কবি নরেশ গুহর কবিতা
*
শান্তিনিকেতনে ছুটি       
কবি নরেশ গুহ

দূরে এসে বসে থাকি : সে হয়তো এসে ব'সে আছে |
হয়তো পায় নি ডেকে, একা ঘরে জানালার কাচে
বৃষ্টির বর্ণনা শুনে ভুলে গেছে এটা কোন সাল |
ভুলে গেছে জীবনের দরিদ্র ধীবর আর জাল
জোড়া দিতে পারবে না | যদি দেয়, তবু ক্ষীণ হাতে
সেই ধূর্ত মাছটাকে পারবে না ডাঙায় ওঠাতে |
পারলেও অভিজ্ঞান সে-অঙ্গুরি হয়তো বা ফিরে
পাবে না কখনো তার শীতল পিচ্ছিল পেট চিরে |
যদি পায় ?
যদি তার এত কাল পরে মনে হয়
--- দেরি হোক, যায়নি সময় ?
শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি : ছুটি শেষ | ভিজে আলতা-লাল
শূণ্য পথ | ডাকঘরে বিমুখ কাউন্টর চুপ | কাল
হয়তো রদ্দুর হবে, শুকোবে খোয়াই, ভিজে ঘাস |
লোহার গারদ ঘেরা আম্রকুঞ্জে কবিতার ক্লাশ
কাল থেকে ফের | ঘুমে ফোলা চোখ, ভাঙা-ভাঙা গলা,
কবে সে মন্থর পায়ে পাতা-ঝরা ছাতিমতলায়
একা এসে ঘুরে গেছে ? ঘন্টা গুনে হঠাৎ কখন
অকারণে দিন গেলো | ছায়াচ্ছন্ন শান্তিনিকেতন |
কলকাতায় ফিরে যদি---যদি আজ বিকেলের ডাকে
তার কোনো চিঠি পাই ? যদি সে নিজেই এসে থাকে ?

.              *************************      
.                                                                                   
সূচিতে . . .      



মিলনসাগর       
*
মাঘ শেষ হ'য়ে আসে       
কবি নরেশ গুহ

মাঘ শেষ হ'য়ে আসে,
ভোর হ'লো হিমে নীল রাত |
আলোর আকাশগঙ্গা ঢালে কত উল্কার প্রপাত |
আনত ওষ্ঠের তাপ বসন্তের প্রথম হাওয়ায় |
তবু ক্লান্তি চোখের চাওয়ায় |
দিন ভ'রে ওঠে স্বাদে, ভরে রাত,
তুমি কাছে নাই |
বসন্তের জানালায় মাঘের রাতের শীত
একলা পোহাই |


.        *************************     
.                                                                                   
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর       
*
রুমির ইচ্ছা       
কবি নরেশ গুহ

আমি যদি হই ফুল, হই ঝুটি বুলবুল              হাঁস
.          মৌমাছি হই                        একরাশ,
তবে আমি উড়ে যাই           বাড়ি থেকে দূরে যাই
ছেড়ে যাই ধারাপাত          দুপুরের ভূগোলের ক্লাস
তবে আমি টুপ টুপ নীল হৃদে দিই ডুব          রোজ
পায় না আমার কেউ                             খোঁজ
তবে আমি উড়ে উড়ে            ফুলেদের পাড়া ঘুরে
মধু এনে দিই এক                                 ভোজ
হোক আমার এলো চুল        তবু আমি ফুল    লাল
ভরে দিই ডালিমের                                ডাল
ঘড়িতে দুপুর বাজে             বাবা ডুবে যান কাজে
তবু আর ফুরোয় না আমার                    সকাল |


.              *************************    
.                                                                                   
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
একটা নষ্ট ফল       
কবি নরেশ গুহ

আহা রে, তুই কে ফল অকালে
কৃপণ ডালে ফলতে গিয়েছিলি ?
কেউ এখানেফলতে আসে না রে,
খোঁজে না কেউ বেদনা নিরিবিলি |
ভিখিরিদের ভিত পায়ের ফাঁকে,
ব্যভিচারীর পাপ মেশানো পাঁকে,
ফুলের বেলা অবহেলার ঢাকে,
.              ছি-ছি ছাপায় প্রাণের ঝিলিমিলি |


তাপ জুড়ানো ঘাটের বারাণসী,
তুই এখানে ? কী দেখতে যে আসা!
কাঁকালে-সোনা-নারীতে উর্বশী ?
বিশ্ব ভুলে বিধাতা ভালোবাসা ?
দেহের কোষে যা এনেছিলি তার
তীর্থে ভিড়ে দলিত সমাচার
পৌঁছবে না ত্রিদিবে সংসার
.               বুঝবে না সে অভিধানের ভাষা ||


.              *************************   
.                                                                                     
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
দুরাশা       
কবি নরেশ গুহ

আজো জেগে আছি, ঘুমে দুই চোখ ক্লান্ত |
আসবে না আর আসবে না তুমি আগে তা কি মন জানতো ?
মেনেই নিয়েছি ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে,
অলীক আলোয় ছায়াপরীদের নৃত্যে
মূঢ় চিত্তকে করিনি আত্মহারা |
বুঝিয়েছি : মন, স্ববশে আনো তো লেখনী |
কাল-কে হারাবে কী দিয়ে ? আজো কি শেখো নি
সার্থকরা-ই পায় শুধু তার সাড়া ?
কিছু-র বদলে কিছু দিতে হয়---এ কথাটা কে না জানে ?
সার্থকতাই হাত ধ'রে জেনো অভাবনীয়-কে আনে |


যদি তাই হয়, দিতে যদি হয় তুল্য,
ক্লান্তিবিহীন শ্রমে যা গড়েছি কিছু কি হবে না মূল্য ?
মেঘে মেঘে নীল কত আষাঢ়ের লুঠ-ক'রে-আনা পণ্য
গানের জাহাজে এনেছি তোমার জন্য |
করিনি লজ্জা, মনে বাসি নাই ভয় |
দস্যুর মতো মনের ঘোড়ায় চাপি
ছিনিয়ে এনেছি নীল তারাদের ঝাঁপি,
তুমি কি জানো না সে জয় তোমারি জয় ?


ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে হয়েছে, দিনের ক্লান্তি মিথ্যে |
বিনিদ্র রাত, অধৈর্য ভরা চিত্তে
---তুমি আসো নাই---বসে আছি একা বৃষ্টির সুরে ক্লান্ত |
মূল্যে তোমারে মেলে না একথা আগে যদি মন জানতো!


.              *************************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
লোকটা
কবি নরেশ গুহ

আকাশে সোনার মুখ দেখছে সারনাথে কে নতুন,
ধুলো-পা, আবিষ্ট চোখ, ব’সে থাকে মস্ত নীল মাঠে !
চার দিকে হিম শীত নক্ষত্রের উজ্জ্বলতাগুণ |
সে যেন পড়েছে লেখা ‘অন্ধকার’ ভাগ্যের ললাটে |

বিহারে গম্ভীর ঘন্টা, ধ্বনি গাঁথে নেপাল লাডাক
সিংহল তিব্বত শ্যাম কম্বোডিয়া নম্র-মহাচীন,
এবং স্তুপের পায়ে একা লোকটা | হয়তো একই ডাক
তারও প্রাণ শুনেছিল পদ্মাপারে বিজনে একদিন |

নাকি সারনাথে এসে শিলাকাটা বুদ্ধের অভয়
দেখেছিল মিউজিয়ামে, অভ্যাসবশত লোভী হাত
ছুঁয়েছিল শিল্প-ধ্যান, ছেনিতে বাটালে গড়া জয় ?
সে নিজে পারে নি, তার খেদ ক্ষুধা কান্নার আঘাত
রাত্রি জানে ?  স্বপ্ন জানে ?

.                          অথবা মন্দিরে যেতে ফিরে
ধমনীর সব রক্ত আছড়ে পড়েছিল বুকে তার ?
মন্থর মেয়েটি তবু মিশে গেছে কুটিল তিমিরে ?
এখন পৃথিবীভরা অন্ধকার, শুধু অন্ধকার ?

সারঙ্গ উধাও, দীপ্ত মন্ত্রলাগা স্তব্ধ রাত, মাটিলেপা গ্রামে
স্ত্রীপুরুষ ঘরে গেছে : বেণুবনে ---- সুজাতা কি ? – চাঁদ একাকিনী |
অপার আকাশী আলো মূলগন্ধবিহারের সিঁড়ি বেয়ে নামে |
সে পায় নি করুণা যাঁর, প্রভু তথাগত,
.                           কেন এ-লোকটাকে ফেরালেন তিনি !

.              *************************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
অলৌকিক
কবি নরেশ গুহ

কলকাতায় বেঁচে আছি শুধু এই মহাপুণ্যবলে
এখনও গলির মোড়ে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় গ্যাস জ্বলে,
ভোরে কলে জল আসে, পাশের বাড়ির
দ্বিতল রেলিঙে ঝোলে সদ্যস্নাত জাফরানী শাড়ির
আঁচলের প্রান্তভাগ | কী আশ্চর্য, প্রহরে প্রহরে
পাড়ায় বস্তির কোণে রাত্রি ছিঁড়ে দস্যুতার স্বরে
কুঁকড়োর ঘোষণা ওঠে | ক্লান্তিহীন কী অধ্যবসায়,
একফোঁটা কালো মাছি দুপুরে বিরক্ত করে যায়
ভন্ ভন্ উড়ে উড়ে | চায়ের উদ্বৃত্ত কিছু চিনি
খুঁটে তুলে নিয়ে যায় এক সার পিঁপড়ে প্রতিদিনই
নিপুণ নিষ্ঠায় | আর জানালায় দু’গজ আকাশ---
দু’গজ বেগনি নীল কমলা কি ফ্যাকাশে পাঙাস---
বারোমাস উপস্থিত | অন্ধকারে ফস্ করে জ্বালো
সরু দেশলাই কাঠি, ঘর ভরে মৃদু নীল আলো !
বিলিতি অ্যান্টিকে ছাপা সদ্য কিনে আনা কোনো বই
বুক ভরে গন্ধ দেয়, তাড়াতাড়ি সযত্নে লুকোই,
যেন কোনো প্রেমপত্র, বন্ধুদের লুদ্ধ দৃষ্টি থেকে |
দিনে থাক, আলো জ্বেলে রাত্রে পড়া যাবে চেখে চেখে |
আর কী আশ্চর্য কান্ড, ছয় রাত্রি যেই হয় পার,
হাসিতে আটখানা মুখ ফিরে আসে লাল রবিবার,
ভাসমান লাল বয়া, ছয়দিন সমুদ্র সাঁতরিয়ে
জাহাজডুবির পর | এ অলস রবিবার নিয়ে
মনে বুঝি, জীবিকার পশুটার লোমশ থাবায়
বিদীর্ণ হয়েও তবু শনিবার ঘরে ফেরা যায়
শিস দিয়ে | আর, দেখ, চিঠির বাক্সটা যেই খুলি
রোজ কিছু চিঠি থাকে ! অলৌকিক কে ডাকপিওন,
রেখে যায় রোদ্দুরের চৌকো খামগুলি !

.            *************************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
অজ্ঞাতবাসের ভূমিকা
কবি নরেশ গুহ

হায়, ঝড় নেই | বিশ্ব ছেয়েছে কেবলই ঝড়া পাতা,
দিনরাত ঝরে, ঝরে যায় |
বিশীর্ণ বিপুল বন, শাখাশীর্ষে পাতুক পল্লব
আঁধারের আলোতে বাগিচায় |

বনে এত প্রেত কেন, শাদা এত কঙ্কালের দাঁতে ?
চোখের বিবরে এত সাপ ?
কনকপরীরা কেন এ-কাননে ডাইনী হয়ে যায় ?
জ্যোছনা ঝরে শুধু মনস্তাপ ?

সব বাঘ মরে গেছে, ফিরে গেছে সব দেবতারা,
গেছে সব হলুদ, কপিশ |
খোসার আড়ালে ফল কখন পচেছে ডালে-ডালে,
সব জাম কামরাঙা বিষ |

ঝড়েরা উধাও, শূন্যে কোনো মেঘ ফেলে না নোঙর |
অবজ্ঞাত বিধানকর্তার
হাহাকার থেমে গেছে, স্তূপাকার ঝরাপাতা ঢাকে
তার কৃশ পাঁজরের হাড় |

সাঙ্গ বনবাস | বাকি অজ্ঞাতবাসের বারো মাস !
নৃত্যগীত বিরাট-সভায় !
কোথায় লুকোবে তূণ ? হায়, সব শমীশাখা থেকে
অন্তহীন পাতা ঝরে যায় ||

.            *************************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
হাওয়ায় হিম
কবি নরেশ গুহ

হাওয়ায় হিম, পৃথিবী তাই
বনের ডালে পাতা খসায় |
মাঘের শীতে কিসের শোক
অন্ধকারে ভরে ত্রিলোক,
তাই কি তার সব সুখের
.        অন্তরায় ?
তবুও কেন স্খলিত পায়ে
লোকটা একা কোথায় যায় ?
মরেনি আশা, যদিও তার
ভরে না মন, ত্রিসংসার
যখন থাকে মৌনমুখে
.         নিশ্চেতন |
তখনো জ্বলে দু’চোখে তার
অলখ এক হীরের ধার,
যখন ডোবে তিমির তলে
.          দূর গগন |

.     **********************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর       
*
খার্সং-এ একটি মৃত্যু
কবি নরেশ গুহ

খার্সং-এ সন্ধ্যা করলো, স্যানাটোরিয়ামে
তাকে শেষ দেখে এসে ফিরতি পথে ভাবি ---
(পাহাড়ী রাস্তার বাঁকে হেনার সুরভিধারা নামে )---
কেন ছেড়ে যেতে হয় অসময়ে ধরণীর দাবী ?
মন্ত্রী কি মেয়র হবে ভাবেনি সে | তবে ?
মদ্যপ মোটরে চেপে চাপা দেয়নি ভিখিরী ছেলেকে |
ছলোছলো দুটি চোখ বুকে মেনে তবু যেতে হবে
অস্তদূরে ? শেষ দৃশ্যে অকম্পিত হাতে দেবে এঁকে
গিরিশিরে রৌদ্রআভা জাফরানী কুঙ্কুম ?

ভাবতে-ভাবতে দার্জিলিং | মন ক্লান্ত, চোখভরা ঘুম |
কাল আবার যাওয়া আছে গ্যাংটকে , অনেকটা পথ |
অন্ধকারে অজগর-ঝরনা নামে, চারদিকে ছায়া
দৈত্যদানবের, যারা দিবালোকে পাহাড়পর্বত |

.               **********************    
.                                                                                  
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর