কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
|
. আপন আবেগে তাই আপনি ঝরিলে !
. মানিলে না যমের দুয়ার খুলিয়া
. এলে তাই মৃত্যুপুরে, স্বপ্নাতুর-আঁখি,
. সত্যের সন্ধানে ! স্বপ্নশেষে এইবার
. সষুপ্তি-সাগর,----উদিবে তাহারি কূলে
. সেই জ্যোতির্লোক--- চন্দ্রতারকার ভাতি
. ম্লান যেথ, দ্যুতিহারা বিদ্যুৎ-বল্লরী |
. অগ্নি যেথা চিত্রবৎ---- নিষ্প্রভ, মলিন !
. হে ব্রাহ্মণ ! হেরিলাম তোমার মাঝারে,
. দেহজয়ী, কালজয়ী, মৃত্যুজয়ী সেই
. পুরাণ-পুরুষে ! ---- যাঁর মহা-মহিমায়
. ঊর্ধ্ব হতে মহানিম্নে পশিছে আলোক,
. নিম্ন হতে ঊর্ধ্বে উঠে আহুতির ধূম----
. স্বর্গে--মর্ত্যে রহিয়াছে নিত্য--পরিচয় |
. অমৃতের পুত্র তুমি, হে মর্ত্য-বান্ধব !
. মৃত্যুপুরী তীর্থে আজ তোমার পরশে,
. তোমারি প্রসাদে আমি চির--জ্যোতিষ্মান্ !
. ********************* উপরে
মিলনসাগর
মৃত্যু ও নচিকেতা
কবি মোহিতলাল মজুমদার
[ ঔদ্দালকি--আরণির পুত্র বালক নচিকেতা পিতৃসত্য--রক্ষার জন্য যমপরে গমন করেন | সে সময় যম গৃহে না থাকায়
তাঁহাকে তিন রাত্রি অনশনে থাকিতে হয় | অতঃপর যম গৃহে ফিরিয়া তাঁহার যথোচিত সংবর্ধনা করেন, এবং অতিথি-
সত্কারে বিলম্ব হওয়ায় নচিকেতাকে ঈপ্সিত বর প্রার্থনা করিতে বলেন | ]
নচিকেতা | বৈবস্বত ! অতিথির করিবে তর্পণ

. হেরিব স্বরূপ তব ! স্নিগ্ধ কি নির্মম,
. করুণ কোমল, কিবা ভীষণ ভয়াল,
. হেরিতে বাসনা চিতে !---- সহস্র জনম
. জন্মিয়া মরেছি আমি, তবু মনে নাই
. কেমন তোমার মুখ ! আজ প্রাণে মোর
. জাগিয়াছে সেই আশা, দেখিব তোমায় !
. তোমারে চিনি না, তবু দিবা-বিভাবরী
. হেরিয়াছি ওই ছায়া রবি-শশি-করে--
. হরিৎ, শ্যামল, পীত, লোহিতের মাঝে
. উড়ে তব উত্তরীয়, পদচিহ্ন তব
. গণিয়াছি কতবার জীবনযাত্রাপথে !
. বৈবস্বত ! করিও না অবিশ্বাস মোরে,
. প্রাণে জাগে নিরন্তর তোমার মূরতি !---
. পূরাও কামনা মোর ---- খোল’ আবরণ !
মৃত্যু | কি দেখিবে নচিকেতা ?------মৃত্যুর স্বরূপ ?
. মৃত্যু মহা-ভয়ঙ্কর, জানে সর্বজন ;
. জীবনের সুখশয্যাতলে দুঃস্বপন
. মরণ-কল্পনা !--- সেই মৃত্যু দাঁড়াইয়া
. তোমার সন্মুখে, আবরিয়া সর্বদেহ
. কহিতেছে সুনৃত-বচন, তাই তব
. হৃদয় নির্ভয়, সাহস অপরিসীম !----
. জগতের লঘুলীলা ভুলায়েছে তোমা,
. হে গৌতম, নহি আমি জীবনের মিতা !
