কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
শুভ-ক্ষণ
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা—১০/ ১০ /১৯২২

শাদাফুলে-ভরা মালতীর বনে, প্রিয়,
মোর মুখ চেয়ে সুখ-হাসি হেসে নিয়ো !
অধরে, কপোলে, অলকে, পলক ‘পরে----
যেথা মধু পাও সেথায় চুমাটি দিয়ো !
এই রজনীর চাঁদিনীর আবছায়া
দেখ না, কেমন বাড়ায় চোখের মায়া !----
দেহের যে-ঠাঁই সব চেয়ে সুন্দর,
সেইখানে, সখা, অধীর চুমাটি দিয়ো |
কে বলিবে, কাল কোথা র’বে রূপরাশি ?----
আজ রাতে তাই নিঃশেষ সুধা পিয়ো |
ওই দেখ, হোথা শিউলি পড়িছে ঝরি’----
চাঁদ না ডুবিতে অমনি সে যায় মরি’ |
নিমেষ ফেলিতে সুখ যে পালায়ে যায়---
ফাগুনের বুক আগুনে উঠিছে ভরি’ !
আকাশ-সেতারে রজনী যে-তার বাঁধে,
সে কি প্রতিনিশি এমন মুরছি’ কাঁদে ?
প্রেয়সীর মুখ, যেন সে সাঁজের তারা-----
আঁখি-পথ হ’তে সহসা যায় সে সরি’ !
যত ভালবাসা, হে মোর পরাণ-প্রিয়,
এ শুভ-লগনে সবটুকু বেসে নিয়ো !

.       ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
রূপ-দর্পণ
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা—২৯ / ৯ / ১৯৩৭

আমার নয়ন-পুতলিতে হের তোমার রূপের ছায়া---
.                     দর্পণ ফেলে দাও !
.   থির-কটাক্ষে আঁখি মেলি’ সখি চাও |
সোনার মুকুরে কিবা কাজ তব ?---- এ মনোমুকুরতলে
যে দীপ-দহনে হৃদয়-গহনে মমতার মোম গলে----
.      তাহারি আলোকে নেহারি ও মুখ-ছায়া
.      ভুলে যাবে, তুমি নারী---- নশ্বর-কায়া,
.                  ------দর্পণ ফেলে দাও !

তোমার পিঠের কালো কেশপাশ তুলিয়া গ্রীবার ‘পরে
.                      বেঁধেছ কবরীখানি,
.      চোখের কিনারে কাজল দিয়েছ টানি’
.      তারো চেয়ে কালো অসীম-রাতির তিমিরের পটে আঁকা
.      ও বিধু-বদনে ---- আমারি মনের কলঙ্ক-কালি-মাখা
.          নীল আঁখিদুটি মুনিদেরো মন হরে !
.          মূরছিবে তুমি নিজ কটাক্ষ-শরে----
.                        দর্পণ ফেলে দাও !

কেতকী-পরাগে পাণ্ডুর করি’ ললাটের হেম-ভাতি---
.                        অঙ্কিত-কুঙ্কুম,
.     অধরে ভরেছে মদিরা-সুরভি চুম্ |
হেথা হের, তব সীমন্ত-তলে ঊষার-ধূসর নিশা----
একটি সে তারা, বুকে জ্বলে তার উদয়-আলোর তৃষা !
.     মোর স্বপনের পোহাইছে শেষ-রাতি ----
.     তা লাগি তোমার অধরে হাস্য-ভাতি !
.                      ----- দর্পণ ফেলে দাও !

আমার নয়ন-রশ্মির রসে পরায়েছে যেই টিকা
.                       তব ভালে, সুন্দরি !
.     শশীতারাময় নিশাকাশ সন্তরি’-----
তাহারি কুহকে মানস-সায়রে উছলে বারিধি-নীর,
জলতলে ছায়া----কনক-কান্তি কোন্ সে পদ্মিনীর !
.     তোমারি সে রূপ---- চিনিবে কি, মালবিকা
.     মোর আঁখি দিয়ে আপনার পানে চাও
.                        ----- দর্পণ ফেলে দাও !

.               ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
কাল-বৈশাখী
কবি মোহিতলাল মজুমদার

মধ্যদিনের রক্ত-নয়ন অন্ধ করিল কে !
ধরণীর ‘পরে বিরাট ছায়ার ছত্র ধরিল কে !
.         কানন-আনন পাণ্ডুর করি’
.         জল-স্থলের নিঃশ্বাস হরি’
আলয়ে-কুলায়ে তন্দ্রা ভুলায়ে গগন ভরিল কে !

আজিকে যতেক বনস্পতির ভাগ্য দেখি যে মন্দ,
নিমেষ গণিছে তাই কি তাহারা সারি-সারি নিস্পন্দ
.          মরুৎ-পাথারে বারুদের ঘ্রাণ
.          এখনি ব্যাকুলি’ তুলিয়াছে প্রাণ ?
পশিয়াছে কানে দুর গগনের বজ্রঘোষণ ছন্দ ?

হেরি যে হোথায় আকাশ-কটাহে ধুম্র-মেঘের ঘটা,
সে যেন কাহার বিরাট মুণ্ডে ভীম-কুণ্ডল জটা !
.          অথবা ও কি রে সচল-অচল----
.         ভেদিয়া কোন্ সে অসীম অতল
ধাইছে উধাও গ্রাসিতে মিহিরে, ছিঁড়িয়া রশ্মি-ছটা !

ওই শোন তার ঘোর নির্ঘোষ, দুলিয়া উঠিল জটাভার
সুরু হয়ে গেছে গুরু-গুরু রব------- নাসা গর্জন ঝঙ্কার !
.          পিঙ্গল হল গল-তলদেশ,
.          ধুলি-ধুসরিত উন্মাদ-বেশ----
দিবসের ভাগে টানিয়া খুলিছে বেণীবন্ধন সন্ধ্যার !

অঙ্কুশ কার ঝলসিয়া উঠে দিক হ’তে দিক-অন্তে ---
দিগ্ বারণেরা বেদনা-অধীর বিদারিছে নভ দন্তে !
.           বাজে ঘন ঘন রণ-দুন্দুভি,
.           ঝড়ে সে আওয়াজ কভু যায় ডুবি’,
যুঝিতেছে কোন্ দুই মহাবল দ্যুলোকের দুর পন্থে !

বঙ্কিম-নীল অসির ফলকে দেহ হ’ল কার ভিন্ন ?
অনাবৃষ্টির অসুরের বাধা কে করিল নিশ্চিহ্ন ?
.           নেমে আসে যেন বাঁধ-ভাঙা জল,
.           ম্লান হয়ে আসে মেঘ-কজ্জল,
আলোকের মুখে কালো যবনিকা এতখনে হ’ল ছিন্ন |

হের, ফিরে চলে সে রণ-বাহিনী বাজায়ে বিজয়-শঙ্খ,
আকাশের নীল নির্মল হ’ল----- ধৌত ধরার পঙ্ক |
.           বায়ু বহে পুন মৃদু উচ্ছালে !
.           নদী উথলিছে কুলুকুলু ভাষে,
আলো-ঝলমল বিটপীর দল নিঃশ্বাসে নিঃশঙ্ক

নব বর্ষের পূর্ণ-বাসরে কাল-বৈশাখী আসে,
হোক্ সে ভীষণ, ভয় ভুলে যাই অদ্ভুত উল্লাসে |
.            ঝড় বিদ্যুৎ বজ্রের ধ্বনি ----
.            দুয়ার-জানালা উঠে ঝন্ ঝনি’,
আকাশ ভাঙিয়া পড়ে বুঝি, তবু প্রাণ ভরে আশ্বাসে |

চৈত্রের চিতা-ভস্ম উড়ায়ে জুড়াইয়া জ্বালা পৃথ্বীর,
তৃণ-অঙ্কুরে সঞ্চারি’ রস, মধু ভরি’ বুকে মৃত্তি’র,
.           যে আসিছে আজ কাল-বৈশাখে ---
.           শুনি’ টঙ্কার তাহার পিনাকে
চমকিয়া উঠি---- তবু জয় জয় তার সেই শুভ কীর্তির !

এত যে ভীষণ, তবু তারে হেরি’ ধরার ধরে না হর্ষ,
ওরি মাঝে আছে কাল-পুরুষের সুগভীর পরামর্শ |
.            নীল-অঞ্জন-গিরিনিভ কায়া,
.            নিশীথ-নীরব ঘন-ঘোর ছায়া—
ওরি মাঝে আছে নব-বিধানের আশ্বাস দুর্ধর্ষ |

.               ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর