কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
উদিয়াছে চাঁদ, দেখিনু তখন আকাশের পানে চাহি',
অলখিতে ওঠে মাঠ-বাট ক্ষীণ জ্যোত্স্নায় অবগাহী' !
বনবালাদের কবরীকুসুম ঘোমটা আঁধারে ঢাকা,
মৃদু সৌরভ কোনো মতে তবু যায় না লুকায়ে রাখা !

নেবু-মঞ্জরী-মন্থর-বাস অন্তরে গিয়ে পশে,
কেদারবাহিনী---দখিনা বাতাসে কত কথা কহিল সে !
কতদিন পরে ঘরে ঘরে আজ বাতায়ন খুল্য়াছে !
সোহাগিনী ওই করবীর ঝাড় পাশে তার দুলিয়াছে |
ঝির্ ঝির্ ঝির্ বহিছে সমীর, বাঁশীর রাগিনী ভাসে,
আজিকে চাঁদিনী-চাঁদোয়ার তলে প্রাণ খুলে' কারা হাসে !
এমন সময়ে যদি কেহ ডাকে কানে কানে "প্রিয়তম" !---
গীত গেয়ে পারি উত্তর দিতে প্রতিধ্বনির সম |
মরমের কথা কহেনি যে-জন, আজিকে কহিবে যে সে,
কঠিন হৃদয় আজিকে হইবে কৃতার্থ ভালবেসে !
মনে হ'ল আজ জীবনের যত নিরাশার পরাভব,
রঙীন এ রাতি, বাসনার বাতি যত আসে জ্বালো সব
তৃণভূমি 'পরে বসিয়া ক্ষণেক হেরিলাম নাশানাথে,
বুঝিনু আবার বসন্ত এল পঞ্চমী-চাঁদ সাথে !


.             ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
তারি টঙ্কার-ঝঙ্কারে রচি রতি-বিলাপের ঋক্ |


আপনারি দেহ-শবাসনে বসি শ্মশানের বিভীষিকা
নিবারিয়া জ্বালি আমার আঁধার অলকার দীপশিখা !
.               অঙ্গার আর অস্হিমালায়
.               অতি অপরূপ রূপ উথলায়,
হেরি, দিকে দিকে খুলে যায় চোখে জীবনের যবনিকা !


দেহ-অরণিরে মন্থন করি লভি যে অগ্নি-কণা--
সেই দহনের মিঠা-বিষে মোর মদনের আরাধনা !
.                    এই সুগঠন দেহ-উদূখলে
.                কঠিন মর্ম দলি কুতূহলে,
আমি নিদাঘের দাবদাহে রচি হিন্দোল-মূর্ছনা !


আমার পীরিতি দেহ-রীতি বটে, তবু সে যে বিপরীত ---
ভষ্মভূষণ কামের কুহকে ধরা দিল স্মরজিৎ !
.                ভোগের  ভবনে কাঁদিছে কামনা
.                লাখ লাখ যুগে আঁখি জুড়াল না !
দেহেরি মাঝারে দেহাতীত কার ক্রন্দন-সঙ্গীত !


আর সে বিষাণে প্রলয়-নিনাদ তুলিবে না শঙ্কর
রূপলক্ষ্ণী যে বিরূপপাক্ষের ভরিযাছে অন্তর !
.                দেহ-লাবণ্যে হোমানল জ্বালা
.                কর-কমলের জপ-বীজমালা
শ্মশানেশ্বর করেছে উতলা--সুধা-বিষ-জর্জর !

.            ************************    
.                                                                            
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
.                দিবস রাতি !
কতবার তার ভস্ম ভাসায়ে দিয়েছি জলে,
কভু সে আমারি চিতায় বসেছে চরণ-তলে,---
.        অজানা আঁধারে যতনে জ্বালায়ে
.                বাসর-বাতি !
.        ছিল কি একদা এই ভুবনেই
.                জীবন-সাথী ?


.        আর কি কখনো এই বাহুপাশে
.                দিবে না ধরা ?
.        হৃদয়-সায়রে হয়ে গেছে তার
.                কলস-ভরা ?
এ আলোকে যবে না হেরি’  তাহারে , পরান কাঁদে----
মনো-বাতায়নে গোধূলি-বেলায় বেণী সে বাঁধে !
.              গানেরি আড়ালে সাড়া দেয় শুধু
.                  সে অপ্সরা,
.            বাহির-ভুবনে এই বাহুপাশে
.                   দিবে না ধরা ||


.                ************************    
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
ইরাণের ধ্বজা--- ইরাণের গ্লানি-- বিধাতার অভিশাপ !

.               ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
বসন্ত-আগমনী
কবি মোহিতলাল মজুমদার

যাই যাই করে' শীত চলে' গেল সেদিন কুহেলি-প্রাতে
স্মর--গরল
কবি মোহিতলাল মজুমদার

আমি মদনের রচিনু দেউল দেহের দেহলী পরে
পঞ্চশরের প্রিয় পাঁচ-ফুল,  সাজাইনু থরে থরে |
.            দুয়ারে প্রাণের পূর্ণ কুম্ভ---
.          পল্লবে তার অধীর চুম্ব,
রূপের আবীরে স্বস্তিক তার আঁকিনু যতন-ভরে |


মধু ঋতু  সাথে মাধবের সখা দাঁড়াল দুয়ারে মোর,
মানস-লক্ষ্মী
কবি মোহিতলাল মজুমদার

.        আমার মনের গহন বনে
.     পা’ টিপে বেড়ায় কোন্ উদাসিনী
.        নারী-অপ্সরী সঙ্গোপনে !
ফুলেরি ছায়ায় বসে তার দুই চরণ মেলি’
নাদিরশাহের শেষ
কবি মোহিতলাল মজুমদার

রচনা : ০৮/  ১২ / ১৯১৮

স্থান --- প্রান্তর-মধ্যস্থ শিবির
কাল ---- হত্যা-রাত্রি, নিশীথ

তুমি চলে’ যাও এখনি এ রাতে উজ্ বেগ সর্দার !
আমি একা রব’ --- কোনো ভয় নেই, দেরী আছে মরিবার !
কে মারে আমারে ! ---- এখনো ছেঁড়ে নি আকাশের গ্রহতারা
.                                      হঠাৎ দেয়ালে ছায়া !
ঠিক এইমত ঘুরে’ গেল মাথা, হটে গেল চৌপায়া !

দূর দূর ! আরে দেখ দেখ-----যেন পাহাড়ী সাপের চোখ !
অবশ করিয়া বেহুস করিল, হরিল সকল রোখ্ !
ওর পানে চেয়ে সেদিনের মত আজো জাগে আফ্ সোস,
মনে পড়ে’ যায় বালক-কালের দিনগুলি নির্দোষ |
দেখ, শয়তান মিলাইয়া যায় স্মরণে সে কথা আনি’------
চোখ দিয়ে বুকে বিষ ঢেলে দিয়ে,  মাথায় মুগুর হানি !
.                                  ------- এ কি হল, হায় হায় !
এ বুড়া-বয়সে সেদিনর মত আবার দাঁড়ান’
যায় !                                                                                                                                                               

মাথা হতে’ যেন সকল রক্ত শুষে’ নেয় নাভি-শিরা,
কি যেন বাঁধন বেঁধেছিল বুকে, খুলে যায় তার গিরা !
‘হাশিশ্’ খাওয়ায়ে অজ্ঞান করে রেখেছিল এতদিন-----
‘জম্ জম্’-জলে ধুয়ে দিল মাথা দিল্ দার কোন্  জিন !
রক্তের নেশা একেবারে যেন ছুটে যায় লহমায়-------
পরীর  আঙুলে পরাইল চোখে  স্তাম্বুলি সুর্মায় !
.                                   ----ডুবে’ যাই গলে’ যাই !         
তাজ শম্ শের ফেলে দিনু এই,  কিছুতেই কাজ নাই !

নাদির ! এখনি ভুলে গেলে ---- তুমি দুনিয়ার দুষ্ মন !----
বাতিল করেছ কায়কোবাদের ধর্ম-সিংহাসন !
কোটী শবদেহে দেয়াল তুলিয়া আল্লার আশ্ মান্
আঁধারিয়া, তুমি দিনের জলুস্ করিয়া দিয়াছ ম্লান !
পাথরে আছাড়ি মারিয়াছ শিশু, জননীর কোল ছিঁড়ে !
ক্রোশ হতে ক্রোশ আগুন দিয়েছ মানুষের সুখ-নীড়ে !
.                                 আপন ছেলের চোখ---
নখে করি ছিঁড়ি উপাড়ি ফেলেছ, কিছু কর নাই শোক !

সে নহে নাদির, মানুষ নহে সে ! ---খোদারি সে কারসাজি |
শয়তান, সেও পারে কি এমন দেখাবারে ভোজবাজি ?
স্থির হও মন ! ভেবে দেখি আজ, কে করেছে এই খেলা----
আমি তো মানুষ সবার মতন, কাদা ও মাটির ঢেলা !
বুকে মারো ছুরি , গল্ গল্ করে’ বাহিরিবে রাঙা জল,
এই দেখ---- চোখে এখনি অশ্রু করিতেছে টল্ টল্ ,
.                                    ----- এত কুদরৎ তার !
আল্লা তালা আক্ বর !  এ যে মতলব বোঝা ভার !

বারুদের মত কালো-মেঘে বাজ তোপ দাগে----দেখে নাই !
আগুন ছুটিয়া পাহাড়ের মুখে ---- কত দেশ হল ছাই !
সাগরের জল-স্তম্ভনে আর ভূমিকম্পনে যাঁর
হুকুম তামিল করে দেবদূত পৃথিবীতে বারবার ---
ইসারায় তাঁরি জেগেছিল দূর ইরাণের সীমানায়
যুবা আফ্ সারী, নাদির ---- এ নাম দিয়েছিল বাপ মায় !
.                                       মেঘ –পালকের আজি
দুনিয়ার সেরা দুষ্ মন্  নাম ,------এ কাহার
কারসাজি ?                                                                                                                   
  

সেই কথা মোর ছিল নাক’ মনে , থাকে না বোধ হয় কারো ;
ভুলেছিনু, আমি মানুষ যে শুধু ---- ভেবেছিনু, বড় আরো !
লক্ষপরাণ  হানিবার কালে ভুলেছিনু এক প্রাণ ----
সে যে সেই মত করে ধুক্ ধুক্ , তেমনি দয়ার দান !
তারি সাথে আজ মুখোমুখি করে’ দিয়ে গেল মাঝরাতে----
দেখিতেছি তায় আগাগোড়া ছুড়ি মারিয়াছি এই হাতে !
.                                    রহিমর্ রহমান !
নাদির তোমার বান্দাই বটে,  যত হোক্ বেইমান !

নাদির ! নাদির !--- সাড়া নাহি দেয়, একেবারে মরিয়াছে ?
আরে শয়তান ! শযতানী তোর বেইমানী ধরিয়াছে !
সেই বাহু এই লোহার সমান, ওই সেই করবাল !
তুর্কি-শোণিত-মেহেদির রঙে নখ যে এখনো লাল !
বোখারা-বিজয়-উত্সব-দিনে নর-শির-পর্বত
করে নাই খুশী, ক্ষীণ মনে হল দরবার-নহবত !----
.                               আজ তার হল ভয় !
নাদির! নাদির ! এতদিনে তোর এই হল পরিচয় !
মরিয়াছি আমি ! চলে গেছি আজ সেই পাহাড়ের ধারে---
প্রেত হয়ে আজ সন্ধান করি, জীবনে ভুলেছি যারে !
জ্যোত্স্না মত প্রভাত-রৌদ্র মিশে আছে কুয়াসায়,
ঝিক্-ঝিক্ করে’ বহিছে নদীটি পাহাড়ের পায়-পায়,
দেবদারু-শাখে জড়ায়েছে লতা সোনালি-ঝুমুকাভরা,
আখ্ রোট্-সারি ঝুরিছে শিশিরে, আপেল পাকিবে ত্বরা-----
.                                       এই সেই গ্রামপথ,
এর ধূলা ছেড়ে চেয়েছিনু আমি বাদশাহী মস্ নদ !

নওরোজ্ –বেলা হল অবসান, আকাশে সুতালী চাঁদ---
তরুণী ইরাণী সারাদিন কত পাতিয়াছে ফুল-ফাঁদ !
কস্তুরী-কালো পশ্ মিনা চুলে বিনায়ে ‘লালা’র মালা
আজ গোলাপের অপমান কেন ? গজল্ গাও নি বালা ?
আঙুরের রস কোথা পেয়ালায় ?----
.                                      তহ্ মিনা ! তহ্ মিনা !----
চাও, কথা কও ! কোথা’ সুখ নাই নাদিরের তোমা বিনা !
.                                      আজ নওরোজ্-রাতে
আশেক এসেছে, যৌতুক দিতে দিল্ তার ওই হাতে !

কবেকার কথা ! আমি তুলেছিনু, তহ্ মিনা ভুলিল না-----
স্বপনেও তার চোখদুটি মোর মুখ ‘পরে তুলিল না !
সে নয়ন যেন তুষার-রস্মি সন্ধ্যাতারার মত----
চাহিল বিঁধিতে বড় ঘৃণাভরে হৃদয়ের এই ক্ষত !
লুটাইনু পায়, বলিনু----- বাঁচাও ! তুমি জানো সেই পাতা
যার রসে এই যাতনা জুড়ায়, আর কেহ জানে না তা’ |
.                                   তহ্ মিনা চলে’ যায়,
দূরে ---- দূরে, শেষে মিশে গেল ওই আকাশের তারকায় |

চাঁদ ডুবে গেল, নিবে যায় ওই ‘পার্ বিন্’ ‘মুশ তারা’ ----
একি থ্ম থ্ম করে আশ্ মান নীল ইস্পাতপারা !
মাঝখানে তার আগুনের চাকা ঘুরে’ ঘুরে’ উঠে নামে |
জ্বলন্তবালু পার হয়ে আসে মুর্দারা তাঞ্জামে |
ঘূর্ণি ঘুরিছে দক্ষিণে-বামে রক্তের দরিয়ায় !
দব্ দব্ করে বাতাস, যেন সে মার খেয়ে মূরছায় !
.                                  ঢাল যেন তলোয়ারে----
সারা ময়দান ঝন্ ঝন্ করে,  ফেটে যায় হাহাকারে !

কি ঘোর পিপাসা ! জিহ্বা-তালু যেন ফুলে’ যায় সবাকার,
কালো হয়ে গেল ওষ্ঠ-অধর, জল নাই ভিজাবার !
দূরে দেখা যায় ঝর্ না ঝরিছে, কাছে গেলে আর নাই !
এ কি দিল্ লগী আল্লা গাফুর ! মাফ চাই, মাফ চাই !----
আঃ বাঁচা গেল ! বোখার ছুটেছে !---- কি যেন আওয়াজ হয় ?
বাহিরে বুঝি বা পাহারা-বদল ? নাঃ, ও কিছুই নয় !
.                                     খোদা যে মেহেরবান্ ----
ভয় নাই ---- ও যে স্বপনে দেখিনু ‘হাশরে’র ময়দান |

কে পশিল ওই চোরের মতন ? কারা আসে পাছে পাছে ?
দুরাণীর লোক ---- হাঁ হাঁ বুঝিয়াছি ---- এস ভাই, এস কাছে |
কিরীচ খোলা যে ! আরে বেতমিজ্ বুজদেল্ কাপুরুষ !
নাদির দাঁড়ায়ে সমুখে তোদের, এখনো হয়নি হুঁস্ !
হা হা হঠে’ যায় ! ---- মারিবে, তবুও স্বর শুনে’ হঠে’ যায় !
আয় চলে’ আয়, ধর্ গর্দান, কাজ নাই তামাসায় !