কবি মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
|
অঙ্গ শিথিল---লোল পয়োধর না বাঁধি বসনে বসুন্ধরা----
সুন্দরী নয়, সতীবেশে হবে দিগম্বরের স্বয়ম্বরা !
আর সে রূপসী পারিবে না রাতে তারা-ঝল্ মল্ যামিনী-চেলী,
দিনে দহিবে না পুরুষের মন, আলোক-সিনানে বক্ষ মেলি’ |
. ঘুচে য়াবে রূপ, ঘুচে যাবেতার অঙ্গরাগ,
. ঘুচে যাবে কায়া----কামনার এই ব্যর্থ যাগ,
ঘুরিবে না আর মর-মরুপথে প্রাণের দেবতা পাথর ঠেলি’----
দাঁড়াবে সমুখে কঠিন কুলটা ভ্রূকুটি-ভীষণ দশন মেলি’ ?
জাগো মহাকাল ! রুদ্র-দেবতা ! বর্ণ-বিহীন বিভূতিময় !
দাও খুলে তব গ্রন্থিল জটা, ব্যোমকেশ ! কর সৃষ্টি লয় !
. ফেটে যাক নীল নভোবুদ্বুদ----- রঙের হাট !
. মেদিনীর এই বেদী ভেঙে যাক্ ---- রূপের ঠাট !
সুন্দরে হানো সত্যের শূল, টুটাও স্বপন হে নির্দয় !
নিত্য-মরণ হরিয়ে দাও গো নিত্য-জীবন শূন্যময় |
সৃষ্টির ভরা ভারী হয়ে এল, ভেঙে যায় বুঝি রূপের চাপে !
তবু রূপ চাই স্নায়ু চিরে চিরে , আয়ু যে ফুরায় তাহারি দাপে !
. রূপ নয় আর প্রিয়েরি লাগিয়া প্রেমের ছলা,
. সে যে নিজ তরে কামনা-নটীর নৃত্যকলা !
সে তো নহে আর হৃদয়েরি দান --- তারে পেতে হয় অশেষ পাপে !
মিথ্যার ভারে ভারী হ’ল ধরা, চূর্ণ কর গো চরণ-চাপে !
এই মিথ্যারে মন্থন করি’, কালকূট পুন করিবে পান----
কবে অমৃতের শুভ্র ফেনায় নীল-অম্বুধি করিবে ম্লান ?
. এ যে চারিদিকে কঙ্কাল আর শায়িত শব,
. কোথা অনুচর ?--- কারে নিয়ে হবে মহোত্সব ?
কারে জাগাইবে ? কোন্ মৃতজনে জীয়াইয়া তুলি’ করিবে দান
মহা-মারণের মন্ত্র ভীষণ, কারে কালকূট করাবে পান ?
মন্বন্তরে মারী-মুখে বুঝি দূর হবে যত আবর্জনা ?
শুষ্ক শবের মূর্ধজে ধূপ-দীপ করি’ হবে পূজার্চ্চনা ?
. নর-পশুদের হিহি-হাহাকার মন্ত্ররব,
. নারী-শিশুদের ছিন্নকন্ঠে গীতোত্সব,
উদ্বন্ধনে করিবে নৃত্য শূন্য-মঞ্চে রসিক জনা,----
ঘূর্ণাঝড়ের চামর ঢুলায়ে হবে কি তোমার পূজার্চনা ?
* * * *
ভেবে নাহি পাই, কবে কোন ঠাঁই ঊষর ধরার উরস-মুখে---
শৈল-চুচুক বিদারি’ ছুটিবে আগুনের স্রোত সকল বুকে !
. তারি মাঝে দিক-পিশাচেরা করে ডমরু-নাদ,
. রবি মুছে যায় কালো হয়ে যায় আকাশের চাঁদ !---
কবে সেই দিন উদিবে হেথায়--- মমতাবিহীন মরণ-সুখে
নর-কঙ্কাল উঠিবে হাসিয়া লোহপান করি’ লৌহ-বুকে !
. ************************
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
. সন্ধ্যা-আকাশে সাজিল কাহারা রক্ত চীনাংশুকে !
ওগো, এখনি হবে কি রঙের বাসর, ফুলের দীপালি শেষ ?
. নিশার নেশা যে এখনো লাগে নি---- নয়নে ঘুমের লেশ !
. কাজল-আঁকা এ আঁখির কোণায়
. এখনি অরুণ-আভাটি ঘনায় ----
. রিনি-রিনি করে সকল শিরায় রজনীর রসাবেশ !
আমার কবরী এখনো হয় নি শিথিল---- শিথানে পড়ে নি খুলে,
. মুকুরে যে হাসি দেখেছি অধরে, সে হাসি যাই নি ভুলে |
. ধূপের ধোঁয়ায় দিছি মিলাইয়া
. দেহের দহনে সুরভি এ হিয়া---
. প্রাণের গহনে জ্বলে নি যে দীপ বেদনার বেদীমূলে |
ওগো মধু-যামিনীর জ্যোত্স্না-কামিনী এখনো যে কানে-কানে
. সুধাইছে মোরে সুধার কাহিনী---- সে কথা সেও না জানে !
. সুখের স্বপনে সুমধুর ব্যথা
. কেন জেগে রয়---- সেই রূপকথা
. শুনিবারে চায়, কেবলি তাকায় আমারি মুখের পানে !
আমি মরণেরে, তার নীল-তনু ঘেরি’ জীবনের পীত-বাস
. পরায়ে, সাধায় হৃদয়-রাধারে --- কত না করেছি আশ !
. হাসিয়া উঠিবে গোচরনা –গোরী ----
. আবীরের ধূলি মুঠা মুঠা ভরি’,
. শ্যাম-মুখ তার রাঙাবে রচিবে মরণের মধুমাস !
ওগো সে কামনা মোর জ্বলে’ নিবে গেল শিমূলের শাখে শাখে,
. চৈত্র-নিশীথে বসন্ত কাঁদে’, দ্বারে হেরি’ বৈশাখে
. সিঁথিটি সাজয়ে অশোকের ফুলে,
. চাঁপার মুকুল ভরিয়া দুকূলে,
. কাঁদে কাম-বধূ বিদায়-বিধূর, নূপুর খুলিয়া রাখে !
. ************************
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
ভারিয়াছে বনস্থলী, হেমকান্তি কিরণ-সম্পাতে
বিবাহের চেলীখানি পরিয়াছে বসুধা-সুন্দরী
আজস্র আরক্ত-পীত গাঁদাফুল এখনো বিদায়
লয় নি অঙ্গন হতে---- রূপে তার চক্ষু আসে ভরি’ |
তবু সে মলীন শীর্ণ, তারি মত চেয়ে আছি হায়,
আজি এ বসন্ত-দিনে---রিক্ত-মধু, যাপি অলিহীন
সারাটি প্রহর একা, বিদায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষায় |
আর কি আসিবে ফিরে---- আক এক বসন্তের দিন
সেই যারা অর্ঘ্য-থালি সুনিটোল ললাটে পরশি’
সন্তর্পণে নিবেদিয়া, দুরু-দুরু হৃদয় নবীন,
চেয়েছিল মুখপানে ? ---- কলামাত্র-অবশেষ শশী
যেমন মলিন হেসে দিক্–প্রান্তে যায় অবতরি’,
তেমনি লুকাল তারা---- চিত্রার্পিত আমি ছিনু বসি’ |
ধর্ম যাহা ধরণীর আমি তায় আছিনু পাসরি’
আমারো যে নিমন্ত্রণ হয়েছিল পূর্ণিমা-উত্সবে,
যৌবনের নিধুবনে নাম ধরি’ ডেকেছে বাঁশরী !
চমকি’ চকিতে উঠি’ দ্বার খুলি’ সেই বাঁশী-রবে,
চন্দ্রালোক-পুলকিত নভ-তলে মেলিয়া নয়ন
খুঁজি নাই কভু কারে--- কেন, হায়, কে আমাদের ক’বে ?
আত্মার নিশীথ-রাতে প্রেম বুঝি স্বপ্ন-সঞ্চরণ----
বাঁশীখানি বেজে ওঠে অচৈতন্য প্রাণের অতলে ?
প্রেম কি ‘নিশির ডাক’ --- গাঢ় ঘুমে গূঢ় জাগরণ ?
বিস্ফারিত অন্ধ আঁখি, তবু পথ চিনিয়া সে চলে,
বাহিরের ডাক শুনি’ স্বপনে সে হয়েছে বাহির---
পথের পথিক--বালা নিজ মালা দেয় তার গলে !
কারো লগ্ন ভ্রষ্ট হয়---- স্বপ্নভঙ্গে ব্যথার অধীর;
কারো স্বপ্ন ভাঙে না যে, সেই নর চির-ভাগ্যবান,
স্বপ্নশেষে আসে তার মহানিদ্রা মরণ-তিমির !
তাই বুঝি সত্য হবে ! শুনি নাই প্রেমের আহ্বান,
প্রাণেরে পাড়ায়ে ঘুম স্বপনেরে দিয়েছিনু ফাঁকি,
বাজে নাই দেহ—বীণে আত্মহারা কামনার গান |
আজ নিদ্রা অবসান---- স্বপ্ন শুধু রহিয়াছে বাকি,
গাহিতেছি মনে মনে অপরাধ-ভঞ্জনের শ্লোক ;
বাসি নি যাহারে ভাল তার হাতে কবিতার রাখী
বাঁধিনু সুদূর হতে ; থাকে যদি কোথা পরলোক,
পরজন্ম,--- সেইখানে একবার বাঁধি’ বহুপাশে
মুছাতে পারিব কারো অশ্রুভার-অবনত চোখ ?
পায় নাই ভালবাসা কেহ কভু এ মর্ত্য-আবাসে----
মিথ্যা কথা ! ধরণী যে প্রেম, প্রীতি, স্নেহের নিলয় !
বাসে নাই ভাল কারে যে অভাগা ---- তারি দীর্ঘশ্বাসে
দিনান্তে ডুবিছে রবি, ঘেরি’ আসে আঁধার নিদয়
আসন্ন রজনীমুখে ; প্রাণ যার ছিল উদাসীন
জীবনের বঞ্চিত সেই--- তার চেয়ে দুঃখী কেহ নয় !
. ************************
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
চেয়ে থাকে অনিমিখ নব মেঘালোকে---
কবির অমর শ্লোকে লভে জয়টীকা !
উপবাসী চাষী কাঁদে শূন্য আঙিনায়,
শরতের পীত-রৌদ্রের দীর্ঘ জ্বরজ্বালা !
কে গাঁথিবে তরুমূলে শেফালির মালা----
অর্চিবে কমল তুলি’ কমলাসনায়
তুমি লক্ষ্ণী ছিলে কবে ?----আছ কল্পনায় ;
নাই ঝাঁপি, আছে শুধু নৈবেদ্যের থালা
নিত্যপূজা-অভিনয়ে---- বৃথা দেয় বালা
গৃহদ্বারে আলিপনা প্রতি পূর্ণিমায় !
ছিলে যবে, হে জননী, সারা দেশ ভরি’-----
তখন করেছি পূজা গৃহদেবী-রূপে
আজ তুমি গৃহে নাই, তাই চুপে চুপে
সমগ্র দেশের রূপে মূর্তিখানি গড়ি
লক্ষ্ণীরে চাহি না বটে দীপে আর ধূপে----
বঙ্গলক্ষ্মী?--- সেও যে রে ছায়া-ধরাধরি !
. ************************
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
রুদ্র-বোধন
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা ---০৩-০৬-১৯২৭
বজ্র কোথায় লুকাইয়া আছে নির্মেঘ নীল গগন-তলে
ধূর্জটী ! যোগমগন তোমার নয়নে কোথায় অনল জ্বলে
শেষ-শিক্ষা
কবি মোহিতলাল মজুমদার
রচনা—২৯ / ১ / ১৯২৮
ভালবাসা লভি নাই সেই দুঃখ বড় যদি হয়---
তার চেয়ে অভিশাপ আছে কিছু ---- ভাবিয়া না পাই,