দাদাঠাকুর মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর শহরের পার্শ্ববর্তী দফরপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন | শৈশবেই পিতামাতা পরলোক গমন করায় তাঁর কাকা রসিকলাল তাঁকে পালন করেন | বাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর স্কুলজীবন কাটে জঙ্গীপুর হাই স্কুলে | স্কুল কতৃপক্ষ তাঁর দারিদ্র্যের কথা মাথায় রেখে তাঁর অর্দ্ধেক বেতন মুকুব করেন | তাঁর পরিহাসচটুল বাক্যালাপ, তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, তাত্ক্ষণিক কাব্য রচনার ক্ষমতা তাঁকে স্কুল জীবন থেকেই জনপ্রিয় করে তুলেছিল | কলেজ জীবন কাটে বর্ধমানে | সেখানে তিনি গৃহশিক্ষকতা করেই নিজের ব্যায়ভার বহন করতেন |
ছাত্রজীবন শেষ হলে রঘুনাথগঞ্জে, তাঁর নিজের বাড়ীর পাশেই একটি ছাপাখানা খোলেন | অর্থাভাবে সেই প্রেস এ সব কাজই নিজের হাতেই করতেন | তাঁর নিজের ভাষায় “আমার ছাপাখানায় আমিই প্রোপ্রাইটার, আমিই কম্পোজিটার, আমিই প্রুফরিডার, আমিই ইংকম্যান, কেবল প্রেসম্যান আণি নই, সেটি উওম্যান অর্থাৎ আণার অর্ধাঙ্গিনী” | তবে ক্রমে তিনি তাঁর প্রেসের সাধ্যমত উন্নতিসাধন করেন এবং সহকারী রূপে পান নির্লোভ বিখ্যাত স্বদেশী গায়ক ও বিপ্লবী নলিনীকান্ত সরকারকে প্রায় বিনা বেতনে | নলিনীকান্ত পরবর্তীতে রচনা করেন ‘দাদাঠাকুর’ গ্রন্থটি |
নলিনীকান্ত সরকারের মাধ্যমে দাদাঠাকুর পরিচিত হয়েছিলেন সে যুগের বিপ্লবীদের সঙ্গে | তাঁরাও তাঁর সহানুভূতিশীল মনের স্পর্শ পেয়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েছিলেন | যদিও তিনি কোনোদিনই রাজনিতীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তবুও তিনি তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও রসরচনার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ বিরোধী শক্তিগুলিকে তীব্র কশাঘাত করতে কখনো ক্ষান্ত হননি |
তাঁর প্রকাশিত পত্রিকা ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’-এ তিনি তত্কালীন প্রচলিতসামাজিক অন্যায় ও অবিচারেপ্রতি তীব্র আঘাত করেছিলে | প্রচলিত অর্থে কৃতী মানুষের নীচতা, বা অন্তরের দৈন্যের প্রতি তাঁর আঘাত ছিল নিষ্ঠুর | বঙ্গীয় ভদ্রলোকদের অকারণ ধনগর্ব, তাদের আত্মপ্রচার লালসা, অনর্থক পাশ্চাত্য ব্যবহারের অনুকরণ তাঁর তিরষ্কারের লক্ষ্যবস্তু ছিল | ডাক্তারের ভুল চিকিত্সায় দরিদ্র রোগীর মৃত্যু, সংক্রামক কলেরায় আক্রান্ত ছাত্রের প্রতি শিক্ষকদের উদাসীনতা, গৃহভৃত্যের প্রতি গৃহস্থের নিষ্ঠুর আচরণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাঁর কলম তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বর্ষণ করে গেছে ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ এ | এরপর তিনি প্রকাশ করেছিলেন ‘বিদূষক’ পত্রিকা | এই পত্রিকাটিই তাঁর জীবন ও প্রকৃতির সার্থকতম প্রকাশ রূপে মনে করা হয় | এর প্রধাণ ও প্রায় একমাত্র রচয়িতা ছিলেন স্বয়ং নিজে | ‘বিদূষক’ পত্রিকার চরিত্র ছিল দাদাঠাকুরের জীবনের মত সত্যনিষ্ঠ, সবল, দৃঢ় এবং তত্সহ সুমধুর পরিহাসের দ্বারা স্নিগ্ধ | কলকাতা শহরে ‘বিদূষক’ পত্রিকা ফেরি করার লাইসেন্স ছিল তাঁর | সেই লাইসেন্সটি তাঁকে নিজ ব্যয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতা করপোরেশনের তদানীন্তন চিফ্ এক্সিকিউটিভ অফিসার সুভাষচন্দ্র বসু | তিনি আরও একটি লঘু রসের পত্রিকা ‘বোতল পুরাণ’ প্রকাশ করেছিলেন, যা সেই সময়ের রসিক বাঙালী এবং অবাঙালীদের সমাদর পেয়েছিল |
অতি শৈশব থেকেই দাদাঠাকুরের কাব্য প্রতিভা প্রষ্ফুটিত হয়েছিল | কৈশোরে, ইস্কুলের আপাত দূরহ বিষয় আয়ত্ব করার জন্য তিনি সেগুলিকে সম্পূর্ণ কবিতায় রূপান্তরিত করে সহজ কণ্ঠস্থ করেছিলেন এবং বন্ধুদেরও কণ্ঠস্থ করতে সাহায্য করেছিলেন | পণপ্রথা, স্বার্থপরতা, ছুঁৎমার্গ, জাতিভেদ, হাস্যকর ইংরাজ অনুকরণ ইত্যাদি সকল বিষয় সম্বন্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সর্বদাই সচল থেকেছে |