আমি জলে-ভেজা এই কাঠের পাটাতনের ওপর বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে এই প্রথম দেখলাম বৃষ্টি এবং মানুষের সাধের জন্ম |
আমি হাওয়ার দারুণ শব্দের অন্তর থেকে শম্বরের দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করার জন্যে এই সারা বৃষ্টির দেশে মাটিতে চোখ গুঁজে খুঁজে চলি ঝিঁঝিঁপোকার অজ্ঞাত আস্তানা |
বৃষ্টির তুমুল ঘ্রাণের মধ্যে আমি নিজেকে আবার নিজের মধ্যে আবিস্কার করি | এক হাত থেকে আর-এক হাতের মুঠোয় পতাকার মতো তুলে দিই বিজয়ী মানুষের চোখের সজল পল্লব |
এই বৃষ্টির দেশে জল মাটি এবং অরণ্যের অনুজ গন্ধ থেকে মানুষ তার দু’হাতের বিস্মিত শক্তিতে টেনে বের করে তার নবীন সন্তান-সন্ততিকে |
এ-ভাবেই এই তুমুলবৃষ্টির দেশে মানুষ নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে আকাশভাঙা বৃষ্টি এবং ঝড়ের এক নৈসর্গিক আলোড়ন |
আমাদের নিজস্ব এক ভারতবর্ষ কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
আজ, আজ এ-ভোরে, ঠিক ভোরে হাওয়ার ঝাপট উঠল তুলোর খেতে | মাটি হাওয়া এবং তুলোর জড়াজড়ি সৃষ্টি করল এক উষ্ণ মে-দিনের ভোর |
ঠিক আজ ভোরে জামরুল গাছের তীক্ষ্ম শাখা এবং পল্লবের গোপন আস্তানা থেকে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল চিতাবাঘের এক ডোরাকাটাআকাশ, দুধের ফেনার চেয়েও নরম পায়ের নীচে হাওয়া শুষ্ক জল এবং তুলোর এক আদিগন্ত চষা-জমি |
বৃষ্টির ধারার মধ্যে কবি কমলেশ সেন কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত “অপ্রকাশিত কবিতা” কাব্যসংকলন ( ২০১১ ) থেকে নেওয়া |
বৃষ্টির ধারার মধ্যে আমি জলজ-গাছের মতো বেড়ে উঠেছি |
পৃথিবীর প্রাচীন নগর থেকে উঠে আসছে মাটির পরতে পরতে উদাসীন এক সভ্যতা |
বিদায়, বিদায় হে জননী তোমাকে |
তুমি কেন বৃষ্টির ধারাকে ধরে রাখতে পারনি তোমার অনামিকা আঙুলের সুপ্ত ক্রোধ এবং বিশ্বাসের মধ্যে, কেন বিস্মিত ফসলের নীচে লুকিয়ে রাখনি সময়ের ভীষণ নৈঃশব্দ্যকে | আমি পৃথিবীর এই নবীন শহরে বৃষ্টির অযুত ধারার মধ্যে জেগে বসে আছি |
পড়ছি প্রাচীন শোক এবং শৌর্য-গাথা |
বৃষ্টির মধ্যে আমি খুঁজে চলেছি প্রাচীন মুখ, পুরাকালের কোনো শোক পুরাকালের কোনো ব্যথা |
সময় থাকতেই আমি ধরে রাখি বৃষ্টির প্রতিটি ধারার নিকষ শব্দরূপ |
আমি জলজ-গাছের গভীর আত্মার মতো শব্দকে বুকের মধ্যে পালন করি |
শব্দ যাতে একদিন আগুনের শিকড়-বাকড়ের মতো সূর্যকে ধরে রাখতে পারে মগ্ন জল এবং মাটির নীচে |
আমি বৃষ্টির ধারার মধ্যে বৃষ্টির শব্দকে দু’হাতে ওলোট-পালোট করি পুরাকালের কোনো শোক এবং ব্যথার জন্যে |