কে বলেছে সেই কথাটা রথ দেখা আর কলা এক সঙ্গে বেচতে পারলে জমবে ভালো মেলা . কেউ দেখছে রথের ঠাকুর . কেউ বেচছে ভাজা পাঁপড় ধন্মোকম্মো কেনাবেচা সারছে একই বেলা॥
ভবিষ্যৎ অন্তরীণ, সত্তা শুধু অস্থির দর্শক কবি কৃষ্ণ ধর গোপাল হালদার ও মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৭০ (ফেব্রুয়ারী ১৯৬৪) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
প্রতীকের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করে যারা থাকে নির্মল ফুলের জন্য সাজানো বাগানে হঠাৎ প্রথর হলে হাওয়া সর্বনাশ ঘর ভাঙে, স্বপ্নের ঠোঁটে বসে মাছি সব মরে, কিছুই থাকে না শুধু সর্বনাশ আগুনের বেড়া চারদিকে, নিষ্ঠুর আগুন কিছুই থাকে না, থাকে না কিছুই স্বতি নষ্ট হলে, ধুলো মেখে উঠোনে গড়ালে বড় কষ্ট হয়, বড় অসম্মান তার চেয়ে বেশি দুঃখ বিপন্ন সময়ে দুঃখ ছাড়া আমাদের আর কোনো সঙ্গল থাকে না কবিতার ভাষা নয়, দেখ চেয়ে উদ্ধত ঘাতক উপস্থিত, হত্যা করে, নষ্ট করে, ছিন্নভিন্ন করে ঘরবাড়ি, ভবনশিখির পুচ্ছ, স্নেহ ও মমতা, প্রতীকের, স্বপ্রের অথবা প্রেমের প্রয়েজন ধূলোতে ফুরোয় সর্বনাশ গ্রাস করে সমস্ত বিস্ময় ভবিষ্যৎ অন্তরীণ, সত্তা শুধু অস্থির দর্শক॥
শেক্সপিয়রের সনেট কবি কৃষ্ণ ধর গোপাল হালদার ও মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৭১ (এপ্রিল ১৯৬৪) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। পত্রিকাতে এই কবিতাটি ৮১ নম্বরে আছে। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
(৮১)
হয়তো বাঁচবো আমি স্মৃতিশিলা তোমার গড়াতে, নয়তো তুমিই থাকবে, ধূলিতলে যাবো আমি মিশে ; তোমার স্মৃতিকে মৃত্যু পারবে না আর কেড়ে নিতে, যদিও আমার সত্তা বিস্মৃত হবে সব শেষে।
এখন তোমার নামে উপার্জিত অনন্ত জীবন, একবার চলে গেলে মৃত বলে জানবে আমাকে, আমাকে কি দিতে পারে, এই মাটি, সমাধি শয়ন চিরোজ্জ্বল থাকবে তুমি, মানুষের অগণিত চোখে।
তোমার স্মরণতিহ্ন হুবে কান্ত কবিতা আমার, অনাগত মানুষেরা বারবার পড়বে কৌতূহলে, উচ্চারিত হবে কণ্ঠে চিরকাল তোমার সত্তার পৃথিবীর মাহষেরা মৃত হয়ে সব চলে গেলে।
তখনো বাঁচবে তুমি, এ কবিতা এত গুণ রাখে উচ্ছ্বলিত শ্বাস বহে, এমনকি মানুষের মুখে।
হয়তো আমিই লিখব কবি কৃষ্ণ ধর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার পৌষ-মাঘ ১৩৭৬ (জানুয়ারি ১৯৭০) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
হয়তো আমিই লিখব অনশন বন্দীদের ঘুমভাঙা গান ভাঙবে শিকল ঝনঝন শব্দ তার শুনতে পাব একদিন হয়তো আমরাই।
এ শুধু শব্দ নিয়ে খেলা নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু খোঁজা আমাদের সকলেরই মুখ দেখে মনের ভিতর দেখা মতো রক্তের ভিতরে আনাগোনা মন্ত্রগুপ্তি মানা এ সবই আমি লিখব মরচে-পড়া লেখনীকে আবার শাণিত ক'রে হিংস্রতার মুখোমুখি হয়ে।
ধানের আশ্চর্য গন্ধ কবি কৃষ্ণ ধর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার আষাঢ় ১৩৭৭ (জুলাই ১৯৭০) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
দেখেছি অনেক মাঠ জাগরিত চঞ্চল ফসলে দেখেছি বাঙলাদেশেই আদিগন্ত প্রসন্নতা ঘিরে ছেয়ে আছে যেন এক আত্মভোলা শিল্পীর স্বভাবে।
নদী বহে অবিরল, পায়ে বাজে পরিচিত সুর নূপুর যেন বা তার কথা কয় কলকঠে মেঘের দুপুরে ধানের সোনালী গুচ্ছ চুলে বেঁধে দুরন্ত কিশোরী দ্বেখেছি তারেই যেন কখনো বা সমাহিত সুমহান শস্যে স্তবে।
কা’রা এই অনিন্দিত শিল্পকর্ম খোলামাঠে রেখে দিয়ে গেছে কা'রা এর শিল্পী কা'রা এমন দাক্ষিণ্যে ভরে দিয়ে গেছে মাঠ, কা'রা সেই সুজন কৃষক কবে তারা ফিরে আসবে নিজেদের শিল্পশস্য তুলে নিতে নিকোনো উঠোনে? কবে তারা জল বহে নিয়ে আসবে আমাদের তৃষ্ণার শিকড়ে? রাত্রির কঠিন বেড়া, পথ সেকি এখনও সুদূর? বীজে তার কান্না শুনি, ধানে তার আশ্চর্য সুবাস নদী মাঠ গ্রাম গঞ্জ ভরে গেছে শস্যের গানে শুনেছি চলার আওয়াজ পায়ে পায়ে হাঁটাপথে বৈজয়ন্ত গান দিলখোলা সবল গলায় শুনেছি আমারও সে অনাদি আত্মীয় তার শিরায় শিরায় সুর তোলে আগামীর নিশ্চিত ভৈরবী
ঝড়জল বিদ্যুতের, বুলেটের কাঁদানে ধোঁয়ার প্রতিবাদী আমাদের ভাই।
বঞ্চিত ক্ষুধার্ত খিন্ন এসেছে সে নিতে অধিকার শস্যের সম্ভার জাগাবে সে নিদ্রিত মাটির বুকে আমাদের সকলের গান।
শিল্পী জানে সৃষ্টি তার সবুজে সোনায় মিলে খেলাবে বিদ্যুৎ আগামী দিনের মাঠে ধানের আশ্চর্ধ গন্ধে ভরে যাবে আমাদের নিরন্ন সময়।
সহযাত্রী অটল বিশ্বাস কবি কৃষ্ণ ধর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৭৬ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৬৯) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
তার সঙ্গে কানামাছি খেলি প্রতিদিন হৃদয়ের সহযাত্রী যার দৃঢ় বাহু অস্তিত্বকে আগলে রাখে সংশয়, সন্ত্রাস, ভয়, অবিশ্বাস, আগুনের জতুগৃহ থেকে।
কখনো দ্বন্দ্বের ভিতরে পড়ি, কখনো চীৎকারে উচ্চকিত হয়ে উঠি কখনো নিজের ভায়ের মুখ দেখে ঘৃণা করতে শিখি কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত অন্য এক প্রতিবেশী অজ্ঞাত কুলশীল শ্বেচ্ছাচারী ভাবি।
কখনো নিজের নখের ঘায়ে ক্ষতস্থান থেকে পিতৃপিতামহের রক্তপাত দেখি বিচলিত হতে চায় হৃদয়ের, বুদ্ধির সাহযাত্রী বিশ্বস্ত চেতনা, বোধ . . . সত্তার অদ্বিতীয় সখা। এই সর্বনাশে ছলনায়, প্রলোভনে, নিরাপত্তা লাভের ইচ্ছায় নিজেরই চিবুক নেড়ে আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখি।
কেউ আর কাছে নেই শুধু এই আত্মবোধ ছাড়া পলাতক এ সময়ে আমিই আমার রক্ষক ডামাভোলে শুধু টিঁকে থাকে যাকে নিয়ে দুর্ভাবনা যার সঙ্গে প্রতিদিন কানামাছি খেলা যাকে ঘিরে সত্তার আশ্রয় হিরণ্যবাহুর মতো দীন্তিমান অদ্বুতীয় সখা পবিত্রতা অটল বিশ্বাস।
বাঁড়ুজ্যেই উত্তর দেন কবি কৃষ্ণ ধর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার শারদীয় ১৩৮০ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৩) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
কেন বলেছিলেন তিনি, নদী ছাড়া আর সবই বাহুল্য? কেন এই সুগভীর দ্যোতনার কথা? দেখেছি কি মহানদী কী ভাবে ঢেউকে নাচায় প্রাণের মোচড়ে ? দুকুল ভাসায় রাগে, প্রেমে, ধানের গোড়ায় জীবনের হামুখে দেয় জল ?
কেন তিনি মোহানার আশ্চর্য রূপে মুগ্ধ হন, দেখান উজাড় করে তাহাদের ছবি? কেন তিনি তৃষ্ণার শিকড়ে দেন জল? কেন তিনি মিখায়েল এঞ্জেলোর টানে ভেঙেচুরে দেখান ঈশ্বর, মানুষেরই মানে জ্বলস্ত ক্যানভাসে? কেন তিনি নদীতে মেলাতে চান জীবনের স্রোত প্রাণকে জাগান মরা ঘাসে?
সময় ছিল না কবি কৃষ্ণ ধর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮১ (মে-জুলাই ১৯৭৪) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
সময় ছিল না ব'লে কথাগুলো বুকে ছিল গাঁথা অথচ নদীও ছিল বহমান অন্তরঙ্গ জল, আকাশে ছড়ানো ছিল গোধুলির আরক্তিম ডানা সে কি হতে চেয়েছিল আমারই মতন স্বেচ্ছাচারী হৃদয়ের অন্তর্গত ছিল তার এমনি অবাধ্যতা?
সময় ছিল না ব'লে যাই নাই তোমাদের কাছে ঘুরপথে নিষিদ্ধ উত্তর দিকে যাবার বাসনা ফুঁসে উঠেছিল বুকে দুরন্ত ঝড়ের মাথা নাড়া ( মেঘের কুর্তা গায়ে বিজলির ঝলমলে পাজামা ) আমাকে দেখাল সে তোমাদের ঘরের ঠিকানা।
সময় ছিল না ব'লে দেখিনি পাহাড়ে বাজপড়া অরণ্যের সর্বনাশ, বুকভাঙা বিশাল অশত্থ সাক্ষী হয়ে পড়েছিল যেন বা সম্পাতি সে একা আমাকে দেখায় পথ অন্ধকারে ঝলসানো সে চূড়া॥
নির্বাসনে নয় কবি কৃষ্ণ ধর দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার শারদীয় ১৩৮৮ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৮১) সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
ছাড়ুন মশাই ছাড়ুন, কলকাতা ছাড়ুন এটা কি শহর, না হদ্দ পাড়াগাঁ? পাদানিতে পা, হাতের মুঠোয় জান নিয়ে নিত্যি যাওয়া আসা এর নাম বেঁচে থাকা?
তার চেয়ে বরং চলুন সেই নতুন দ্বীপটায় যেখানে হাড় হাভাতে মানুষজন এখনো গিয়ে জোটেনি এন্তার খালি জমি মাগনাই মিলবে।
একটা রূপসী বাড়ি বানাবেন সেখানে উঠোনের চারধারে লাগিয়ে দেবেন বেল যুঁই মাধবী লতা মৌমাছিদের জন্যে বানিয়ে দিতে পারেন মৌ-ঘর খাকবেন দিব্যি আরামে কলকাতাকে তুড়ি মেরে।
বাসের হাতল ধরে খাবি খেতে খেতে ভ্যাপসা গরমে বিবাদীবাগ যেতে যেতে দ্বীপের নির্জনবাসের আনন্দে মশগুল হয়ে পড়ি ভিড়ের চাপটাকে খুবই মোলায়েম মনে হতে থাকে আর কদিনই বা এই ভোগান্তি ! থাকব মাধবীলতা মৌমাছি আর রাতের জোনাকিকে নিয়ে, খাসা ! ধ্যুস্ কলকাতা, একে কি বেঁচে থাকা বলে?
ভিড়ের ভিতরেই আমি সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাই খুব আলতোভাবে মনে হয় আমি যেন চলেছি কোনো স্পেস্ শিপে চড়ে
কলকাতার নাগালের বাইরে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে অনস্তনক্ষত্রবীথি অন্ধকারে . . . আমি একা চল্লিশলক্ষ মানুষমানুষীর পাগলপাগল ভিড় এড়িয়ে আমিই যাত্রী আমিই পাইলট।
হঠাৎ স্বপ্নভাঙ্গে আমি ঘামতে থাকি ভয়ে নিঃসঙ্গতার ভয়াবহতা আমাকে জড়িয়ে ধরে অক্টোপাসের মতো আমি মানুষজনের মুখ দেখতে না পেয়ে কেমন জানি বোবা হয়ে যাই ফিরে যেতে চাই আমি আমাদের মানুষের মাঝখানে সুখের নির্জনতানির্বাসন থেকে ছিটকে বেরিয়ে ধুলোমাটিনোংরা হল্লায় আক্রান্ত আমার নিজের জায়গায়।
আশ্বিনের ছড়া কবি কৃষ্ণ ধর ২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।