কবি কমলেশ সেন-এর কবিতা
*
রবীন্দ্রনাথও চাই ভাতও চাই
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |


যদি কোনো কবির হাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা
তুলে দেয়া হয় |
তাহলে তিনি প্রথমেই শব্দের এক্সপ্রেস ছোটাবেন
যদি কোনো কবির হাতে পুলিশ-বাহিনীর পরিচালনার
ভার দেয়া হয়
তাহলে তিনি প্রথমেই কেড়ে নেবেন
হারামজাদা সব শব্দ |
যদি কোনো কবির হাতে খাদ্য বিতরণের
ভার দেয়া হয়
তাহলে তিনি প্রথমেই কৃষকদের হাতে তুলে দেবেন
সমস্ত ফসলের জমি

আর যদি কোনো কবিকে বিচারকের আসনে
বসিয়ে দেয়া হয়
তাহলে তিনি প্রথমেই রায় দেবেন
.          দমনের জন্যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন নেই

বলবেন, রবীন্দ্রনাথও চাই ভাতও চাই
ভয়হীন একটা দেশ চাই |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সমুদ্রের ক্ষোভ ও গর্জনের কাছে
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |


শূন্যতার পেটে জল গড়াতে গিয়ে
আমি অক্ষরমালা রোজ ঝন্ ঝন্ বেজে উঠি

আমার এক হাতে একতারা
অন্য হাতে খঞ্জনি
যেন পাখির ঠোঁট চোখের নীলমণি

পায়ের ঝুমুর মুগ্ধ বেজে ওঠে
মাটির তাল লয় ও ছন্দে

আ-শরীর আমার, আমার গো
অক্ষরমালার নদ ও নদী

হেই নদী, তুই ছুটে যা
নুন-মাখা কথার অতল সাগরে |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এমন মুখরতাই কি ...
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


কথা ছিল, কোনো প্রকৃতিকে নিয়ে নয়
কামারষালায় তৈরি একটা টাঙ্গিকে নিয়ে
আমি কবিতা লিখব

কবিতা লিখতে গিয়ে
একটা শব্দকে কিছুতেই যুৎ করতে পারছিলাম না
বড্ড ঠেটা ছিল শব্দটা

টাঙ্গি উঠিয়ে শব্দটাকে আঘাত করতে গেলে
সে রেগে চিত্কার করে উঠলো :

শব্দকে নয়,
আমাকেই ধারালো শব্দের নিচে রাখো

দেখবে,
একটা টাঙ্গির গায়ে কতো রক্ত কতো ঘাম আছে

আমাকে নিয়ে কবিতা লিখতে হলে
প্রতিটি মানুষের হাতে এক-একটা টাঙ্গি তুলে দাও

হাতে শব্দের টাঙ্গি না থাকলে
কবিতা লেখা অত সহজ নয়

তারপর সে বললো :
শব্দই হচ্ছে টাঙ্গি
টাঙ্গিকে বাগে আনা যত সহজ ভাবছো
ততো সহজ নয়

টাঙ্গির সাথে শব্দের একটা যোগসূত্র খোঁজার জন্যে
আমি একটা প্রাচীন পুঁথি খুলে বসলাম

ভাষার কোন গূঢ় রহস্য টাঙ্গিকে এমন সুন্দর করেছে
এমন মুখরতাই কি ভাষার অন্তরসত্তা !

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আদি সন্তান
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


একটা অনন্ত ঘুম ভেঙে গিয়েছে আমার মধ্যে

ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করুন
আপনার অদৃশ্য পায়ের কাছে বসে বলছি
আমি আপনার তেমন পুত্র নই

যে-পিতা আমার নাম রেখেছিলেন
আমাকে দুবেলা দুমুঠো ভাত দিয়েছেন
ছিটের জামা এবং প্যান্ট দিয়েছেন বছরের পর বছর
যিনি বলেছেন গতর খাটিয়ে ভালো মানুষের মতো চলো
নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে পথ হাঁটো
যিনি বলেছেন, তুমিই ঈশ্বর
সেই পিতার জন্যে অন্ন ও জল হাতে নিয়ে
আমি মন্ত্র উচ্চারণ করি |

একটা অনন্ত ঘুম ভেঙে গিয়েছে আমার মধ্যে
আমাকে জাগিয়ে তুলেছে

আমি নিজের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি,
এতদিন আমি নিজেকে কেন ঈশ্বরের সাথে
তুলনা করিনি,
বলিনি, আমিই ঈশ্বর

বলিনি,
আমিই ভক্তিমন্ত্র
কবিতার আদি সন্তান |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |

ওরা যুদ্ধ চায়
শুধু যুদ্ধ
যুদ্ধ
আর যুদ্ধ |

আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি |

ওরা যুদ্ধ চায়                           অস্ত্রের ব্যবসার জন্যে
আমরা যুদ্ধ করি                    অস্ত্রের ব্যবসার বিরুদ্ধে |

ওরা যুদ্ধ চায়                          কাপড়ের ব্যবসার জন্যে
আমরা যুদ্ধ করি                   কাপড়ের ব্যবসার বিরুদ্ধে |

ওরা যুদ্ধ চায়                           মানুষের ব্যবসার জন্যে
আমরা যুদ্ধ করি                    মানুষের ব্যবসার বিরুদ্ধে |

ওরা যুদ্ধ চায়                   ব্যবসা
ব্যবসা
আর ব্যবসার জন্যে |

আমরা যুদ্ধ করি                  স্বাধীনতার জন্যে

আমরা যুদ্ধ করি                    গণতন্ত্রের জন্যে

আমরা যুদ্ধ করি                সমাজতন্ত্রের জন্যে

আমরা যুদ্ধ করি                             মানুষ
মানুষ
আর মানুষের জন্যে |

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্রোত
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


কথা ছিল এই নদীর প্রতিটি বাঁক এবং ধ্বনিকে নিয়ে
আমি একটি কবিতা লিখব |
আমি ধ্বনির জন্যে আমার হাতের প্রতিটি শব্দকে তুলে
পরখ করব বলে, যেই চোখকে নদীর মতো খুলে দিলাম,
দেখলাম আমার চোখ জুড়ে প্রবল ভাঙন
নদীর প্রচন্ড গর্জন |

এমন একটা ঘন মেঘ আমার চোখের ওপর
কেন ছায়ার বিস্তার ঘটালো !  কেন অঝোরে ঝরার জন্যে
এমন ব্যাকুল হয়ে উঠল !
আমার দু’চোখে তখন গভীর টান | স্মৃতির টান |
না-বলা কথার টান | পরানের টান |
আমি আমার হাতের দিব্য আঙুলগুলি দিয়ে স্পর্শ করি
এক-একটা টান | আমি বলি, একটা আকুল নদী |
একটা আকুল স্রোত |
এমন একটা স্রোত যখন কলমের মুখে
কবিতা হয়ে ওঠে, তখন ভূগর্ভের জ্বলন্ত লাভা
জীবনের ক্ষণিক রূপ নেয় |
জীবন বলতে আমি বুঝি স্রোতের একটা আঁকাবাঁকা
জোড়-লাগানো হৃদয়-রেখা | এমন একটা রেখাই
যে-কোনো মুহূর্তে কবিতাকে উদাস বা বিজয়ী করে তুলতে পারে |

আসলে কবিতা তো শব্দেরই টানা বা ভাঙা স্রোত |

এমন স্রোত নদীর বা মানুষের যারই হোক না কেন
তুমি কি বলবে !

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাঙা মাটির বাবা ঠাকুরকে
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


অর্ধেন্দু নস্করকে আপনারা চিনবেন না | ও দেহতত্ত্বের
গান লিখত | তাতে সুর দিত |

মা-পাখি যেমন তার শিশুকে ঠোঁট দিয়ে খাইয়ে দেয়,
তেমনি ও বাউলদের ঠোঁটে তুলে দিত গানের ভাষা | সুর |

ও যখন খ্যাপা অর্ধেন্দু হয়ে গেল, একদিন বিশ ক্রোশ
পথ পায়ে ঠেলে এসেছিল শান্তিনিকেতনে | কবিকে দেখতে |

কবির কাছে বসে কবিকে অবাক চোখে দেখছিল |
আমাকে, খ্যাপা ছেলে |

অর্ধেন্দু কবিকে বলেছিল, বাবা ঠাকুর,
তোমার আলখাল্লার নিচে যে-পিঞ্জরটা আছে,
সেই পিঞ্জরটা থেকে যে ভেসে আসছে
একটা শিস্ |  কোন্ পাখি গো ঠাকুর !
এমন সুর যে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে |

ঠাকুর বললেন, শুধু পাখিই দেখলি, রাঙা মাটির
রাঙা গাছটিকে দেখলি না |

সব দেখেছি বাবা ঠাকুর | রাঙা পাতার
রাঙা শব্দও যে শুনেছি |

বাবা ঠাকুর মিষ্টি হেসে আদর করে বললেন,
বুকের পিঞ্জরটা খোলা রাখ অর্ধেন্দু | পাখিরা
আসুক | উড়ে যাক | ওদের সুরকে শুধু কান পেতে শুনিস |

দেখবি কোথাকার সুর কোথায় যায় |  কোন বুকে
দোলা লাগায় | কোন্ বুক ভেঙে আলগা করে দেয় |

শুনতে শুনতে খ্যাপা অর্ধেন্দু সেই বালক বয়সেই
বুকের পিঞ্জরটা  হাট করে খুলে দিয়েছিল |
কত পাখি সেই পিঞ্জরে এলো |  গেল |
শিস্ দিলো | গান গাইলো |
ওর সব গানেই ছিল বাবা ঠাকুরের মতো প্রার্থনা |
মানুষকে ও দেবতার আসনে বসালো |
বাবা ঠাকুরের মতো ওর চোখে ছিল জল |
ব্যথার জল | আনন্দের জল | সৃষ্টির জল |

ও যেদিন চির বিদায় নিলো, সেদিন ওর
ঠোঁটে জল দিতে দিতে বলেছিলাম :

তুমিও তো আমাদের রাঙা মাটির বাবা ঠাকুর |
তুমি চলে গেলে, কে আমাদের ঠোঁটে
ভাষা দেবে | সুর দেবে | ভাঙা বুকে প্রলয় দেবে |

একটা আঙুল নিয়ে চোখ থেকে একটু জলের রঙ
তুলে নিয়ে ও আমার হাতে দিল |

বাবা, তোমার একফোঁটা জলের রঙ
রাঙা মাটির সব বাউলদের আমি দিলাম |

বললাম, তোরা মা-পাখির মতো
ঠোঁটে সুর নিয়ে ভাষা নিয়ে নাচতে নাচতে
উড়ে যা | যেদিক দুচোখ যায়,  সেদিকে যা |

তোরা একতারা বাজিয়ে বাবাঠাকুরকে প্রণাম জানা |

শেষ প্রণাম |

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভাত মানুষের কাছে
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


মানুষের কাছে কোন গ্রহ
কোন নক্ষত্রই
আর বিস্ময় নয় |

বিস্ময় সে নিজেই
নিজের কাছে |

নিজের জন্য একমুঠো ভাত,
বা ভাতের এক অজানা গন্ধ
স্বপ্নের চেয়েও মধুর !

ভাতের জন্যে এ গ্রহের
প্রতিটি প্রান্তেই
মানুষ প্রতিদিন কী ঘটনাই না  ঘটিয়ে চলেছে |

ভাত ছাড়া
মানুষ এক মুহূর্তের জন্যেও
নিজেকে টুকরো টুকরো করে
অনায়াসে ভাবতে পারে না |

ভাতের মধ্যে আছে
মানুষের কতকালের পাঁচটি আঙুল,
কতকালের পাঁচটি অদৃশ্য ভুবন |

ভাত,
মানুষের কাছে তাই
কতকালের ভালোবাসা,
কতকালের স্বপ্ন |

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যে দেহে বাবুদের বিন্যাস
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


আলোর মত কোঁচকানো চোখের ভাঁজে ভাঁজে
জোয়ানি আওরতের কলিজার রঙ
যদিও জলস্তম্ভের মতো হিম্মত, আকাশকে
ভেঙে ভেঙে সমুদ্রের লবনাক্তে
আরণ্যক বিশ্বাস |

তবু হিম্মত আগুন, আগুনের মতো
শহরের পেশীতে পেশীতে
মশালের নাচ, আগ্নেয়গিরির
টগবগ হিম্মতি আওলাদ |

হাতের তালুতে, আয়নার মতো বিন্দু বিন্দু
কর্মিষ্ঠ হাতের তালুতে
মুঠোয় পেশীতে রক্তে
লোনা সমুদ্র, গরাদের শিকগুলো
বেঁকে বেঁকে ধনুক, লোহার গান্ডীব !
মশালের পিঠে পিঠ দিয়ে মশাল হয়ে
আগুনের মতো, আগুন আগুন
হিম্মত নিয়ে, কলিজার রঙে
অঙ্গ পরিধেয়, হাতের মুঠোয়
চোখের ভাঁজে ভাঁজে, মুদরায় মুদরায়
গরাদে জানলায় শহরে
সমুদ্রের গর্জন, ভেঙে ভেঙে
বাবুদের বিন্যাস

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মৃত নগরীর বাসিন্দাদের
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


আমার পূর্বপুরুষেরা
যাঁরা এখন গোরস্তানের বাসিন্দা
যাঁরা আল্লা আর আদমের মাঝখানে
আমার সেই সব পূর্বপুরুষেরা
সেই সব মৃতশক্তিরা গোঙাচ্ছে আর ফুঁসছে |

যে দিন আমার কলিজা
খান খান করে কেটে ফেললো
কলিজা মানে আমার সহান স্বপ্ন
অর্থাৎ আমার দেশকে
সেদিন থেকে আমি এতটুকু ফুরসুত পাই নি
চাইনি দীর্ঘশ্বাস ফেলার এতটুকু
অবসর |

আমারই চোখের সামনে
গর্বোদ্ধত বেইমান চেহারা
যাদের সাথে বংশপরম্পরায় বেমানান
আমার আভিজাত্য, আমার আত্মা
আমার দৈহিক আর মানসিক গঠন
সেই সব বিদেশি সাদা আদমিরা
বুক-সমান বেয়নট উঁচিয়ে
আমার গতিবিধিকে শৃঙ্খলিত করছে
অনবরত
আর আমার কন্ঠকে ছাপিয়ে
যে আওয়াজ প্রতিনিয়ত
কানে এসে বাজছে
তাকে বিদেশিরা বলে : মিলিটারি কমান্ড |
আমার পূর্বপুরুষেরা
যাঁরা এখন গোরস্তানের বাসিন্দা
যাঁরা আল্লা আর আদমের মাঝখানে
সেই সব পূর্বপুরুষেরা
কিছু জ্যান্ত কলিজা উপহার দেবে
মৃত নগরীর সেই সব বিবেকবান বাসিন্দাদের
যাদের জন্য মওজুদ করে রাখা হয়েছে
এমন সব অদ্ভুত উপমার ব্যবস্থা
আর যে ব্যবস্থা সম্পর্কে
সব চেয়ে বেশি হুঁশিয়ার আর কায়দাদুরস্ত
আমেরিকার ধুরন্ধর সামরিক কর্তারা |

মৃত নগরীর বাসিন্দাদের
আমার পূর্বপুরুষেরা
কিছু জ্যান্ত কলিজা উপহার দেবে |

.          ********************         

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর