কবি কবিতা সিংহের কবিতা
*
রাত্রি আমার কবিতা
কবি কবিতা সিংহ

কিবা অত্যাশ্চর্য রাত্রি, অভিভূত রাত্রি কিবা রাত
চিত শুয়ে আছি রাত্রি, বাজে রে রজনী বাজে বাজে
কি মৃদু ঝাঁজর ঝিঁঝি কি মৃদু ঝল্লরী কিবা রাত! রাত!
এ দোল কি ঘন দোল দোলে দোলে রে দোলা দোলা
কিবা কালো ফোয়ারারা তারারা তারারা সারারারা
ঘুরুক ধরারে ঘোরা, ঘোরের হৃদয় ঘোরে ঘোরে
গোষ্পদের জল প্রাণ --- সে জাত দর্পণ প্রাণ
অবিকল ছায়া বুকে ঘোরে

তারার আঙুর ফল কতকাল দেখাবে সে তোরে ?


বিশ্বাস করো রাত্রি
        ঠিক আমার মতন জ্যান্ত
তার বুকে মাথা রেখে দেখেছি---
        ফেশি ত্বকের তলায় শিউরোয়

সত্যি বলছি, গিলেছি
        এই অন্ত্র চিরলে মিলবে
দেখো গলা জ্বলে জ্বলে নামছে
        নিট নির্জলা কালো রাত্রি

কালীর দিব্যি রাত্রে
        সাধু নিষ্পাপ বেশ্যার
হাতে হাত ঘোরা দেখেছি
        মুখগুলি সব আয়নার |

রাত্রির হাতে হত্যা
        লেখা জন্ম থেকেই কপালে
কবে বিঁধবে কৃষ্ণ ছুরিকা
        কবে হে বিশল্য-করণী?


সাধে খি দিনের লাল উজ্জ্বল কর্দম দেহে মাখি
অবারিত দিবালোকে পথ হাঁটি মলিন বসনে,
রানীর মতন বুকে রজনীর নীলকান্ত রাখি|

ছেঁড়া তাঁবু ফুটো দিয়ে রোদের নিলাজ মারে উঁকি
আমার জীবন গতি অণুবীক্ষণ চোখে ছেয়ে
তবু বাঁচি বুকে কাঁপে রজনীর নীল ধুক্ ধুকি |

মাটির পাত্রেও ফুটো গলে যায় পূতিগন্ধ জল
দুমুঠো এলানো অন্নে হুড়োহুড়ি দিবা-সহচর
তবুও রাত্রির নেশা নীল মদ বুকে টলমল|


আকাঙ্ক্ষা সিশুর মত অত্যন্ত অবুঝ তাই রাতে
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে তাকে ছেড়ে দেই
ঘুরে তারা খেলা করে যেমন চাঁদের আলো ছাতে
জট পড়া ইচ্ছার  সুতো নিয়ে শুধু খুঁজে ফিরি ---খেই |

ক্রমশ হৃদয়জাগে, হৃদয়ের অত্যন্ত গভীর
দেখে আমি ভয় পাই ---সব প্রতিরোধ মরে আসে
মনের আগুনে গড়া রূপ তার বিষম সুন্দর
কেঁপে ফেরে বসন্তের কৃষ্ণচূড়ার উচ্ছাসে |

অবুঝ শিশুর মত তার দুটি স্ফুরিত অধরে
কে আর চুম্বন দেবে? ---সান্ত্বনার মত অন্তত
ঠান্ডা নরম হাতে রাত এসে তার হাত ধরে
ঝরে যায় যেন তার জমে থাকা নিকষ শোণিত |
উষ্ণ ললাট তার রাত্রি ছোঁয় ---চুম্বনের মত!


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিবিকে ফুল মার্কস
কবি কবিতা সিংহ

বুনলি একই পশমে
.        বিবি তোর চুলের পশমে
.          দোনা সাত’শ  পুলোভার
.            বিবি তোর জোড়া মেলা ভার |

ওই তিরছি নজরে
.        তোর ওই নয়ন বাণে
.          মারলি সাত’শ তীরের মার
.            বিবি তোর জোড়া মেলা ভার |


ওই দেহের সায়রে
.        বিবি তোর দেহের সায়রে
.           ভাসালি পানসি দু হাজার
.             বিবি তোর জোড়া মেলা ভার |


ওই চার ঘরা হার্টে
.        বিবি তোর চার ঘরা হার্টে
.        পশ্ রা হাজার সওদাদার
.                বিবি তোর জোড়া মেলা ভার |


উড়োনো চুমু ছুঁড়ে দে
.        শুধু তুই চুমু ছুঁড়ে দে
.          জ্বলছে হৃদয় দু হাজার
.            বিবি তোর জোড়া মেলা ভার |



.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
ঈশ্বর ! ঈশ্বর !
কবি কবিতা সিংহ

গোপনে সবাই খুব বিফলতা ভয় করে করে
সে সব পাথুরে পথে গেলামই না!
নিজে বিদ্ধ হবে বলে তুমি ছাড়া কে আর ঈশ্বর |
বধ্যভূমে আপনার ক্রশখানি বহে নিয়ে গেল,
হা ঈশ্বর! হা ঈশ্বর! কাকে তুমি বিফলতা বলো?

সফলতাগুলি  বিফলতা?

যথার্থ প্রেমের খুব কাছে কোনো সফলতা নেই বলে
জীবনে প্রেমের মুখ দেখলামই না!
মুখের ভঙ্গিমাগুলি ভেঙে গেলে অদ্ভুত দেখাবে, তাই
কখনো কাঁদি নি!
কেউ নয়! হা ঈশ্বর তুমি বিনে কেউ কাঁদল না!
ক্ষমার ভীষণ শাস্তি তাকে আর কখনো দিও না!
কলঙ্কে, লজ্জায় তাকে যেতে দাও উন্মাদ জনতা
ছদ্মহাতে তুমি সব পাথর ছুঁড়েছ আমি জানি,

দুজনে আহত হলে রক্তের চুক্তিতে কাছে যাবো
নির্যাতিতহলে বুঝি আত্মজার মত বুকে নেবে,

সফলতা! সফলতা! না হলে কি সফলতা শুধু?
কাকে ঠিক সফলতা বলে?

সফলতাগুলি বিফলতা |


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
ভ্রূণা
কবি কবিতা সিংহ
(যখন গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গনির্ণয় সম্ভব হলো)

আমরা ভ্রূণ না    ভ্রূণা
জন্ম দিও না      মা!
মা আমার জেনে শুনে কখনো উদরে
ধরোনা এ বৃথা মাংস
অযোচিত কখনো ধরোনা |

আর ভয় নেই কোনো ভয়
যত গর্ভবতী ভাঙো শোক
নিশ্চিন্ত হোক সর্বলোক
হলুদ-বসন্ত পাখি ডাকুক নির্ভীক স্বরে হোক
গেরস্তের  ঘরে ঘরে
খোকা হোক! খোকা হোক! শুধু খোকা হোক!


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
আকাশ
কবি কবিতা সিংহ

আমি বাঁচার জন্য তোমাকে চাই হে !
আকাশ হে, --- তুমি যে হও সে হও !
তুমি এত নীল!
মেঘ হলে, ভিতরে ভিতরে
যত পাল সব ফুলে ওঠে
আমার সমস্ত হাড়ে     ঘষে খাও বজ্রের চুম্বক

ভিতরে ডায়নামো      এত ধ্বক্ ধ্বক্ করে!

তারার মেডেল বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছ
চিতিয়ে রয়েছে বুকখানি
একদিকে   অরুন্ধতী অন্যদিকে জ্বলছে এযান্ ড্রোমিডা

ছায়াপথ ধরে আমি একদিন ঠিক চলে যাবো
যেখানে মন্থন-দন্ড ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তুমি

অজস্র তারার জন্ম দাও

আমি চাই বাঁচার আকাশ
এই মর্ত মৃত্তিকায়    আমি চাই    আকাশ  আকাশ!



.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
বৃদ্ধ বেশ্যা তপস্বিনী
কবি কবিতা সিংহ

হঠাৎ তোমাকে কেন রঙীন ‘অফসেট্’ মনে হ’ল ?
হঠাতই ল্যাকারকরা চুল
সিল্ক স্ক্রীন শাড়ী?
বহু বর্ণে সুশোভিত ‘লেদার বাউন্ড’---
শরীরে নিখুঁত ‘লাইনো’
মলাটে ‘মেডেন ফর্ম’হল্ দে লাল বিবাহ মরশুম
বুদ্ধি করে কে এঁকেছে তোমার ‘কভার’?

বিয়ের বাজারে তুমি পড়তে পাবে না নারী
পড়ার আগেই বিকে যাবে

এযাবত সব বাত্সায়ন কে শেখালো ? কখন শেখালো?
বলল সে, ---‘শিখিয়েছে হীরামালিনী গো’!

বিঘে সুন্দর কেচ্ছা  তুমি কি পড়োনি?
মাসীর মেয়েতে আজ ছেয়ে গেছে পেনেটি
.                     টেরিটি!

এ বয়সে আর কিবা পারি?
ভদ্রবেশ্যা বানানোর টিপস্ বলে দিই হপ্তায় হপ্তায়
যেভাবে ঘোড়ার টিপস্ বলে দেয় দেউলে-ঘোড়েল


সেইভাবে কচি কচি খুকিদের ব্যবসা শেখাই |


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
আলাত-পুরুষ
কবি কবিতা সিংহ

যে নারী পেরিয়ে যায়     অসংখ্য শিখর
বাচ্চেন্দ্রিপালের গাঢ় হৃদয়-নিবেশে
.        সে কী পায়?
পায় না কিছুই
পাবার জন্য নয় কোনো অতিক্রম
অতিক্রম কেবলই হারার পথে পথে লুঠ হয়ে যায়
বন্ধু সখা প্রিয় নর   পড়ে থাকে নিজস্ব একেলা!

আবার পাহার ওঠে নারীর মতন নন্দাদেবী
ফ্যালিক্ ত্রিশুল!

যে নারী ছোঁয় না সেই নশ্বর যৌনতা
কেবল শরীরে যাহা শিহরিত ভঙ্গুর ক্ষণিক
মাংসের, লসিকায়, স্নায়ু বিস্ফোরণে
সে নারী যায় না কোনো মুহূর্তের মোহিনী-মায়ায়-
যৌনতা ঘোরায় নারী     ঘুরে যায় মোড়
ঘুরে যায় গ্রীবার মোচড়!

ফেটে পড়ে শিল্পতার অজস্র বিস্ফোট
শরীরের বিপরীতে    জন্ম নেয় নতুন সৌরতা

নারী যায় অশেষ যাত্রায় যায় অগ্নির নির্ঘোষে
পাকদন্ডী ঘুরে যায়   উঠে যায় পথ
অসংখ্য শিখর হার মেনে নীচে পড়ে থাকে
.                যত লিঙায়েতী শিলা পুত্তলিকা
শূন্য থেকে নারী তার দেহ ছুঁড়ে দেয়

দেহখানি গ্রাস করে অলাত-পুরুষ |



.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
সহজ সুন্দরী
কবি কবিতা সিংহ

চোখে যদি মন ফোটালে
মনে কেন চোখ দিলে না
বদলে তার বদলে
লজ্জায় ভুঁয়ে নোয়ালে |

লজ্জায় ভুঁয়ে নোয়ালে
তবু কেন ছেড়ে দিলে না
বদলে তার বদলে
দুনিয়ায় বেঁধে ঘোরালে |

দুনিয়ায় বেঁধে ঘোরালে
কালা মুখ ঢেকে দিলে না
বদলে তার বদলে
রক্তে প্রেমের বিষ মেশালে |

রক্তে প্রেমের বিষ মেশালে
বিষে কাল ঘুম দিলে না
বদলে তার বদলে
চোখে মন ফুটিয়ে দিয়ে
আঁজলায় যাচ্ না দিয়ে
বুকে কানা হৃদয় দিয়ে
দুনিয়ায় বেঁধে ঘোরালে
দুনয়ায় বেঁধে ঘোরালে |



.        ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
কোনো এক কূপমন্ডূকের উক্তি
কবি কবিতা সিংহ

আমার বিষয় নয় ‘বাংলাদেশ’
দায়হীন নীরক্ত উচ্ছাস
এ-জন্য মার্জনা চাই, শাস্তি দিন---যেমন বিধান !
কেবল সীমান্তপারে আমি কোনো বিশেষ আলাদা
‘বাংলাদেশ’আছে বলে স্বীকার করি না |
আমার স্বদেশ তবে কোন্ দেশ ?
আমি তবে কেমন বাঙালী ?

আমার বিষয় নয় চৌরাস্তার বোমার দাপটে
ভয়ে মূত্রপাত করে সবিক্রমে চৌরঙ্গীর মোড়ে
দিব্য সামিয়ানা তুলে যে-কোনো ছুতোয় শান দেওয়া
রক্তের ভিতরশায়ী জন্মগত-ভিখিরির পেশা !

আমার বিষয় নয় ভানযুদ্ধ
সুরক্ষিত বহুদূর থেকে
বাস্তব নিকটব্যাপী গৃহভেদে পিঠ পেতে
কানে তুলো---দুই চক্ষু বুজে
চতুর আয়াসে সারা বিশ্বকে জানিয়ে বাহাস্ফোট  |

আমার বিষয় নয় দলীয় প্রমেহদুষ্ট নাক
অন্যের রুধির শুদ্ধ সংগ্রামের ভিতরে গলানো |
আমার বিষয় নয় এ-মুহূর্তে যাবতীয় বিশ্বের সংবাদ
লাওস, ভিয়েতনাম, চেকভূমে কুম্ভীরাশ্রুপাত |

আমার বিষয় শুধু নিজ বাসভূমে
শিরে ঘোর সংক্রান্তির স্তম্ভিত সংবাদ |
এই ঘোর গুরুদশা, গৃহদাহ, রক্তে মহামারী
সন্তানের, বন্ধুর, পিতার মৃতদেহে টালমাটাল
ঘর, গলি, বড় রাস্তা, কাশীপুর, বরাহনগর
এর বেশি দৃষ্টি নেই, অদ্ভুত বধির

আমার বিষয় আজ নিজ কূপ
দুখিনী স্বদেশ |


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
ব্যালেরিনা
কবি কবিতা সিংহ

বুক ও কটিতে শুধু সামান্য সাটিন
পৃথিবীকে ছুঁয়ে আছে দুপায়ের অগ্রভাগ তার
তাকে ঘিরে আলো ঘোরে জালে পড়া শাদা মৌমাছি
চারপাশে রঙ্গমঞ্চে থমকায় কালো অন্ধকার |

মনে হয় পিঠে তার ডানা আছে, কাচের পতাকা
অথবা সে হাঁস এক, উড়ে যাওয়া আলোর পালক
অস্থিহীন অলৌলিক, দেহ তার উরন্ত বলাকা
ওপরে আলোর দিকে, তার দুই বাহু উদ্দালক |

হীরক কঠিন ঊরু অন্ধকারে জ্যোতি-সমকোণ
কটিদেশে বৃত্তচাপ, বাহু কাঁপে সরোদের তার
তবুও নাচের চেয়ে অপরূপনাচের উঠেন
কারণ শরীর তার উচ্চনাদ তৃষ্ণার ভৃঙ্গার |

নাচ শেষ, ফিরে এসো উইংসের অন্ধকার কোণ
যত কাছে যেতে পারে, তত কাছে নিয়ে এসো মুখ
ম্যাস্ কারা বিস্ফারিত, নাচে দুটি মোহন-নয়ন
অন্ধকারে ডুবে গেছে উচ্চারিত, বাহু কটি, বুক
নাচ শেষ, ফিরে এসো, নেচে ওঠে অপেক্ষার মন
এতখনে তোর নাচ ছাড়ায়েছে নাচের উঠোন |


.                   ****************     
.                                                                         
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর