কবি কমলেশ সেন-এর কবিতা
*
একটি সংবাদ
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


একটি সংবাদ দিই তোমাদের
অত্যন্ত গোপনে, স্থির নিশ্চিত বিশ্বাসে,
পুব আর পশ্চিম থেকে যারা আসছে
.                        তারা অভিন্নহৃদয়
একই গান্ধারে তাদের প্রাণের মিতালি
জন্মও তাদের একই মাতার গর্ভে
.                        পরিচয় শুধু ভিন্ন |

তাই আমার খবরে নিশ্চিত বিশ্বাস রেখে
তোমাদের প্রাণকে মাতোয়ারা করো
.                        আনন্দে হাস্যে,
বিপদের গম্ভীর থেকে
উড়িয়ে দাও নিজেকে
ভোমরার মতো ফুলবাগিচায়
.                        গুনগুন গানের কলিতে |

শুধু পরিচয়ের সূত্রটি থাক
.                        অত্যন্ত গোপনে
একাম্ত নিজস্ব হয়ে :
কারণ তোমাদের জীবন তো আর
ফুলের মতো ক্ষণস্থায়ী নয় |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পার্টি আমার
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


পার্টি আমার বিশাল দেশে, মহান বেশে
যুদ্ধ জয়ের দিয়েছে ডাক ;
পার্টি আমার প্রাণের গভীরে ভেঙেছে নিরাশ
দিয়েছে এনে সূর্যমুখী নদীর প্রপাত |

পার্টি আমার চোখের তারায়
বসিয়ে দিয়েছে জীবন গান, অগ্নিপ্রাণ ;
পার্টি  আমার মুখর দিনের অগ্নিরথে
উড়িয়ে দিয়েছে রক্ত নিশান |

পার্টি আমার বিশাল দেশে, ভারতবর্ষে
দিয়েছে এনে প্রাণের সাজ, বিজয় সাজ ;
পার্টি আমার কন্ঠে দিয়েছে স্মৃতির গান
যুদ্ধ জয়ের অমর গান |

পার্টি আমার বিশাল দেশের গভীর প্রাণে
উড়িয়ে দিয়েছে জীবন নিশান, রক্ত নিশান ;
পার্টি আমার চোখের তারায়, বুকের তারায়
বসিয়ে দিয়েছে অমর প্রাণ, মৃত্যুহীন গভীর প্রাণ |

পার্টি আমার, আহা পার্টি আমার
বিশাল দেশের, গভীর দেশের পার্টি আমার |

.          ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কোন কথাই বলতে পার না           
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


কোন কথাই তুমি এখন
বলতে পার না

না আগুন
না বুলেট
না ফুল
কোন কথাই না |

কোন কথাই তুমি এখন
বলতে পার না
না মানুষ
না দেশ
না তোমার
কোন কথাই না |

কোন কথাই তুমি এখন
বলতে পার না,
পার না বলেই
তোমার হাতে
আর পায়ে বাজছে
ঝুম ঝুম লোহার
নুপূর |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটু পানি দাও
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ”  ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম
আর কোরান শরিফের আয়াতগুলি
সুর করে আবৃত্তি করছিলাম

আমার মুখ কোন্ দিকে ফেরানো ছিল
কাবা মসজিদের দিকে,
না, কারবালা প্রান্তরের দিকে ?

হিজরির কোন সনে যেন কারবালার যুদ্ধ হয়েছিল
ভাবতে গিয়ে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি
কে দোষী, এজিদ,
না, হাসান-হোসেন !

না, ফোরাতের এক ফোঁটা পানি !

আমি ভাবি,
এমন অস্ত্র এমন মানুষ কি পৃথিবীতে নেই
যে-অস্ত্র এমন মানুষ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে
কোরান শরিফের আয়াতগুলি
আমার মতো সুর করে আবৃত্তি করবে |

আমি এক কোমর যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলে উঠি :
বিসমিল্লা বিসমিল্লা

একটু পানি দাও
ওজু করবো |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শিশুদের মুহুর্মুহু গোসা
কবি কমলেশ সেন
“ভারতবর্ষ সেই দেশ” ( ২০০৮ ) কাব্যসংকলন  থেকে নেওয়া |


ছোটবেলায় আমি প্রায়ই আল্লার কাছে যেতাম

আল্লা আমার বন্ধ বইয়ের মধ্যে গুঁজে দিতেন
পাখির রঙিন পালক মৌমাছির চাক
বৃষ্টির দানার মতো শস্যের হলুদ কুসুম

বলতেন
মাথায় মুকুটের মতো এ-পালক পরে
তুই যুদ্ধে যাস,
মৌমাছির চাক শস্যের হলুদ কুসুমকে তুই তুলে রাখিস
তোর ছেঁড়াফাটা বইয়ের ছোট্ট তাকে
যুদ্ধের নিয়ম-কানুন শিখে নিস আমার কাছে

যুদ্ধ বলতে এ-বয়সে আমি বুঝতাম
ভীষণ গোসা,
আমি গোসা করে দুবেলা ভাত না খেয়ে থেকেছি
আল্লাকে বলেছি
আমি যুদ্ধ ঘোষণা করেছি

আমার খুব গোসা দেখলে
আল্লা হাসতেন আর বলতেন
মুকুট থেকে পাখির পালক খসিয়ে
পায়ের কাছে রাখ
দেখবি নিমেষে গোসা কোথায় পালিয়ে গিয়েছে

আমি আল্লাকে বলি,
এই মুহূর্তে আমার দোয়াত কলম চাই
তোমাকে নিয়ে এমন কাব্যি করব
যেন আর কেউ কোনদিন তোমাকে নিয়ে
কাব্যিটাব্যি না করে

আসলে আল্লা,
ছোট মানুষদের সাথেই তোমার ভাব
এ-সারতত্ত্ব আমি এ বয়সে এসে বুঝেছি

বয়সের অভিজ্ঞতা দিয়ে
তুমি নিশ্চয়ই আল্লা এমন এক গ্রন্থ লিখবে,
যে গ্রন্থের মধ্যে থাকবে আমার পাখির রঙিন পালক
মৌমাছির ভরা চাক শস্যের হলুদ কুসুম

থাকবে শিশুদের মুহুর্মুহু গোসা

এ-গোসা হচ্ছে তোমার ভরা চাক হলুদ কুসুম
আল্লা, তোমার কাব্যের চির উপমা |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি নারীর বুকের ভেতর খুঁজেছি
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


তুমিই আমাকে বলেছিলে
এমনিভাবে জোর করে ভালবাসতে হয় |

জোর করতে না পারলে
কোনো দিনই ভালোবাসা
আহত বাঘের মতন তেমন গর্জে উঠতে পারে না |

ভালোবাসার শৌর্য বলতে
কোনো সত্যিকারের মানুষ
কোনোদিনই মানুষের পোশাক-আশাক বোঝেনি |

আমি জানি
বুকের গভীর ঐশ্বর্যে লুকিয়ে থাকে
বাঘের অনন্ত যৌবন এবং লাবণ্য |

খিদের সাথে
আমি ভালোবাসাকে তাই কোনোদিন মেলাতে চাইনি |

একটা শহর
বা একজন নারীর যে অদম্য ভালোবাসা
তারও একটা নিজস্ব রূপ
আদল
এবং সাহস আছে |

সাহস না থাকলে
যেমন শহর এবং নারীর রূপ পালটে যায়,
ঠিক তেমনি পালটে যায় ভালোবাসার সহজ বিশ্বাস |

ভালোবাসার জন্যে
আমি চিরদিনই নারীর বুকের ভেতর
ঝড় এবং তাণ্ডবের ঐশ্বর্য খুঁজেছি |
স্বপ্নের মতো আমার বুকের ব্যথার মধ্যে
জেগে ওঠে গোলাপ কাঁটা

আমি পকেট ভর্তি
জল
এবং আকাশ নিয়ে
কোথায় কোথায় না ঘুরে বেড়াই |

আমার অদ্ভুত
একরোখা তর্জনী বেয়ে
টুপটুপ বৃষ্টির ফোঁটার মতো পড়ে
রক্ত
ব্যথা
না, এসব কিছুই না,
পাতালপুরীর
জল
আকাশ
না, এসব কিছুই না |

ভালোবাসা হে, ভালোবাসা |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যেন ভোরের স্বর্ণকুন্তল        
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |

ভোর,
একহাঁটু রোদ্দুরে ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ তুলে
আমি ঘরে ঢুকলাম |

বব্ধুবরের চোখে
জামার কলারে
অবিন্যস্ত চুলে
তখনও বরফের কুচির মতো নরম ঘুম |

সামনে টেবিলের ওপর খোলা পড়ে আছে
গত রাত্রে পড়তে পড়তে হঠাৎ রেখে-যাওয়া
মীর তকী মীরের কবিতার বই |

আমি বেমালুম নিজেকে চেপে যাই
কী জন্যে
এ-ভোর-ভোর এসেছি |

এক চামচ চিনি
হালকা চায়ের সঙ্গে মিশোতে মিশোতে
বলি :

আজ সন্ধ্যায় আবার আসব |

একহাঁটু রোদ্দুরে ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ তুলে
আমি যেমন ভাবে ঘরে ঢুকেছিলাম
তেমনিভাবে বেরিয়ে গেলাম |

টেবিলের ওপর খোলা
মীর তকী মীরের কবিতার বইয়ের পাতা
রৌদ্রে
কী ভীষণ ভিজে যাচ্ছে |
যেন ভোরের স্বর্ণকুন্তল |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কী অদ্ভুত দেশ না তোমার
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


কী অদ্ভুত দেশ না তোমার
কী অদ্ভুত তোমার দরিয়া !

তুমি খাচ্ছ-দাচ্ছ
ঘুরে বেড়াচ্ছে |
চিত্পটাং মরু প্রান্তরের মতো
তোমার নদী
নালা
খন্দক |

ভোজবাজির মতো
প্রতিদিন তারা পাল্টাচ্ছে
সাতকাহনিয়া মেজাজ |

মেজাজে চালিয়ে দাও না কেন হে
তোমার
সখের ত্রিভূজ লাঙল |

হেঃ হেঃ
কী অদ্ভূত দেশ না তোমার !

কী অদ্ভূত তোমার পোশাক !

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শহুরে হাঙর
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


ফাইভ স্টার হোটেলের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে
আমি দেখছিলাম
শহরের হাঁটুর গোছ
কোমরের সখেদ বেল্ট
আর বুকের হলদে ঝিনুক বোতামগুলো |

এতো দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল
কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে
জল আর কাদার তোড়,
মুখ গুঁজে জলের নীচে পড়ে আছে
সজনেখালির ট্রাম-লাইন
হাইড্রেনের হিঁ হিঁ দাঁত-বের-করা মুখ |

দাঁত-বের-করা মুখ দিয়ে
ভস ভস ভেসে উঠছে
বেকুব ধাঙড়গুলোর
অকৃত্রিম মাছের মতো ফ্যাটফেটে চোখ |

চোখে নেই কোনো ধ্রুবতারার মতো
জ্যোতি, কোনো সঘন সময়
কোনো উদ্বেল দিবস-রাত্রি |

সামনে স্বপ্নের মতো নাড়িয়ে চলেছে
হাতের সবুজ
আর লাল রঙের নিশান,
যেন বুটিদার আলোর নাবিক |

‘বাপু, এদিকে ভুলেও এসো না,
ঘুরে যাও না হয় এক ফার্লং পথ |’

এখন এদিকে,
শহরের বাদামি হৃদ্ পিন্ডে
চালানো হচ্ছে জবর অপারেশন |

অপারেশন টেবিলের ওপর
মাখামাখি চিত্পটাং পড়ে আছে
জল কাদা আর অঝোর বৃষ্টির সাথে
বিরাট শহুরে হাঙর |

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমি কোনো কোনো দিন
কবি কমলেশ সেন
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |


আমি কোনো কোনো দিন
ভোরবেলায় ঘুমিয়ে পড়ি |

ভোরের ঘুম জাগরণের মতো মনে হয় |

কার সাথে যেন আলাপ করি,
সূর্যকে ছড়িয়ে দিই
গতকাল রাতে পাতা বিছানায় |

মেঝের ওপর স্তূপাকার কাপড় থেকে
নির্বিঘ্নে বেরিয়ে পড়ে আহতমন |

চোখ না তুলেই
সম্বোধন করি পুরোনো বন্ধুদের |

কবিতার ছেঁড়া-ফাটা কাগজের মধ্যে লুকিয়ে-রাখা
ভোরের সূর্যকে এক পেয়ালা
চায়ের মতো এগিয়ে দিই |

তারপর বলো, কি খবর
সব ভালো তো ?

সবাই বলে,
আমি নাকি প্রায়ই ভোরকে নিয়ে
এমন উপহাস করি |

আমার চোখের ওপর থেকে
দু’হাতে সরিয়ে দিই
পুরোনো বন্ধুদের জলছবি |

ভোরের সূর্যকে নিয়ে কি
আমি কোনো উপহাস করতে পারি !

.      ********************  

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর