এই মাটি, বলতে পার কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |
এই মাটি, বলতে পার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধূলা আর ধোঁয়ায় ঢাকা রেশমের মতো নরম এখানকার মানুষের মন | মনের উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে কতো তলোয়ার আর ঘুর্ণিঝড় |
এই তলোয়ার আর কামানের ঘুর্ণিঝড়ের মধ্যেই আমি নামিয়েছিলাম আমার মাটি-মাখা পা, আমার পায়ের পাশেই ছিল শস্যের প্রসারিত সমাধিভূমি |
আমি কখনো শস্যের কালো দানা এত কাছ থেকে দেখিনি, আমি কখনো মানুষের বুকের শব্দ এত নিবিড়ভাবে অনুভব করিনি, আমি কখনো বারুদের গন্ধ এত কাছ থেকে নেইনি |
এই মাটি, বলতে পার শস্যের বিস্তীর্ণ সমাধিভূমি ধূলা আর ধোঁয়ায় ঢাকা, এই ধূলা আর ধোঁয়ার অন্ধকারে আমি রেখেছিলাম আমার মাটি-মাখা পা, রেখেছিলাম মর্মরিত গাছের সজীবতা |
এই মাটি, বলতে পার শস্যের প্রসারিত সমাধিভূমি ধূলা আর ধোঁয়ায় ঢাকা |
ভালোবাসা যে সজাগ চোখ কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |
পায়ে পায়ে মাটি, ছুটে চলেছে সারা পৃথিবীময় নদীর মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঢল হয়ে নেমেছে এখানে, যেন দাবানল |
জন্ম আর মৃত্যুর সাথে এমন লুকোচুরি এমন হৈ হৈ দৌড় এই ঠাঁটাপোড়া রোদে মানুষের সাথে এমন মিতালি আমাকে অবাক করে |
আমি মৃত্যুর সাথে বাঁধি জন্মের এক ভীষণ লগ্ন |
উনুনে চাপানো বালির মধ্যে ফাটছে বরণধান ফেটে বাতাসে ছড়াচ্ছে খইয়ের চাপা গন্ধ যেন মানুষের গা থেকে এই ভোরে এই দুপুরে এই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় খসে পড়ছে মমতার চাপ-ধরা ঘ্রাণ মানুষ বলে চাপা ক্ষোভ |
আমরা যদি মাটিকে না চিনি কী করে ভালোবাসব সেই মাটির পুরুষকে যার দশ আঙুলের ওপর ঘুরছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পতাকার মতো উড়ছে টানা কাজল চোখ |
বুকের রক্তের মধ্যে এখানে দহন হচ্ছে, মুনিজা আমাদের শোকগাথা |
মৃত্যুর সাথে মানুষের পবিত্র বন্ধন কোথায় গিঁট বাঁধে জানতে গিয়ে আমরা পাথরের শিকড়ের নিচে দেখি ঘরময় জলের আলপনা |
মুনিজা, এই পোড়ামাটির দেশে কোথায় যেন জন্ম নেয় মৃত্তিকা, জমাট মেঘ | আমরা কিছুতেই এই মুহূর্তে বলতে পারি না ভালোবাসা যে সজাগ চোখ |
ওর পরাগ মাখা হাত আমার হাতে রেখে বলেছিল, আমাকে বাঙলা শেখাবে !
মনে মনে বলেছিলাম, লুসি, তুমি এত দূর দেশ থেকে এসেছ তবু অবলীলায় বাঙলায় কথা বলবে বলে |
আমি কি ছাই তেমন বাঙলা জানি ! আমলকির পাতার মতো তোমার কচি দুটি ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললাম, তোমাকে এই পাখির মতো উড়িয়ে দিলাম দিগন্তজোড়া বাঙলায় শালিধানের মাঠে |
আকাশে উড়তে উড়তে তুমি বলবে, আমার দুটি ডানায় শীতের নিঝুম দুপুর | তার স্নিগ্ধ গন্ধ | এই গন্ধে আমি যে পাগল হয়ে যাচ্ছি |
স্পেনের ষোড়শী কন্যা লুসি, তুমি এ-দেশের সাজা-আকাশে ওড়ো | পাখির মতো ঠোঁটে তুলে নাও জারুল পারুল বাতাবি লেবুর গন্ধ |
এই আদিগন্ত গন্ধের মধ্যে আছে ভাষার অনুরাগ | প্রেম বিষাদ রোষ কান্না যন্ত্রণা | পরম বিশ্বাসও |
আগুন এবং প্রেমের পুণ্যধারা কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |
আসলে এসব কিছুর জন্য প্রেমের জলধি থেকে
দুটি বাহু যখন ভরন্ত গাছের ডালপালার মতো শূন্যে দোল খায় আর জলের জন্যে আকুল হয়ে ওঠে তখন তুমি অগ্নিশিখাকে বলো আমার দুটি ডানায় জ্বলছে প্রেমের আগুন
একটা চোখ থেকে যখন আর একটা চোখে তুমি আগুনকে পাঠিয়ে দাও তখন তাতে থাকে প্রেমেরই অগুনতি জল-প্রবাহ
আমি মানুষের জন্যে জমিয়ে রেখেছিলাম কতো সহস্র চকমকি পাথর সেই পাথরগুলি ঠোকাঠুকি হতেই জ্বলে উঠল আগুন আমি বললাম, বুঝতে পারছ না, আদতে এ তো জলেরই আর এক ধর্ম প্রেমের বারিধারা
আসলে জল এবং আগুনে মাখামাখি না হলে প্রেমের জন্ম হয় না
প্রেমের সাথে আগুনের এই সখ্য এই ভাব বিনিময় তোমাকে সজাগ করে তোলে
এসব কিছুই – আগুন এবং জল তোমাকে তপ্ত করেছে তোমাকে শান্ত করেছে
তাই, তুমি দেবপুত্র নও, মানবপুত্র হয়ে উঠেছ
আর, মানুষের দু’হাতে তুলে দিচ্ছ আগুন এবং প্রেমের পূণ্যধারা ---
হুজুরের কাছে নিবেদন কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |
হুজুর, কুর্নিশ, বেয়াদপি মাপ করবেন |
আপনার খাস তালুকে আল্লার ওয়াস্তে ভালই আছি | হুজুর মা বাপ, জান মাল আপনার জিম্মায়, আমার গর্দান রাখতেও পারেন --- নিতেও পারেন সব হুজুরের মেহেরবানি |
মাঝে মাঝে বেয়াদপি করি বলে হুজুর আমার গুস্তাকি মাফ করবেন, আপনার প্রতি আমার অসীম ভক্তি বাপ দাদার নামে কসম খেয়ে বলছি আমার বাল বাচ্চাদের আপনার তালুকে মানুষ করবো |
হুজুর, এ সব ইচ্ছা অনিচ্ছা সব আপনার ওপর, আমাদের নসিব ভালো, আপনার মতো হুজুর পেয়েছি |
হুজুর কয়েকদিন ধরে একটি কথা দিলের কাছে উসখুস করছে বিলকুল সত্যি কথা
তোবা তোবা কী করব হুজুর, দিলটা যে বড় বেইমান আপনার ইজ্জতের তোয়াক্কাই রাখে না |
বলছিলাম কি হুজুর, জান মাল আপনার জিম্মায় রেখেই বলছি ---
হুজুর আপনি বহুত ওস্তাদ আছেন | আপনার খেল দেখতে দেখতে বেমালুম লোপাট হয়ে যাচ্ছি | হুজুর মেহেরবান করে আপনার দিল্লাগি বন্ধ করুন
চোখের পাতায় ভাঙা-নদীর জলে কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া |
আমি কোনোদিন কোনো ভোরকে চোখের আড়াল করিনি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আমি দেখেছি সূর্যাস্ত খোলাকন্ঠে গান গেয়ে উঠেছে আমার পেছনের খাড়া দেয়াল গানের ভাষায় সুরে জানিয়ে দিয়েছে কেন একদিন আমাকে এ-গান শুনিয়েছিলে |
আমি ভোরকে ধরে রাখি চোখের পাতায় হাতের মুঠোয় ভোরের আবদার |
আমি নিজেকে ছাড়িয়ে আনি দেয়াল থেকে আমার ছায়া আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে টপকে সামনে আসে সূর্যকে ছোটায় সামনে পেছনে বেশ একটা মজার খেলা |
আমার গান বয়সের পেছন দিকে ছুটছে ছুটতে ছুটতে তাবৎ মানুষকে ডাকছে |
এই অন্ধকারের মধ্যেও গর্জন করে উঠছে ভাঙা-নদী গলা-জলে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ আমার গান মাঠের মধ্যে দিয়ে ছুটছে সুরের সাথে ছুটছে ভাঙা-নদীর জল কোথাও আবার নতুন করে ভাসিয়ে দেবে নদীকে |
ক্ষুব্ধ দেশ, বাংলাদেশ কবি কমলেশ সেন “ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া | ( সম্প্রতি ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে নিহত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক শ্রমিক নেতাদের উদ্দেশে )
এইতো দেশ তোমার দেশ ক্ষুব্ধ দেশ বাংলা দেশ এইতো আশা তোমার আশা ক্ষুব্ধ আশা অরূপ আশা . তোমার দেশ কীসের দেশ . তোমার আশা কীসের আশা . ভালোবাসা . অসীম আশা |
কিবা আছে তোমার আশা নেই যে কোনো ভালোবাসা . অসীম আশা . ক্ষুব্ধ আশা . হাতের মুঠোয় ভালবাসা |
. ক্ষুব্ধ আশা দারুণ আশা . ক্ষুব্ধ দেশ দারুণ দেশ . বুকের ভেতর অগ্নিদেশ . বাংলাদেশ . ভীষণ দেশ |
ভীষণ দেশ অগ্নিদেশ বুকের ভেতর ক্ষুব্ধ দেশ . তোমার দেশ . বাংলাদেশ | এইতো আশা তোমার আশা ক্ষুব্ধ আশা এইতো দেশ তোমার দেশ ক্ষুব্ধ দেশ . ক্ষুব্ধ দেশ অরূপ দেশ . বুকের ভেতর জ্বলছে দেশ . বাংলাদেশ . ভীষণ দেশ . অরূপ দেশ |