স্নিগ্ধ ছায়া ফেলে সে দাঁড়ায়, আমারে পোড়ায় তবু উত্তপ্ত নিশ্বাস . গৃহাঙ্গনে মরীচিকা আনে | বক্ষ রিক্ত তার মমতায়, এ জীবনে জীবনের এল না আভাস . বিবর্ণ বিশীর্ণ মরতূণে |
রাতের কবিতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যয় ( মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "দিবারাত্রির কাব্য" উপন্যাসের দ্বিতীয় বিভাগের নামকবিতা )
প্রেমে বন্ধু পঞ্জরের বাধা, আলোর আমার মাঝে মাটির আড়াল, . রাত্রি মোর ছায়া পৃথিবীর | বাষ্পে যার আকাশের সাধা, সাহারার বালি যার ঊষর কপাল, . এ কলঙ্ক সে মৃতা সাকীর |
শান্ত রাত্রি নীহারিকা-লোকে, বন্দী রাত্রি মোর বুকে উতল অধীর---- . অনুদার সঙ্কীর্ণ আকাশ | মৃত্যু মুক্তি দেয় না যাহাকে প্রেম তার মহামুক্তি |-------নূতন শরীর . মুক্তি নয়, মুক্তির আভাস |
সুকান্ত ভট্টাচার্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যয় ( এই কবিতাটির রচনাকাল ১৭ এপ্রিল ১৯৪৭, প্রথম প্রকাশ- "দৈনিক স্বাধীনতা" পত্রিকা, রবিবার, ৪ মে, ১৯৪৭ সালে। পরে মিহির আচার্য সম্পাদিত "সুকান্তনামা" নামক সংকলনে পুনর্মুদ্রিত হয়। )
চৈত্রের পরিচয়ে তুমি সূর্য হতে চেয়েছ | তোমার যক্ষা হয়েছে ? তোমার তরুণ রশ্মি দেখে ভেবেছিলাম, বাঁচা গেল, কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ | তোমার যক্ষা হয়েছে ? এও বুঝি ষড়যন্ত্র রাত্রিজ মেঘের, ঊষার যারা আজ দুর্যোগ ঘটালো | বুলেট ছেঁদা করে দিচ্ছে তোমার উলঙ্গ ছেলেটার বুক, তোমার বুক কুরে খাচ্ছে টি বি কীট | দুর্যোগের ঘনকালো মেঘ ছিঁড়ে কেটে আমরা রোদ এনে দেব ছেলেটার গায়ে, আমরা চাঁদা তুলে মারবো সব কীট | কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা | বুলেটের রক্তিম পঞ্চমে কে চিরবে ঘাতকের মিথ্যা আকাশ ? কে গাইবে জয়গান ? বসন্তে কোকিল কেসে কেসে রক্ত তুলবে সে কিসের বসন্ত!
ছড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যয় ( এক পয়সা ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৯৫৩ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা ছড়া | প্রথম প্রকাশ ১৭ই জুলাই ১৯৫৩, স্বাধিনতা পত্রিকায় | )
আমরা শুনেছি তার পুলিসী ঝঙ্কার, মিলিটারী হুঙ্কার, অনেক অনেক বার---- সাদা রাজা কালো দাস মিলে যিনি অবতার, . স্বাধীনতা হীনতার !
বার বার ফোস্কায় কড়া পড়ে সেরে যায় ;--- লাঠি ও গুলির ঘায় জনতার প্রাণটায় মোটে আর ব্যথা নেই ভীরুতার ফোস্কায়, . কড়া পড়া একতায় |
খবরের কাগজ নাকি বাংলা ভাগ করতে চায় ? নেতারা নাকি ভাতের হাঁড়ি ভাগ করতে ইচ্ছুক, . বড়লাটের আজ্ঞায় ? হাঁড়ি ফাটলে যে ভাত পুড়ে ছাই হে উনানের আগুনে, শ্রমার্ত ক্ষুধার্ত আমরা খাব কি ? কি খাবে আমাদের হাড়গিলে বৌগুলি, ন্যাংটো নচ্ছার ছেলেমেয়ে ? পঁয়ত্রিশ লক্ষ মরলাম, মরলাম শুধু ওই নেতাদের লাটেদের খেয়ালে, আরও কি দু’চার কোটি মরব, দামী পেনের, এটলির হৃদয়ের মমতায় শোকভরা লেখনীর, নেহেরুর নখের আঁচড়ে জিন্নার গরিব মুসলমানের প্রতি দরদে, দাঙ্গা, কারফিউ, ব্যর্থ ও মিথ্যায় ? নেতাদের নেতারা বাংলা ভাগ করতে চায় ! বাংলা বাঙালীর | ঈশ্বর আল্লার হাজার বছরের সব জনমন মহামহোদয় বাক্য, জীবন ফাউ নাকি ? মরণ তো জানাশোনা | মৃত্যুই হল শেষে বিচারক ! বাঙালীরা মরছে মরল মরবে, কিন্তু ভাইরে, আর মরা যায় না ! যত পারি মরেছি, আর মরা যায় না | মাইরি বলছি কালীর দিব্যি, খোদার দোহাই, আর মরা যায় না কিছুতেই | তাই ঈশ্বর আল্লা নেতা লাটদের বাদ দিয়ে এবার বাঁচতে চাই, মানুষ নিয়ে মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই | ঘর ভাগ হোক, ভাগ হতে দেব না দেহটা, প্রাণটা !
শীতে ছেলেমেয়েগুলো কাঁপছে, কাঁদছে ! শীতে না খিদেয় কে জানে ! তবে বুঝি শীতেই কাঁপছে, খিদেয় কাঁদছে ! ফসল তোলার মাসে মরণ ধোঁয়ার কুয়াশায় পুবের সূর্য এমন করে ঢাকলো কেন মসলিনে ? পশ্চিমের এই এস্ প্ল্যানেডে রঙিন আলোর বিজ্ঞাপন ঝিলিক মারা তারার মতো আখর সমাবেশ | বড় শীত, বড় ঠান্ডা, শহরের অট্টালিকা তৈরী বরফের, . প্রাণহীন লোভের বরফ |
আশে-পাশে কত মুখরতা, পোষা পাখি স্বরলিপি সাধে, আত্মীয়েরা ভাষা গদ্ গদ | চিকন সুন্দর সব আকাশী বাতাসী অভিলাষ পুঞ্জ পুঞ্জ বিকশিত ছন্দের শাখায় সাজানো গোছানো কবিতায়----- বোবা শুধু প্রিয়া আর প্রিয়তমগুলি . মেয়ে চাষী-মাঝি | হাসে কাঁদে কথা কয় মেয়ে, খেলা যেন করে বড়দের খেলা ঘর পেয়ে ছোট সেজে খড়ি পেতে বড়দের কাটাকাটি খেলা ভালোবাসাবাসি মায়েদের মাসিদের অবসাদ বিষাদ বেদনা, বিনুনির রিবনেতে খোঁপার ভ্রূকুটি চোখ বোজা ভয়ে মুখে মন-রাখা হাসি বিতৃষ্ণার প্রতিবাদ অন্তর্হিত আঁটালো সরমে,---- অবিশ্বাসীর সাথে তারও যেন অশেষ লড়াই জন্মাতে বিশ্বাস ! আমি মৃদু আমি সূক্ষ্ণ, আঘাত কোরো না কিন্তু মোরে | ঝড়ে যাব ছিঁড়ে যাব আমি, আমি দাসী, কায়মনে শ্রীচরণে দাসী ! মানুষের মর্মর পাঁজর, হাড়মালা স্তনে, গৈরিক বৈরাগ্য শিশু বল্মীক কবরে, জপে কান্না উই-ধরা সুরে কৈশোরের ঘর-ভরা প্রেমের পুরাণে |
পদ্মায় ভেসে যেতে হেঁটে যেতে ক্ষেতে, ব্যস্ত হাটে, শ্লথ পথে, ছায়া-শান্ত ঘাটে শণ খড় খেজুরের কুঁড়েতে কুঁড়েতে, হাসি কান্না কুড়াই আগ্রহে, শূন্যে মিশে যায় স্বপ্ন-বলাকার মতো | বৈশাখে বন্যায় শীতে ফসলে বসন্তে, তৃষ্ণায় সর্বনাশে রিক্ততা হতাশা ক্ষুধা জ্বরে মোটা কালো ঠোঁটে ধরে রাখে . তৃণহীন ফাটা ক্ষেত মাঠের হাসিটি | নিশ্বাসে নিশ্বাসে তোলে অশান্তির মতো যে ডিঙি জীবিকা খুঁজে পাড়ি দেয় ঝড়ে গলুয়ের ঢেউ-ভাঙা তালে . হালে বাজা জল-কাটা সুর | হাসি কই, গান কই, কথা কও ভাই ! কথা তারা কয়, যে কথা বুঝি না, দাঁড়ের ঝপাঝপ, কাস্তের ঘষাঘষ ভাষাতে | কায়মন দিলাম নিলাম তবু পেলাম না প্রিয়দের, গা ঘেঁষে মিশেও চেনা গেল না প্রিয়তমগুলিকে, কবিতা লিখতে পারলাম না কৈশোরে |----
প্রথম যৌবনে ঘাঁটলাম দেবাশ্রমিক কবিতা | আর জীবনের নিচের তলায় বস্তির পচা পাঁক | যদি পাই সঞ্জীবনী মন্ত্র বা সুধার বিন্দু, যদি পাই নাগলোকের মণির একটা টুকরো | সবুজ করব হৃদয়ের শুকনো বিদ্রোহের চারাগুলি, বাঁচাব পাতালের বিষ-হত কালো ধনঞ্জয়দের | কি মোহিনী ছিল সে আশা যে কাব্য জীবনেরই রসায়ন, আঁধার অতল পাঁকে কেমন ঝিকমিক করেছিল আশ্বাস, নীল সমুদ্রে লুকানো মানিকের মতো ঢেউয়ের মুকুটে মুকুটে তা, আশা আশ্বাসের অসীমতাতেও রসালো না প্রাণের বিদ্রোহই | কাব্যের সাগরে ঝড় সৈকতের মরীচিকা বাস্তবে প্রতিক্রিয়া ভরা | অরণ্য অভিযানে পচা গলা কটুগন্ধী গোলাপের স্তূপ, ফুল পাতা ঝরা গাছে উদ্যত উদ্ধত শুধু কাঁটার সঙ্গিন, শুষ্ক ঘাসে ক্ষুরধার, আকাশ আঁচড়ে আর্ত পাখির চিত্কার | শীতে-মরা উপবাসী বাঁকা চাঁদখানি, দক্ষিণের উতালী বাসরে ঘামে ভেজা জ্যৈষ্ঠের গুমোট, কুয়াশার ছল চারিদিক, ভীরু চোখে জানালার শিক-ঘেঁষা মানস দিগন্ত, ভূমানন্দে পরিস্রুত কঙ্কালের হাসি, ইস্পাতের প্লাস দিয়ে আঁটাও অসাধ্য | অবচেতনার স্বপ্নে মুগ্ধ জাগরণ, স্তব্ধ আলো, শব্দ কালো, গন্ধ ক্ষত, স্বাদ পক্ষাঘাত | কবিতার আঁচড়েই নোনা রক্ত ঝরে পড়ে ভেনাসের গালে, মজুরের মেয়ে সাজা কুমারীর স্তনের বাকলে, দাঁতে নখে খাঁটি প্রেম সোনার ওজনে | কাব্যলক্ষ্ণীর নেই পুঁজি, অর্জুনের সিফিলিস উর্বশীর রুজি | পেটে দানা মানুষের নেই, অনর্থক বাঁচার লড়াই, মাটি শক্ত, অভিযান প্রতিহত স্নায়ু শিকড়ের, অশ্রুজলে ফলে না ফসল, হৃদয়ের বাষ্পোদ্যমে চলে না ইঞ্জিন | মুক্তির স্বাদ নেই লবনের মাসুল ভিক্ষার রক্তহীন গঙ্গাজলী আলুনি সংগ্রামে |
ঈর্ষা আতঙ্কে দিশেহারা, মন বুদ্ধি অন্ন মাংস একসাথে চোলাই চলেছে শুঁড়িদের, শব্দ-মদ বেচা কারবারে | কাব্যবালা নাচে গায় রাজার সভায়, এলো চুলে ক্ষত পদে নগ্না শীর্ণা বৃদ্ধা বিভীষিকা, আত্মহারা উলঙ্গিনী কালের নকল, মরণের ছায়া,---- ঐশ্বর্যের শেষ দীপ্তি দাহকারী তীব্র নীল আলোর অবজ্ঞা যে ছায়া ফেলেছে | রাজপথে প্রত্যূষের আলো, কোটি মূক সঞ্চারিণী ছায়া, বোরখা ঘোমটা ঢাকা ধর্ষিতা পোয়াতি ইতিহাস | জীবনের মানে পেলাম না কবিতায়, মরণের মানে পেলাম না দুঃখীর জীবনে | কি দিয়ে বন্দনা শুরু করি ?----- রাজার প্রাসাদে বাক, অর্থ জনতায় | কবিতা লেখা হল না প্রথম যৌবনেও |
নিত্য আত্মহত্যা করি বুদ্ধির ছুরিতে, আমি তো চাই নি পরাজয় | আমি তো খুঁজি নি শান্তি সুলভ সহজ আত্মীয় বন্ধুর বরাভয়, বিদ্যা অর্থ মান নারী প্রতিষ্ঠা ক্ষমতা সীমাবদ্ধ যথেচ্ছচারিতা | বিশ্বজয়ী স্নেহের দাবিতে বাপ ভাই আত্মীয় সুহৃদ, আমারে করেছে আমন্ত্রণ, নিত্যকার রাজভোগ আরাম বিলাসে অংশ নিতে | আমি তো খেয়েছি খুদ, আমি তো করেছি উপবাস, আমি তো ভুগেছি রোগ চাষী মাঝি মজুরের সাথে ! অকারণে আমি তো মরেছি লক্ষ বার | স্বল্প মোর কৈশোর যৌবন, আমার জগতে কাল মানুষের জন্মক্ষণ থেকে তিলে তিলে করেছে সঞ্চয় মহা সম্ভাবনাময় যে মহাবিপ্লব, আমি তারই আত্মীয়তা চাই | তার পিতা, তার হোতা, তার সার্থকতাদাতা, একমাত্র আমি | আমি ! আমি ! আমি ! আমি তারে বাঁচাব আঁতুড়ে, আমি চিকিত্সক | প্রহরে প্রহরে দেব বোতলে বোতলে মর্মের মন্থনজাত সঞ্জীবনী ঘণা আমি মৃত্যু হব তার সাধে জগতের ভীরু পঙ্গু ছদ্মবেশী মৃত্যুদাতাদের | আমি তার চোখে দেব কয়লা খনির কালো মরণ-কাজল, টিপ দেব চাকায় মাখানো গাঢ় জমাট রক্তের | সর্ব অঙ্গে এঁকে দেব লালিম অঞ্জনা বুলেটের তাজা তাজা ক্ষতের চিহ্নের | শিরে দেব সাদা দানবের দয়ার শোষণে শুভ্র পাটের মুকুট, রাঙাতে রক্তের প্রতিদানে | লোহার নূপুর দেব পায়ে সোনামোড়া বুক ভেঙে সেরা লোহা কেড়ে, চলনে প্রলয় বাজাবার | আমি সব দেব, আমি ! আমি ! আমি !
জীবনের এতখানি কাব্যের ভূমিকা, বক্র ক্লিষ্ট অশান্ত ব্যাহত, আন্দামানী অন্ধকার ঘেঁষা নিশীথ কাব্যের তুষানলে | শৈশবের আকাশকুসুমে যৌবনের পদ্মলোভী গোবর গাদায় অদম্য সাধের দাহ কবিতা লেখার | মানুষের আসল কবিতা----- আমার যে মানুষেরা রোগ শোক ক্ষুধা ব্যথা বঞ্চনা হত্যায় জীবিকার ব্যভিচারে পচে গলে যায় আমার জীবন জুড়ে স্বপ্ন জাগরণে | রেখে যায় প্রতিবাদ, অক্ষম কবির বুকে শত কোটি ভাষাহীন বিরহী ধ্বনির | প্রতিবার প্রেরণার মূক পরাজয় কোটিবার হৃদয়ের মরার সমান | দিনে দিনে বাড়ে ক্ষোভ, বাড়ে জ্বালা, বাড়ে ব্যাকুলতা, বাড়ে জিদ, বাড়ে অহংকার, একা যুঝি বহুরুপী অত্যাচারী জগতের সাথে তির্যক্ আঘাত হানি ভঙ্গুর কথায়, ব্যঙ্গ করি বিষাক্ত শাণিত উপেক্ষায়, অভিশাপ রচি | সে যেন নিজেরে আঘাত করা, নিজেরে চিবানো দাঁতে ব্যর্থতার অসহায় রোষে | আশ্রয়ের ঠিকানা জানি না, জানি না কোথায় থাকে আত্মীয়-স্বজন | জন্মভূমি বিদেশের মতো, বন্ধুরা মুখোশপরা বুদ্ধিজীবী জীব | শত্রুমিত্র চেনা দায় স্বদেশের সঙ্কীর্ণ সীমায়, দানবের দাঁতে নখে আহতা ধরণী, বিষে জরজর | মনে হয় একমাত্র সুহৃদ শহীদ আমরই অর্ধেক জীবন, আমার ব্যর্থতা | জীবনের মানে না জেনেও ভালোবেসে যাঁদের করেছি অপমান, তারাই দিয়েছে অর্ঘ্য শ্রদ্ধা ও সম্মান, যাদের দিয়েছি গালাগালি, তারাই দিয়েছে খ্যাতি মান | ফাঁকির বদলে ফাঁকি নয়, সত্য পুরস্কার, ব্যর্থ সাধনার, নিজে পুড়ে ভষ্ম করা আত্মার ভেজাল, জীবনকে দগ্ধ করে বিকারের চাওয়া প্রতিকার, শোষণ, সংস্কার----- তাও পুরস্কার পায় অকুন্ঠ উদার আশ্বর্য জীবন !
তখন আশ্বাস এল এক দল বাস্তব কবির | ইতিহাসের সুতোয় যারা মালা গাঁথছে মানের, জীবন-যুদ্ধের, জয়লাভের, অগ্রসরের, কাজের | আমার মানুষের কষ্টে তারা মোটেই কাঁদছে না সমবেদনায়, রাজাও করছে না প্রজাকে নকল ব্যথা দরদের নকল অভিষেকে | ঘৃণা করছে আমার ঘৃণ্যদের, সজীব আগ্নেয়গিরির নিরভিমান ক্ষমাহীন ঘৃণা, প্রেমের চেয়ে তেজী | প্রজার দলে ভিড়ে গিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শিকড় গাড়ছে না মোড়ে মোড়ে অনেক শাখা-পথের ধাঁধায়, পিছনের টানে | ঠিক পথটি খুঁজে নেবার চিরন্তনী ছলে | ওরা আমায় বলল : সব ঠিক আছে ! মানুষের পরাজয় নেই, মানুষ অমর | দানবের মৃত্যু আস্ফালনে, যদি বা ঘনিয়ে থাকে দুর্যোগের মেঘ, যদি বা বর্ষণ চলে থাকে উষ্ণ তাজা বিপ্লবী রক্তের,---- আমরা হাতে হাতে শুধু ছিঁড়ে আনব না মেঘ, শুধু দেখব না গ্রহণ-ক্ষুণ্ণ ম্লান সূর্য়ের মুখ, হাতুড়িতে গুঁড়ো করে, কাস্তেয় কেটে সাফ করব দুর্যোগের কারখানার হাড়-মাস মগজ-হৃদয়, হাসব দীপ্ত সূর্য়ালোকে, সবুজে ! এসো সাথী, একার আলাপ ছেড়ে এসো !
ওরা আমায় বলল : মূক তো কেউ নয় ? মেয়ে, মাঝি, চাষী, বস্তির ছেলে ? ওরা হাসে কথা কয়, সুরে গান গায় যদ্ধের ভাষায় ! জানে শুধু বাঁচার লড়াই, শেখে শুধু লড়ায়ের কথা হাসি-গান ! মুহূর্তের অবকাশ নেই, কখন বা শেখে, ওদের শোণিতে কেনা নিরাপদ অলস ছুটিতে, যুগ-যুগান্তের শান্ত নিশ্চিন্ত আরামে, কর্মহীন শ্লথ দীর্ঘ উর্বর বিশ্রামে গড়ে-তোলা রাজকীয় রসাত্মক ভাবময় ভাষা | বিশাল আবদ্ধ হ্রদে গাদাগাদি কমলার ঘন গন্ধজাত বায়বীয় সংস্কৃতির মোহে, ক্ষণেক যে মুগ্ধ হব সে সময় কই | স্রোতে তার ভেসে চলা চাই, প্রখর অশান্ত দ্রুত স্রোতে, থেমে মজে পচে গিয়ে পদ্মফুল ফোটাবে কখন, কচুরিপানার নীল ফুল | বন্যা তাকে হতে হবে ভাই, অনেক জমেছে আবর্জনা, অচল হ্রদের তীরে বহু দূর পচে গেছে মাটি | ঝড়ে ও বন্যায় তাকে ধুয়ে নিতে হবে ফাঁকি, পচা জল, বন্ধ্যা মাটি, আতরে আচ্ছন্ন মৃত বায়ু | এসো সাথী, একার আকাশ ছেড়ে এসো !
একার আকাশ ! মধ্যাহ্নের নিষ্প্রভ আকাশ ! ছেড়ে এল ক্ষব্ধ-পাখা মন | মাটিতে আবার খুঁজে ফিরি, খুঁজে ফিরি প্রতিনিধি, নব প্রতিশ্রুতি, নতন আশ্বাস | আমার তো জন্মান্তর নেই, সাড়ম্বরে সমর্পিত পৈতৃক ঈশ্বর ফেলেছি খরচ করে বিজ্ঞানের গবেষণাগারে | জন্মান্তরে কবিতা লেখার সম্ভাবনা নাই | তাই খোঁজ করি, আমার এ পৃথিবীতে জন্ম যদি নিয়ে থাকে অন্য এক কবি | জন্মের নিয়মের মৃত্যুঞ্জয়ী অখন্ড রাখীতে সে বাঁধা আমার সাথে, যার আমি পরম আত্মীয়, ঐক্য যে আমার | কিশোর সৈনিক এক জন, সে লেখে কবিতা লেখে শৈশব থেকে, সংগ্রামী শৈশব | লেখে আমার না-লেখা কবিতাগুলি, মানে দেয় আমার বিরহী ধ্বনিকে, ছন্দে সাজিয়ে সৃষ্টি করে বোবা প্রাণের ভাষা, রূপ দেয় অবাধ্য অনায়ত্ত ঝড়কে, আবর্তকে | আমার বিদ্রোহের চারাগুলি সবুজ হয়েছে ওর মনে, আমার সাধ হয়েছে ওর সার্থকতা | উদয়-সূর্যের প্রভাত থেকে জগতের কবিরা যুগে যুগে দাঁড়িয়ে সারি দিয়েছে হাত ধরে, শেষ হাতটি ধরতে হাত বাড়িয়েছে কিশোর সৈনিক | তা, বড় রোগা ছিল আমার কিশোর কবি, তার ভাত ছিল কম, ক্ষয় অনেক, জাত-লড়ায়ে সৈনিক তো ! এক দিন চিরতরে থেমে গেল তার চলা, অসাড় হয়ে গেল বাড়ানো হাতখানি | যুগের বসন্ত এলে সে গাইত জয়গান তাকে জমিয়ে দিল ভাতের মালিকের ছড়িয়ে রাখা উপোসী শীতের ফাঁদ, ক্ষইয়ে দিল জিইয়ে রাখা রক্তপায়ী কীট | আমার কবিতা লেখা হল না অন্য কবিকে দিয়ে |
মাঝ বয়সে মক্ স করছি হাত, খুঁজছি ছন্দ, ভাঙছি আত্মপ্রীতি সংস্কারের দেওয়াল, ছিঁড়েছি বুদ্ধির জটিল জাল, শিখছি রণ-রঙ্গিণী কাব্যলক্ষ্মীর সাথে মারণ প্রেমের কায়দা-কানুন | তির্যক্ ভয়ানক বিহ্বল বোবা রাত, শেষ করে জেগেছি বেঁচেছি এই আশা | এতকাল ছিলাম সে স্বকীয় জেলখানায় কুলুপ আঁটা ফাটল ধরা তার সাতটা ফটক | দ্বারে দ্বারে আমার পোষা রাজার কুমার প্রহরী, আমায় আকাশী মুক্তিও দিত না ঘুষ না পেয়ে,----- সাতটি রাজার টাকা এবং রাজকুমারী | ফাটল দিয়ে দেয়াল ডিঙিয়ে মাটির কাঁপনে, কানে আসছে মূকদের মুখর ভাষণ, প্রাণে লাগছে ঘরে ঢোকা ঝড়ের আলোড়ন | পদ্মায় যে ডিঙি চালায়, মেদনিপরের শক্ত মাটি চষে, বোম্বে থেকে কলকাতাতে লাখো চাকা ঘোরায়, উদয়াস্ত লাখো কলম পেশে, বুঝতে যেন পারছি তাদের ফাঁসে আটক গলার ঐকতান, অনুভব করছি ব্যাহত জীবনকামনার উজ্জ্বল তাপ, সূর্যোলোকের মতো | তুলনা পাই নি রাজকীয় কাব্য ইতিহাসে, এমন সহজ সরল বিরাট সুন্দরের | এ প্রাপ্য, এ সার্থকতা, এ সিদ্ধি, এ সৃষ্টির স্বাধীনতা, চেতন সূচনা, বিচিত্র আরম্ভ, নতুন উত্তাল রস-সাগরের নব মাটির বেলাতটে ঢেউয়ে ঢেউয়ে চির-মিলন সিক্ততা, সংঘাতে সংঘাতে | জীয়ন্ত তৃষ্ণার জয় তৃপ্তিতে তৃপ্তিতে অফুরন্ত অসাধ্য সাধন জীবনের স্পন্দনে স্পন্দনে জয়ে জাগরণে, আরো বেশী বাঁচবার অসীম কামনা মিটিয়ে চলার | এই পিপাসাতেই কি পড়ি নি বিজ্ঞান, জীবনের মানে খুঁজি নি টেস্ট টিউবে . বস্তু মিশ্রণের প্রতিক্রিয়ায়, অঙ্কে ছকি নি জীবন, আলোর গতিবেগ, চতুর্থ বিশ্ব খুঁজি নি মনের বিশ্লেষণে ? মনের মতো মানের মায়ায় আজও খোঁজার ভান করা, কবিতা লেখা স্থগিত রাখা, আর কি সাজে ? জের বরবাদ ব্যর্থতার, বাতিল আমার মিষ্টি ব্যথার অমিত ঐশ্বর্য ! কি করব ব্যর্থতা দিয়ে, ব্যর্থ মানুষের মন ভুলি.য়ে, যারা ভোলার ভান করে কিন্ত ভোলে না ? এবার লিখতেই হবে কিতা আর সময় নেই | বসন্ত ডেকে এনে গেয়ে যেতে হবে সারা বসন্তের জয়গান, জগতের কোকিলদের সাথে গলা মিলিয়ে | অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে, সর মেলাতে হবে অনেক বেসুর সানাইয়ের, অনেক ভাঙা পাঁজর জোড়া দিয়ে শুধরে নিতে হবে অনেক গান | গা রে পাখি গান গা, দে রে ফুল গন্ধ, শিশির-ভেজা ঘাস বেঁচে থাক, বেঁচে থাক জীবনের রসঘন কবিতা |