কবি কষ্ণ ধর-এর কবিতা
*
তোমার বসন্ত
কবি কৃষ্ণ ধর
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “এই শতাব্দীর প্রেমের
কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


বসন্তে ফোটাই ফুল, কথা দিচ্ছি এই ফুল
তুলে তোমাকে একগুচ্ছ দেবো চুলে।
দিয়ো। কিন্তু বিহ্বলতা এনো না কখনো চোখে
তার চেয়ে স্বপ্ন দেখো, কে জাগাল চৈত্রদিনে
কে জাগাল আকশ্মিকতায়?

আমি কি বসন্ত হ’বো তোমার বসন্ত
স্পর্ধা নিয়ে দোলাবো কি তোমার যৌবন
নতুন বৃষ্টির মতো ধানচারা তোমার শরীর
আমাকে জড়াতে চায়, আমি কিন্তু
বিপন্নের মত তখন লুকোবো মুখ
দুঃখিত হয়োনা অরুন্ধতী।

তোমার বক্ষের স্বর্গ করতলে দিয়েছে
উত্তাপ, চাই না চাই না আমি, ওই দুটি
বিস্মিত আপেল কোনো চিত্রাশিল্পীকে দিয়ে।
অনাবৃত উপহার সে আঁকবে আশ্চর্য তুলিতে

আমি হ’বো বিমুগ্ধ দর্শক।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নির্বাচিত ফুল
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৯ সালে প্রকাশিত, মেঘ বসু সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” কবিতার
সংকলনের কবিতা। ২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।

আত্মসমর্পণ চাইলে দিতে পারি নির্বাচিত ফুল
দিতে পারি কিছু কিছু প্রাকৃত প্রহর
স্মৃতিতে উজ্জ্বল

হৃদয়ে পড়েছে চড়া, ধূ ধূ বালি মধ্যাহ্ন বেলায়
নিঃশব্দ নদীর জল, নেই কলস্বর
শুধু স্বপে আছে

ভাবছো কী আর পাবে তার কাছে
তুকতাক, মন্ত্রগুপ্তি প্রত্নের স্বাক্ষর বর্ণমালা
জানি তুমি ভুলেও ছোঁবে না তা
যদি জ্বলে ওঠে ছোঁয়া লেগে স্মৃতির রুমাল

প্রশ্ন করো, কেন বা এমন হয়? কেন স্তব্ধ ভোরের আজান?
সে কি বিশ্বাস বধির, কিংবা শ্রুতির বিভ্রম?
অথচ তোমার বুকেই আছে বিকল্প সন্ন্যাস
স্মৃতির ভেজানো দরজা আলতো হাতে খুলতে যদি পারো
তাহলে দেখাতে পারি করতলে ধরা আছে
নির্বাচিত ফুল

ইচ্ছা হলে তুলে নিতে পারো

ভালবাসা সব কিছু পারে॥

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রচ্ছন্ন স্বদেশ
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৯ সালে প্রকাশিত, মেঘ বসু সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” কবিতার
সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


মানচিত্রের রেখায় নয়, অদৃশ্য কালিতে লেখা
তার সাম্রাজ্য সীমানা
অস্থিমজ্জার ভিতরে, শিরায় শিরায়, চেতনে
অবচেতনে, স্মৃতিসত্তায়
প্রচ্ছন্ন স্বদেশ।
আজন্ম তার ধুলো মাটি আঁকড়ে
ঘাসের ভিতরে ঘাস হয়ে, শিকড়ে
পুণ্য জলধারা খুঁজে, উৎসে ফিরে গিয়ে
প্রচ্ছন্ন স্বদেশ জেগে থাকে
অস্তিত্বে, বোধে, স্বপ্নে ও বাস্তবে

শুধু ছাড়পত্র পরিচয়ে নয়
বুকের ভিতরে, গভীরে, রক্তকণিকায়
ভালোবাসা ও ঘৃণায়, প্রাকৃত সত্তায়
সংবিধান সংশোধনে নয়।
বুকের ঘাসের শীষে রাঙা প্রজাপতির ডানায়
কাঁটাতারের বেড়ায় সীমান্তের নিঃসঙ্গ পোড়োবাড়ির
ভাঙা দরজার গায়ে, কুলুঙ্গিতে, হতোমের
প্রগাঢ় ডানায়, আমাদের কৃতকর্মে
সময়ের বিষণ্ণ দুন্দুভি বেজে বেজে
ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে নির্জন অলিন্দে।
ইতিহাসের বিবর্ণ পাতায় ঢাকা দগদগে ক্ষত
নিরাময় আশা কি দুরাশা
তারই জন্য পথচলা, জেগে থাকা, নদীর উজানে যাওয়া
সর্বস্ব অর্পণ করে স্বপ্ন দেখা।
মানচিত্রে নয়, বুকের গভীরে শুয়ে আছে
আবহমানের পাশে একা একা,
সময়ের হৃদয়ে আমূল প্রোথিত করে, অস্থিমজ্জায় মিশে
বিস্মৃতির অন্ধকারে, স্মৃতির উষায়

অভিমানী প্রচ্ছন্ন স্বদেশ।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খড়ির গণ্ডি
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৮ সালে প্রকাশিত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও কালিদাস ভদ্র সম্পাদিত “আবৃত্তির শ্রেষ্ঠ
কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


আঁকা আছে খড়ির গণ্ডি চারদিকে
দেখি কার এমন সাধ্য তা পার হয়
দেখি কেমন করে তাকে ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্ত

এখানে পা দিলে টলে উঠবে মাটি
জেগে উঠবে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি
স্রোত বয়ে যাবে প্রবল বেগে শুকনো চরায়---
কার সাধ্য তা পার হয়?
কার এমন বুকের পাটা তাকে ছোঁয়?

এই হেমন্তে হলুদ পাতারা গোটা অরণ্যে
কেমন সুন্দর বিছিয়ে রেখেছে পা রাখার জায়গা
মৌমাছির চাক ভেঙে মধু গড়িয়ে পড়ছে
শুধু তার ঠোঁট স্পর্শ করবে বলে।

নীল সমুদ্র, তুষার পাহাড় আর
দুরন্ত ঘূর্ণির সব কটা ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়ে
ভেসে আসছে একটাই কণ্ঠস্বর
ভয় নেই, এই রয়েছি আমরা তোমার পাহারায়।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ফটিকবাবু
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৮ সালে প্রকাশিত, উত্থানপদ বিজলী সম্পাদিত “এপার বাংলা ওপার বাংলার ২০০
কবির ২০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


বাজার ফেরত থলে হাতে
ফটিকবাবু
খবর কাগজ চোখ বুলোতেই
হলেন কাবু।
আর কটা দিন বাঁচার কত
সাধ ছিল
সে আশাতে বিজ্ঞানী জল
ঢেলে দিল।
পাঁচশো কোটি বছর মাত্র
আছে বাকি
জীবনটা তো হয়েই গেল
ফক্কা ফাঁকি।
আকাশের ওই সূর্য নাকি
তেজ হারাবে
ঠাণ্ডা হয়ে পৃথিবীটাই
ছিটকে যাবে !
কথা শুনে পড়শিরা কয়
ফটিকবাবু
খবর পড়েই কেন মিছে
হলেন কাবু?
পাঁচশো কোটি বছরটা তো
ফেলনা নয়
ততদিনে আপনি আমি
সব মহাশয়
থাকব কোথায় সে কথাটা
দেখুন ভেবে?
আপাতত পৃথিবীটা যেমনি আছে
তেমনি রবে॥

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খসড়া
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৪ সালে প্রকাশিত, অজিত বাইরী সম্পাদিত “দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকদের
১৫০ বছরের প্রেমের কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


চিঠি লেখার আগে তার খসড়া বানানো চলে
মনে মনে বেশ ক’দিন ধরে
যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকা শব্দ আর বাক্যগুলিকে নিয়ে
রাতের জোনাকি, বর্ষারাতের ব্যাঙের ডাক, বৃষ্টির শব্দ
একে একে খসড়ার ভেতরে ঢুকে পড়ে

কথায় কথায় চিঠির পাতাটা ভরতি হতে থাকে
হাতের অক্ষরগুলো ঠিকঠাক থাকে না আজকাল
যেন লম্বা শীতঘুম দিয়ে উঠে আড়মোড়া ভেঙে
ওরা খসড়ার সঙ্গে এক হয়ে যায়
বাকি কথাগুলো কখন লিখে শেষ করব
এমন চিঠি লেখা আর না লেখা নিয়ে ধন্দে পড়ি
আসলে সবটাই তো মনে মনে খসড়া
সময়ের ব্ল্যাকহোল এই খসড়াগুলোকে শুষে নিয়েছে
মৃত নক্ষত্রের মতো এতদিন ধরে
কাকপক্ষীও তা টের পায় নি
গর ঠিকানা সে সব চিঠির মৃতস্তূপ থেকে
খসড়াগুলোকে কি উদ্ধার করা যাবে?

বাতাস হা হা করে বয়ে যায়ে, খোঁজো, খোঁজো
খোঁজার কি শেষ আছে?

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এক অলীক শহরের গপ্পো
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৪ সালে প্রকাশিত, শ্যামলকান্তি দাশ ও বিমল গুহ সম্পাদিত “হাজার কবির হাজার
কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


এ যেন এক অলীক শহরের গপ্পো
তার ঘর বাড়িগুলো দেখতে ঝকঝকে
যেন বা ডানা মেলে এক্ষুনি উড়ে এসেছে
অন্য কোনো গ্রহ থেকে।
তাদের এক ঝুল-বারান্দায় লম্বা জোব্বা আর মেঘের টুপি পরে
দাঁড়িয়ে শিস্‌ দিচ্ছেন শহরের মেয়র।

রাস্তায় রাস্তায় উজ্জ্বল রূপোলি আলোগুলো
কামরাঙা ফলের মতো
হেলমেটপরা ট্র্যাফিক পুলিশের মাথায় চুমু খাচ্ছে।
শহরের ট্যুরিস্ট নারীদের দিকে না তাকানোই এখন ভব্যতা
কেননা ওঁরা জন্মদিনের পোশাকে
স্নান করতে নেমেছেন নদীতে।
আশ্বিনের মেঘ দেখলেই
ওঁদের বাড়ির কথা মনে পড়ে যাবে
তখন ভিনাস ডি মিলোর ভঙ্গিতে জল থেকে উঠে এসে
নিজস্ব স্বর্গে ফিরে যাবেন লক্ষ্মী মেয়ের মতো
সবার হাঁ-করা মুখের ওপর দিয়ে।

অলীক শহরটা সেদিন খুব বেজার হবে তাদের ব্যবহারে
তার বুকটা টনটন করে উঠবে ব্যথায়।
ওরা ভাবতে থাকবে
কবে আবার পাখিরা আসবে তার সাজানো বাগানে
কবে তার গাছপালাগুলো আবার সবুজের কনসার্ট বাজাবে ভোরবেলা।

শুধু ফুটপাতের ভিথিরি শিশুটা
খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠবে তিনবার।
শহরের মেয়র তিন সত্যি করেছিলেন
ওকে এবার শীতে একটা কম্বল দেওয়া হবে।
সেদিন থেকে সে স্বপ্ন দেখে
সবার গায়ে রঙ-বেরঙের পশমের পোশাক
সেই শুধু ঠকঠক করে কাঁপছে বোকার মতো
মেয়রের ম্যাজিকে যদি তার সেই কাঁপুনিটা থেমে যায়
তাই সে হাততালি দিয়ে উঠল খুশিতে।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চলো না যাই দমদমা
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৮ সালে প্রকাশিত, শ্যামলকান্তি দাশ সম্পাদিত “ছোটদের আবৃত্তির ছড়া ও কবিতা”
সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


চলো না যাই দমদমা
রাতদিন সে রমরমা।
বিমান ওড়ে বিমান নামে
দেখবে চলো দমদমে!

বোয়িং সাথে ওড়ে ফড়িং
ডানার ওপর রয় সে চড়িং।
লাউঞ্জ কত গমগমা
চলো না যাই দমদমা।

বিমান ওড়ে বিমান নামে
দেখতে পাবে দমদমে।
নামা ওঠার শব্দ হুস্‌
সবার মেজাজ বেজায় খুশ্‌।

গল্পটা তো হয়নি শেষ
বলছি তারই পরিশেষ।
সেদিন গেছি দমদমে
আকাশ তখন থমথমে

সন্ধেবেলায় দেখি এ কী
নামল একটা উড়ন চাকি!
যাত্রীরা সব ভ্যাবাচেকা
কেউ বা একা কেউ বা দোকা।

দমদমা কী গমগমা
হঠাৎ হল থমথমা।
উড়ন চাকি করল যে কী
হঠাৎ কখন মারল ঝাঁকি
নীলচে আলো, লাল, ফ্যাকাসে
উড়ল চাকি পুব আকাশে।

রইল পড়ে দমদমা
রাত নিশুতি ছমছমা।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ছড়া, ঘরের ভিতর ছিল বেড়াল
কবি কৃষ্ণ ধর
২০০৮ সালে নির্মল বুক এজেন্সি থেকে প্রকাশিত, শ্যামলকান্তি দাশ সম্পাদিত “ছোটদের
আবৃত্তির ছড়া ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


ঘরের ভিতর ছিল বেড়াল
খাঁচার পাখি দিল উড়াল
দেখে না তাই শ্যামল বড়াল
.        রাগ
করল তবু উড়ল পাখি
বেড়ালটাকে দিয়ে ফাঁকি
বড়াল বলে, থাকগে পাখি
.        যাক।
পুষব না আর বেড়াল পাখি
ফতুর হতে অল্প বাকি
এদের খানা অল্প নাকি
.        ব্বাস্‌।
এই না বলে বেড়াল তাড়ান
পাড়ার লোকের বাঁচান পরাণ
শ্যামল বড়াল শুয়ে গড়ান
.        খাস্‌।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ছেলে ভুলোনো শহর
কবি কৃষ্ণ ধর
Holy Child Publication থেকে প্রকাশিত, উত্থানপদ বিজলী সম্পাদিত “ছোটদের আবৃত্তির ছড়া
ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


ঘাসিরাম সাপুড়ে
যাস না রে বাপুরে
অইখানে আর সাপ খেলাতে।
রাম রাম কহ রে
কে বা যাবে এই বারবেলাতে।

এইখানে ঝুড়ি থো
টেপা কলে মাথা ধো
মিছিমিছি কেন বোঝা বহ রে?
ছোলাভাজা খাবি আয়
ঝালমুড়ি দেব তায়
শোভা দেখ কইলকাতা শহরে।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর