কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।

.       ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
---- সে গান শুনিয়া শিহরি’ আকাশ তারকা উঠিছে দুলি’ |
টিট্ কারী দাও মৃত্যুরে তবু, আমরা তাহাতে ভুলি !
.              টিট্ কারী দাও,  দাও টিট্ কারী ----
.                                  পড় গো সবাই ঢুলি’ !

জীবন মধুর ! মরণ নিঠুর ---- তাহারে দলিব পা’য়,
যতদিন আছে মোহের মদিরা ধরণীর পেয়ালায় !
.              দেবতার মত কর সুধাপান---
.              দূর হ’য়ে যাক্ হিতাহিত-জ্ঞান !
আমরা বাজাব প্রলয়-বিষাণ শম্ভুর মত তুলি’ ---
টিট্ কারী দাও মৃত্যুরে, ধর মড়ার মাথার খুলি !
.              চুমুকে চুমুক দাও বার বার,
.                             পড় গো সবাই ঢুলি’ !

দেহের সকল রক্তকণিকা উতরোল উতরোল !
ওকি ও মধুর হাস্য বিকাশি জগৎ দিতেছে দোল !
.              অপরূপ নেশা----- অপরূপ নিশা !
.              রূপের কোথাও নাহি পাই দিশা----
সোনা হয়ে যায়, সোনা হয়ে যায় শ্মশানভস্ম---- খুলি !
টিট্ কারী দাও মৃত্যুরে, ধর মড়ার মাথার খুলি !
.              চুমুকে চুমুক দাও বার বার----
.                             পড় গো সবাই ঢুলি’ !

.                ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
জানে না, গরল নীল হয়ে আছে মৃত্যুজিতের গলে !

কামনার মণি বাসনার সোনা, আশার রতন-খনি----
জানে না---- জীবন কল্পলতিকা, ধরণী কি ধনে ধনী !
বেদনার মূলে বিকাইছে তাই নাম হল তার পাপ !
ওইটুকু দিতে তবুও কৃপণ, হায় এ কি অভিশাপ !

পাপ কারে বলে ?----- হৃদয়ে ফোটে যা’ যৌবন-মধুমাসে ?
যার সৌরভে অবশ পরাণ কভু কাঁদে কভু হাসে ?
সাগরের মত আকুলি-ব্যাকুলি পূর্ণিমা-চাঁদ লাগি ?
যে-তৃষা জুড়াতে চাহে এ-হৃদয় পায়ে ধরি’ কৃপা মাগি ?

পাপের লাগিয়া ফুটিয়াছে হেন অতুল অবনী-ফুল ? -----
রসে রূপে আর সৌরভে যায় চরাচর সমাকুল !
পরতে পরতে দলে দলে যার অমৃত-পরাগ ভরা---
মধুহীন যারে করিবারে নারে শোক তাপ ব্যাধি জরা !

চিররোগী ----- সেও চাহে তার পানে, তৃষিত নয়ন দুটি !
বুড়ারও অরদ-অধরে মধুর হাসিটি উঠিছে ফুটি !
হায়-হায় করে চিরদুখী যেই---- সেও কি ছেড়েছে আশা ?
বিমুখ হইয়া বসে’ থাকে যেই----- নাই তার ভালোবাসা |

পাপ কারে বলে ? সুখ খুঁজে-ফেরা আঁধার কুটিল পথে ?
কে বলেছে তার ঘুচিবে না ঘোর, জাগিবে না কোনো মতে ?
আছে তারো শোভা, আঁধারের বিভা---- সেও যে অমৃতরস !
দেবতাত্মার অগতি কোথায় ? সকলি যে তার বশ !

ত্যাগ নহে, ভোগ,----ভোগ তারি লাগি’, যেই জন বলীয়ান,
নিঃশেষে ভরি’ লইবারে পারে, এত বড় যার প্রাণ !
যে জন নিঃস্ব, পঞ্জর-তলে নাই যার প্রাণ-ধন,
জীবনের এই উত্সবে তার হয়নি নিমন্ত্রণ |

কত যুগ কত জনম ধরিয়া কত হাহাকার করি’,
ধরণী-মাতার স্তন সে আঁকড়ি তুলিবে অধরে ধরি’ ;
স্পন্দিত হবে স্তব্ধ হৃদয়, ক্রন্দন করি’ শেষে
জুড়াবে জীবন, অজানা হরষে অবশে উঠিবে হেসে !

ভুল করিবারে পাবে অধিকার, পাপ সে জানিত যারে----
একটি মধুর চুম্বনে দিবে সারা প্রাণ একেবারে !
শতবার করি পুড়িয়া মরিবে বাসনা-বহ্নি-মুখে----
মরি’ মরি’ শেষে অমর হইবে প্রেমের স্বর্গ-সুখে |

পাপ কোথা নাই----গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান ;
গাহিয়াছে, আলো বায়ু নদীজল তরুলতা মধুমান্ !
প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে যজ্ঞের সোমরস !
সে রস বিরস হ’তে পারে কভু-----হতে পারে অপযশ !

.                ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
.               এম্ নি কি তোর কাজের ত্বরা
.               সত্যি হল কলস-ভরা !
হ’লই যদি, কাঁখের ও-জল নদীর জলে আবার ঢালো !
জলের কালোর চেয়ে ভালো ঘরের আলো !--- বল্ না, হ্যাঁলো ?

ফিরব ঘরে অলসপ্রাণে মন্দপদে বন্ধ্যাপারা ---
পশ্চিমে ঐ ফুলবাগানে তুলবে গোলাপ সন্ধ্যাতারা !
.                ঘোম্ টা টেনে লাজের ভানে,
.                চেয়ে আপন পায়ের পানে,
কলস ভরে’ উঠবে যখন, আকাশ তখন আলোক-হারা,
যাবার পথে পড়বে ঝরে’ সিক্ত-দেহের কাঁদন-ধারা !

.                ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
চিনেছি তোমারে, নারী, অয়ি মুগ্ধা মর্ত্য-মায়াবিনী !
বহিতেছে হাসিমুখে পুরুষের পাপের পসরা---
তোমারে নরকে সঁপি’ হতভাগ্য স্বর্গ লবে জিনি’ !
মানসমোহিনী অয়ি, মানবের দেহ-প্রসবিনী,
কবে স্বর্গ ঘুচে যাবে ?---- ঘুচে যাবে আত্মার প্রমাদ ?
তোমারি মাঝারে হেরি’  নিখিলের প্রাণ-প্রবাহিণী
লভিবে নির্বৃতি নর, ফুরাইবে নিত্য-বিসম্বাদ----
মৃত্যু-মুক্তি হবে কবে ? --- ঘুচে যাবে চিরতরে অমৃতের সাধ ?

.                ************************    
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
দেবেন্দ্রনাথের সনেট
কবি মোহিতলাল মজুমদার

হে দেবেন্দ্র, কি সুন্দর তোমার সনেট----
কাব্যলক্ষ্মী সাজে যেন বাসন্তী দুকূলে !
অঘোর-পন্থী
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা – ১৬ / ৮ / ১৯১৭

কাচের পেয়ালা ভেঙে ফেল্ তোরা, লওরে অধরে তুলি’
পাপ
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা- কার্তিক ১৩২৬

পাপ কোথা’ নাই---গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান---
গেয়েছিল, আলো বায়ু নদীজল তরুলতা--- মধুমান্ !
প্রেম দিয়ে হেথা শোধন-করা যে কামনার সোমরস,
সে রস বিরস হ’তে পারে কভু ? ত’বে তা’য় অপযশ !

সাগর যখন মন্থন করি’ উঠিল অমৃত, শশী---
কলস-ভরা
কবি মোহিতলাল মজুমদার

ফাগুন-বেলা পড়ে’ এল বুকটি জলে না জুড়াতে---
নারীস্তোত্র
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা- জুন, ১৯২৭

তোমার চরিত, নারী কত জনে কত যে বাখানে---
অযুতাঙ্ক নাটকের এক নটী---- তুমি নিপুণিকা !
কত নিন্দা, কত স্তুতি !---- স্বপনের সীমান্ত-সন্ধানে
ছুটিয়াছে পিছে-পিছে ধরিবারে রূপ-মরিচিকা
কত কবি, কত ঋষি হেরিয়াছে ও নয়নে লিখা
চির শান্তি মানবের --- তনু তব নরকের দ্বার !
ত্রিলোকের অধিষ্ঠাত্রী রমা তুমি, বিষ্ণু-স্বয়ম্বরা !
অবিদ্যারূপিণী, ধনি ধ’রে আছ মিথ্যার পসরা,
উরিছে ঘাগরি তব দিকে দিকে বিবিধ-বরণ !
যৌবন-সঙ্কটে তুমি প্রাণেশ্বরী পীন-পয়োধরা---
জায়া-স্বসৃ-মাতারূপে কর যায় মরণ বারণ,
মদন-সদনে তারে বাহুপাশে বাঁধি’ আয়ু করিছ হরণ !

তাই দ্বন্দ্ব চিরন্তন, অন্তহীন কলহ সংশয়---
ডান হাতে সুধাপাত্র, বিষভান্ড তাই বাম করে !
তুমি সত্য, তুমি মিথ্যা, তুমি ভয়, তুমিই অভয়---
প্রলাপ বকিছে কবি, যোগী শুধু অট্টহাস্য করে
শাস্ত্র আর সংহিতায় বাঁধা তুমি নিয়ম-নিগড়ে !----
সৃষ্টির প্রাণের স্ফুর্তি, বন্ধহারা আনন্দরূপিণী ,
মৃত্তিকার সোমলতা, সুধাভান্ড মৃত্যুর অধরে---
সেই তুমি---- আদিরস-উত্স-ধারা মুক্ত প্রবাহিনী !
তোমারে বাঁধিবে কেবা ?---বিধি পয়ায়েছে যার চরণে কিঙ্কিণী !

দুই নয়, এক সে যে! ---- নহে বিষ, নহে সে অমৃত !----
জীবন মরণ নাই, আছে শুধু সৃষ্টির উল্লাস !
নাই মন, নাই মোহ ; আছে শুধু ছন্দ অনিন্দিত
আনন্দের ; নাই ভয়, নাই কোন স্বর্গের আশ্বাস !
ধরিত্রীর এই ধর্ম, তুমি তার মর্মের উচ্ছাস ;
প্রলয় হয়েছে লয়, তুমি চির সৃষ্টির সুষমা ;
তুমি কামনার কায়া, বিভু-হৃদি-পদ্মের পলাশ ;
চিন্ময়ী মৃন্ময়ী তুমি, শরীরিণী শোভা নিরুপমা---
রাসরসোল্লাসময়ী নিয়তী-নিয়ম-হারা পীরিতি পরমা |

বেদনার বিষহরি ! মৃত্যু ---- তব মঞ্জীর মেখলা ---
নেচে ওঠে তালে তালে, গাও যবে জীবনের গান !
অসীম ব্যথার ভারে তবু তব হৃদয় উতলা
মমতার মহোত্সবে আত্মবলি করিবারে দান !
নয়নের বারি তব কামনারি অভিষেক স্নান----
যত দুঃখ, যত শোক ---- তত সত্য এ ভব-ভবন !
সন্তান মরিছে বুকে, তখনি যে নব গর্ভাধান !
রক্ত-রাঙা বেদনার আলিম্পনে ভরিছ ভুবন---
বেদনা সে ?----- কে বলিবে সুখ নয় অসহ্য সে প্রীতির দহন !

তোমারে চিনিতে নারি পুরুষের অশান্ত ক্রন্দন----
ধরণীর ঘরণীরে স্বরগের দেবী-সমতুল
হেরিবারে চায় নর --- চক্ষে ভাসে অলীক নন্দন,
আকাশ-কুসুম হয়ে ফুটে তাই মাটির মুকুল |
তপনেরে তুচ্ছ করি’ তারকার লাগি’ সে আনন্দ !
ওই দেহ-রূপ-হ্রদে ----টলমল রসের সায়রে -----
জুড়াল না জ্বালা তার, ঘুচিল না জীবনের ভুল ?
সে চায় অমৃত-দীপ চিরনিশা-যাপনের তরে----
দেহহীন দেবতাত্মা !---- দেবী চায় স্বরগের শয়ন-শিয়রে !

মিলনে মলিন তাই, তাই তুমি বিরহে শ্রেয়সী---
দুর্লভ প্রেমের ধ্যানে কত গীত গুমরি’ ধ্বনিছে !
পায় নাই যারে কভু, সেই তার পরাণ-প্রেয়সী----
ইতালীর মহাকবি, তুমি তার প্রিয়া ‘বিয়াত্রিচে’ !
কত স্বর্গ-নরকের পথে পথে ধায় তার পিছে,
চরণ টলিছে মুহু, মুরছিয়া পড়ে বারবার !
উন্মাদ হেরিল শেষে ---- সান্ত্বনার বঞ্চনা সে মিছে---
ঊর্দ্ধে-স্বর্গে স্বর্ণজ্যোতি-কিরীটিনী মুরতি প্রিয়ার !
অমর সে মহাকাব্য, অমরীর স্তবগানে মোহিত সংসার !

আরও এক রাজকবি রচিয়াছে মর্মর-অক্ষরে
বিরহের মঞ্জু শ্লোক মমতাজ-মহিষীরে স্মরি’;
আজও তার দীর্ঘশ্বাস হাহা করে কবর-গহ্বরে---
কবে প্রিয়া বেঁচে ছিল ?---- চিরদিন রহিয়াছে মরি’ !
মিলনে মিটে নি তৃষা, তাই দীর্ঘ বিরহ-শর্বরী
জপিয়াছে নাম তার ! চিনেছিলে কভু কি তাহারে ----
একান্ত সে ধরণীর বৃন্ত’পরে আনন্দ-মঞ্জরী ?
তবে কেন আঁখি ধায় পিছে-পিছে মৃত্যু-পরপারে----
জীবনের জয়মালা রাখে কেন মরণের শ্বেত শবাধারে ?

হায় নর ! কে বলেছে নারী তব মানসের মিতা ?
উন্মাদ তাপস তুমি, সে তো নয় স্বেচ্ছা-তপস্বিনী !
তুমি শিল্পী, হেরিয়াছ নারী-মুখে ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’----
দেহের সীমার শেষে তটহীন রূপ-মন্দাকিনী !
ঋষিপত্মী মৈত্রেয়ীরে জানি আমি----সে ব্রহ্মবাদিনী
ভুলেছিল নারীধর্ম---- মুখে তার পুরুষ-ভাষণ !
তুমিই করেছ তারে মূঢ়, মূক, নিয়ম-চারিণী----
আম্বপালী যাচে তাই যোড়করে বুদ্ধের শাসন !
যুগে যুগে কত নারী হেন মতে ত্যাজিয়াছে নারীর আসন !

পতিতা সে ? দেহ তার শুচি নয় ? ---- পুরুষের মন
চায় রুক্ষ শমী-শাখা, গুঢ়তাপ যজ্ঞের সমিধ !
পর্যাপ্ত-স্তবক-নম্রা বসন্তের লতিকা শোভন
চায় বটে,---- আপন মন্দিরে শুধু, ধূর্ত স্থানবিদ্ !
মুক্তবায়ু-বিহারিণী কেড়ে লয় নয়নের নিদ
মুক্তির বিমল মুক্তা চায় না সে ডুবিয়া অতলে-----
পাপ-ভীরু কৃপণের লক্ষ্য শুধু পূণ্যের কুশীদ !
রমণীর দেহ-মণিপদ্মে যেই আলোক উথলে----
জন্মান্ধের কিবা তায় ?------- স্পর্শ করে মৃদ্ ভান্ড শুধু করতলে |

তাই তনু তুচ্ছ করি’ ফিরে তার অন্তর তপাসি’----
বরাঙ্গে যেথায় নিত্য বিরাজিছে দেবতা সুন্দর
প্রাণের প্রত্যক্ষরূপে, হেরিল না যেথায় উদাসী
ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রধনু-আঁকা সেই শোভার নির্ঝর !
মাটির প্রতিমা বটে, মাটি বিনা সবই যে নশ্বর ----
দেহই অমৃত-ঘট, আত্মা তার ফেন-অভিমান !
সেই দেহ তুচ্ছ করি’ আত্মা-ভয়-বন্ধন-জর্জর
ভ্রমিছে প্রলয়-পথে অভ্শপ্ত প্রেতের সমান---
আত্মার নির্বাণ-তীর্থে নারীদেহে চায় শুধু আত্মার সন্ধান !

হের, ওই চলিয়াছে পথে নারী যৌবন-উন্মনা---
অপাঙ্গ লালসা-লোল, স্মিত হাসি স্ফুরিছে অধরে ;
অধীর মঞ্জির, তবু শ্রেণীভারে অলস-গমনা,
বসনের তলে দুটি স্তনচুড়া এখনো শিহরে !
কাংস্যঘটে গঙ্গাজল---- সদ্যস্নাতা ফিরে যায় ঘরে,
তপ্ততনু স্নিগ্ধ এবে, গেছে ক্লান্তি গত যামিনীর,
নাই লজ্জা, নাই খেদ ; মুক্তগতি মৃদুলীলাভরে
যায় চলি’------ শুভ্রপক্ষ মরালী সে, ত্যজি পঙ্ক-নীর !