কবি কষ্ণ ধর-এর কবিতা
*
পাথর প্রতিমা
কবি কৃষ্ণ ধর
২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


তার কাছে নত হয়ে দাঁড়াই
তিনি এখন একটা নিশ্চিদ্র পাথরের পোশাক পরে
বেদীর ওপর বসে আছেন পদ্মাসনে।
প্রথর রৌদ্র হাসিমুখে তিনি গায়ে মাখেন
শ্রাবণের জল অবিরল তাকে ধুইয়ে দিয়ে যায়
তিনি স্থির চোখে তাকিয়ে থাকেন উদাসীন একা

অনেক শরৎকালের মেঘ হাতছানি দিয়ে যায়
পায়ের তলায় ঝরে পড়ে অনেক নির্বাচিত ফুল।
তার জন্যে ঘেরা বাগানে
বসন্তের কোকিল এসে গান গেয়ে যায় এক একদিন
তিনি কিছুই শোনেন না, বসে থাকেন বধির হয়ে।

কিন্তু শীতের রাত্রিতে যখন বেওয়ারিশ ছেলেটা
ওঁর পাথরের বেদীর তলায়
কুকুরের মতো কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে
শুধু তখন, শুধু তখনই
তিনি তাঁর পাথরের পোশাক থেকে বেরিয়ে এসে
নেমে আসেন নিচে
ছেলেটাকে বুকে তুলে নিতে।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যে যেখানে আছো
কবি কৃষ্ণ ধর
২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।


যে যেখানে আছো সবার জন্য
কিছু কথা বলে যেতে ইচ্ছা করে
অপরিচিত মক্ষোভা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে
আমার কেবলি মনে পড়ছিল অন্য এক নদীর কথা
যার তীরের মাটি হাতের মুঠোয় ধরে বলেছিলাম,
আজ নয় অন্যদিন তোমার কথার জবাব দেবো।

এখন সে যেখানে থাকুক না কেন
সেদিনের কথাগুলো মনে হবে খুব অর্থহীন
তাই হয়তো স্বাভাবিক
সময় কথাগুলোর অর্থ পাণ্টে দেয় নিমর্ম উদাসীনতায়

ভিলাই ইস্পাত কারখানায় গলানো লোহায়
আগুনের ফুলঝুরি দেখে
ধৌঁয়াটে লণ্ঠনের আলো নিয়ে বসে থাকা তার কথা
যার কাছে মস্কোভা নদী কিংবা ভিলাই ইস্পাত কারখানা আপাতত অর্থহীন।

যে যেখানে আছো সবার জন্য
কিছু কথা এখনও বলে যেতে ইচ্ছা করে
কথা বড় গরিমাময়, তার শক্তি বড় আশ্চর্য
কথার জন্যই সে আশ্বিনের হিম মাথায় অপেক্ষা করছিল
কথার জন্যই সে এখন চলে গেছে।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঘরে ফেরার সময়
কবি কৃষ্ণ ধর
২০১৬ সালে প্রকাশিত, কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।

(কোনো যাযাবর নবদম্পতিকে)

অনেক হয়েছে আর যাযাবর হয়ে থাকতে চাইনা
কোথাও বসতে চাই, স্থিতু হয়ে কোনো গৃহকোণে
দেখতে চাই আমাদের দুজনের ভিতরে
আর কী কী সংলাপ বাকি আছে বলার
জানতে চাই, ধুলোপায়ে ঘরের ভিতরে এসে
এ শহরে আমাদের আগন্তুক মনে হয় কিনা।

ঘুরেছি অনেক সরাইখানা, আড়াই দিনকা ঝোপড়িতে
ওয়েটিং রুমে, কেটেছে অনেক রাত্রি সুপার ফাস্ট ট্রেনের কামরায়
অজন্তার গুহাচিত্র দেখতে দেখতে নিজেদেরও দেখেছি আড়চোখে
কোভালাম সমুদ্রসৈকতে প্রতিটি স্পর্ধিত ঢেউয়ের চূড়া
পৃথক দেখেছি গুণে গুণে আলস্যে মধ্যাহ্নে

অরণ্যেও গেছি, প্রতিটি পাতায় দেখেছি রৌদ্র থেকে
কীভাবে ক্রোরোফিল শুষে নেয় দুর্মর প্রাণের স্পৃহায়
নির্বাক উদ্ভিদ, পেয়েছি নিগূঢ় ঘ্রাণ স্তব্ধতারও
এবার বসতে চাই স্থির পরস্পর মুখোমুখি
কিছুদিন, দেখতে চাই নিজস্ব জানালায় রোদ,
সন্ধ্যার অলিন্দে আকস্মিক ভাঙা চাঁদ, বুভুক্ষু ও একা
বুঝতে চাই বুকের ভিতরে জোয়ারভাঁটার টান খেলে কিনা আজও
দেখতে চাই প্রতিদিনের ঘষায় প্রতিমার রঙ উঠে যায় কিনা।

যাযাবর এসবের খবর রাখেনি কোনোদিন
তাকে ডাকে প্রোজ্জ্বল সকাল আর আচ্ছন্ন গোধূলি
ডাকে মরুস্থলী, ডাকে ছায়াবীথি, নিষিদ্ধ নীলিমা
ঘরকে ডরায় সে, পলাতক তাই বুঝি যেতে চায় পথে

আমি তাকে চারদেয়ালের ভিতর টেনে আনতে চাই
দেখতে চাই হৃদয়ের তলানিতে উষ্ণতা আছে কিনা তার
বুঝতে চাই ঘরে ফেরার সাধ ছিল কিনা।

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নির্ভয়
কবি কৃষ্ণ ধর
এশিয়াটিক সোসাইটির মাসিক বুলেটিনের এপ্রিল ২০২ সংখ্যায় প্রকাশিত
রচনা - ৪ এপ্রিল, ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৯.৮.২০২০।

ব্যাঙ্গমা বলছে ব্যাঙ্গমিকে
শোনো শোনো কান পেতে শোনো
ব্যাঙ্গমি বলে কী আর শুনবো
সবই তো পুরনো পুথির বাক্য একই ছাঁদে ঢালা
সবারই এক কথা- পালা পালা পালা
কোথায় পালাবে তারা? কার কাছে যাবে?
কে আছে ডেকে নিতে ছাদহীন ঘুঘুচরা ভিটেতে তাদের
একদিন শিখেছিল মানুষকে সঙ্গে নিয়ে থাকো
এখন ত্রস্ত তারা দিশেহারা পরিযায়ী পাখিদের মতো।
ব্যাঙ্গমা বলছে, এত ঘৃণা, এত বিষ, জমা ছিল
তবে কেন একদিন জেনেছিল মানুষ মানুষের জন্য
মানুষের মাপেই সব কিছুর বাছ ও বিচার
মৃত্যুনীল বিষের অক্ষরে ধ্বংস ও বিনাশের ভয়
আকাশে বাতাসে ছড়ায়
ব্যর্থ করো ব্যর্থ করো তারে
মানুষই ফেরাবে তাকে শুভ চেতনায়

.              *************************                

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর