সব দিতে পারি কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৯ সালে প্রকাশিত, কবির “কবিতা সংগ্রহ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
দিতে পারি আমাদের সব গোপন অহংকার ভাষার মালায় গেঁথে অনিঃশেষে দিতে পারি আমাদের দিন ফুরোবার আশা ও নিরাশা বিনাশর্তে হলুদ খামেতে পুরে ভাকবাক্সে দিতে পারি বাহান্ন বিঘার ছায়াবীথি কুসুমসুবাস চৈত্র দিনের খ্যাপা হাওয়া বিজনে দুপুরে দিতে পারি ঘাট বাঁধানো পুকুরের শান্ত শীতলতা তৃষ্ণার্তের প্রহরে অযাচিতে।
দিতে পারি অভিমানী হৃদয়ের মৌনভাষ। অনিদ্রাকাতর রাত্রির নিঃসঙ্গ মুহূর্তে দিতে পারি আমাদের নিকানো দাওয়ার আলপনা মাঘমণ্ডলের ব্রতকথা, আশ্বিনের ঘ্রাণ দিতে পারি এই জেনে, তোমার শিয়রে ওরা জেগে থেকে আমাদের শিকড়ে দেবে জল আর রৌদ্রের খবর।
মহারাজ, তবে আজ তুমিও যজ্ঞের আশা ছাড়ো ওই দ্যাখো কালিগুলার দামাল ঘোড়াটা ইতিহাসে পাথর সেজেছে।
এ শহরকে চেনো না তুমি মহারাজ হাততালি দিলে ঘর থেকে পিল পিল করে বেরিয়ে পড়ে অক্ষৌহিণী সেনা এরা সব সংশপ্তক হাজার বছর ধরে মার খেতে খেতে এ মাটি এখন পাথর এ বড় কঠিন শহর মহারাজ, দ্যাখো কী বেইজ্জত, অশ্বমেধের ঘোড়া ময়দানে গিয়ে মুখ দেয় অর্বাচীন ঘাসে।
মানুষ মানুষের জন্য কবি কৃষ্ণ ধর ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত, কবির “নির্বাচিত কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
( প্যালেস্টাইনের কবি তৌফিক জায়াদ অবলম্বনে )
আমার জীবনের অর্ধেকটা উৎসর্গ করব তাকে একটা বাচ্চা ছেলের কান্না থামিয়ে যে তার মুখে হাসি ফোটাতে পারবে। বাকি অর্ধেকটা দেবো একটি তাজা ফুলকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য।
আমি একটি গানের জন্যে হাজার বছর পথ হাঁটব পার হব কঠিন দুর্গম হাজার উপত্যকা এবং সব কটা ঝড়ো সমুদ্র পাড়ি দেবো একটি লাইলাক ফুলের সুঘ্রাণ নেবার জন্য।
আমি মানুষ মানবতার জনাই আমার সব চিন্তা ভাবনা। আমি কী করে মনে শান্তি পেতে পারি যখন অবিরাম রক্তপাত হচ্ছে মানুষের !
যাওয়া কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৯ সালে প্রকাশিত, কবির “কবিতা সংগ্রহ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
দরজা অবধি গিয়ে একবার ফিরে তাকিয়ে বলল, যাই বেশ কিছুদিন থাকা হল একসঙ্গে এবার তবে যাই দেখা হল কত দেশ, কত মানুষের সঙ্গে চেনাশোনা হল সব স্মৃতি নিয়ে যাচ্ছি ভুলব না যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যাবার আগে যদি কাউকে আনন্দ দিয়ে থাকি ডেকে বলো পাড়াপড়শিদের
দরজাটা খোলাই রইল যেতে যেতে বাড়িটাকে ফিরে দেখবে বলে বিদায় দেওয়া কি এতই সহজ যে পড়ে রইল, তুমি কি জানো, তার যাবার জায়গা নেই সে নিজের কাছেই বন্দি হয়ে আছে আজীবন
বলেছিলে দেখা হবে, কোথায় তা বলোনি কখনো নগর সংকীর্তনে প্রত্যহই শুনি নামগান জয়ধ্বনি দিয়ে ভিড়ে আমিও যে হাঁটি সারাবেলা কোথায় তোমাকে পাব জানি না তা, তাই পথ চলা।
ইচ্ছাপত্র কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
অগ্নিতে দিয়োনা শরীর, দিও না পুণ্যবারিস্রোতে কিংবা গোরের মাটির বুকে দেহটাকে দিয়ো যাতে মানুষের কাজে লাগে এ আমার ইচ্ছাপত্র লিখে যাই দেওয়ালের গায়ে প্রিয় বৃক্ষের পাতায়, শাখাপ্রশাখায় অন্যথা করোনা, মায়ায় ভুলোনা, যেতে দাও নশ্বর শরীর
শোক নয়, এ দেহকে নতুন সজ্জায় ঢেকে দিয়ে এসো শুশ্রূষার কাজে, সে তাই চেয়েছে কান্না দিয়ে ভিভিয়ো না তাকে, দুয়ার পেরোতে দাও, আকাশ দেখুক তাকে পৃথিবীকে ভালবেসে, পৃথিবীর নিরাময় চেয়ে রেখে যাব নিজের শরীর
অগ্নিতে দিয়োনা তাকে, দিয়োনা নদীতে মাটিতে শোবেনা শরীর যাবে মানুষেরই কাছে যার জন্য ছিল তার আজীবন মনন শিল্পের চর্চা, মোহহীন ছিল অন্বেষণ জীবন সত্যের।
সে বড়ো মায়াবী গোধুলিবেলা কবি কৃষ্ণ ধর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত, কবির “হে সময় হে সন্ধিক্ষণ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
সূর্যাস্তের আকাশ জুড়ে বাঞ্জে বিসর্জ্জনের বাজনা রাখাল বালকেরা তখন ফিরছিল ঘরের দিকে সে বড়ো মায়াবী গোধুলিবেলা ছিল।
এই চোখ বিস্ময়ে দেখেছে কতো সূর্যোদয় আর সুর্যাস্ত আজকের সূর্যাস্তের মতো এমন প্রহর বুঝি আসেনি কখনো মাণিকবাবুর গল্পের শশী আর কুসুমের হৃদয়ের কথাগুলি এমনি এক অস্তসূর্যের রক্তিমতায় মিশে গিয়ে সময়ের বুকের ভিতর বাসা বেঁধে আছে।
রৌদ্রের কৌটো উপুর করে ঝরে পড়ে দ্রোণ ফুলের বুকে ঘুরে ফিরে তার ওপর বসে হালকা পায়ে হলুদ প্রজাপতি আকাশের প্রচ্ছদপটে আঁকা হয়ে থাকে এই নিসর্গ চিত্র
তখন হৃদয়ের ভিতরে বাজে বিসর্জ্জনের বাজনা রাখাল বালকেরা ফেরে ঘরের দিকে সে বড়ো মায়াবী গোধূলিবেলা ছিল।
এখনো তোমাকে খুঁজি কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
এখনো তোমাকে খুঁজি চিত্রে ও ভাস্কর্যে লোকায়ত পটে নিজস্ব পঙ্ক্তিতে, খুঁজি ধুলোয় ধূসর জনপদে নীলিমায় নয়, চৌরাস্তায় নগরীর আগণন ভিড়ে নিসর্গেও খুঁজি কখনো বা ভুবনডাঙায় রুক্ষ গেরুয়া উদাসে
তুমি তো নিঃসঙ্গ ছিলে ব্রাত্যদের দলে মিশে মন্ত্রহীন তোমার সে স্তব জেনেছিলো যারা তাদের আসন কই তোমার সভায় এই বৈশাখ পঁচিশে ফুলের জলসায় ধূপে গীতিমাল্যে সে কি তুমি?
অথচ তুমি তো জানো তোমাকে কেন বা খুঁজি এই দিনে এই তপ্তরিক্ত হাহাকারে দাউ দাউ গ্রীষ্মের দুপুরে নির্ঝরের স্বপ্নের পাশে? কেন খুঁজি নীলিমায় সকরুণ চিলের কান্নায়?
তুমি জানো কেন এই ছিন্নভিন্ন দিন সঙ্গতি খুঁজতে যায় তোমার নিকটে স্বীকারোক্তি চাও যদি লিখে দিতে পারি স্বেচ্ছাবন্দি তোমার শিল্পের কাছে
মন্ত্রহীন পুরোহিত, তুমি জানো নিগূঢ় সংবাদ তাই তো তোমাকে খুঁজি প্রতিদিন জীবনযাপনে স্বপ্নে ও সংগ্রামে, মৈত্রী ও দ্বন্দ্বের দ্বৈত অনুভবে পেতে চাই শিল্পের শাণিত সত্যে জয়ে পরাজয়ে।
বাড়িবদল কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
হঠাৎ হয়ে গেল তার বাড়িবদল প্রতিবেশীরা কেউ জানতেও পারেনি আগের দিনেও যথারীতি বাজার, দুধতোলা এবং কুশল সংবাদ বিনিময় পার্কের বেঞ্চিতে একসঙ্গে ওঠাবসা, বেড়ানো অথচ তিনিই, কাক এসে ভোরকে ঠোকর দেবার আগেই টেম্পোতে জিনিসপত্র তুলে হাওয়া।
এসেছিলেনও আচমকা কোথায় কোন দূর প্রবাস থেকে এখানেই থাকবেন বলে স্থির করেছিলেন অথচ তিনিই পশ্চিম থেকে পুবে এসে আপাতত দক্ষিণে। ছিল কি কোনো অভিমান অথবা গভীর বেদনাবোধ? একা একা রাতে বেড়াতেন ছাদে নিঃসঙ্গতা তাঁকে সঙ্গ দিতো সারাক্ষণ। কোনো শ্লোগানে বিচলিত হতেন না তিনি এক নিঃশব্দ নীলিমায় আক্রান্ত সময়ের দিগন্ত।
এখন কোথায় গেলেন তিনি? কোন দক্ষিণে? সেখানেও তো জনপদ, প্রতিবেশী এবং রাস্তার মানুষ। ঠিকানাবদল হলেই কি বাড়িবদলের স্বাদ পাওয়া যায়? আবহমানের অভিমান বুকে নিয়ে বাঁচে যে শহর তার প্রতিটি পাথর খুঁজলে পাওয়া যায় এমনি কতশত বাড়ির ঠিকানা বর্ষার জল এসে তাঁদেরও একদিন ধুয়েমুছে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিম থেকে পুবে তারপর উত্তরে দক্ষিণে এইভাবে জনপদ তার ইতিহাসের পরিধি বাড়ায়।
মনে রেখো কবি কৃষ্ণ ধর ২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।
মনে রেখো আঁকা রুমাল দিয়ে মুখ মুছি কেমন যেন বিবশতায় ঝরে যায় সব স্মৃতি সৃচীকর্মে সাদার বুকে রঙিনসূতোয় ফোটানো কারনেশনের রঙ মনে রেখো বলে তার মিনতি আমার অস্তিত্বে মনে নেই বলার মতো অকৃতজ্ঞতায় ধরা পড়ে যাই।
সব মনে থাকেনা, থাকা সম্ভব নয় পথে যেতে যেতে অনেক কিছুই ঝরে যায় তাকে ফের কুড়িয়ে আনতে গেলে সে হবে এক দুঃসাধ্য কাজ কেন তবে এই মিনতি “মনে রেখো"?
পায়ের তলায় ঘাসফুল বুঝি ডাকে পথিককে? এভাবেই আমাকে মনে রেখো আমাকে মনে রেখো বিকেলের নদীর জল এভাবেই বুঝি ডাকে বিদায়ী সূর্যকে, আমাকে মনে রেখো
চরাচর অন্ধকার হয়ে এলে মনের মধ্যে বাজতে থাকে রুমালের বুকে জ্বল্ জ্বল্ কারনেশনের রঙে আঁকা দুটি শব্দ ‘মন রেখো’।