একটুক্ রো রুটী (গাথা) কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায় দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগ সম্পাদিত “কল্লোল” পত্রিকায় ১৩৩৩,আষাঢ় (জুলাই ১৯২৬) সংখ্যায় প্রকাশিত। আমরা পেয়েছি অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” থেকে |
কাঁদিয়া উঠিল অবোধ বালিকা পাঁচ বছরের মেয়ে ‘বাবা গো কি খাব কিছু আর নেই’ চোখে জল পড়ে বেয়ে, ‘কাঁদছিস্ কেন মা আমার হেমা কেনা আঁখি ছল-ছল’ কহিল প্রতাপ, ‘আমি তোর বাপ কি মোরে হয়েছে বল’ ? রাজার ঝিয়ারি উঠিল ফুকারি লাল হল গাল কেঁদে, ‘ঘাসের রুটিটী বেড়ালে নিয়েছে আনো বাবা তারে বেঁধে’ | ছেড়ে দিয়ে হাল ঠুকিয়া কপাল কহিলেন মহারাণা, ‘শান্তির কোলে নাও ওগো প্রিয় ব্যথিতের প্রাণ-খানা’ | চমকি চাহিয়া দেখেন প্রতাপ আন্ মনে কাঁদে প্রিয়া, হাসি-মাখা মুখ হতাশ মলিন ব্যথার আকুল হিয়া ; ধৈর্যের বাঁধে ধরেছে ভাঙন করিবে কে তার রোধ, লিখি কি না লিখি ভাবিছেন রাণা জাগিছে আত্ম-বোধ, চঞ্চল মন নেই কিছু ঠিক করিলেন শেষ স্থির, মনের বেদনা জানাবেন রাণা নোয়ায়ে ‘মোগলে’ শির— ক্ষুৎ- পিপাসায় যার মেয়ে কাঁদে হায় কোথা তার মান যাক্ মান ডুবে অতল পাথারে যায় যাক্ যদি প্রাণ, রাণার আদেশে আনিল বাহক কাগজ কলম কালি, লেখনী-হস্তে নীলাকাশ পানে চাহিছেন রাণা খালি, লিখিলেন শেষে সাহ্ আকবরে ‘ছেলেদের দিও খেতে ;-- ডাকে মোরে শ্যাম বনানীর ছায়া স্নেহের আঁচল পেতে, রাজার-প্রাসাদ চাহি না আমার চাহি না সিংহাসন প্রতাপের কাছে তূণের শয্যা বড় আদরের ধন’,
রুদ্ধ-কন্ঠে বৃদ্ধ-মন্ত্রী ভাম্-সাহ্ কহে, ‘রাণা’ মেবারে’র ভালে এই ছিল লেখা কুমারী পায় না দানা ! ‘মহারাণা বলি করোনা’ক’ আর মেবারে’র অপমান’ | কহিছেন রাণা, ভিক্ষুক হয়ে চেয়েছি দয়ার দান, ‘রাণা’ – কথা মোর বড় বাজে বুকে মনে হয় উপহাস, জননীর পদ পূজা বিনিময়ে হেনেছি সর্বনাশ | সিংহের মত পাহাড়ের বুকে কাঁপিলেন তেজে বীর লক্ষ বেদনা বিঁধিছে বক্ষে শিহরিছে তাঁর শির--- ক্ষণ পরে মনে ভাসিয়া উঠিল একটি করুণ-মুখ রুদ্ধ ব্যথার হাহাকারে তাঁর কাঁপিয়া উঠিল বুক ; বিছুটির মত হানিছে চাবুক নয়নে জ্বলিছে জ্বালা, বিদ্রোহী-বীর ভাবেন লিপিকা নিভালো মেবার-আলা |
বন্দিল ‘ভীল’ লিপিকা লইয়া রাণার চরণদুটি ঝিল্লী-মুখর প্রখর রৌদ্রে চলিল দিল্লী ছুটি | সভা মাঝে বসি “সাহ্-আকবর” আলোকি সিংহাসন, ‘বীরবল’ সবে ছল করি তাঁর করিছে ফুল্ল মন, এ হেন সময়ে লিপিকা হস্তে কুর্ণিশ করে ভীল , ‘মোগল বাদশা’ পড়ে বার বার ভরে না কিছুতে দিল্ | দিল্লীশ্বর আপনার পাশে আঁকিছে মোহন-ছবি— কৃপার-ভিখারী মেবারের রাণা তাঁহার অঙ্ক লভি | বাদশাহ-মুখে প্রতাপের কথা শুনিল পৃথ্বীরাজ, ভাবিল, এখনো নিখিলের পতি হাসিছে পৃথ্বী—মাঝ,--
রাজপুত কবি প্রতাপসিংহ ভরিয়া অগ্নি-বাণী লিখিলেন, বীর তোমার লাগিয়া ধন্য মিবার রাণী, মানের বাজারে সকল রাজারে রেখেছে বাদশা কিনে, শুধুই প্রতাপ মিবারের মান একলা রেখেছে চিনে, কালের প্রভাবে হিমালয় শির হয় যদি শেষে লয় চিতানল জ্বালি ‘বাপ্পা’র নামে জীবন করিও ক্ষয়’ | কবি-লিপি নিয়া চলিয়াছে দূত আরাবলী পথ বাহি--- মেবারের ভূত-গরিমার গানে অনিমিখ যায় চাহি, রাণার চরণ বন্দিল শেষে কত চলি গিরিপথ, সার্থকতার সফল গরবে পুরিয়াছে মনোরথ |
ভীরু আছে --- তাই গর্ব্বে দুলিছে চারণের গান দেশ পত্রিকার পৌষ ১৩৪৫ (জানুয়ারী ১৯৩৯) সংখ্যা থেকে গানটি আমরা পেয়েছি। গানটিতে কবির নামের জায়গায় “চারণের গান” লেখা হয়েছে। আমরা তিন জন কবি পাই যাঁদের নামের সাথে চারণ কথাটি যুক্ত রয়েছে। প্রথমত চারণকবি মুকুন্দদাস। দ্বিতীয়ত সেই সময়ে পানগর-বর্ধমানের কবি কণকভূষণ মুখোপাধ্যায়-কেও অনেকে চারণ কবি বলে সম্বোধন করতেন কারণ তাঁর “চারণ” নামক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতবর্ষ, মাসিক বসুমতির মতো পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হোতো। তৃতীয়ত নদীয়ার কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, যিনিও চারণ কবি নামে খ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে দেশ পত্রিকার প্রকাশের পেছনে এই কবির সক্রীয় ভূমিকা ছিল। গানের কথা এবং ভাবগত বৈশিষ্ট্য থেকে গানটি চারণকবি মুকুন্দদাস অথবা বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের রচনা বলেই মনে হচ্ছে। তবুও আমরা তিনজন কবির পাতাতেই কবিতাটি রাখছি।
ভীরু আছে --- তাই গর্ব্বে দুলিছে . অত্যাচারির জয়-নিশান। ক্লৈব্য রয়েছে --- অন্যায় তাই . নিঃস্বের করে রক্ত পান॥