আমরা আগুন নিয়ে আগুনের কবিতা লিখব কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া | [ অন্ধ্রের মাটিতে যাঁরা প্রতিদিন শহীদ হচ্ছেন ]
মেয়েটার সাথে কি অসম্ভব প্রবঞ্চনাই না করেছে উড়ুক উড়ুক ছেলেটা বাপের নিঃস্ব পকেট হাতড়ে যে-কটা গোনাগুনতি পয়সা পেয়েছিল ভালোবাসার জন্যে তা কীভাবেই না জলের মতো উড়িয়ে দিল |
ছেলেটার বুকে কি কোনো দহ, কোনো জল নেই ?
জলের স্বভাব-ধর্ম কি ছেলেটাকে স্পর্শ করেনি !
২ শিরিস গাছের নীচে বসতে আমার মোটেই খারাপ লাগে না |
শিরিস গাছের আঠা দিয়ে আমরা ছেলেবেলায় চঙ-ঘুড়ি বানাতাম |
চঙ-ঘুড়ির জন্যে আমি কোনোদিন আমার ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করিনি |
৩ ঘাসের মধ্যে পা ডুবিয়ে মাটির তলায় কী আছে অনুভব করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে |
লাল-কালো ডাই পিঁপড়েগুলো ক্ষুদে পাহাড়ি ট্যাঙ্কের মতো আমার লোমশ পা বেয়ে বেয়ে উঠে আসে, বুকের নীচে কী আছে হামলা করে নিয়ে যাবে বলে |
আমি কবিতার ভেজা-ভেজা কাগজ হিসেবের ফর্দের মতো হাতে ধরে থাকি, হাসি—বেকুব, যার জিনিস তাকে যে কবে দিয়ে রেখেছি |
পাবেটা কোন ছাই আমার বুকের নীচে |
৪ ভুলে যাই শিরিস গাছ মাটির তলায় অনুভব সবুজ ঘাস এখানে-ওখানে দহে জমা বৃষ্টির বা চোখের জল |
চমকে উঠি, না, ক্ষুদে পাহাড়ি ট্যাঙ্ক নয় তোমার ঠোঁট কী সুন্দর অদৃশ্য সোনালি মৌমাছির মতো নেমে এসেছে সটান আমার ঠোঁটের ওপর |
আমি বেদানার কোয়ার মতো নিজের মধ্যে উপছে পড়ি |
মুঠো-ভর্তি আর ধরে রাখতে পারছি না বারুদের মতো তোমার ঘাম |
আমার ঠোঁটের ওপর সটান নেমে এসেছে কী সুন্দর অদৃশ্য সোনালি মৌমাছির মতো তোমার ঠোঁট |
এই শহরের বুকের ভেতর কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
এই শহরকে নিয়ে যেদিন আমি গল্প করতে বসলাম, সেদিন শহরের গভীর বুকের ভেতর কী এক অদ্ভুত ঘ্রাণ কী এক অদ্ভুত ব্যথা দাপাদাপি করে উঠল |
এ বয়সের ঘ্রাণ ব্যথা না যৌবনের কোনো উদার অক্লান্ত স্মৃতি !
আমি কোনোদিন তেমনভাবে আমার স্মৃতিকে বুকের ভেতর সঞ্চয় করে রাখতে পারিনি |
আমার বিশ্বাস আমার ভালোবাসা আমার করুণা আমার স্মৃতিগুলোকে নিয়ে কোনোদিন বেকুবের মতো হো হো করে হেসে ওঠেনি |
বরং স্মৃতিগুলো যেন আমাকে ভীষণ যন্ত্রণা না দেয় তাই এই শহরের বুকের ভেতর আমি তা নিজের হাতে নিজের স্বপ্নের মতো লুকিয়ে রেখেছি | কোনোদিন কোনো বিষাদ কোনো ভয় আমাকে তাই অপমান করতে সাহস করেনি |
সাহস নিয়েই তো আমি এই শহরের বুকের ভেতর তেমনভাবে বেঁচে আছি | আমি ঘ্রাণ এবং ব্যথার মধ্যে জীবনের মরণের আলোড়ন দেখেছি |
আমি এই সবে মানুষকে দেখলাম কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
আমি এই সবে মানুষকে অভিলাষ নিয়ে দেখলাম |
মানুষ আমার কাছে শৈশবের লুকোচুরি খেলার মতো অনাবিল |
মানুষ কেন কাঁদে আমি বহুদিন আথাল-পাথাল ভেবেছি |
ভেবেও ঠাহর করতে পারিনি, কান্নার এত জল মানুষের কোন প্রত্যন্তে জমাট বেঁধে থাকে !
আমার শৈশবের এক বন্ধুকে আমি প্রতিক্ষণ অঝোরে কাঁদতে দেখতাম |
বুঝতে পারতাম না, ও কেন এত উদাস হয়ে কাঁদে !
নদীর জলে সাঁতার কাটতে কাটতে আমি ওকে কাঁদতে দেখেছি, মনে হতো সমস্ত নদীটাই যেন ওর বুকের অনন্ত গভীর থেকে উত্সারিত হয়েছে |
একদিন চৈত্রের এক প্রখর রোদে চালতা বাগানের ছায়ায় বসে ওর চোখের টলটল জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জিজ্ঞেস করলাম : তোর চোখের এতো জল তুই কোথায় জমাট বেঁধে রেখেছিস ?
এই প্রথম আমি দেখলাম ওর মুখে একটুকরো শনাক্ত হাসি | ওর হাসির মধ্যে ছলকে উঠল ওরই চোখের অগাধ লোনা জল |
আমি এই প্রথম অনুভব করলাম জল বলতে কি বোঝায়, মানুষ কেন জলকে এতো প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে | লোনা জলের মধ্যেই যেন মানুষ লুকোচুরি খেলতে খেলতে তার লোনা প্রত্যয় নিয়ে বেঁচে আছে |