কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
আবদারের আধঘন্টা
কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায়
“নূতন খাতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


বেল-ফুল চাই না
.        জুঁই-ফুল দাও!
ও গানটা গেও না
.        এই গানটা গাও!
কেন ভালবাসলে
.        বল--- বল না ;
হাসলে কেন তুমি ?
.        ---কথা কব না!

কালকের গল্প
.        আজ কর শেষ ;
আজকের রাতটা
.        লাগছে না বেশ ?
সারাটা বেলা ধরে
.        বাঁধলুম চুল,
দেখলে না চেয়ে তা
.        এমনিই ভুল!

জুঁই-ফুল চাই না
.        বেল-ফুল দাও,
এ গানটা গেও না
.        ও গানটা গাও!

জুঁই-ফুল নেব না
.        দাও বেল-ফুল---
গোলাপকে পার্শীরা
.        বলে নাকি গুল ?

ওদিকেতে চেও না
.        চাও এই দিক ;
আলোটা নিভে আসে
.        দাও করে ঠিক ;
লাগছে চোখে আলো
.        করে দাও কম ;
ঐ যা, বাতি গেল
.        নিভে একদম!

হবে নাকো জ্বালতে,
.        খুব বাহাদুর!
জানা গেছে বুদ্ধি
.        যায় কতদূর!
বেল-ফুল চাই না
.        দাও জুঁই-ফুল,
পার্শীরা গোলাপকে
.        বলে নাকি গুল ?

জুঁই-বেল চাইনা
.        চাঁপা এনে দাও ;
আমি কি তা জানি তুমি
.        পাও কি না পাও!
কাকাতুয়া কিনে দেবে---
.        কিনে দিলে খুব!
কথা কেন নেই মুখে
.        হয়ে গেলে চুপ ?

ভালবাসো কি না বাসো
.        ঠিক বলো না!
চাঁদ ঐ উঠেছে
.         ছাদে চলো না।
মুখে চুণ লাগলো
.        ফিরে নাও পান ;
মাথা ঘুরে পড়লো
.        গেয়ো নাকে গান ;

চাই না জুঁই-বেল,
.        চাঁপা এনে দাও ;
আমি কি তা জানি তুমি
.        পাও কি না পাও ?
চাঁপা ফুল চাই না
.        চাই চামেলি ;
সব-তাতে হবে হবে,
.        খালি গাফেলি!
আজ রাতে দুজনাতে
.        জেগে থাকবো,
কে হারে কে জেতে আমি
.        তাই দেখবো!
ছোট বলে করবে কি
.        তুই-তোকারি ?
তাতে যে গো অপমান
.        হয় আমারি!

না বলে নাকয়ে তুমি
.        কেন চুমা খাও ?
বলি নাকো যত কিছু
.        আশকারা পাও!
চামেলি সে চাই না
.        দাও চাঁপা-ফুল,
মিঠে তার গন্ধ
.        গা তুল্ তুল্ |

চাঁপা-ফুল চাই না
.        দাও বেল-ফুল ;
খোঁপা থেকে ঝরে প’ড়ে
.        গেল বিলকুল্!
কুড়িয়ে সব ক’টা
.        পড়িয়ে দাও ;
আবার না-ব’লে তুমি
.        গালে চুমা খাও!

আমি মরে গেলে তুমি
.        খুব কাঁদবে ?
তখন এ বাহুডোরে
.         কারে বাঁধবে ?
ওকি, ওকি, চোখ থেকে
.        পড়ে কেন জল ?
মরে কেন যাব আমি---
.        মিছে করি ছল!
জুঁই-বেল চামেলি---
.        যা খুশি তা দাও,
ও গালেতে চুমা খেলে
.        এ গালেতে খাও ||

.         ******************          
.                                                                          
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর   
*
প্রতীক্ষায়
কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায়

অস্তগিরির পরে---
ঝড় উঠেছে রঙের বনে আলোর বৃষ্টি ঝরে!

সবুজ মাঠের ক্ষেতে,
ধূপছায়া-রং শাড়ীর আঁচল কে রেখেছে পেতে!

ওই গগন কিনারায় ;
সাদা মেঘের পাল তুলে কার পানসি ভেসে যায়!

কালো দিঘির জলে,
হাওয়ার কাঁপন লাগলো কখন, সাঁঝের আলো জ্বলে!

বকুল ফুলের বনে,
গন্ধে ভারি দখিন বাতাস দোয় দোলানি মনে!

মাথায় রূপের ডালি
আড়চোখে দূর আকাশকোণে সরু চাঁদের ফালি!

গোলাপ-বাগিচায়,
গোলাপজলের ঝরনা তলায় কাজকুমারী নায়!

হলদো বাড়ীর ছাতে
তুলসীতলায় ঘোমটা মাথায় বউটি প্রদীপ হাতে!

বন্ধ ঘাটের খেয়া,
ডিঙি-বাঁধা নদীর কূলে চুকল দেওয়া নেওয়া।

গাঁয়ের সীমানায়,
বাজিয়ে বাঁশি রাখাল ছেলে ঘরে ফিরে যায়!

আমি চেয়ে আছি পথে
ওই গোধূলির উড়িয়ে ধূলি আসছে সে কি রথে ?

.         ******************          
.                                                                          
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর   
*
দুনিয়াদারী
কিরণধন চট্টোপাধ্যায়


আরে বন্ধু এসো এসো, অনেকদিন পর দেখা --- কেমন আছ ?
.                                        খবর ত হে ভালো ?
ওরে রামা কোথায় গেলি ? দে না তামাক, সন্ধ্যে হল নেইক খেয়াল
.                                        জ্বাল-না ঘরে আলো!
কি হে তুমি খাও না তামাক! সাধু পুরুষ হলো আবার কবে ?
চা খেতে ত আপত্তি নেই ? এক পেয়ালা চা পান করোই তবে।
আজকে রাতে ছাড়চিনাক - এইখানেতেই তোমার নিমন্ত্রণ ;
কোন্ ঠিকানায় আছ বলো ? খবর দিতে পাঠাচ্ছি একজন ;
.        ছেলে মেয়ে কটি হল ? কত বড় তারা ?
.        বল কি হে একটি ছেলে সেদিন গেছে মারা!
বলছিলে কি ? কথা আছে ? চলো চলো বারাণ্ডাতে চলো,
দিব্যি সেথায় নিরিবিলি, বইচে হাওয়া, কী বলছিলে বলো!
মেয়ের বিয়ে ? শুনে বড় আনন্দিত হলেম আমি। বর্ধমানেই
.                                        ছেলের বাপের বাড়ি
শাশুড়ী নেই ননদও নেই -- এ তো অতি ভাল কথা ; মেয়ের দেখছি
.                                        বরাত ভালো ভারি!
ছেলেটি কি ? পরচে বি.এ! বাপেরও বেশ পয়সা কড়ি আছে ---
শুভকার্যে বিলম্ব কি ? অমন পাত্র বাড়ির অমন কাছে
ছাড়ে কি কেউ ? কিন্তু তাদের, বলচো তুমি, টাকার বড় খাঁই ---
গয়না বাদে নগদ নগদ তিনটি হাজার গুণে দেওয়া চাই!
.        ছেলের বাজার বেজায় গরম --- উপায় তার কি বলো ?
.        সভা করে বক্তৃতা দে’ নেই এর কোনো ফলও।
তবু দেখো চেষ্টা করে যদি কিছু কমে সমে পারো,
এমনই কি তাড়াতাড়ি ? মেয়ের বয়স সবে ত এই বারো।


অবাক কল্লে! আজ বাদে কাল মেয়ের বিয়ে, বোলচো তুমি ---
.                                সমস্ত টাকার যোগাড় নাই,
বারো বারো বয়স হল মেয়ের তোমার, এতদিন নির্ভাবনায় ঘুমুচ্ছিলে ভাই!
ছেলে মেয়ের জন্ম দিয়েই আমরা খালাস, ভাবেন অনেক বাপ,
এতে করে সমাজেতে ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে পাপ,
বাড়চে দুঃখ, বাড়চে দৈন্য, তবু লোকের ভাঙচেনাক ভুল,
দায়িত্বহীন বিয়েই হচ্ছে এই সমাজের সব অনর্থের মূল।
.        হয়তো আমার কথাগুলো লাগবে অনেক রূঢ়,
.        কিন্তু দেখ চুল পেকেছে, হয়ে গেলাম বুড়ো ---
স্পষ্ট কথা মনে যা হয় স্পষ্ট করে মুখেই ফেলি বলে,
বন্ধু চটে --- নাচার তাতে, বোসো বোসো --- যাচ্ছ কোথা চলে।
এ পৃথিবী কঠিন ভারি --- বি,এ, এম.এ-এর কর্ম নয় সমঝে হেথা,
.                                        বুঝে সুঝে চলা,
এত বিদ্যে করলে জমা, ফল কি হল ? মূর্খ আমি আমার মুখে
.                                        মানায়নাক বলা
এসব কথা --- তবে কিনা ভবিষ্যতে এমন করে আর
পড়তে না হয় --- বে-আন্দাজি খরচ করে লোকের কাছে ধার
চাইতে না হয় --- তারি জন্য বন্ধুভাবে বলচি এসব আমি
--- কাপড় বুঝে জামা কাটো --- ইংরাজের এই প্রবাদ ভারি দামী!
.        আহা আহা উঠচ কেন ? এত কিসের তাড়া ?
.        ট্রামেই যেও, লাগবে না হয় পাঁচটা পয়সা ভাড়া।
বাড়ির গাড়িই দিতুম আমি কোচোয়ানটা দুদিন পরে জ্বরে,
মোটরখানাও বিকল হয়ে পড়ে আছে আস্তাবলের ঘরে।


হ্যাঁ, যে কথা বলতে ছিলুম, আছে বটে আমার কিছু যত্সামান্য
.                                                  বিষয় আশয় আয়,
কিন্তু আমার খরচপত্র এত বেশী অনেক সময় মান-সম্ভ্রম
.                                                বাঁচিয়ে চলাই দায়।
তোমরা দেখ মোটর চড়ি, ফেটিং হাঁকাই, কিন্তু ইহার পিছু
কতগুলি ঢালতো যে হয়, হিসেব তাহার নাও তো কেউ কিছু।
তার উপরে গিন্নী আমার এত অবুঝ, খরচে এত বেশী,
এমনি ভাবে চললে পরে ফতুর আমায় করবে শেষাশেষি!
.        যত বলি বুঝে বুঝে সমঝে একটু চলো,
.        আমোল দেয়না মোট্ সে কথা --- কোমন করে বলো ---
পেরে উঠি এমনিতর প্রবল প্রতাপ গৃগশত্রুর সাথে ?
শাসন বারণ ঢের করেছি উল্টে কেবল কেলেঙ্কারিই তাতে।
ধার দিওনা, ধার নিওনা --- শুনতে পাই যে বলে গেছে ইংরাজের যে
.                                        সবার সেরা কবি,
সাধে কি আর জাতটা বড় ? বলতে পারে অমন একটা দামী কথা
.                                        তোমাদের ঐ রবি ?
.        ধার দিওনা, ধার নিওনা --- আমারও ভাই এইটি হচ্ছে “মটো”
.        খোলাখুলি বললুম সবই এতেও যদি আমার উপর চটো,
.        করবে তুমি আমার প্রতি একটা বড় মস্ত অবিচার,
.        ভাববে তুমি ইচ্ছে করেই তোমায় আমি দিলুমনাক ধার।
.                ঋণের চেয়ে নেই মহাপাপ, তাহার চেয়ে ভালো,
.                একবেলা যে খেয়ে থাকে, এই যা গেল আলো।
.        ওরে রামা, ওরে রামা, গেলি কোথা ? চলো নিচের হলে,
.        না না এই যে আলো এলো। উঠচো কেন ? পড়োনি তো জলে।


মানুষে যে কর্জ করে -অনেক সময় অভাবে নয় কূ-অভ্যাসের
.                                        দরুণ শুধু খালি,
কত লোকের নেশাই হচ্ছে কর্জ করা --- পেশাই হচ্ছে মহাজনকে
.                                        পাড়া তাদের গালি :
.        কর্জ করার কূ-অভ্যাসটি অনেক স্থলে আপনি গজিয়ে ওঠে,
.        সেই জন্যেই কর্জ দেবার পক্ষপাতী নইকো আমি মোটে,
.        বিশেষত বন্ধুজনে --- যারা আমার প্রাণের মতোই প্রিয়
.        টাকার সঙ্গে অনেক সময় যায় যে মারা সাবেক প্রণয়টিও!
.                টাকা ভারি পাজি জিনিস সব অনর্থের মূল,
.                --- ঋষির বাক্য নেইক এতে একটি বর্ণ ভুল।
রুমাল দিয়ে একশোবারি ঘোষচো যে চোখ, পড়লো কিছু চোখে!
কওনা কথা, আমিই কেবল এক নাগাড়ে যাচ্ছি কেবল বকে।
এখন থেকে হিসাব করে চলতে শেখো --- বুঝে সুঝে খরচা করো
.                                                আয়ের অনুযায়ী,
অদৃষ্টকে দোষ দিওনা --- ভাগ্য সে তো নিজের হাতে --- মিথ্যে কেন
.                                        কর তারে দায়ী।

চাকর বামুন তাড়িয়ে দিও --- বড় মানষি নয়কো অত ভালো,
নিজের হাতে কিনবে জিনিস আনাজ-কোনাজ, তেল-নুন-চাল-ডাল
পরিবারকে বসিয়ে রেখে খেতে দেওয়া আহাম্মকের কাজ!
বলবে তারে রেঁধে দিতে অসঙ্কোচে --- নেইক এতে লাজ ;
.        পরের হাতের লুচি পোলাও কোপ্তা কাবাব চেয়েও
.        ঘরের রান্না শাক-অন্নও একশো গুণে-শ্রেয় ;
শরীর খারাপ ? অষুধি তার দুটি বেলা হাড়ি নিয়ে বসা,
সকাল হলেই ঘটি-বাটি থালা-গেসাল মাজা এবং ঘষা।


ঐখানেই যে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে --- বুঝে দেখো এমন কথার
.                                                নেইক কিছু মানে,
রাজার ঘরে দিলেই বিয়ে হয়না রাণী --- আসল হচ্ছে মোয়ের বরাত
.                                        কেই বা না এ জানে ?


ওরি মধ্যে দেখে শুনে যেখানে হয় সস্তা গণ্ডা --- দাও,
চেষ্টা করে খুঁজে দেখো --- বিনাপণে হতে পারে তাও,
শুনতে ত পাই ভালো ভালো এমনতর আছে অনেক ছেলে
বিয়ে যারা করতে পারে হাসি মুখে কিছুও না পেলে,
.        দৈনিকে কি সাপ্তাহিকে দাও না কেন ছেপে,
.        নামটা না হয় আপাতত রাখলে তোমার চেপে।
একি! একি! পড়লে উঠে! আচ্ছা এসো, --- কে আছিস রে কে ও।
আসবে যখন কলকাতাতে একবার করে দেখা করে যেও।

.                    ******************          
.                                                                          
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর   
*
পুজোর ফরমাস
কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায়
বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত “কিশোর কবিতা সঞ্চয়ন” ২য় সংস্করণ,
১৯৯৯ থেকে পাওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৭.১১.২০১৮।


চাই না পুজোর জরির পোষাক---চাই না এবার আলপাকা,
নক্শা-কাটা রেশমী রুমাল বিলাসিতার রং মাখা,---
মোটা জামা মোটা কাপড়---তাই আমাদের দিস্ কিনে,
তাঁতের বোনা হাতের সূতো---দাম যে মা তার লাখ টাকা।

কাজ কি বাজে বাবুয়ানি, খদ্দর তো ভদ্র-বেশ ;
মহাত্মাজীর ঐ তো বাণী,---পি. সি. রায়ের ঐ আদেশ।
তাঁদের কথা কোন্ মুখে মা ফেলব ঠেলে ফেলব আজ?
বিদেশী চিজ্ কিনব নাকো, নেই কি আমার লজ্জা লেশ।

জননী আর জন্মভূমি স্বর্গ হতে শ্রেষ্ঠ ঢের ;
একটি ফোঁটা রক্ত আমার থাকবে য’দিন এই দেহের---
ঐ কথাটি বুকে লেখা থাকবে সোনার অক্ষরে ;
তোমাদেরই কোলে আমার জন্ম যেন হয় মা ফের!

তোমার হাতের শাক-ভাতে-ভাত লাগে কি মা তার কাছে---
পোলাও কোর্মা কোপ্তা কাবাব? হোটেলে তো ঢের আছে।
স্বদেশ-জাত সকল জিনিষ তেমনি লাগে মিষ্টি গো---
পাত্ লা, পুরু, সস্তা, দামী,---দোষ গুণ তার কে বাছে?

আর এক কথা বলতে তোমায় ভুল করেছি---মস্ত ভুল,
ঐ খানেতে খেলতে আসে হাতে চাঁপা, টগর ফুল,
মতি চারু দুটি ভাই-এ, বড়ই গরীব মা-হারা,
দেখলে মায়া হয় মা তাদের মলিন মুখ আর রুক্ষ চুল।

আমারে যা দিবি কিনে তাদেরো তাই দিস্ কিনে,
মোটা জামা মোটা কাপড়---চাই না মিহিন্ ফিন্ ফিনে,
যত্ন আদর করবে তাদের---মুখের পানে চাইবে কে?
সংসারে কেউ নেইক তাদের বিধবা এক বোন বিনে।

দেশ ছেয়ে মা এমনিতর অনাথ ছেলে মেয়ের দল
দুখের বোঝা বইছে বুকে ফেলছে কত চোখের জল---
তাদের অশ্রু কে মোছাবে? দুঃখ তাদের বুঝবে কে?
পাই না ভেবে কূল কিনারা---হৃদয় শুধু হয় বিকল।

আয় দুজনে আয় করি আয় মা দুর্গারে প্রার্থনা,
দাো ঢেলে দাও ওদের প্রাণে শান্তি এবং সান্ত্বনা ;
ফুটলে হাসি এদের মুখে টুটবে আঁধার জগৎ ময়---
নইলে মোদের ব্যর্থ পূজা, কি বলিস্ মা? ব্যর্থ না?

.                    ******************          
.                                                                          
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর   
*
কমলানেবুর দেশে
কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায়
নীরেন্দ্রনাথ চক্রব্রতী ও সরল দে সম্পাদিত “ছোটদের ৫০০ কবিতা”, ২০০৬ থেকে পাওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৭.১১.২০১৮।


আঙুর বেদানা পেস্তা বাদাম কমলামেবুর দেশে
আমরা দু’জনে যাব মা এবার মিহিজাম থেকে এসে।
.        বাংলাটি খুঁজে নেব ঠিক সেথা,
.        তলা দিয়ে নদী বয়ে যায় যেথা---
সন্ধেবেলায় হেনার গন্ধ হাওয়ার সঙ্গে মেশে ;
এবার আমরা যাব মা দু’জনে কমলানেবুর দেশে।

দালচিনি আর মৌরি এলাচ সেইখানে মা কি ফলে?
লাল নীল যত মাছগুলি সব খেলে পুকুরের জলে?
.        দলচিনি-ফুল এলাচের পাতা
.        খেতে দেয় বুঝি হরিণের মা, তা---
তোমার মতন খোকাটির তার খিদে পেলে বেলা হলে?
মাঠে মাঠে খেলে ময়ূর হরিণ এলাচের গাছ ফলে?

ভেঙে কুচি কুচি করে দে শেলেটে, ছিঁড়ে কুটি কুটি বই ;
পাগড়ি মাথায় দেখলে ‘ঙ’টা ভয়ে আমি সারা হই।
.        ‘৯’ কারের মতো ডিগবাজি খেতে
.        পারি আমি দিলে কার্পেট পেতে ;
কেদারায় বসে আ ক খ গ ঘ ঐটেই রাজি নই।
আঙুরের দেশে যাব মা দুজনে ফেলে দে শেলেট বই।

বোম্বাই মেল, পাঞ্জাব মেল, কোনটা. যাবি বল?
পথ জেনে নে মা ঠাকুমার কাছে ; ঠাকুমাকে নিয়ে চল।
.        উড়োন জাহাজে হয় নাকি গেলে?
.        আকাশের নীল মেঘ ঠেলে ঠেলে---
নয় তো জাহাজে দুলে ঢেউ তুলে নাচিয়ে সাগর জল?
হাসছিস কেন? বল মা আমায় কোনটায় যাবি বল?

কমলাফুলের রঙ দিয়ে দিস ছাপিয়ে কাপড় মোর ;
টিক এঁকে দিস পরিয়ে কাজল যেমনি হবে মা ভোর।
.        রাখাল ছেলের মতন আমায়
.        চুড়ো বেঁধে চুল দিস গো মাথায়
আপেলের খেতে আঙুরতলায় করব মা দিন-ভোর।
কমলাফুলের রঙ দিয়ে দিস ছাপিয়ে কাপড় মোর।

দুপুর বেলায় ডাকবি যখন---ভাত খাবি আয় ওরে!
পেস্তা বাদাম কিচ্ মিচি সব আনবো আঁচল ভরে ;
.        আপেল আঙুর দু-এক হাজার
.        এনে ঢেলে দেব সামনে তোমার
ডিম-ভরা লাল-নীল রঙ মাছ আনব কতই ধরে ;
দুপুর বেলায় ডাকবি যখন ভাত খাবি আয় ও রে!

পেরজাপতির পিছনে পিছনে এ-বনে ও-বনে যাব,
যদি খিদে পায় হাতের নাগালে টাটকা আঙুর খাব।
.        সন্ধেবেলায় ফিরব যখন,
.        ঝাঁপ খেয়ে কোলে পড়ব তখন ;
তোমার মুখের মিষ্টি চুমু মা মধুর মতন খাব।
পেরজাপতির পিছনে পিছনে এ-বনে ও-বনে যাব।

বাদাম খোলার ছিনিমিনি খেলা খেলব পুকুর পাড়ে,
লুকিয়ে বসে মা গাছের ছায়ায় আপেল গাছের আড়ে।
.        ভয় পাবি তুই পাছে ডুবে যাই,
.        ছুটে তাড়াতাড়ি আসবি গো তাই,
দেখবি সেথায় খোকা তোর নাই ; বেদানা গাছের ঝাড়ে।
বাদাম খোলার ছিনিমিনি খেলা খেলবপুকুর পাড়ে।

খেলার সময় যদি কোনোদিন কুড়িয়ে হঠাৎ পাই---
ছোট্ট একটি হরিণছানা সে ঠিকানাটি যার নাই।
.        কেঁপে কেঁপে সারা ভয়ে থর থর
.        ডাগর দু’চোখ জলে ভর-ভর,
বলে যেন খোকা বলতে কি পার মা কোথা আমার ভাই?
হারিয়ে যাওয়া সে হরিণের ছানা যদি কোনোদিন পাই!

বাড়ির সুমুখে পুঁতে দেব দুটি কমলানেবুর চারা,
সকালে বিকেলে জল দেব তাতে নইলে যে যাবা মারা।
.        পিচকিরি ছুঁড়ে ঝরনার জল
.        দিতে তুই মানা করবি না বল?
লাগলেই জল অসুখ করে কি? ভয়ে কেন হোস সারা?
বাড়ির সুমুখে পুঁতে দেব দুটি কমলানেবুর চারা।

বকাঝকা কিছু কোরো না সেথায় বলছি এখন থেকে।
কী রকম রাগ জানো তো আমার একটু দাঁড়ালে বেঁকে।
.        কমলানেবুর খোসা ছিঁড়ে নিয়ে
.        টিপে তার রস দেব চোখে দিয়ে,
উহু উহু করে পালাবি তখন আঁচলে দু’চোখ ঢেকে।
বকাঝকা কিছু কোরো না সেথায় বলছি এখন থেকে॥

.                    ******************          
.                                                                          
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর