প্রশ্ন কবি কৃষ্ণ ধর ২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
বিন্দুবাসিনী পিসি ডেকে ক'ন ওরে বল্ দেখি মাথা কেন ব'সে থেকে ঘোরে? সূর্য্যিটা ডোবে তার ভেজে না তো গা চাঁদ যদি হাসে তার দাঁত দেখা না ! রোদ্দুর ওঠে বল্ কোন্ মই বেয়ে পৃথিবীতে রাত নামে কোন সিঁড়ি দিয়ে? কার ধান কোটে বল্ বুদ্ধির ঢেঁকি অভিধান ঘেঁটে বল্ সাত-পাঁচে কী? কতো কিলো চিন্তায় মন হয় ভারী আটখানা করে তারে কার হাতুড়ী? কতো টক খেলে মেটে শরীরের ঝাল কোন সুতো দিয়ে বোনে চিন্তার জাল? বুদ্ধিটা বাঁকা হলে কে বা করে সিধে গল্পটা গিলে খেলে মেটে কার খিদে? বল্ তো চাঁদের হাট বসে কোন বারে সময় গড়ায় কোন্ ঢালু পথ ধ'রে? ভেবে ভেবে ভাইপোর চুল হলো খাড়া, পিসিমা ধ্মকে কন---এক পায়ে দাঁড়া।
লন্ডভন্ড কবি কৃষ্ণ ধর ২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
দেখছ কী যে কান্ড বিড়াল চাটে বাঘের হাড় সব যে লন্ডভন্ড। মশাই তুমি মজার লোক সব হারিয়ে করছ শোক দুধের বাটি উল্টে দিলে শূন্য হবেই ভান্ড, বিড়াল চাটে বাঘের হাড় আজগুবি সব কান্ড।
পৃথিবীর শেষতম কবিতার জন্য কবি কৃষ্ণ ধর ১৯৮১ সালে প্রকাশিত, কবির “শব্দহীন শোভাযাত্রা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনা ২৪ আগস্ট ১৯৭৯। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
পৃথিবীর শেষতম কবিতা লেখার জন্য দিগন্ত জোড়া সোনার জলে নাম লেখা একটি সুনীল মলাটের খাতা চাই আর চাই পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য একটা নিটোল স্বপ্ন সভ্যতার নোনা-ধরা ইমারতের জন্য চাই কিছু রঙপালিশ যা মানুষই দিনভর লাগাবে নিজের হাতে।
এই সব প্রয়োজনের ফর্দ লেখা আছে কবির ডায়েরিতে এখন সমস্ত দুনিয়া খুঁজে জোগাড় করে নিতে হবে তাড়াতাড়ি। তারই সঙ্গে খুজে নিতে হবে নিরক্ষরেখার সমান লম্বা একটা ছায়াবীথি পরমাণু বোমার তেজস্ক্রিয় ধোঁয়াবিহীন আকাশের নীলিমা আর শিশুর চোখের মতো টলটলে নদীর জল।
এই নষ্ট প্রদর্শনীর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তখন মানুষ পৃথিবীর শেষতম, দীর্ঘতম ও প্রিয়তম কবিতার এক একটা আশ্চর্য পংক্তি রচনা করবে খোলা আকাশের তলায় মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে নিজেদের স্বপ্ন আর তৃষ্ণার কথা মনে রেখে আগামী দিনের পাঠকের জন্য।
কথা কখনও শেষ হয় না কবি কৃষ্ণ ধর ২০০১ সালে প্রকাশিত, কবির “প্রিয়বাক্, কথা রাখো” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
সর্বত্রই কলরব ছেয়ে গেছে শহর পোস্টারে তুমি শুধু নিজস্ব কথা বলতে এসেছো সর্বত্রই বিস্তর জৌলুস তুমি শুধু এক কোণে পা ছড়িয়ে বসেছো ঘাসে খুব জমকালো ভাষণে চমকাচ্ছে ময়দানের সভা তুমি গাছের ছায়ায় নিচুগলায় বলছো জীবনের কথা যতবার তোমার সঙ্গে দেখা তুমি চেয়েছো আমার দিনগুলিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে সবাই যখন ভিড় করে রাস্তায় তুমি সোজা হেঁটে যাও কোনো পিছুটান না রেখে আমার প্রতিবেশীরা তোমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তুমি কোনোদিকে না তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসো দরজায় কড়া নেড়ে জানিয়ে দাও আজই তোমার আসবার দিন।
আমার সঙ্গে তোমার কোনো কথা বাকি ছিল না তবু তুমি এসে জানিয়ে গেলে কথা কখনও শেষ হয় না প্রতিদিনই ভোর হয় তবু ভোরের জন্য প্রতিটি রাত অপেক্ষায় থাকে পাণ্ডুলিপির ওপর তোমার স্বাক্ষর পাবার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে বর্ণমালা পাথরের ওপর তোমার নাম কারা যেন লিখে গেছে সেবার হেমন্তে তুমি চলেছিলে বনস্থলীর দিকে তোমাকে বুঝতে বারবার ভুল হয়ে যায় তুমি তাই বলতে এসেছো কথা কখনও শেষ হয় না শেষ হবার নয়।
লখিন্দরের হাড় কবি কৃষ্ণ ধর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত, কবির “হে সময় হে সন্ধিক্ষণ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
বেহুলা এলেন ইন্দ্রসভায় আঁচলে বাঁধা লখিন্দরের হাড় ক'খানা নিয়ে তার সব কিছুই কেড়ে নিয়েছে বিরুদ্ধ জল বাতাস আর রৌদ্র লখিন্দর বলে এখন আর কেউ নেই আছে তার মজ্জাহীন শুকনো ক'খানা হাড়।
নত হয়ে দাঁড়ালেন বেহুলা তার বুকের কাছে ঘুমুচ্ছে লখিন্দরের হাড় ভিতরে ধিকি ধিকি জ্বলছে এক মানবীর মৃত্যুজয়ের আকাঙ্ক্ষা তার মুখে কোনো ভাষা নেই চোখের জল শুকিয়ে গেছে কবে
তার ননীর মতো শরীর উঠছে দুলে ছন্দের মোহিনী মায়ায় দেবতারা দেখছেন একটি নারীর নাচ আড় চোখে ;
লখিন্দর বলে এখন আর কেউ নেই বাতাস হা হা অট্টহাসিতে সে খবর রটিয়ে দেয় সর্বত্র বেহুলার নৃত্যের তালে তালে তার মজ্জাহীন হাড়ে লাগছে ছন্দের দোলা তার নূপুরের শব্দে মুগ্ধ সমাহিতি অচেতনার স্তর থেকে জেগে উঠছে এক আশ্চর্য জীবনের গল্প মজ্জাহীন হাড় থেকে জন্ম নিচ্ছে অন্য এক লখিন্দর মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এক মানবীর ভালবাসার উত্তাপে শরীর ফিরে পেয়ে।
প্রিয় বাক্, কথা রাখো কবি কৃষ্ণ ধর ২০০১ সালে প্রকাশিত, কবির “প্রিয় বাক্ কথা রাখো” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
প্রিয় বাক্, তোমার ভিতরে ছিল কঠিন পাথর আর খরজল ছিল নির্গত বাষ্পের উত্তাপ, আমি বুঝিনি তোমাকে ভেবেছি খেলার সামগ্রী নিরুত্তাপ নিস্পৃহতায় স্বেচ্ছাচার করেছি কত তোমার গায়ে লেপ্টে ছিল কৃষ্ণমৃত্তিকা জনপদের দিকে যাইনি কখনো প্রিয় বাক্, তুমি আমাকে খিড়কি দুয়ারে এনে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো কীভাবে হবে দ্বন্দ্বের মীমাংসা, তোমার সহ্গে কীভাবে হবে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর? তোমার শরীরে নানা উল্কি আঁকা আমি কি তার পাঠোদ্ধার করতে পারব? প্রিয় বাক্, জিভে নয়, তুমি আমার ভিতরে এসে আসনপিঁড়িতে বসো।
আমি মুদ্রাশাসনের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছি এখন তোমার স্তবগানে কণ্ঠ মেলাব প্রিয় বাক্, কথা রাখো।
ভুসুকুর ভাসান কবি কৃষ্ণ ধর ২০০৮ সালে প্রকাশিত, কবির “হাঁটব থামব না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
পুথিভরা কাব্যকথা শুনত যখন কুপির আলোয় বুঝেছিল কিছুটা তার বোঝেনি সব মন্দভালো। এখন করে শহরে বাস প্রান্ত ঘেঁষে খাল যেখানে দিনের বেলা সূর্যভরসা রাতে পথের হ্যালোজেনে। হালচাল সব ওলট পালট বিপিএল-এ আছে বেঁচে মধ্যবিত্ত দালান কোঠার বাসন মেজে কাপড় কেঁচে। খড়কুটোদের জীবন যেমন বাণের তোড়ে জলের ঘূর্ণি বেঁচে আছে কোনোমতে সেটাই ভাবে বাপের পুণ্যি। শ্রাবণ জুড়ে পদ্মাপুরাণ রয়ানি গান খুপড়ি ঘরে কীর্তন খোলা আড়িয়াল খাঁ নদীর কথা মনে পড়ে। কাঁটাতারের বেড়ার আড়াল জল মাটি গাছ রয় ওপারে সব ছাড়িয়ে নাছোড় স্মৃতি আসছে ফিরে বারে বারে। লোক কথার ভাষাটুকু বাঁচিয়ে রাখে মুখে মুখে হাত ধুয়েছে আর্যাবর্ত ভাসান তবু গায় ভুসুকে।
ফুটপাতে অন্নপূর্ণা বসেছেন ভাত রাঁধতে কবি কৃষ্ণ ধর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত, কবির “হে সময় হে সন্ধিক্ষণ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
এই তোমার নবান্নের নেমতন্ন ! এই হাঘরেকে চৌমাথায় বসিয়ে রেখে ফুটপাতে অন্নপূর্না বসেছেন ভাত রাঁধতে সব গাছবিরিক্ষি জ্বলে যাচ্ছে ঠাঁ ঠাঁ রোদে এরি মধ্যে তুমি ডাকলে নবান্নের নেমতন্নে !
মনে আছে তোমার সেই হিংসুটে নদীর কথা মেঘ না চাইতেই বানভাসি করে দিত আর খরার দিনে বুকে পাথর হয়ে বসত ধূ ধূ ঝালির চড়া
কিচ্ছু আর মনে নেই সব ঝাপসা হয়ে গেছে তার চেয়ে এমন কি আর মন্দ এই শান-বাঁধানো ফুটপাত !
মুখ ফেরালে কেন? আমাদের আর ভাল দিন কবে ছিল? অন্নপূর্ণা, তুমি ওদের দিকে আড়াল করে বসো দেখছো না কেমন করে ওরা তাকায় দেখলে গা রি রি করে ওঠে রাগে ওরা কি জন্মে ভাত রাঁধা দেখেনি?
চলে যাওয়ার সময়ে কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৯ সালে প্রকাশিত, কবির “কবিতা সংগ্রহ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
যেতে চেয়েছো বলে হাওয়া তোলপাড় বাড়ি ঘর সিঁড়ি, ঝুল বারান্দার টবের জিনিসগুলো এমন উতলা হয়েছে টের পাচ্ছো না তুমি শুধু দরজায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট করে বিদায় চেয়েছিলে, আসি। এই দু'অক্ষরের শব্দে সেদিন থমকে দাঁড়িয়েছিল তোমার সমস্ত কালসীমা তোমার বর্ণময় অস্তিত্ব মায়া আর স্মরণ কাঙাল
তুমি যেন অনুচ্চারে বলেছিলে ভুলোনা তোমাদের সঙ্গে ছিলাম এতদিন আমার ভুলত্রুটি যা কিছু স্বপ্নের অলীক রেখে যাচ্ছি তোমাদের জিম্মায় ঋণী ছিলাম শোণিতে অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষার কাছে জীবনের উষ্ণতার প্রকৃতির দাক্ষিণ্যের কাছে ভালোবাসা আর অভিমানের কাছে। সব নিয়ে চলে যাচ্ছি ভুলোনা
ওরা বলেছিল, সামনে যা দেখতে পাচ্ছো তা বিদায়গোধুলি নয় শুনতে পাচ্ছো না তুমি দূরাগত ভোরের আজান যেতে যেতে সবাইকে জাগিয়ে তুমি যাবে ঘুম নয় এখনতো জেগে ওঠার সময় পথের নিশানা ফলকে শুধু আমন্ত্রণ থাকে তার কোনো বিদায়সম্ভাষণ নেই যাওয়া নয়, যেতে যেতে ফিরে ফিরে দেখা পরিচিত জলমাটি মানুষের বসতি জনপদ।