দূরে এসে বসে থাকি : সে হয়তো এসে ব'সে আছে | হয়তো পায় নি ডেকে, একা ঘরে জানালার কাচে বৃষ্টির বর্ণনা শুনে ভুলে গেছে এটা কোন সাল | ভুলে গেছে জীবনের দরিদ্র ধীবর আর জাল জোড়া দিতে পারবে না | যদি দেয়, তবু ক্ষীণ হাতে সেই ধূর্ত মাছটাকে পারবে না ডাঙায় ওঠাতে | পারলেও অভিজ্ঞান সে-অঙ্গুরি হয়তো বা ফিরে পাবে না কখনো তার শীতল পিচ্ছিল পেট চিরে | যদি পায় ? যদি তার এত কাল পরে মনে হয় --- দেরি হোক, যায়নি সময় ? শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি : ছুটি শেষ | ভিজে আলতা-লাল শূণ্য পথ | ডাকঘরে বিমুখ কাউন্টর চুপ | কাল হয়তো রদ্দুর হবে, শুকোবে খোয়াই, ভিজে ঘাস | লোহার গারদ ঘেরা আম্রকুঞ্জে কবিতার ক্লাশ কাল থেকে ফের | ঘুমে ফোলা চোখ, ভাঙা-ভাঙা গলা, কবে সে মন্থর পায়ে পাতা-ঝরা ছাতিমতলায় একা এসে ঘুরে গেছে ? ঘন্টা গুনে হঠাৎ কখন অকারণে দিন গেলো | ছায়াচ্ছন্ন শান্তিনিকেতন | কলকাতায় ফিরে যদি---যদি আজ বিকেলের ডাকে তার কোনো চিঠি পাই ? যদি সে নিজেই এসে থাকে ?
আমি যদি হই ফুল, হই ঝুটি বুলবুল হাঁস . মৌমাছি হই একরাশ, তবে আমি উড়ে যাই বাড়ি থেকে দূরে যাই ছেড়ে যাই ধারাপাত দুপুরের ভূগোলের ক্লাস তবে আমি টুপ টুপ নীল হৃদে দিই ডুব রোজ পায় না আমার কেউ খোঁজ তবে আমি উড়ে উড়ে ফুলেদের পাড়া ঘুরে মধু এনে দিই এক ভোজ হোক আমার এলো চুল তবু আমি ফুল লাল ভরে দিই ডালিমের ডাল ঘড়িতে দুপুর বাজে বাবা ডুবে যান কাজে তবু আর ফুরোয় না আমার সকাল |
আহা রে, তুই কে ফল অকালে কৃপণ ডালে ফলতে গিয়েছিলি ? কেউ এখানেফলতে আসে না রে, খোঁজে না কেউ বেদনা নিরিবিলি | ভিখিরিদের ভিত পায়ের ফাঁকে, ব্যভিচারীর পাপ মেশানো পাঁকে, ফুলের বেলা অবহেলার ঢাকে, . ছি-ছি ছাপায় প্রাণের ঝিলিমিলি |
তাপ জুড়ানো ঘাটের বারাণসী, তুই এখানে ? কী দেখতে যে আসা! কাঁকালে-সোনা-নারীতে উর্বশী ? বিশ্ব ভুলে বিধাতা ভালোবাসা ? দেহের কোষে যা এনেছিলি তার তীর্থে ভিড়ে দলিত সমাচার পৌঁছবে না ত্রিদিবে সংসার . বুঝবে না সে অভিধানের ভাষা ||
আজো জেগে আছি, ঘুমে দুই চোখ ক্লান্ত | আসবে না আর আসবে না তুমি আগে তা কি মন জানতো ? মেনেই নিয়েছি ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে, অলীক আলোয় ছায়াপরীদের নৃত্যে মূঢ় চিত্তকে করিনি আত্মহারা | বুঝিয়েছি : মন, স্ববশে আনো তো লেখনী | কাল-কে হারাবে কী দিয়ে ? আজো কি শেখো নি সার্থকরা-ই পায় শুধু তার সাড়া ? কিছু-র বদলে কিছু দিতে হয়---এ কথাটা কে না জানে ? সার্থকতাই হাত ধ'রে জেনো অভাবনীয়-কে আনে |
যদি তাই হয়, দিতে যদি হয় তুল্য, ক্লান্তিবিহীন শ্রমে যা গড়েছি কিছু কি হবে না মূল্য ? মেঘে মেঘে নীল কত আষাঢ়ের লুঠ-ক'রে-আনা পণ্য গানের জাহাজে এনেছি তোমার জন্য | করিনি লজ্জা, মনে বাসি নাই ভয় | দস্যুর মতো মনের ঘোড়ায় চাপি ছিনিয়ে এনেছি নীল তারাদের ঝাঁপি, তুমি কি জানো না সে জয় তোমারি জয় ?
হাওয়ায় হিম, পৃথিবী তাই বনের ডালে পাতা খসায় | মাঘের শীতে কিসের শোক অন্ধকারে ভরে ত্রিলোক, তাই কি তার সব সুখের . অন্তরায় ? তবুও কেন স্খলিত পায়ে লোকটা একা কোথায় যায় ? মরেনি আশা, যদিও তার ভরে না মন, ত্রিসংসার যখন থাকে মৌনমুখে . নিশ্চেতন | তখনো জ্বলে দু’চোখে তার অলখ এক হীরের ধার, যখন ডোবে তিমির তলে . দূর গগন |
খার্সং-এ সন্ধ্যা করলো, স্যানাটোরিয়ামে তাকে শেষ দেখে এসে ফিরতি পথে ভাবি --- (পাহাড়ী রাস্তার বাঁকে হেনার সুরভিধারা নামে )--- কেন ছেড়ে যেতে হয় অসময়ে ধরণীর দাবী ? মন্ত্রী কি মেয়র হবে ভাবেনি সে | তবে ? মদ্যপ মোটরে চেপে চাপা দেয়নি ভিখিরী ছেলেকে | ছলোছলো দুটি চোখ বুকে মেনে তবু যেতে হবে অস্তদূরে ? শেষ দৃশ্যে অকম্পিত হাতে দেবে এঁকে গিরিশিরে রৌদ্রআভা জাফরানী কুঙ্কুম ?
ভাবতে-ভাবতে দার্জিলিং | মন ক্লান্ত, চোখভরা ঘুম | কাল আবার যাওয়া আছে গ্যাংটকে , অনেকটা পথ | অন্ধকারে অজগর-ঝরনা নামে, চারদিকে ছায়া দৈত্যদানবের, যারা দিবালোকে পাহাড়পর্বত |