. আমারে দেখিতে চাও ? ----প্রদোষ-আঁধারে
. দারণ ঝটিকাবর্তে ছিন্ন ক্ষণপ্রভা
. হেরিয়াছ---দাঁড়াইয়া তরণীর ‘পরে
. তরঙ্গ-দোলায় ? মহারণ্যে পথহারা,
. সহসা সম্মুখে তব হেরিয়াছ কভু-----
. ধাবমান অগ্নিকেতু বনস্পতি-শিরে ?
. অর্ধরাত্রে, নিদ্রোথ্বিত ঘোর কলরবে,
. করিয়াছ অনুভব----দুলিছে মেদেনী ?
. সেও তুচ্ছ ! তারো চেয়ে কত ভয়ংকর
. মৃত্যুর আসন্ন মূর্তি কালান্ত-তিমিরে !
. বালক কিশোর তুমি, নবীন বয়স-----
. ধরণীর স্তন্যরসে স্তিমিত চেতনা,
. কি বুঝিবে মরণের রীতি সুকঠোর ?
. কহ মোরে, এ কামনা কেমনে পশিল
. চিত্তে তব কীট যথা প্রস্ফুট প্রসূনে !
নচিকেতা | শুনিয়াছি, মর-জ্যেষ্ঠ পিতৃলোকে তুমি------
. পশেছিলে মৃত্যপুরে তুমিই প্রথম,
. তাই দেবগণ বসাইল সিংহাসনে,
. প্রেতরাজ্যে তোমারেই দিল অধিকার |
. হে রাজন্ ! কহ মোরে---- সে কি বিভীষিকা-----
. সৃষ্টির প্রথম মৃত্যু ! ----- তুমি দেখেছিলে !
. নহ মর-জ্যেষ্ঠ শুধু , জ্ঞানিশ্রেষ্ঠ বটে----
. তোমারে প্রণমে আজ অমৃত-সমাজ,
. আত্মার আত্মীয় তুমি, হে সূর্যতনয় !
. মৃত্য যদি মহাভয়, দ্যুলোক-দুয়ারে
. কেন আছ দাঁড়াইয়া ? কেন রাখিয়াছ
. সুধাভান্ড করতলে ?---- বৃথা ভয় তুমি
. দেখাও বালকে !
. বয়সে নবীন বটে,
. তবু, মৃত্য ! জেনো আমি জনম-স্হবির !
. আমারে করেছে বৃদ্ধ তোমারি ভাবনা |
. জাতিস্মর নহি----তব আবাল্য আমার
. নয়নে জ্বলিছে কোন দিব্য দীপশিখা !
. সে আলোকে জীবনের চারু চিত্রপট
. বিবর্ণ মলিন ! সে আলোকে নিশিদিন
. হেরিয়াছি কার যেন সুগভীর ছায়া !
. প্রত্যক্ষ জাগ্রত যাহা----সে যেন স্বপন,
. নদীজল প্রতিবিম্ব-সম ! সত্য কহি,
. হাসিও না ! ঔদ্দালকি-আরণি-তনয়
. মিথ্যা নাহি জানে |
মৃত্যু | অদ্ভুত কাহিনী বটে !
. সতেজ সরস বৃন্তে এ শীর্ণ কুসুম
. কেমনে ফুটিল ? পিতার ভবনে
. হের না৩ই সোম-যাগ ? বেদমন্ত্রধ্বনি,
. উদ্গাতার উদাত্ত সে উচ্চ সামরব,
. অগ্নিস্ততি, ইন্দ্রস্তব,বৃত্রজয়গাথা
. দিল না হৃদয়ে বল ?---- সোমরস-পানে
. দেবতা-দোসর হয় ক্ষীণজীবী নর !
. এ সব জানো না বুঝি ? করিও না শোক----
. লহ দীক্ষা, শিক্ষা কর অগ্নিহোত্র-বিধি
. আমার সকাশে ! কেমনে করিতে হয়
. সে অগ্নি-চয়ন----নির্মাণ করিবে চিতি,
. কোন্ মন্ত্রে হবিঃশেষ করিবে গ্রহণ ----
. শিখাইব সমূদয় ; হে সত্য-পিপাসু,
. আমি সেই সত্য-মন্ত্র দানিব তোমায়
. এইক্ষণে---না চাহিতে দিনু এই বর |
. আরবার কহ, বত্স, কি তব প্রার্থনা ?
নচিকেতা | ওগো মৃত্যু সুদক্ষিণ ! দাক্ষিণ্য-তোমার
. হৃদয়ে রহিল গাঁথা ; অগ্নিহোত্র -বিধি
. যা’ কহিলে বুঝিয়াছি, রহিবে স্মরণে |
. সে যে মোর নিত্যকর্ম --- জন্মিয়াছি আমি
. মহাঋষি-কূলে ! জানি সে সাবিত্রী -মন্ত্র
. বলহীনে করে বলদান--তবু দেব !
. শুধু মন্ত্রে, স্তোত্রগীতে, হবিঃশেষ-পানে
. ভরে না আমার চিত্ত ; অগ্নি বৈশ্বানর
. জ্বলিছেন অহরহ অন্তর-আলয়ে !
. আমি চাই উত্তরিতে জন্ম-জলধির
. নিস্তরঙ্গ বেলাভূমে---আলোক-আঁধার,
. উদয়াস্ত অতিক্রমি’ , পঁহুছিতে সেই
. জ্যোতির্ময় দেশে---যেথা নাই দুঃস্বপন,
. যেথা দেবগণ নিয়ত অমৃত-পানে
. জ্যোতিষ্মান্ , যথাকাম করে বিচরণ !
. ব্রহ্মবাক্য--পূত হয়ে যেথা সোমরস,
. বিনা যাগযজ্ঞবিধি, বিনা আহরণ
. ক্ষরিছে নিয়ত ! বৈবস্বত ! সেই লোকে
. শাশ্বাত অমৃত-পদ দিবে না আমায় ?
. দেখাও স্বরূপ তব ! জানি, যেই জন
. হেরিযাছে ওই রূপ, ছিঁড়ি’ মোহপাশ
. যায় সে যে ধ্রুবলোকে---- যথা বত্সতরী
. ছিঁড়িয়া বন্ধন-রজ্জু ধায় নিরুদ্দেশে !
. জানি না কেমন তুমি, তবু মনে হয়
. তুমি মনোহর ! বাহিরিয়া গোচারণে,
. প্রথম প্রাবৃটে যবে নবমেঘোদয়
. হেরিয়াছি নদীপারে, চন্দ্রভাগা-তীরে---
. চাহি’ তার অভিরাম সুনীল বয়ানে
. অকারণ অশ্রুবেগে হয়েছি কাতর,
. মুহূর্তে জাগর-স্বপ্নে হারায়েছি জ্ঞান !
. কোথায় সে পদে পৃথ্বী , রুক্ষ ক্ষেত্রতল,
. গবীদের হাম্বারব নাহি পশে কানে,
. মধ্যন্দিন সবনের কথা ভুলে গেনু !
. হেরি’ সেই ঊর্ধ্বাকাশ নবঘনশ্যাম
. ভুলে গেনু কেবা আমি, কোথায় বসতি,
. কি নাম আমার ! জন্ম-মৃত্যু-ইতিহাস
. নিমেষে পাইল লয় ! যেন সৃষ্টি-প্রাতে
. ফিরে গেন ---- বাজিল সহসা বক্ষে মোর
. আত্মীয়ের আদিম বিরহ !--- মেঘ নয় !
. যেন ওই আকাশের বিমল দর্পণে
. দোলে নীল স্মৃতিখানি ! শুনাই তোমায়,
. সে কি তব প্রতিচ্ছায়া ? তোমারি আভাস ?
মৃত্যু | নচিকেতা ! মৃত্যু নীল নহে, নাহি তার
. বর্ণ -রূপ ! জানো না কি, করে সে হরণ
. নেত্র হতে সর্বশোভা ?--- সে যে অন্ধকার !
নচিকেতা | তাই বটে ! দিবা, নিশা--- দুই ভগিনীর
. একজন স্বর্ণসূত্রে করিছে বয়ন
. ধরার বরণ-বাস আলোক-দুকূলে !
. অপরা সে, অস্তাচল-শিখর-শায়িনী,
. জেগে থাকে নির্নিমেষ--- নিত্য খলে দেয়
. অসংখ্য সে তারকার সূচীমখ দিয়ে
. দিবসের সুদীর্ঘ সীবন !---- অন্ধকার !
. সান্দ্র স্তব্ধ সুগম্ভীর স্নিগ্ধ অন্ধকার !----
. বুঝিয়াছি , তারি তলে তোমার আসন |
. মনে পড়ে, একবার আমি, রিষ্টিশেন----
. দোঁহে মিলে গিয়েছিনু পর্বত-ভ্রমণে ;
. শালবনে সূর্য অস্ত যায় ----বহুক্ষণ
. দাঁড়াইনু দুইজনে অরণ্য-সীমায়,
. মালভূমি ‘পরে | দূর পশ্চিমের পানে
. উঠিয়াছে অভ্রভেদী চতুঃশৈলচূড়া |
. তুষারধবল ---- যেন স্তম্ভ-চতুষ্টয়
. ধরে আছে আকাশের নীল চন্দ্রাতপ !
. তারি তলে আলুন্ঠিতা মুমূর্ষু ঊষার
. হেরিলাম মৃত্যুশয্যা ! পূর্বাচল হতে
. ছটিয়া এসেছে সে যে সারাটি আকাশ
. সবিতার আগে আগে--- দেয় নাই ধরা !
. এতক্ষণে, প্রণয়ার প্রগাঢ় চুম্বনে
. খুলে গেল কালো কেশ, রক্ত চেলাম্বর !
. আর সে কুমারী নহে, নহে সে অহনা,
. কন্যা জ্যোতির্ময়ী !--- বধূবেশী সন্ধ্যা সে যে
. মৃত্যু-স্বয়ম্বরা ! তখনি সে অন্ধকারে
. মুছে গেল রক্তস্রোত, তবুও মানসে
. বহুক্ষণ নেহারিনু শোণিত উত্সব !
. মনে হল, পশ্চিমের যজ্ঞ-বেদিকায়
. দেবতারা করে যাগ----দীর্ঘ অগ্নিষ্টোম,
. ঊষা তায় নিত্যবলি, সবিতা-ঋত্বিক্
. হোম করে আপনার পরান-বধূরে !
. এ রহস্য বুঝি না যে ! তবু কহ শুনি,
. সন্ধ্যা-রক্তরাগ, পশুর শণিত-পঙ্ক---
. সে কি, মৃত্যু ! তোমারি ও আঁধার ললাটে
. লোহিত তিলক ?
মৃত্যু | জানো দেখি এত কথা,
. তবু কৌতূহল ? হে বালক ! বুঝিলাম
. বিজ্ঞ তুমি, বহুদর্শী, সহজ-প্রবীণ !
. তবুও চপল চিত্ত সংশয়-আকুল ?
নচিকেতা | তাই বটে---মূঢ় আমি ! তাই প্রাণে-মনে
. এখনো বিরোধ | প্রাণ বলে, নহে নহে---
. এক নহে মৃত্য আর মরণ-দেবতা |
. মৃত্য ---সে যে সুনিশ্চিত দেহ-পরিণাম,
. তাহারি শাসনতরে দন্ডধর তুমি ;
. মৃত্যু হয় কালে কালে, তুমি মহাকাল !
. মনে তবু জাগে সদা সভয় ভাবনা,
. তোমারেই স্মরে নর আয়ুশেষ-কালে |
. গতাসুর শূন্যদৃষ্টি অক্ষি-তারকায়,
. শমিতার সমুদ্যত অসির ফলকে,
. হেরে জীব মরণের মূরতি করাল---
. একি মোহ ! জীবনের একি প্রবঞ্চনা !
. তথাপি তোমারে আমি করিয়াছি ধ্যান
. চেতনা-গহনে, তুমি নিঃশব্দ-সঞ্চারে
. স্বপন-শিয়রে মোর দাঁড়ায়েছ আসি’
. সুনির্জনে---- আসে যথারাত্রি তমস্বিনী
. শব্দহীন কলস্বনে, গগন-অঙ্গনে,
. দুকূল প্লাবিয়া, অতিক্ষুদ্র বীচিমালা
. তরঙ্গিয়া ধরে শিরে ফেনপুষ্পসম
. নিযুত নক্ষত্ররাজি, স্তব্ধ মনোহর !
. করি’ সন্ধ্যা সমাপন, কুটীর ছাড়িয়া
. পশিয়াছি কতদিন দেবদারু-বনে ;
. বিরাট ন্যগ্রোধ এক আছে দাঁড়াইয়া,
. প্রসারিয়া শাখা-বাহু শতস্তম্ভময়----
. সে বিশাল পত্রঘন আতপত্র-তলে
. কাননের অন্ধকার রহিয়াছে যেন
. বিশ্বের রজনী মাঝে আরেক রজনী !
. সেইখানে মাথা রাখি’ বাহু-উপাধানে,
. ওগো মৃত্যু ! হেরিয়াছি তোমার স্বপন !
. অন্ধকার ভরিয়াছে অন্তর-বাহির,
. স্তব্ধ চরাচর, শুধু শোনা যায় দূরে---
. গভীর গর্জন-স্বনে পর্বত-নির্ঝরে
. ঝরে বারিধারা--- যেন বায়ুহীন ব্যোম
. শিহরি উঠিছে তার ‘ওম্ ওম্’ রবে !
. সেই ক্ষণে মনে হল , আত্মার নিশীথে
. সহসা জ্বলিয়া ওঠে প্রভাত-প্রদীপ !
. জন্মান্ত-তিমির টুটি’ কে আসি’ দাঁড়ালে
. আমার নয়ন-আগে ? সে কি তুমি নও ?
. কহ, দেব ! কহ মোরে, ঘুচাও ভাবনা |
মৃত্যু | ঋষির তনয় তুমি, বাল-ব্রহ্মচারী----
. এ বয়সে করিয়াছ কঠিন সাধনা,
. মানস-নিগ্রহ ; তাই কৃচ্ছ্র-তপস্যায়
. নিপীড়িত কামনার ক্ষোভ সুগভীর
. করিয়াছে অন্যমনা, বিষয়-বিরাগী |
. নচিকেতা ! ধরণীর বিপুল সম্পদ
. হেরিয়াছ ? জন্ম, মৃত্যু---দুই সীমান্তের
. অন্তরালে আছে সুখ, দেবতা-দুর্লভ !
. দেহের রহস্য নয় সহজ-সন্ধান !
. অল্পভোগী দরিদ্রের দীন কল্পনায়
. ক্ষুদ্র বটে জীবনের কামনা-পরিধি----
. অতৃপ্ত-ক্ষুধার ব্যাধি, নিত্য উপবাস
. করে তারে মর্ত্যসুখে ঘোর উদাসীন ;
. তাই তার সর্ব-দুঃখ, দুরাশার আশা,
. সফল করিতে চায় মৃত্যু-পরপারে---
. তুমিও কোরোনা সেই বৈরাগ্য-সাধনা ;
. তরুণ তাপস তুমি, ভোগ-আয়তন
. ফুল্লতনু যৌবন-উন্মুখ ! --- দুই চক্ষু
. নীলোত্পল---ঢল ঢল, পীযূষ-পিয়াসী !
. উদার তোমার মন, প্রসন্ন ইন্দ্রিয়----
. ভুঞ্জিবে সকল সুখ তুমি মহীতলে |
. মহাভূমি, হস্তী, অশ্ব, হিরণ্য প্রচুর
. দিব তোমা-----পরমায়ু সহস্র-শরৎ,
. দেহে কান্তি, ক্ষে বীর্য, বল বাহযুগে ;
. দিব নারী অগণন---- মোহিনী অপ্সরা,
. রথারূঢ়া বাদিত্রবাদিনী ! কর ভোগ
. সমুদয়, রতি আর প্রমোদ-কৌতুকে !
. অমৃত ? -- সে ব্যাধিতের বিকার-জল্পনা !
. দেহের বিনাশ হয় কাল পূর্ণ হলে,
. তারপর আবার জনম ; শস্যসম
. জন্মিয়া পাকিয়া ঝরে, জন্মে পুনরায়
. পৃথ্বী’পরে মর্ত্যজন, বর্ষঋতুক্রমে !
. আমি শুধু করি উত্পাটন প্রাণ তার
. মুঞ্জা হতে ঈষিকার মত | নচিকেতা !
. দেহীর সহজ ধর্ম জানে সর্বজন,
. নাহি পন্থা অন্যতর, জন্মান্তে আবার
. জন্মিতে হইবে ধ্রুব ! -- কর পরিহার
. বিফল বাসনা | জীবনের শ্রেষ্ঠ বর
. করিতেছি অঙ্গীকার-- বিত্ত আর আয়ু,
. তার চেয়ে বড় কিবা, দেখ বিচারিয়া !
নচিকেতা | বিত্তে নহে তর্পণীয় চিত্ত পুরুষের !---
. ওগো মৃত্যু ! জীবনের ঐশ্বর্য-আড়ালে
. তুমি কেন চিরদিন আছ দাঁড়াইয়া ?
. ধরার অমরাবতী, রুধি’ বাতায়ন,
. চিতাধূম নিবারিতে পারে ?---- উত্সবের
. আনন্দ-বাঁশরী, মিলনের মঞ্জুগাথা
. কেন বা গুমরি’ ধরে বিদায়ের সুর ?
. ধরিয়াছ নানা ভোগ সম্মুখে আমার----
. আছে সুখ, তৃপ্তি কোথা ? এই মোর দেহ
. জরিবে না গুপ্তচর জরা সে তোমার ?
. অন্তক তোমার নাম----তুমি কহিয়াছ,
. প্রাণীদের প্রাণ-ধন কর উত্পাটন ,
. শস্য হতে ঈষিকার প্রায় !--- কহ তবে,
. কতকাল ভুঞ্জিব সে ভোগ সুদুর্লভ ?
. সহস্য-শরৎ আয়ু ? তার বেশা নয় ?
. যম বুঝি বাঁধা আছে নিয়মঃ-শৃঙ্খলে ?---
. তাই তুমি নিয়তির কঠিন নিগড়
. ঢাকিতেছ ফুলদল দিয়া ?---- ধিক্ মৃত্যু !
. ধিক প্রতারণা ! ---দেহ-অন্তে এক পথ !
. নাহি পন্থা অন্যতর ? --- শুনে হাসি পায় !
. বৈবস্বত ! নচিকেতা জানে তোমা চেয়ে !
. জানিয়াছি সেই সত্য ---নহে বহুদিন,
. শুনি নাই, হেরিয়াছি স্বচক্ষে আমার,
. এখনো রোমাঞ্চ হয় সে কথা স্মরিলে !
. শুন মৃত্যু ! সে কাহিনী কহিব তোমায় |
. পিতামহ বাজশ্রবা বানপ্কস্থ শেষে
. প্রয়োপেশনে করি’ ত্যজিলেন তনু
. বিপাশার তীরে | কৃষ্ণা-দ্বাদশীর তিথি,
. রজনী তৃতীয় যাম, দক্ষিণাগ্নি শিখা
. শুভশংসী ---পরশিল স্তূপকাষ্ঠ-মূলে,
. জ্বলিয়া উঠিল চিতা | নদী পূর্বমুখী----
. মিশিয়াছে একেবারে দিক্-চক্রবালে |
. দাঁড়ায়ে অনতিদূরে আমি চেয়ে ছিনু
. অন্যমনে, অন্ধকার আকাশের পটে |
. হোথায় সে মহাকায় কৃষ্ণ তুরঙ্গমে
. পিতৃলোকে পিতৃগণ দেন সাজাইয়া
. তারার-মুকুতা-হারে ! সহসা হেরিনু
. ভূমিতলে ---চিতা হতে হতেছে উদয়
. সুবৃহৎ শশিকলা, তরণীর প্রায়,
. পূর্বাকাশে ! সেই ক্ষণে বিস্ময়বিহ্বল
. হেরিলাম সে কি দৃশ্য স্বপ্ন-অগোচর---
. দেহ-অন্তে পূণ্যবান্ বৃদ্ধ বাজশ্রবা
. আরোহি’ আলোক-যানে যান দেবলোকে !
. ক্ষণ পরে চিতা ছাড়ি’ কিছু ঊর্দ্বে উঠি’
. শোভিল সে চন্দ্রকলা সুদূর আকাশে
. নদীসীমা-শেষে, --- দিব্যচক্ষে হেরিলাম
. আত্মার অমৃত-পন্থা মৃত্যু-পরিণামে !
. ওগো মৃত্যু ! পারিবে না ভুলাতে আমায় --
. এ বিশ্বাস ত্যজিবে না মূর্খ নচিকেতা !
মৃত্যু | হে ব্রাহ্মণ, ত্যজিও না বিশ্বাস তোমার----
. নহ মূর্খ ! তোমা চেয়ে জ্ঞান-গরীয়ান
. আছে নাকি আর কেহ সপ্তসিন্ধু-দেশে !
. বালক ! তোমার চিত্তে সত্য উদিয়াছে
. অকলুষা পূর্ণ শ্রদ্ধা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসার !
. তুমি ভাগ্যবান্ , প্রসন্ন তোমার ‘পরে
. আত্মা প্রেমময় ! তাই ললাটে তোমার
. জ্বলিয়া উঠেছে হেন শুভ্র জ্যোতিশ্ছটা !
. প্রবচন, বহুশ্রুত, সুমহতী মেধা-----
. কিছুই পারে না তাঁরে লাভ করিবারে ;
. আপনি যাহারে তিনি করেন বরণ,
. সেই লভে !--- ঔদ্দালকি-আরুণি-তনয় !
. লহ বর, যাহা ইষ্ট, ইপ্সিত তোমার |
নচিকেতা | এইবার নয়নের মিটাও পিপাসা---
. আবরণ কর উন্মোচন, জ্যোতিষ্মান্ !
মৃত্যু | কেথা আবরণ, নচিকেতা ? ---নেত্র হতে
. আপনি খসিয়া যাবে সূক্ষ্ম মায়াজাল ;
. মৃত্যুর রহস্য-কথা শুনিতে শুনিতে
. শ্রবণ-উত্সুক চিত্ত হবে নির্বিকার,
. মুহূর্তে সংশয়মুক্ত নেহারিবে তুমি
. আমার স্বরূপ-রূপ অন্তরে বাহিরে !
. শুন নচিকেতা ! --- হৃদয় দুর্বল যার,
. মলিন, সংকীর্ণমনা, স্বভাবকৃপণ---
. সেই নর যূপবদ্দ পশুর সমান
. মৃত্যর আঘাতে সহে জীবযজ্ঞভূমে |
. ভয় তারে ক্ষুদ্র করে, মর্ত্য-মরু মাধে
. তৃষায় হারায় দিশা মৃগ-তৃষ্ণিকায় |
. বার বার পড়ি’ মৃত্যুমুখে, হয় তার
. নিত্য অধোগতি ; দুই বদ্ধ করতলে
. ধরিয়া রাখিতে চায় সর্বস্ব আপন,
. তাই মুঢ় অতিলোভে হারায় সকলি !
. মৃত্যু তার মহাভয় !--- আমারে হেরিল,
. সংকুচিয়া সর্বদেহ, শশকের মত
. রহে চক্ষু বুজি’ ---ভাবে বুঝি হেন মতে
. এড়াইবে হিংস্র ক্রূর ব্যাধের সন্ধান !
. সে জন চাহে না এই রূপ নেহারিতে----
. তোমা-সম, নিচিকেতা ! নয়ন বিস্ফারি’ |
নচিকেতা | এখনো হেরি নি তোমা---তবু মনে হয়,
. সরিছে কূহেলিজাল, ধূম্রনীল দেহ
. ঈষৎ দুলিছে ! রজনীর শেষ যামে,
. বাঁধিছে ঊষার রথে শুক্লা-পয়স্বিনী
. অশ্বিনীকুমার বুঝি ? আর কিছুক্ষণে
. উদিবে আঁখিতে মোর হিরণ্ময়ী বিভা
. দিগন্তপ্লাবিনী !
মৃত্যু | এইবার কহি শুন
. আমার স্বরূপ ----হে ব্রাহ্মণ ! কহি তোমা
. সেই বাণী, নিহিত যা গহন গুহায় !
