জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় কল্লোল পত্রিকার ১৩৩১ চৈত্র সংখ্যায়। কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা”-র (১৯৩২) কবিতা।
জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল--- ওরে ব্যর্থ ব্যথাতুর সে মিথ্যায় মত্ত হয়ে সত্য তোর ভোল্ | . ব্যথিত শ্বাসের বাষ্পে ইন্দ্রধনু রচি’ ইন্দ্রজালে, . যদি সে মৃত্যুর মরু-মরীচিকা সৃজিয়া সাজালে, . অনন্ত মৌনতা মাঝে কাতর দরদী . এক কণা সুর লাগি এত করি সাধিল সে যদি . সৃষ্টির পাণ্ডুর ওষ্ঠে শীতল তিক্ততা, . অন্তরের নির্মম রিক্ততা, . ক্ষণিকের অপ্রচুর শীর্ণ শুষ্ক . হাসির ছলনা দিয়া রাখিতে আবরি, . এত সকাতর ব্যর্থ চেষ্টা যার, . শুধু তার সকরুণ প্রেমটিরে স্মরি . আজি তবে সযতনে হাস্য টানি ব্যথাম্লান মুখে . নিদারুণ কপট কৌতুকে . রঙীন বিষের পাত্র ওষ্ঠে তুলি ধরি . যাব পান করি | অবিশ্বাসী প্রিয়ারেও অসঙ্কোচে দিব আলিঙ্গন, যে অধর করিল বঞ্চনা, তাহারেও করিব চুম্বন | যে আশার ম্লান দীপখানি তিমির রাত্রির তীরে আতঙ্কে শিহরি বহুক্ষণ নিভে গেছে জানি, ---তারি আলো আছে ,---করি ভান, কন্টকিত লক্ষ্যহীন পথে, নিরুদ্দেশে করিব প্রয়াণ, . মিথ্যা অভিযান |
যে প্রেম জীবনে কভু মুঞ্জরে না তারি মৃতমূলে সমস্ত জীবন-রস নিঙারিয়া সঁপি দিব জ্ঞাতসারে ভুলে . মর্মগ্রন্থি খুলে | ছল করি ভালোবাসি, জরা-শোক-জর্জরিত, মূল্যহীন এ মাটীর শখ, আগ্নেয় আয়ুর দ্বীপে ক্ষণকাল তরে, তার লাগি আয়োজিব মিথ্যা মহোত্সব | যদিও সকল হাস্য-ফেনপুঞ্জ-তলে জানি ক্ষুব্ধ ব্যথা সিন্ধু দোলে, যদিও অশ্রুর মূল্যে কোন স্বর্গ মিলিবে না জানি, হাসি অশ্রু উচ্ছলিত তবুও রঙীন, এ বিস্বাদ জীবনের বিষ-পাত্রখানি ওষ্ঠে তুলি ধরি, নিঃশেষিয়া যাব পান করি,-- শুধু তার সযতন অনুরাগ স্মরি, জীবন-শিয়রে বসি দোলা দেয় যে স্বপ্নসুন্দরী !
উদ্বেলিত যৌবনের সিন্ধুতীরে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ বৈশাখ ( মে ১৯২৫ ) সংখ্যার কবিতা। অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |
সুন্দর প্রভাতে একদিন, জীবনের নীল পারাবার তীরে, অকলঙ্ক পাল তুলি কযেছিল শৈশব আমার চলিলাম যৌবনের দেশে | সুপ্তিহীন সমুদ্রের গান অহরহ তারে ঘিরে ঘিরে ওঠে উচ্ছ্বসিয়া ; সেথা নিত্য আনন্দের মেলা সেথা চির নন্দনের খেলা |
তার পর একদিন পথহীন পারাবারে দিক্ ভ্রান্ত কৈশোর আমার কয়েছিল কাঁদি --কবে উতরিব সেই যৌবনের দেশে যেথা মায়া, যেথা সব বস্তহীন ছায়া যেথা শুধু স্বপনের মেলা ; যেথা মোর সব কান্না শুধু বিরহের, সব হাসি মিলনের শুধু ; যেথা প্রিয়া ব্যাকুল নয়ন মেলি জাগে চির প্রতীক্ষায় অন্তহীন যুগযুগান্তর ; বিরহের দীর্ঘশ্বাসে নিত্য উদ্বেলিয়া ওঠে অশান্ত সাগর | যেথা দিন ক্লান্তিহীন তন্দ্রাহীন রাত, যেথা কথা অশ্রান্ত প্রলাপ | ---আনন্দ যে ক্ষণে ক্ষণে পরিপূর্ণ আপনারে সহিতে না পারি গলে যায় আঁখিজলে, আঁখিজল মুক্তা হয়ে হাসে— প্রিয়া বিনা যেথা কিছু নাই | তাহারি প্রশান্ত প্রেম ফুটে আছে জলে স্থলে নিখিল ভুবনে অক্ষয় সৌরভে ভরা একটি অপূর্ব চাওয়া— পরিপূর্ণ পদ্ম একখানি | আজ সূর্য অস্ত যায় পশ্চিমের ছিন্ন রক্ত-মেঘের আড়ালে রক্তসিন্ধু স্থির অচঞ্চল মূর্ছাহত সীমাহীন বালুচর ! মন্দবায়ে ছিন্ন পাল তুলি ভগ্ন নায়ে ফিরে চায় জীবন আমার ফিরে চায় পশ্চাতের পানে | পূর্বের সীমান্ত রেখা মুছে যায় অন্ধকারে ধীরে --জীবনের যাত্রা হল শেষ | কি কহিতে চাহে আজি জীবন আমার— হিম-ওষ্ঠে কি কথা বাধিয়া যায় কঠিন নীহারে –- আরবার ফিরে চল হোথা ফিরে চল যৌবনের দেশে, প্রিয়ারে খুঁজিতে যেথা বিফলে কাটিয়া গেল দিন তবু প্রিয়া দেখা নাহি দিল চিনিতে হল না চেনা | যেথা তার সাথে বারবার নানা মত পরিচয় হল পলে পলে অনন্ত অশেষ ; তবু তৃপ্তি হল নাক হায় |
ফিরে চল উদ্বেলিত যৌবনের সিন্ধুতীরে হাসি কান্না ভুল ভ্রান্তি ভরা দীর্ঘ-নিশ্বাসের দেশে ; স্বপ্ন সত্য যেথা সত্য প্রিয়া যেথা প্রণয়ের জয় নিত্য ওঠে গানে গানে মৃত্যুর কল্লোল উল্লঙ্ঘিয়া | ---দীর্ঘ জীবনের মোর সমস্ত আশ্বাস ধন্য হল যে যৌবনে একটি ছোঁয়ায় শুধু একটি চাওয়ায় প্রাণের প্রিয়ার |
আজ আমি চ’লে যাই কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ শ্রাবণ ( অগাস্ট ১৯২৫ ) সংখ্যার কবিতা। অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |
. আজ আমি চ’লে যাই . চ’লে যাই তবে, . পৃথিবীর ভাই বোন্ মোর . গ্রহতারকার দেশে . সাথী মোর এই জীবনের . কেহ চেনা, কেহ বা অচেনা | . তোমাদের কাছ হতে চ’লে যাই তবে ; . কোথাও দু’ফোঁটা জল শুকাইবে ভূমিতলে . একটী করুণ শ্বাস মিশাইবে উতলা বাতাসে . আজ কয়ে যাব এক সন্ধান তাহার !
নীল আকাশের গ্রহে একটী প্রার্থনা মোর রেখে যাই শুধু রেখে যাই স্পন্দহীন বক্ষপুটে মৃত্যুম্লান মর্মকোষে মোর |
. যে কেহ আমার ভাই যে কেহ আমার ভগিনী, . এই ঊর্মি-উদ্বেলিত সাগরের গ্রহে . অপরূপ প্রভাত সন্ধ্যার গ্রহে এই . লহ শেষ শুভ ইচ্ছা মোর . বিদায় পরশ, ভালোবাসা, . আর তুমি লও মোর প্রিয়া . অনন্ত রহস্যময়ী . চিরকৌতূহল-জ্বালা . --- অসমাপ্ত চুম্বনখানিরে . তৃপ্তিহীন | . যদি প্রেম সত্য হয় . যদি সত্য হয় এই কান্নার সাধনা, . তবে আর বার . অদেখা আকাশে কোন্ . কোন্ নীহারিকাপুঞ্জে . নব সূর্য উদ্ভাসিত সে কোন্ সুন্দরী তারকায় . হবে কিরে পরিচয় . নাহি জানি ! . ---নয় এই অনাহূত নিষ্ঠুর বিদায় ! . আজ আমি চ’লে যাই— . যত দুঃখ সহিয়াছি . বহিয়াছি যত বোঝা পেয়েছি আঘাত . কাটায়েছি স্নেহহীন দিন . হয়ত বা বৃথা, . আজ কোন ক্ষোভ নাই তার তবে . কোনো অনুতাপ আজ রেখে নাহি যাই— . একটি আকাঙ্ক্ষা শুধু . জ্বেলে রেখে গেনু |
. আজো যারা আসে পিছে . অনাগত, পৃথিবীর ভ্রূণ-শিশু ত, . তারা যেন পৃথিবীরে এমন করিয়া নাহি দেখে | . আজ যারা বাসিতে পেল না ভালো . আমাদের চারিপাশে আজ যত প্রাণ . অন্যায় দারিদ্র্যে আর হীন লালসায় . অন্ধ পঙ্গু কাঁদে উষ্ণ অভিশাপে, . আজিকার মানবের যত গ্লানি পাপ . ---আমাদের সাথে যেন মোরা সব . মুছে লয়ে যাই . --- সব শাস্তি, সকল বেদনা | . যারা আজো জন্ম লয় নাই . তাহাদের প্রেম . ব্যর্থ নাহি হয় যেন এমন করিয়া. . লোভের ক্ষুধার ফাঁদে | . দেবতার দ্বার যেন তাহাদের তরে . আজিকার মত রোধ নাহি করে . স্বার্থ অসঙ্গত, কপটতা, মোহ, প্রবঞ্চনা, . হিংসা অন্ধকার | . পৃথিবী সুন্দর হয় যেন ; . দেবতার আশীর্বাদ লোভ যেন নাহি কেড়ে রাখে . স্বার্থ করে অন্যায় বন্টন | . প্রেম বিনা কারো জন্ম ব্যর্থ নাহি হয় যেন, . ছিঁড়ে যায় লালসার জাল . ধুয়ে যায় আজিকার সব ক্ষুদ্র মলিনতা | . দিকে দিকে কোটি গৃহ ভেঙ্গে পড়ে আজ . প্রচণ্ড লোলুপ এই মানবের বাসনার ঝড়ে ; . উপবাসী কাঁদে মাতা মোহমত্ত নারীর অন্তরে . কাঁদে প্রিয়া উত্পীড়িতা বারাঙ্গানা বুকে . দেবতা কাঁদেন ভাঙ্গা ঘরে |
পৃথিবীর ভাই-বোন মোর— . এই বিলাপের গ্রহে মোর কান্না রেখে যাই আজ . একটি বাসনা আর, পশ্চাতে আসিছে যারা . তারা যেন ধরণীর এ কলুষ দেখিতে না পায়— . মোদের চোখের জলে শেষ হোক সব তাপ গ্লানি . শেষ হোক্ মানব আত্মার এই কাতর কাকুতি . আমারে বেদনায় | . তারা যেন সবে ভালোবাসে |
সে কবে আমার মনে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ পৌষ ( জানুয়ারী ১৯২৬ ) সংখ্যার কবিতা। অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া | .
যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল বনহংসের প্রেমে আকাশ-পথের কোন্ সীমান্ত থেমে . সে কবে আমার মনে ; . ডুবেছে বিস্মরণে, আজি শুধু তার শূন্য নীড়টি ঘিরি হতাশ আশার উদাস অলস মৌমাছি মরে ফিরি |
বেদিয়ার মেয়ে মরু ছেড়ে হল মোতি-মহলের বাঁদি চঞ্চল চোখ্ ‘বোর্ খা’তে দিল বাঁধি . সে কবে আমার মনে ; . ডুবেছে বিস্মরণে | আজি শুধু তার ত্যক্ত জীর্ণ ঘরে পুরোনো স্মৃতির শ্রীহীন শুকানো পল্লব কাঁদি মরে |
ওরা ভয় পায় কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতাটি কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ মাঘ ( ফেব্রুয়ারী ১৯২৬ ) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা”-র (১৯৩২) কবিতা।
ওরা ভয় পায় ! ওরা চোখ বুজে থাকে, বলে মিথ্যা, সত্য, কিছু নাই— শুধু ফাঁকি, আর শুধু মায়া ; . এই আসা যাওয়া, আগে পাছে শুধু তার, অর্থহীন নিরুত্তর অন্ধকার শুধু !
আমার ভুবনে কিন্তু ফুল ফোটে ফল ফলে রোজ ঋতুগুলি আসে যায় গন্ধে গানে প্রাণে ভরপুর ! আগে পাছে আছে কি না কিছু খুঁজিবার নাহি অবসর | আছে যাহা, তাহারই পাছে, আমার দিবসরাত্রি ছোটে অনুক্ষণ ! আমার দিনের আলো, হেসে কাছে আসে, ভালোবেসে কথা কয় ; আমার রাত্রির সুপ্তি, কপোল পরশ করে ধীরে, বলে, নাহি ভয় !
সুদূরের আহ্বান কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র মেঘ বসু সংকলিত ও সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” ( ২০০৯ ) থেকে নেওয়া |
অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখিছে আপন নাম, . চেন কি তাদের ভাই দুই তুরঙ্গ জীবন-মৃত্যু জুড়ে তারা উদ্দাম, . দুয়েরি বল্গা নাই !
পৃথিবী বিশাল তারা জানিয়েছে, আকাশের সীনা নাই, ঘরের দোওয়াল তাই ফেটে চৌচির | প্রভঞ্জনের বিবাগী মনের দোলা লেগে নাচে ভাই, তাদের হৃদয়-সমুদ্র অস্থির !
বলি তবে ভাই, শোন তবে আজ বলি, অন্তরে আমি তাদেরই দলের দলী ; রক্তে আমার অমনি গতির নেশা ; নাশায় অগ্নি স্ফুরিছে যাহার, বিজলী ঠিকরে খুরে . আমি শুনিয়াছি সেই হয়রাজের হ্রেষা !
যে শেণিতধারা ঘুমায়ে কাটালো পুরুষ চতুর্দশ, দেখি আজো ভাই লাল তার রঙ, তাজা তার জৌলস ! আজো তার মাঝে শুনি সে প্রথম সাগরের আহ্বান ; করি অনুভব কল্পনাতীত সৃষ্টির ঊষা হ’তে, . তার জয় অভিযান |
সুশীতল ধারা নদীটি বহুক মন্থরে তব তীরে, গৃহবলিভুক্ পারাবতগুলি কূজন করুক ঘিরে, পালিত তরুর ছায়ে থাক ঢাকা তোমাদের গৃহখানি, স্তোত্র রচিও, যদি পার তব প্রিয়ার আঁখি বাখানি | . ছোট এই আশা, সুখ, ঈর্ষা করি না, ঘৃণা নহে ভাই, শুধু নহি উত্সুক |
মনের গ্রন্থি জটিল বড়ো যে খুলিতে সহে না তর ; সোহাগের ভাষা কখন শিখি যে নাই মোটে অবসর ; . শুনে কাল হল ভাই, অরণ্য-পথ গভীর গহন, সাগরের তল নাই |
অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখেছে আপন নাম, . আমি যে তাদের চিনি | দুই তুরঙ্গ তাহাদের রথে, উদ্ধত উদ্দাম, . ----শোনো তার শিঞ্জিনী |
মোদের লগ্ন-সপ্তম ভাই রবির অট্টহাসি, . জন্ম-তারকা হয়ে গেছে ধূমকেতু ! নৌকা মোদের নোঙর জানে না, . শুধু চলে স্রোতে ভাসি— . কেন যে বুঝি না, বুঝিতে চাহি না হেতু !
সবই জানলায় দেখা | তাই দিয়ে সব চাওয়া-পাওয়া, জীবিকা, জনন, জপ | জানলার ধারে দিন গোনা | আরো যদি বাতায়ন থাকে, খোঁজা বুঝি পণ্ডশ্রম | এক জানলারই মাপে গড়া চোখ কান ও চেতনা |
তবু বেগ যদি হতে পারি কখনও বিবাগী, অচলেরা চমকায় | বহু দূর চক্রবালে স্থির ধ্রুব পাহারেরা নড়ে | ট্রেনের কামরায় চোকাচোখি,-- মানে নেই, নেই পরিণাম, তবু মুহূর্ত মদির |
পাথুরে প্রান্তরে, নয় ফসলের ক্ষেত আগলানো, কিম্বা কারখানার সাক্ষী, যার যার নিজের স্টেশন | চেনা রাস্তা, চেনা বাড়ি, ঘড়ি ঠিক, কিন্তু ভুলচুক | কখনও ঝলকে শুধু আচমকা অন্য অন্বেষণ |
বিফল নায়ক কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড (এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |
অন্ধকারে ডুব দিয়ে নিরাময় হয় হয়তো কেউ কেউ চায় শুধু স্বচ্ছ আলো দিয়ে হৃদয় ধোয়াতে | আছে এক মূঢ়মতি আলো অন্ধকারে ভেদাভেদ বোঝে না যে, সাধে নাকো জীবনের নির্যাস চোয়াতে |
কালা ধলা ভাই আমার কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড (এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |
এ-পারেতে কালো রঙ বৃষ্টি পড়ে ঝম্ ঝম্ ও পারেতে গাছে শুধু লঙ্কা টুকটুক করে, কালা ধলা ভাই আমার মন কেমন করে ! মাঠে নাই পাকা ধান, মই দেব কি ? কাস্তে কোদাল থাকে আন, শান্ দিয়ে দি |
মুগুর হাতুড়ি দাও কাঁটা ঠুকে নেব হাসিমুখে ঠোঁটরাঙা পান খেয়ে দেব | নদীতে কাটালে বান, ডিঙি ভেঙে খান্ খান্ এ-বারেতে যাদুমনি কেমন করে যাই আবার জোয়ার এলে হবে না কামাই | . ঘরে আছে খুদকুঁড়ো . তাতে দিও নুনের গুঁড়ো . লঙ্কা দুটো ছিঁড়ে তাই— . চাঁদমুখে খাও | . বাদল গেলে দেব তোমায় . পুলি পোলাও |
মুখ কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড (এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |
একটা মুখ কাঁদায় হয়ে শীতের রাতে পথে অনাথ শিশু, মেলায় বাজিকরের খেলায় একটি মুখ মুখোশ প’রে হাসায় | . খেয়ার নায়ে ওপারে যেতে কবে যে কোন ভিড়ে একটা মুখ এক নিমেষে অকূল স্রোতে ভাসায় ! . কার সে মুখ, কার ? . জানে কি তারা-ছিটানো অন্ধকার !
সে মুখ যারা দেখে নি তারা জানে না জ্বালা নিদান যার নেই | শীতের দিনে পোহায় রোদ উঠোনে বসে আরামে কাঁথা গায়, . ঝুমকো লতা দেয়ালে তোলে, মরাই রাখে ভ’র, . ফল কি ফুল পাড়তে শুধু নাগাল ডাল নামায় | . হোক সে মুখ যার, . অনিদ রাতে কাঁপে না অন্ধকার |
সে মুখ যার পড়েছে চোখে ঘরে-ই থাকে যায় না সেও বনে, বসত করে পাঁচিল ঘিরে, হিসেব করে পুঁজি যা আছে ভাঙায় | . তবুও কোন হতাশ হাওয়া একটা ছেঁড়া ছায়া . তারার ছুঁচে সেলাই ক’রে রাত্রি জুড়ে টাঙায় | . কার সে ছায়া, কার ? . প্রাণেশ্বরী পরমা যন্ত্রণার |