কবি কামিনী রায়ের কবিতা
*
সে কি ?
কবি কামিনী রায়
("আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া)

"প্রণয়?"
"ছি!"
"ভালবাসা---প্রেম?"
"তাও নয় |"
"সে কি তবে?"
.        "দিও নাম, দিই পরিচয়---
আসক্তি বিহীন শুদ্ধ ঘন অনুরাগ,
আনন্দ সে নাহি তাহে পৃথিবীর দাগ ;
আছে গভীরতা আর উদ্বেল উচ্ছ্বাস,
দু'ধারে সংযম-বেলা, ঊর্দ্ধে নীল আকাশ,
উজ্জ্বল কৌমুদীতলে অনাবৃত প্রাণ,
বিম্ব প্রতিবিম্ব কার প্রাণে অধিষ্ঠান ;
ধরার মাঝারে থাকি ধরা ভুলে যাওয়া,
উন্নত-কামনা-ভরে ঊর্দ্ধ দিকে চাওয়া ;
পবিত্র পরশে যার, মলিন হৃদয়,
আপনাতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবালয়,
ভকতি বিহ্বল, প্রিয় দেব-প্রতিমারে
প্রণমিয়া দূরে রহে, নারে ছুঁইবারে ;
আলোকের আলিঙ্গনে, আঁধারের মত,
বাসনা হারায়ে যায়, দুঃখ পরাহত ;
জীবন কবিতা-গীতি, নহে আর্তনাদ,
চঞ্চল নিরাশা, আশা, হর্ষ, অবসাদ |
আপনার বিকাইয়া আপনাতে বাস,
আত্মার বিস্তার ছিঁড়ি' ধরণীর পাশ |
হৃদয়-মাধুরী সেই, পূণ্য তেজোময়,
সে কি তোমাদের প্রেম?---কখনই নয় |
শত মুখে উচ্চারিত, কত অর্থ যার,
সে নাম দিও না এরে মিনতি আমার |"

.           *******************
.                                                           
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রণয়ে ব্যথা
কবি কামিনী রায়
("আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া)

কেন যন্ত্রণার কথা,                        কেন নিরাশা ব্যথা,
জড়িত রহিল ভবে ভালবাসা সাথে?
কেন এত হাহাকার,                    এত ঝরে অশ্রু ধার?
কেন কণ্টকের কূপ প্রণয়ের পথে?

বিস্তীর্ণ প্রান্তর মাঝে                    প্রাণ এক যবে খোঁজে
আকুল ব্যাকুল হয়ে সাথী একজন,
ভ্রমি বহু, অতি দূরে                     পায় যবে দেখিবারে
একটি পথিক-প্রাণ মনেরি মতন ;---

তখন, তখন তারে                      নিয়তি কেনরে বারে,
কেন না মিশাতে দেয় দুইটি জীবন?
অনুলঙ্ঘ্য বাধা রাশি                  সম্মুখে দাঁড়ায় আসি---
কেন দুই দিকে আহা যায় দুই জন?

অথবা, একটি প্রাণ                    আপনারে করে দান---
আপনারে দেয় ফেলে' অপরের পায় ;
সে না বারেকের তরে                  ভুলেও ভ্রুক্ষেপ করে,
সবলে চরণতলে দলে' চলে' যায় |

নৈরাশপূরিত ভবে                        শুভযুগ কবে হবে,
এরটি প্রাণের তরে আর একটি প্রাণ
কাঁদিবে না সারা পথে ;---                 প্রণয়ের মনোরথে
স্বর্গমর্ত্যে কেহ নাহি দিবে বাধা দান?


. *******************
.                                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাতৃপূজা
কবি কামিনী রায়

যেইদিন ও চরণে ডালি দিনু এ জীবন,
হাসি অশ্রু সেইদিন করিয়াছি বিসর্জন |
হাসিবার কাঁদিবার অবসর নাহি আর,
দুঃখিনী জনম-ভূমি,---মা আমার, মা আমার!
অনল পুষিতে চাহি আপনির হিয়া মাঝে,
আপনারে অপরেরে নিয়োজিতে তব কাজে ;
ছোটখাটো সুখ-দুঃখ---কে হিসাব রাখে তার
তুমি যবে চাহ কাজ,---মা আমার, মা আমার!
অতীতের কথা কহি' বর্তমান যদি যায়,
সে কথাও কহিব না, হৃদয়ে জপিব তায় ;
গাহি যদি কোন গান, গাব তবে অনিবার,
মরিব তোমারি তরে,---মা আমার, মা আমার!
মরিব তোমারি কাজে, বাঁচিব তোমারি তরে,
নহিলে বিষাদময় এ জীবন কেবা ধরে?
যতদিন না ঘুচিবে তোমার কলঙ্ক-ভার,
থাক্ প্রাণ, যাক্ প্রাণ,---মা আমার, মা আমার!

.             *******************
.                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ডেকে আন্
কবি কামিনী রায়
("আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া)

পথ ভুলে গিয়াছিল, আবার এসেছে ফিরে,
দাঁড়ায়ে রয়েছে দূরে, লাজে ভয়ে নত শিরে ;
সম্মুখে চলে না পদ, তুলিতে পারে না আঁখি,
কছে গিয়ে, হাত ধরে, ওরে তারে আন্ ডাকি |

ফিরস্ নে মুখ আজ নীরব ধিক্কার করি,
আজি আন্ স্নেহ-সুধা লোচন বচন ভরি |
অতীতে বরষি ঘৃণা কিবা আর হবে ফল?
আঁধার ভবিষ্য ভাবি, হাত ধরে লয়ে চল্ |

স্নেহের অভাবে পাছে এই লজ্জানত প্রাণ
সঙ্কোচ হারায়ে ফেলে---আন্ ওরে ডেকে আন্!
আসিয়াছে ধরা দিতে, শত স্নেহ-বাহু-পাশে
বেঁধে ফেল্ ; আজ গেলে আর যদি না-ই আসে |

দিনেকের অবহেলা, দিনেকের ঘৃণাক্রোধ,
একটি জীবন তোরা হারাবি জীবন-শোধ |
তোরা কি জীবন দিবি? উপেক্ষা যে বিষবাণ,
দুঃখ-ভরা ক্ষমা লয়ে, আন্, ওরে ডেকে আন্ |

.              *******************
.                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দিন চলে যায়
কবি কামিনী রায়
("আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া)

একে একে একে হায়!                     দিনগুলি চলে যায়,
কালের প্রবাহ পরে প্রবাহ গড়ায়,
সাগরে বুদ্বুদ্ মত                            উন্মত্ত বাসনা যত
হৃদয়ের আশা শত হৃদয়ে মিলায়,
.                           আর দিন চলে যায় |
জীবনে আঁধার করি,                      কৃতান্ত সে লয় হরি
প্রাণাধিক প্রিয়জনে, কে নিবারে তায়?
শিথির হৃদয় নিয়ে,                      নর শূণ্যালয়ে গিয়ে,
জীবনের বোঝা লয় তুলিয়া মাথায়,
.                            আর দিন চলে যায় |
নিশ্বাস নয়নজল                           মানবের শোকানল
একটু একটু করি ক্রমশঃ নিবায়,
স্মৃতি শুধু জেগে রহে,                   অতীত কাহিনী কহে,
লাগে গত নিশীথের স্বপনের প্রায় ;
.                              আর দিন চলে যায়!


. *******************
.                                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুখ
কবি কামিনী রায়
(৩০শে জুন, ১৮৮০ সালে, ষোল বছর বয়সে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার
ছয়মাস পূর্বে লেখা | "আলো ও ছায়া" কাব্য---১৮৮৯, থেকে নেওয়া)

নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?---
.        এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
.        কেবলি কি নর জনম লয়?---
কাঁদাইতে শুধু বিশ্বরচয়িতা
.        সৃজেন কি নরে এমন করে'?
মায়ার ছলনে উঠিতে পড়িতে
.        মানবজীবন অবনী 'পরে?
বল্ ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে,---
.        না,---না,---না,---মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর,
.        না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে |
কার্যক্ষেত্র ওই প্রশস্ত পড়িয়া,
.        সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ ;
.        যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই |
পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
.        এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
.        আপনার কথা ভুলিয়া যাও |
পরের কারণে মরণের সুখ ;
.        "সুখ" "সুখ" করি কেঁদনা আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
.        ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার |
গেছে যাক ভেঙ্গে সুখের স্বপন
.        স্বপন অমন ভেঙ্গেই থাকে,
গেছে যাক্ নিবে আলেয়ার আলো
.        গৃহে এস আর ঘুর'না পাকে |
যাতনা যাতনা কিসেরি যাতনা?
.        বিষাদ এতই কিসের তরে?
যদিই বা থাকে, যখন তখন
.        কি কাজ জানায়ে জগৎ ভ'রে?
লুকান বিষাদ আঁধার আমায়
.        মৃদুভাতি স্নিগ্ধ তারার মত,
সারাটি রজনী নীরবে নীরবে
.        ঢালে সুমধুর আলোক কত!
লুকান বিষাদ মানব-হৃদয়ে
.        গম্ভীর নৈশীথ শান্তির প্রায়,
দুরাশার ভেরী, নৈরাশ চীত্কার,
.        আকাঙ্ক্ষার রব ভাঙ্গে না তায় |
বিষাদ---বিষাদ---বিষাদ বলিয়ে
.        কেনই কাঁদিবে জীবন ভরে'?
মানবের মন এত কি অসার?
.        এতই সহজে নুইয়া পড়ে?
সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
.        পারনা মুছিতে নয়ন-ধার?
পরহিত-ব্রতে পারনা রাখিতে
.        চাপিয়া আপন বিষাদ-ভার?
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
.        আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
.        প্রত্যেকে আমরা পরের তরে |

.          *******************
.                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর