির ওপর যেন কোনো
পাথরের ছায়া না পড়ে
পোড়া মাটির নীতি যে-ই নিক না কেন
আমরা গোপনে অন্ন জুটিয়ে রাখব
আমাদের কন্ঠে জাগিয়ে রাখব সেই গান

আমার বাবা ছিলেন তাঁদেরই একজন
যাঁরা প্রতিদিন তরবারির ডগায় রাখতেন
জীবন নামে বাঘের এক ভীষণ গর্জন
যাঁদের বুকের মধ্যে সারাক্ষণ উড়ত
গোপন রাষ্ট্র-পতাকা

আমার ছেলেবেলার দিনগুলি ছিল
এমনই,
আমরা পিঠের ওপর লাঠির দাগ
রক্তে-ভেজা মাথা নিয়ে
চাকদিক থেকে এসে যেখানে পথগুলি
হাত ধরাধরি করেছে
সেখানে উড়িয়ে দিয়েছিলাম
আমার বাবার সেই নির্জন পতাকা

তিনি কোনোদিন স্বাধীনতা দেখেননি
কোনোদিন স্বাধীন দেশের অন্ন দিয়ে
পেটও ভরাননি

তিনি বলতেন
অস্ত্রের শব্দ ছাড়া স্বাধীনতা আসে না

এতো বয়স ধরে আমি আমার বাবাকে
আমার বলক বয়সকে
এমনিভাবেই ধরে রেখেছি আমার মনের মধ্যে,
যেখানে প্রতিদিন
ডালপালার ভাঙা-শব্দের সঙ্গে মর্মরিত হচ্ছে
বৃক্ষের সবুজ সংসার

যেখানে মাটির নীচে
প্রতিদিন আলোড়িত হচ্ছে জল আর ছায়ার জীবন

এই জীবনের জন্যেই তো
আমি কবিতা লিখি

যুদ্ধের জন্যে আমার কবিতা
এখন শব্দ সাজায়
শব্দের মধ্যে ওড়ে আমার বালক বয়সের
সেই গোপন পতাকা
আমার বাবার চোখের গাঢ় জল

আমি হলুদ-কালো ডোরাকাটা বাঘের মতো
কবিতার হৃদয় বানাতে গিয়ে তাকাই
আমার দেশের মাটির মানুষের দিকে

তারাও কী গোপনে আমার মতো
শব্দের অস্ত্র সাজায় !

শব্দের অস্ত্র ছাড়া যে স্বাধীনতা আসে না |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শোকের মিছিল নিয়ে নয়, জীবনের মিছিল নিয়ে
[ মস্কোর রেডস্কোয়ারে নভেম্বর বিপ্লবের ৭৪তম বার্ষিকী যারা উদ্ যাপন করলেন
তাঁদের জমায়েত এবং মিছিলের ছবি সংবাদপত্রে দেখে ]


আমরা ধীরে ধীরে এগুচ্ছি
হাওয়ায় পতাকার মতো উড়ছে আমাদের চুল
আমাদের খালি পায়ের ওপর গড়াচ্চে
রোদ |

বাঁ-হাতের ওপর বাধা ভালোবাসার লাল ফিতে
ভালোবাসা থেকে টপটপ পড়ছে
কান্নার চোখ |

আমরা সবাই আর খানিক পরে বসে পড়ব
রেডস্কোয়ারে তুষার ঢাকা হিম পথে,
শেষ বারের মতো নয়, এই প্রথম
তার মুখের দিকে আমরা তাকালাম
আর কোনোদিন কাঁধে পড়ন্ত বিকেল নিয়ে
আমরা এমনভাবে হাঁটব না |

পকেটে ঝরনার কলম মুখ খুলতে চাইছে
মুখে কালো জলের স্ফটিক বিন্দু |

আমরা সবাই একসঙ্গে মুখ খুললাম
সবার কন্ঠে পুরোনো সেই গান
বিদ্যুতের মতো ছুটছে গর্জন করছে |

আমাদের সবার শরীর বেয়ে বেয়ে উঠছে
মাটির জমাট রঙ |

আমরা ভালোবাসা নিয়ে হাঁটছি
মাটি ফাটিয়ে এই প্রথম পা ফেলছে শাল-প্রাংশু
চেতনার নীচে জন্ম নিচ্ছে অতীত সময়
রক্তের মধ্যে ফিরে আসছে করপুট |

শোকের মিছিল নিয়ে নয় ভালোবাসার মিছিল নিয়ে
আমরা এগুচ্ছি
মাটি ফাটিয়ে হাঁটছে শাল-প্রাংশু |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর