কবি পিনাকেশ সরকার-এর কবিতা
*
প্রতিনিয়ত    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ২২.০৬.৭১ / বিকেল


আছি আছি
দশ দিগন্ত
বোঝার আড়াল
সহজ বরং
যেমন তেমন
ঘরের কোণে
সামলে আছি

থমকে আছি
দিন রজনী
ক্যালেন্ডারের
ঠান্ডা ফাঁদে
ঘাপটি মেরে
নাগিন যেমন
কাচের ঘরে

জলবিছুটির
ক্ষিপ্ত জ্বালা
রক্তে ফেরে
ভয়ংকরী
বন্য মাছি
দিচ্ছে হানা
নির্জনতায়

নৌকো থেকে
রক্ত সাঁচি
এমনি করে
জটজটিলে
নিত্যদিনের
পিঁজরাপোলে
বর্তে আছি |

.       ****************   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এখন জীবন                
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা মে ২৯/ ১৯৬৮ / সকালবেলা


যেন সব তার ছিঁড়ে গেছে, বিধ্বস্ত হয়েছে সব দৃঢ় খুঁটিগুলি |
সারারাত রুদ্ধশ্বাসে
যোগাযোগশূন্য এই আত্মভূখন্ডের ঠিক মাঝখানে
সর্বহারা গৃহস্থের মতো বসে আছি |
আমারও তো কিছু ছিল---রোপিত স্বপ্নের গাছ, ছোট্ট উঠোন ভরে
মায়াবী আলোর মাচা, কলকন্ঠ জীবনের হাঁস
আকৈশোর বেঁচে-ওঠার-গন্ধে জ্বলে যেত তুলসীতলার সেই তৈলাক্ত
প্রদীপ | কথা ছিল ঈশ্বরবাবুর ধার শোধ করব এই সনে,
বিবেক রক্ষিতকে তাঁর প্রাপ্য খাজনা দিয়ে দক্ষিণ ভিটেতে আরও
তিনখানা ঘর তুলবে |
সেই ঘন জীবনের স্বাদ এ জন্মে দিলে না তুমি, দয়াল ঠাকুর |
সব চালা উড়ে গেল মধ্যরাতের ঝড়ে
বজ্রাঘাতে পুড়ে গেল ফুলন্ত স্বপ্নের গাছ, হাতে--করে--গড়ে--তোলা
আলোর মাচান----- হাসগুলি সারারাত মুমূর্ষু রোগীর মতো
ডেকে গেছে | এখন ডাইনে--বাঁয়ে গাঢ় অন্ধকার,
সোঁ সোঁ ঘূর্নির শব্দ---প্রতিবেশীরা আমাকে একলা ফেলে
হয়তো বা  জীবনডাঙার দিকে ছুটে গেছে |
এখন ভীষণ তান্ডব নিয়ে, ভাঙাচোরা আসবাব চূর্ণ লন্ঠনের কাচ
বুকজোড়া সন্ত্রাস নিয়ে হা--হা  বারান্দায়
আমি বসে আছি | কোনো শব্দ নেই | কাকে ডাকব, কার নাম ধরে---

যেন সব তার ছিঁড়ে গেছে, বিধ্বস্ত হয়েছে সব দৃঢ় খুঁটিগুলি |

.                ****************   
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পশ্চিমবাংলা : ১৯৭১     
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ১৩.০৪.৭১ / রাত ১২টা


মাকে কারা তুলছে চিতায় এই নিশুতি অন্ধকারে
মুখোশ এঁটে শেষবিচারে


দিকদিগন্ত হারিয়ে এখন মধ্যযামে ঘোর কুয়াশা
সাত জুয়ারী খেলছে পাশা


এদের মধ্যে আমায় কেন ঠাউরে নিলে শ্মশানযাত্রী
দুচার বিন্দু জলের জন্য রোগীর মতো প্রবল আর্তি


আর কতকাল চলতে পারে
মাকে ওরা জটলা বেঁধে খুন করেছে রাজদুয়ারে

মুখের ফেনা ওপড়ানো চোখ রক্তে ভাসা নীল প্রতিমা
শুদ্ধ হতে
আমার হাতের আগুন চায়
অন্য পাশে মুখোশ এঁটে কোন বাহিনী দাঁড়িয়ে ঠায় ?

.                ****************   
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একের নামতা    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ০৬.০৭.৭১/  সকাল


এক  এক্ কে  এক
আয়না  তুলে  দেখ
অন্ধকারের  বাজ
ঠুকরে খেল  চাঁদ

দুই  এক্ কে  দুই
স্বপ্ন  কাটে  উই
মাথায় মাকড়সা
(তুই) হবিনে বাদশাহ্ ?

তিন এক্ কে তিন
তিন কোটি আলপিন
চামড়া শুঁকে শুঁকে
(বুকে) বেঁধায় মনের সুখে ?

চার  এক্ কে চার
মরা  নদীর  পার
ভীষণ  বালিয়াড়ি
(কারা) তুলেছে ঘরবাড়ি ?

পাঁচ  এক্ কে  পাঁচ
(তোর) কোঁচার খুটে কাঁচ
মাথার  শিরা ছিঁড়ে
নাই বা পেলি হীরে |

ছয় এক্ কে  ছয়
মিথ্যে  বরাভয়
আর  দেবে না কেউ
জলে  দারুণ  ঢেউ |

সাত এক্ কে সাত
সামনে গভীর রাত
সর্বনাশের বিষ
ঘনায়  অহর্নিশ |

আট এক্ কে আট
কপাট জোড়ে আঁট
(তোর) উঠোন ভরা জল
হাসছে যে খলখল |

নয় এক্ কে নয়
সব হল রে নয়ছয়
দিন রাত্তির দিন
আজ হারালো দূরবীন |

দশ এক্ কে দশ
নামল বুঝি ধ্বস
সামাল সামাল রব
ঊজার  হল সব |

.           ****************   
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কঠিন মৃগয়া    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ০৫.০৭.৭৪

তোমার তূণীরে ভরে ছিল না কি শব্দভেদী শর
.                ব্যবহার শেখো নি কখনো
.                 ধ্বনি শুনে ভেবেছিলে চিতল হরিণ
.                                আয়ুক্ষীণ
.                বালকের প্রাণ তাই ছিঁড়ে নিলে রক্তমাখা বাণে


অনভ্যাসে ভূলে যাও প্রতিদিন কবিতার স্তব্ধ কারুকলা
.                এ যে আরও কঠিন মৃগয়া
.     দীর্ঘ উপবাসে যে ভাবে শুকিয়ে আসে সুঠাম শরীর
.           মেদমজ্জা ঝরে যায়, একদিন হাড়ের প্রাচীর
.                        ভেদ করে উড়ে যায়  প্রাণ
.                                 কবিতার দান
.      সেভাবে কি পুড়ে যাবে সাম্প্রতিক নিঃসাড়শ্মশানে
.      শব্দ ছন্দ জ্বলবে না অলৌকিক যজ্ঞে সম্প্রদানে ?

.                ****************   
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সমাপন    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ০৪.০৬.৭৬


জল ঘোলা হয় , শুধু জল ঘোলা হয়
অন্ধ চাতালে বয়ে আনো কার শব
স্মৃতি না স্বপ্ন রাজপুত্রের মতো
চেনা চেনা খুব অথচ অপরিচিত
শ্মশানবন্ধু, তবু বলো হবে জয় ?

হাতে ছিল বুঝি সোনার পাথরবাটি ?
মড়কে পচছে বাসমতী ভালোবাসা
সজল শিকরে জেগে আছে কালনাগ
ভরা জ্যোত্স্নায় নির্ভুল তেজারতি
ফালা ফালা নীল নম্র শীতলপাটি

বেঁচে থাকা মানে সম্যক প্রণিপাত
তুমি তো মানো নি নষ্ট এ পরিভাষা
উমূল গাছে বৃথা রোজ জল ঢালা
কীট পতঙ্গ খুঁড়েছে পান্ডুলিপি
কোষে কোষে যার সন্ধি ও ধারাপাত

তার কাছে চাও রঙদেশলাই আলো ?
জলে ভাসে রাগ শ্রুতি ও স্বরগ্রাম
ধূলো জঞ্জালঠাসা ঘরে প্রজাপতি
পরাগ হারায়---- কটু গন্ধের ভাপে
সকলি ফুরালো, স্বপনপ্রায় ফুরালো !

.                ****************   
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ক্রমশঃ . . . .    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ০১.০২.৭৮

ক্রমশঃ হাতের থেকে সরে যায় অভিমানী হাত
ক্রমশঃ শরীর থেকে মুছে যায় বর্ণালি --- তাপ
জেগে থাকে বালিয়াড়ি আর দীর্ঘ শীতের কুয়াশা
অন্ধকারে ম্রিয়মান শূন্যতম স্টেশন মাস্টার
বুকের আড়ালে কিছু কাটাকুটি ক্ষয় বা ক্ষরণ
ফুসফুসে কেঁপে ওঠে অশ্রুহীন নীরক্ত বিকেল
মানুষের বোঝাপড়া ছদ্মবেশ মুখোশ মুকুট
শূন্য জাল হাতে জেলে সন্ধ্যাবেলা নদীর কিনারে

ক্রমশঃ চোখের থেকে ফিরে যায় চোখের অঞ্জলি
ক্রমশঃ ঘরের থেকে সরে যায় মানময়ী আলো
ক্রমশঃ পাড়ের থেকে দূরে যায় স্বপ্নের জাহাজ
পাথরে পাথর ঘষে জ্বলে না আগুন কোনোখানে
জ্যোত্স্নার ভিতরে কাঁপে পরিত্যক্ত জীর্ণ দালান
শব্দ জাগে না আর অন্তহীন সমাধি বাগানে |

.                ****************   
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
*
ছেঁড়া কাপড়ের ফাঁস   
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ১৭.০৩.৭৮


১.        দু হাতে জমেছে স্বেদ রক্ত ক্ষত
.        বরণডালার ঠিক মাঝখানে কালো মুখোশ
.        এভাবে চতুর্দিকে তৈরি হয় অবরোধ /   কাচ বসানো
.                                                পাথর প্রাচীর-----
.        মাঝরাতে ডুবে যায় ক্ষীয়মান চাঁদ
.        দূরে ধূ  ধূ শাদা অন্তহীন বালুস্তর ভেঙে হেঁটে
.                                    চলে ক্লান্ত উট দলছুট  
.                                                   একা


২.        বাঁচা মানে সুন্দর খাঁচা---- অধিকার-অনধিকারের
.                                              তাজা বোধ
.        বাঁচা মানে ফুটো নৌকো থেকে
.                        নিচু হয়ে অবিরাম রক্ত সেঁচে চলা
.        বাঁচা মানে ঘোরলাগা অন্ধকারে
.                                       লক্ষ্যভ্রষ্ট দেশলাই খোঁজা
.        বাঁচা মানে সার্থক জ্যামিতি
.                                    মাপজোখ ওজন হিসাব
.        বাঁচা মানে বিচক্ষণ সুশ্রী বোঝাপড়া

.                ****************   
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
২৮.০৭.৭৪
কবি পিনাকেশ সরকার


                         ১

অন্যমনস্ক দিন জেগে আছে বৃষ্টিভজা শেফালির ঠোঁটে
নিয়মের বর্শা-গাঁথা দিবসরজনী পার হয়ে
অপূর্ব লাস্যমুদ্রা ভেদ করে
এই দিন সজল সমাধিলেখা -------একা ভাসমান-------

                         ২
জ্যোত্স্নার ভিতরে আমি খুঁড়ে দেখব একদিন
তোমার কবর  :
বস্তুময় তোমার করোটি ভেঙে দেখে নেব
ক’ইঞ্চি মনীষা ছিল তাতে
একদা , সে বসন্তপ্রভাতে ?

                         ৩

আমর   পতন  আমার  শব্দ
আমার    হৃদয়   আমার  ভ্রান্তি
আমার    শিখর  আমার প্রাচীর
আমার   জীবন    আমার  রক্ত !

                         ৪

কী ভাবে প্রমাণ হয় অনন্ত ত্রিভুজ
.                  মানে
.            প্রেম ঘৃণা বশ্যতার আগ্নেয় তিন বাহু মেলে
.                   জ্বলতে দুটি সমকোণ ?

.                ****************   
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অভিষেক    
কবি পিনাকেশ সরকার
রচনা ২০.০৬.৭৯

.        ‘শব্দ সাজানো  শব্দ সাজানো
.        শুধু  এইটুকু  তপশ্চর্যা ?’
.        বলে দশজনে দশদিক থেকে
১        হো--হো  হেসে  ওঠে
.        ‘এইটুকু মোটে,  শুধু এতটুকু ?’
.        তবু চুপচাপ বধির পাথর
.        মাথা কুটলেও খোলে না দরজা !



.        পুরনো সম্রাট,
.        তোমাকে ফিরিয়ে আনতে
.        আমি কোন্ চিত্রকূট অবধি যাব ?
.        কাকে সাক্ষী মেনে /    আমি
২       তুলে ধরব নতুন নিশান ?
.        এতদিনে তোমার কিংখাবের রঙ হয়তো ফিকে
.        কনককিরীট থেকে খসে গেছে দ্যুতি
.        তবু
.        তোমাকে ফেরাতে চাই নিজস্ব রাজগৃহে
.        তোমাকে বসাতে চাই,  কেন্দ্রমনি,
.                        তোমারই একান্ত সিংহাসনে |

.                ****************   
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর