নতুন বছর সবে পাপড়ি মেলতে শুরু করেছে ময়দানের ঘন কুয়াশায় শহর হারিয়ে গেছে |
এখানেই পাওয়া গিয়েছিল সেই কমরেডের মুন্ডহীন দেহ যা সনাক্ত না হওয়াতেই ছিল দেশ অর্থাৎ পুলিশ প্রশাসনের মঙ্গল |
যদিও এ নিয়ে কথা বলা বারণ এই শহরের লোকেরা কেন এখানকার গাছগাছালিরাও জানে তরাইয়ের ঘুমন্ত জঙ্গলে ও গ্রামে লাঙ্গল ধরা হাত তুলে ধরেছিল লন্ঠন আলোর ছুরির আঘাতে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল শতাব্দীর জমাট অন্ধকার |
পায়ে চলার পথ বেরিয়ে এসেছিল ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে দেখা গিয়েছিল ভোরের পূর্বাভাস |
অন্ধকার আর সঙ্গীন ঘেরা এই শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল লড়াইয়ের খবর পুবের হাওয়া কী যেন বলছিল তাদের, আর রক্তরাঙা শহর ছেড়ে তারা চ’লে গিয়েছিল গ্রামে স্বপ্ন থেকে বাস্তবের দিকে শুরু হয়েছিল কুচকাওয়াজ |
কোনোও হাতিয়ার কোনোও গোলাবারুদ বা পিস্তল ছিল না তাদের সঙ্গে কিন্তু দিনবদলের খবর ফুটে উঠেছিল লোকেদের চেহারায় |
তাদের ছায়া দৃষ্টির বাইরে যেতেই তাদের সংবাদপত্র : দেওয়াল যাতে লেখা হতো লড়াইয়ের শেষ খবর সেই দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কেঁচোর দল |
গ্রামের বাঘেরা পালাতে লাগলো শহরের দিকে |
লাল পতাকা উড়িয়ে হত্যাকারীর আসন আলো করা নতুন মুসোলিনী এবারও সৈন্য নামিয়ে দিলো গ্রামে |
তবে শুধু পাখির কলরব নয় তাদের স্বাগত জানালো ছিনিয়ে নেওয়া রাইফেলের গুলি জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসা তীর গা এফোঁড় ওফোঁড় করা বর্শা হাতবোমা আর মাটির নীচের সুড়ঙ্গ |
যারা আতঙ্ক ছড়াতে গিয়েছিল আতঙ্কে কেঁপে উঠলো তাদের বুক |
মাথা উঁচু করা গ্রামগুলিকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে কনভয় এলো | সৈনিক বুট শিকল পরিয়ে দিলো মৃত্যু নেমে এলো আকাশ বেয়ে |
তাদের বর্বরতা মানুষের ঘৃণাকে উদ্দীপ্ত ক’রে তুললো ---- আর রক্তের দাগ নির্দেশ দিলো আঁকাবাঁকা পথের |
সৈনিকের কুচকাওয়াজ আর কৃষকদের বীজ বোনা চললো পাশাপাশি গ্রামের পর গ্রামে |
খাল বিল ময়দান রক্তাক্ত হয়ে গেল সেই হায়েনারা হিংস্র লীলায় যার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ডাকিনী আক্রমণ করলো প্রতিবেশী দেশকে ছিনিয়ে নিলো শিকার ক্ষেত্র নতুন মালিকের জন্য |
আকাশ পাতাল কেঁপে উঠলো পুতুল রাণীর জয়ধ্বনিতে তার বন্দুক হাতে স্লোগান দিতে দিতে নীল লাল হলুদ পতাকা নিয়ে মিছিলে যোগ দিলো বাজিকরের দল |
সেই অন্ধকার দিনগুলিতে কামানের মুখ যখন প্রতিবেশীর দিকে ঘোরানো তাদের সেপাইরা নেমে পড়েছে পথে ঘাটে যাতে কামানের আওয়াজ চাপা পড়ে এ-দেশের আর্তনাদ, ভেসে যাওয়া রক্ত হারিয়ে ফেলে তার পরিচয় |
বুকের মাঝামাঝি ছোরা বসিয়ে ডাকিনী আর নতুন মুসোলিনী রক্তরাঙা হাত লুকোতে দস্তানা খুঁজতে লাগলো বন্ধ তোষাখানায়
বামন বাজিকরেরা জীবনের চেয়েও বড় মেনে নিয়েছিলো সেই মহিলাকে যে তার চেহারায় দেখেছিল দেশের মানচিত্র |
দেবদূত কাছেই ছিল সারা দুনিয়ায় ডাকিনী ঢাকঢোল পিটিয়ে বুড়ো জাদুকর বসেছিল আরাম কেদারায় | আয়নার সামনে গালে হাত ঘষতে ঘষতে সে এগিয়ে এলো |
সমস্ত বাজিকরদের এক করার জন্য ‘সম্পূর্ণ মায়াজাল’ – এর জেহাদ তুললো বিদ্রোহ করতে আহ্বান করলো জনগণকে আর সৈন্যদের |
আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো দিকে দিকে ‘দেশ যখন একটাই তখন এত বেশি বাজিকরদের প্রয়োজন কোথায় ? আপাত দেশের জনগণই দেশের বিপদ তাই চাবুক চাই |’
রক্তের লেপ মুড়ি দিয়ে রাত নামলো |
যারা বিপক্ষে ছিল তাদের রুটি জেলে দিয়ে দেওয়া হলো | কেড়ে নেওয়া হলো খবরের কাগজের কালি ডাকিনীর দুলালকে চাবুক নাচাতে দেখেই বাজিকরের দল ঢুকে পড়লো নিজের নিজের গর্তে |
কাশ্মীর থেকে কুমারিকা মুখরিত ক’রে তুললো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ |
ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল গ্রামে বস্তিতে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঠতে লাগলো অন্ধকারের বিরুদ্ধে |
ধোঁয়ার ইশারা পেয়েই ডাকিনী সাজতে চাইলো নতুন সাজে কালো ঘোড়া থেকে নেমে ঘোষণা করলো জাদুর খেলার |
বৃষ্টি নামার আগেই বুড়ো জাদুকর মহানায়ক হয়ে গেল | বিচ্ছিন্ন বাজিকরদের বললো : ‘অত্যাচারিনী ডাকিনীর হাত থেকে চাবুক কাড়তে হ’লে ছোট ছোট তাঁবু ভেঙে গড়তে হবে নতুন স্বপ্ন লুকিয়ে ফেলতে হবে দাঁত আর নখ যাতে চেহারা থেকে মুছে যায় হায়েনার হিংস্রতা আর তোমাদের দেখে যেন মনে হয় নিরীহ মেষশাবক |’
কালবৈশাখীকে কানাগলিতে বন্ধ করার ষড়যন্ত্র সফল হলো |
সোনার কাঠি হাতে নিয়ে গৈরিক সুতোয় বাঁধা সাদা বাড়ির পুতুলেরা মঞ্চে এলো |
কিন্তু খেলা জ’মে ওঠার আগেই খেলার পাট তুলে দিতে হলো | :ছিন্ন মায়াজালে জোড়াতালি লাগানোর জন্য বাজতে লাগলো নাকাড়া |
এদিক ওদিক প’ড়ে থাকা শবদেহগুলি সরিয়ে দেওয়া হলো রাস্তায় রক্তের চিহ্ন কালো হয়ে গেছে কিন্তু নিখোঁজ লোকেদের খোঁজখবর বা জেলে উঁকি মারা এখনও বারণ |
স্বপ্নে দেওয়াল রাঙিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল অন্ধকারে ওরা |
গ্রামে ক্লান্ত শ্রান্ত জেলে যারা হারিয়েছে স্বপ্নের চাবি যারা একদিন বলেছিল, ‘হত্যাকারীর তালিকা রাখা রয়েছে ঐ ব্যালটবাক্সে’ মুক্তির স্বপ্নকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে জহ্লাদের খাতায় নাম লিখিয়ে এলো তারা |
সূর্যের প্রতীক্ষায় ( কমরেড চারু মজুমদারের প্রতি ) কাঞ্চন কুমার
তীর ধনুক হাতে আদিবাসীদের ঐ পোষ্টারটা দেওয়ালে আজও ঝুলছে যার ফ্রেমে হাজার হাজার বাবুলালকে তুমি দেখেছিলে যাদের অনুভবের সুতো নতুন নক্সা তোলায় ছিল উদগ্রীব যে নক্সাগুলি ছিল রক্তগোলাপের |
তুমি ডাক দিলে আর জঙ্গলের রং বদলে গেল উত্সবের কাল শেষে যাদের ঘরে ফেরার তারা ফিরে গেল আর বিন্দু বিন্দু রক্ত চুঁইয়ে পড়লো নদীর জলে, সমুদ্রে |
শুধু নদী নয়, সমুদ্র নয় ডুবন্ত নৌকা নয় নেকড়েরা দৌড়ে আসছিল ক্রমাগত |
বিস্তীর্ণ ময়দান জুড়ে যেখানে প্রতিহত হচ্ছিল নেকড়ের আক্রমণ সেখানে জেগে উঠেছিল স্বপ্নিল পরিবেশ, সেই স্বপ্নের কারিগরও একদিন অসমাপ্ত পান্ডুলিপি ছেড়ে গেল |
যাদের সমস্ত অজুহাত তুমি ছিনিয়ে নিয়েছিলে তাদের কাছে এ তোমার ভুল নয় অমার্জনীয় অপরাধ যা কোনোদিন তারা ক্ষমা করেনি |
তোমার যাওয়ার পর দশ বছর কেটে গেছে দশটা বছর কিছু কম সময় তো নয় আমরা প্রতীক্ষা করছিলাম তারা নিজেদের প্রমাণিত করবে |
কিন্তু তোমার ভুলের খতিয়ান দিতেই তাদের দম ফুরিয়ে গেছে |
ঝড়ো হাওয়া বার বার এদিক বয়ে গেছে কুয়াশার ঘোর এখনো কাটেনি অন্ধকারে অনেকেই রাইফেল পুঁতে চ’লে গেছে রাজপথের দিকে |
তোমার কমরেডের কেউ কেউ আজও রাঙ্গা মাটির জঙ্গলে তারা শুকনো পাতা জড়ো করছে |
ছোট ছোট গ্রাম একটু-আধটু চা, হয় এখানে সামান্য কিছু পাওয়া যায় জঙ্গল থেকে আর কোন রুজি-রোজগার নেই | আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার ক্লান্তি দারিদ্রে নুয়ে-পড়া কোমর সময়ের আগেই বার্ধক্যকে ডেকে আনে ; জীবন শব্দহীন ক্ষুধার জ্বালায় |
এখানে কেউ আসে না কেউ আসে না এইসব গ্রামে বাচ্চারাও না | একদিন ‘আন্না’রা এলো সেইসব গ্রামে যেখানে কেউ আসে না বাচ্চারাও না |
ঝড় উঠলো বসন্ত এলো স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু হলো জঙ্গলে ঝড়ো হাওয়া সে বীজ নিয়ে গেল দূর দূরান্তরে |
গ্রাম ঘুরে দাঁড়ালো সিরদাঁড়া সোজা ক’রে মুখে খই ফুটতে লাগলো নতুন নতুন শব্দের এক সাথে উঠতে বসতে আর ঘুরতে লাগলো |
সেই স্বপ্ন দেখা লোকেরা গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়াতে লাগলো জঙ্গলের মতো জঙ্গলের রাজত্বের বিরুদ্ধে |
শহরকে আস্বস্তিতে ফেলে দিলো, যারা নাক ডাকিয়ে ঘুমুতে অভ্যস্ত তাদের ঘুম কেড়ে নিলো এ-খবর |
খিদে আর জঙ্গলে যাদের ভয় রাতের অন্ধকারে তারা এলো বেছে বেছে নিয়ে গেল তাদের যাদের মুখে তারা হাসি দেখেছিল |
ওরা আর ফিরে আসেনি কোনো খবর পাওয়া যায়নি তাদের যারা জঙ্গলের মতো দাঁড়াতে চেয়েছিল জঙ্গলের রাজত্বের বিরূদ্ধে |
যখন ঘর ছাড়ি, তখন চুল আমার কালো ছিল আজ সারা মাথায় কাশের শোভা |
আমার ঘর যা আশ্রয়স্থল ছিল কমরেডদের শান্তিরক্ষকরা তা বদলে দিয়েছিল যাতনা শিবিরে | যাতনার পাথর মা আমার ছবি হয়ে গেল |
প্রিয় সুরের মতো যে শহর কোনোদিন আমার সঙ্গ ছাড়েনি আজ আগন্তুকের মতো ফিরেছি সেখানে |
আমি এখানে শিখেছিলাম ভালোবাসতে শিখেছিলাম ভালোবাসার অর্থ তাই কবিতা ছেড়ে তুলে নিয়েছিলাম বন্দুক, ঘামের নুনে রুটি খেয়ে শামিল হয়েছিলাম দীর্ঘ অভিযানে |
যে কারখানায় উড়েছিল লালপতাকা আজ তালা ঝুলছে সেখানে যে মজদুর-বস্তিতে ব্যরিকেড করেছিলাম আজ তার চেহারা বদলে গ্যাছে |
গ্রাম থেকে শহর ঘেরার আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে সেনা ক্রাচে ভর দিয়ে হাসি মুখে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন তার সেনাপতি | জামাটা যেন আরও বেশি ছেঁড়া আরো বেশি ময়লা |
কমরেড ! চোখে সেই তলোয়ারের ঝিলিক | তার দু’হাত ধ’রে আমি ভুলে গেলাম এই অন্ধকার রক্তে উত্তাল হয়ে উঠলো সেই দিনগুলি
কিন্তু হুজুর, আপনারা একটু ভুল ক’রে ফেলেছিলেন বোবা চেহারাগুলো আপনারা দেখেননি দেওয়ালের লিখন আপনারা পড়েননি সোজাসুজি হত্যা এবং বলাত্কারে নেমে পড়লেন |
য-ই হোক, আপাতত আপনারা কফিনে শুয়ে ফিরছেন আপনাদের সঙ্গীসাথীদের জন্য আমাদের এই আমন্ত্রণ নিয়ে যাচ্ছেন এখানে আমরা তাঁদেরও স্বাগত জানাবো অবশ্য তারা যদি এখান থেকে এইভাবেই ফেরা পছন্দ করেন |