কবি নরেশ গুহর কবিতা
*
বড়ো খবর
কবি নরেশ গুহ

সূর্য থাকেন দিনের বেলায়, রাত্রে থাকেন চাঁদ
আকাশ ভরে গ্রহতারায় এই বড়ো সংবাদ
কেউ পড়ে না ভোরের বেলা, কেউ পড়ে না সাঁঝে |
অষ্টপ্রহর থেকে – থেকেই ভঙ্গ দিয়েই কাজে
ভয়ে সবাই চেঁচিয়ে, বলে--- ‘হায় কি সর্বনাশ,
তিমির মত তিমির এবার করবে সবটা গ্রাস ;
বাঘ বেরোবে পথে ঘাটে, সাপ ঢুকবে ঘরে,
বিষাক্ত গ্যাস হাওয়ার স্তরে দেখবে বিরাজ করে |
মেঘ দেবে না জল, কাজেই মাঠ দেবে না ধান,
কন্ঠ থেকে উত্সারিত হবে না আর গান !
হায় কি সর্বনাশ
শেয়াল শকুন কেড়ে খাবে খোকার মুখের গ্রাস |

বলতে-বলতে সূর্য ওঠেন, বলতে-বলতে চাঁদ
আকাশ কোণে দাঁড়ান এসে, ভাঙে আলোর বাঁধ |
আবার মেঘে বৃষ্টি ঝরে, ফসল ফলে মাঠে :
ধুলোর শিশু দুচোখ মুছে টলতে টলতে হাঁটে ||

.              *************************      
.                                                                                   
সূচিতে . . .      



মিলনসাগর       
*
ইরাক
কবি নরেশ গুহ

তৃষাতুর মরুভূমি |  কঠিন পাহাড় দুই পাশে

ভরা গ্রীষ্মে                       খর চৈত্রমাসে
.      কাশ্ বিন, কের্ মানশা ছেড়ে
.           আরব্য ইরাকের পথে
.      কবি গিয়েছেন দেখে
.            বেহিস্তানী পাহাড়ে পর্বতে
.       দারায়ুসী শিলালিপি |
.            কানিকিন্ রেলইস্টিশনে
.            আদাব আদাব জনে-জনে |
.        সেও এক গন্তব্য বাগদাদ !
ছিল আড়ম্বরশূন্য আরবীয় বীর্যের স্বাদ |
.        বেদুইন-তাঁবুতে পাতা
.        কার্পেটে বসেছেন কবি :
.              উজ্জ্বল বন্ধুতার ছবি |
.        অবশেষে হাল্ কা পল্ কা
.              সসম্ভ্রম ডাচ বায়ুযান
.        কবিকে স্বদেশে আনে,
.               পৃথিবী করেনি খান্ খান্ |

রবীন্দ্রনাথের দেখা সে-বনেদি সৌজন্যে ভরা
.        নম্র শুভ্র প্রাচীন ইরাক
.        কখনো হবে না ধ্বংস |
.                তুরী, ভেরী, সব হাঁকডাক,
.        সব বিষ, সব বাষ্প,
.                 সব স্কাড, সব পেট্রিয়ট,
.      শেষ হবে একদিন, তবু থেকে যাবে
.                     জলে রঙে আঁকা
.                     ধুলো-ঢাকা
.          উদাসীন মানুষের পট-----

যুবকের চেয়ে-থাকা
নিষ্পলক যুবতীর চোখে,
.     শেষহীন দুঃখে সুখে,

হৃদয়-ওপড়ানো অন্য প্রাণান্তিক শোকে ||

.              *************************      
.                                                                                   
সূচিতে . . .      



মিলনসাগর       
*
ট্রেন
কবি নরেশ গুহ

স্বর্গের করিনি আশা |
অলকার অলীক বৈভব
স্বর্ণ পারিজাত আর বাসবের অমৃত আসবে
কোনোকালে ভাবিনি যে একতিল অধিকার হবে |
ত্রিলোকরঞ্জিনী নটী উর্বশী রম্ভার
নির্বিকার মুখচ্ছবি কখনো ভাবিনি |
অসম্ভবে দাবি নেই | এখন গম্ভীর
জীবনের দীর্ঘ ট্রেন ঊর্ধ্বশ্বাস | ঘুরন্ত চাকায়
শব্দের পাঁজর ভাঙে, চূর্ণ হয় সময়ের বুক :
এর চেয়ে দুঃখ দ্রুত ? রোমাঞ্চিত এর চেয়ে সুখ ?
কখন পেরিয়ে গেছি শেষরাতে-আলো-জ্বলা, ঘুমে অচেতন
দুরাশার সিঁড়িতোলা অজানা স্টেশন |
কখন ছেড়েছে গাড়ি, থেমেছে কোথায়,
ঝুড়ি কি জলের কুঁজো হাতে করে কে উঠল,
.               কারা নেমে যায়,
করবীর ডালে বসে ডেকে যার যে পাখিটা
.               কী যে নাম ওর :
আনমনে ছাড়িয়ে এলাম |
প্রকান্ড সূর্যের নীচে শ্রমে তিক্ত, জ্বলে মূর্ছাতুর
আকাশ পৃথিবী ভরা পড়ে আছে নির্বাক দুপুর |
আদিগন্ত রেলপথ ---- অনিশ্চিত অনন্ত সময়----
জীবনের লৌহচক্র অক্লান্ত ইচ্ছায় পার হয় |
মুহূর্তের বনপথ, মুহূর্তের মাঠ,
জ্যোত্স্নায় কুঞ্চিতরেখা  হ্রদের ললাট,
গোধূলিতে হাটফেরা মানুষের ভিড়
পার হয়ে মধ্যরাতে উদ্দাম নদীর
নির্জন পাড়ির ‘পরে চিরতরে থেমে যাবে ট্রেন :
প্রশ্ন শুধাবে না কেউ---- ‘কোথায় যাবেন ?’
আকাশ দেবে না আলো, স্বর্গ পাঠাবে না
অমরার করুণার সেনা |

দ্রুতদৃষ্টি দেখে নেয় অবসন্ন মহানগরীর
সীমান্তে পোহায় রোদ আকাশের আশ্চর্য শরীর
আলোর সমুদ্রে সেরে স্নান |
অতলান্ত নীল তার চোখে ভরা প্রাণ |

আমার সামান্য রুটি, সামান্যই জল
ট্রেনের সম্বল |
কর্কশ কম্বলে ঘেরা অপ্রসর শয্যাভরা রাত
নিয়ে বসে আছি জেগে ; কবে অকস্মাৎ
ছবির মতন ছোটো কোনো এক ইস্টিশানে
.               ওঠে যদি সে-ও
যারে ভেবে এতকাল হৃদয়ে তুলেছি কত ঢেউ,
যে এসেছে অতিদূর আপনার ঘর থেকে তার
মাঠের শিশির ভেঙে, ফেলে তার মায়ের সংসার,
ফেলে তার সখীসোনা, ফেলে তার দিঘিভরা জল,
ট্রেনের বাঁশির সুরে উতলা চঞ্চল |
সুন্দর কপালে আঁকা বিন্দু বিন্দু ঘাম,
ভোরের ঘুমের মতো স্নিগ্ধ যার নাম,
যে আছে অপেক্ষা করে সহস্র নিদাঘে ভরা যেন এক
.                ছায়া সুশীতল :
তারে নিয়ে তবে আমি ভাগ করে খাই
তৃষ্ণার পবিত্র তীর্থে সামান্য পাথেয় এই জল |
কর্কশ কম্বলখানি---মমতা চিত্তের ---ছেড়ে দিই তারে,
জীবনের অপরূপ সীমান্ত-ট্রেনের উন্মোচিত জানালার ধারে |
তখন পাহাড়তলে বিকেলের ছায়া নামে না হয় নামুক,
.                  অরণ্য নীরব :
সূর্যের উজ্জ্বল চোখ ম্লান মেঘে হয় হোক ফিকে |
.                  অন্ধকার নেয় নিক সব |
চোখে তার চোখ রেখে জীবনের জানালায়
.                  আমি শুধু বসি দন্ড কয় |
না হয় সে নেবে যাবে পরের স্টেশনে,
.                  যাবেই না হয় |

.           *************************      
.                                                                                   
সূচিতে . . .      



মিলনসাগর