প্রলাপ কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র উথ্বানপদ বিজলী সম্পাদিত “এপার বাংলা ওপার বাংলার ২০০ কবির ২০০ ছড়া ও কবিতা” ( ২০০৯ ) থেকে নেওয়া |
কক্ষনো বোলোনা কো বোসেদের বেচারে টুকটুকে ব্যাঙগুলো লাগে ভালো আচারে,-- জান নাকি বলে দিয়ে রামাটার হল কী ? শামলা মাথায় দিয়ে পরে শেষে নোলক-ই | গলা ধরে গেল তাই পেয়ে গেল রক্ষে নইলে দেখ্ তে জল বার হত চক্ষে ; একবার বেরুলে তো থামাতে হুকুম নেই, লাইসেন্স আছে যার শুধু জানি পারে সেই | লাইসেন্স পাওয়া সে—ও সোজা বড়ো কাজ নয় দাড়ি যদি না থাকে তো শাড়ি পরে যেতে হয় ; তাও শাড়ি পাবে কোথা বাজারে যে মাগ্ গি দরমা একটা পেলে জানবে যে ভাগ্যি | এত বকা মিছে হল, যেন রেগো নাকো ভাই বোসেদের বেচা বলে শুনছি যে কেউ নাই, না থাকে তো বয়ে গেল রামাটা তো আছে ঠিক নইলে ঘড়িটা কেন মিছে করে টিকটিক | ফিরিওলা কেন রোজ রাস্তায় হেঁকে যায় জল পড়ে পাতা নড়ে, কেন গোরু ঘাস খায় ? আকাশেতে আলু তবে ছোঁড়ে নাকো কেন লোক ? রোদ না উঠলে পরে কেন কাটে নাকো নখ--- এসব প্রমাণ বাপু কোথা দিয়ে এড়াবে, তার চেয়ে বাসে চড়ো, বেহালায় বেড়াবে, তর্ক তো সোজা নয় যদি চাও আঁটতে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ রোজ হবে ঘাঁটতে |
কাঠের সিঁড়ি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ডঃ ঝুমা রায়চৌধুরী সম্পাদিত “প্রিয় কবিতা ২” কবিতা সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
চওড়া কাঠের সিঁড়ি গেছে উঠে ঘুরে-ঘুরে অনেক উঁচুতে | ধাপগুলো মোড়া কার্পেটে, পুরানো নয়, কিন্তু উজ্জ্বলতাও তার নেই |
সিঁড়ির একটি বাঁকে টুলের ওপরে ব’সে থাকে সশস্ত্র প্রহরী | বসার ভঙ্গি তার কঠিন, মুখ নির্বিকার, যেন পাথরে কোঁদা |
সারাদিন সে থাকে বসে, যে কাঠের সিঁড়ি ওপরে গেছে উঠে তারই একটি বাঁকে |
সিঁড়ি দিয়ে ক্কচিৎ একটি-আধটি লোক নামে ভারী গম্ভীর আওয়াজ ক’রে, ঝলমলে ঊর্দিপরা বেয়ারারা নামে ওঠে মাঝে-মাঝে | শুধু প্রহরী থাকে ব’সে, আর কাটের টবে একটি পামের চারা তার সবুজ পাখার মতো পাতা বিছিয়ে থাকে |
বিশাল বাড়ির মোটা দেওয়াল ভেদ ক’রেও বাইরের আওয়াজ এসে পৌঁছয় | ট্রামের ঘর্ঘর, আর নগরের অস্পষ্ট গুঞ্জন আর রোদের আলো জানালার পুরু কাঁচের ভেতর দিয়ে ফিকে হ’য়ে গ’লে আসে |
পোষাকের তলায় প্রহরীর বুক কি ধুকপুক করে ? পামে চারার পাখা কি নড়ে কাঠের টবে ? বলা যায় না |
যে বিশাল সিঁড়ি আকাশের দিকে চেয়েছে উঠতে, তার তলায় তারা ব’সে থাকে ;--- কাঠের টবে পামের চারা আর কাঠের টুলে সশস্ত্র প্রহরী | তবু হতাশ আমি হই না |
জানি --- পামের চারার মধ্যে সংগোপন আছে অরণ্য ; কাঠের টবে একদিন তাকে ধরবে না ! কাঠের টুলে নিঃসঙ্গ জনতা আছে থেমে স্তব্ধ হ’য়ে ; একদিন তার স্থানুত্ব যাবে ঘুচে | শুধু কাঠের সিঁড়ি কোনোদিন পৌঁছবে না আকাশে |
কথা কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ডঃ ঝুমা রায়চৌধুরী সম্পাদিত “প্রিয় কবিতা ২” কবিতা সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
তারপরও কথা থাকে ; বৃষ্টি হয়ে গেলে পর ভিজে ঠাণ্ডা বাতাসের মাটি-মাখা গন্ধের মতন আবছায়া মেঘ-মেঘ কথা ; কে জানে তা কথা কিংবা কেঁপে-ওঠা রঙিন স্তব্ধতা |
সে কথা হবে না বলা তাকে ; শুধু প্রাণধারণের প্রতিজ্ঞা ও প্রয়াসের ফাঁকে-ফাঁকে অবাক হৃদয় আপনার সঙ্গে একা-একা সেই সব কুয়াশার মতো কথা কয় | অনেক আশ্চর্য কথা হয়তো বলেছি তার কানে | হৃদয়ের কতটুকু মানে তবু সে-কথায় ধরে !
তুষারের মতো যার ঝ’রে সব কথা কোন এক উত্তুঙ্গ শিখরে আবেগের | হাত দিয়ে হাত ছুঁই, কথা দিয়ে মন হাতরাই, তবু কারে কতটুকু পাই |
সব কথা হেরে গেলে তাই এক দীর্ঘশ্বাস বয়, বুঝি ভুলে কেঁপে ওঠে একবার নির্লিপ্ত সময়
তারপর জীবনের ফটলে ফাটলে কুয়াশা জড়ায়, কুয়াশার মতো কথা হৃদয়ের দিগন্তে ছড়ায় |
যদি ফিরে আসি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ডঃ ঝুমা রায়চৌধুরী সম্পাদিত “প্রিয় কবিতা ২” কবিতা (২০১৫) সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
ফের যদি ফিরে আসি ; ফিরে আসি যদি কোন শুভ্র শরতের অম্লান প্রভাতে, কিংবা কোনো নিদাঘের শুষ্ক রুক্ষ তপস্যার দ্বিপ্রহরে কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টি-ধরা ছিন্নমেঘ রাতে কোনো,--- নূতন ধরণী ‘পরে কারেও কি পারিব চিনিতে, কাহারেও পড়িবে কি মনে ? এ-জীবনে যাহাদের ভালোবাসিয়াছি আজ ভালোবাসি যাহাদের তাহাদের সাথে হবে দেখা ? --- পারিব চিনিতে ?
জন্ম লবো হয়তো সে কোন্ ঊর্মি-ছন্দোময়ী ফেনশীর্ষ সাগরের তীরে ডুবুরীর ঘরে, কিংবা কোন্ জীর্ণ ঘরে কোন্ বৃদ্ধ নগরীর নগণ্য পল্লীতে দীনা কোন্ পথের নটীর কোলে ; কিংবা --- কোথা, কিছু নাহি জানি | এই আলো সেদিন নয়নে জ্বলিবে কি ? এই তারা এই নীলাকাশ সম্ভাষিবে আর বার ? সেদিন কি এমনি ফুটিবে ফুল, এইমতো তৃণ জাগিবে কি পদতলে এইমতো পুঞ্জ-পুঞ্জ প্রাণ সমস্ত নিখিলময় ? পড়িবে কি মনে, এই আলো মোর চোখে একদিন লেগেছিল ভালো ; এই ধরণীর ‘পরে আমি খেলা করিয়াছি, . কাঁদিয়াছি হাসিয়াছি . ভালোবাসিয়াছি ? যে মুকুল আশাগুলি রেখে যাবো আজ জীবনের খেয়াঘাটে বিদায় সন্ধ্যায় অর্ধস্ফুট, তাহাদের সাথে আর হবে ফিরে দেখা ? এ জীবনে যত কাজ সাঙ্গ হ’ল নাকো, যত খেলা রয়ে গেল বাকি, ফিরে আর পাবো তাহাদের ?
আমার চোখের জল, মোর দীর্ঘশ্বাস, হতাশা, বেদনা, তাদের সাথে পুনঃ হবে পরিচয় ? যত দুঃখ ফেলে রেখে যাবো তাহারা শুধাবে ডেকে, ডেকে কহিবে কি প্রিয়া, “আমারে ভুলিয়া ছিলে কেমন করিয়া ?” আবার প্রিয়ার সাথে সুখে দুঃখে কাটিবে কি দিন, এমন করিয়া প্রতি জীবনের দণ্ড পল সুধাসিক্ত করি, আনন্দ ছড়ায়ে চারিদিকে, আনন্দ বিলায়ে সর্বজনে ? সকলেরে ভালোবেসে --- ভালোবেসে সব-কিছু দুর্দিনে নির্ভয় আর দুঃখে ক্লান্তিহীন চলিতে পাবো কি দুইজনে এক সাথে ?
ফের যদি ফিরে আসি, আরো আলো চক্ষে যেন আসি নিয়ে, বুকে আরো প্রেম যেন আনি পৃথিবীকে আরো যেন ভালো লাগে | এবারের মতো ভুল ভ্রান্তি স্খলন পতন ক্ষমায় ভুলিয়া আসি ; আরো আনি পথের পাথেয় আনন্দ অক্ষয় !
দু-পিঠে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ডঃ ঝুমা রায়চৌধুরী সম্পাদিত “প্রিয় কবিতা ২” কবিতা সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
সব মেঘ সরে যায় সব বৃষ্টি একদিন থামে | প্রচণ্ড দিনের দাহ . ভুলিয়ে দিতে অনিবার্য গাঢ় রাত্রি নামে |
জীবন তা বলে শুধু . এই নিত্য দোল-খাওয়া . ছন্দ মাত্র নয় | নদীর মতন শুধু . কেন দুটি তীরে বাঁধা . বয় না সময় !
যা দেখি যা জানি তার নিচে প্রাণের খোদাই চলে . মহামুক্তি মন্ত্র খোঁজা . সংগোপন সত্তামূল বীজে |
জানি তাই গভীর গহনে সময় প্রবাহ নয় শুধু | আলো ছায়া দুঃখ সুখ হৃদয়ের মেরু আর মরু— . শুধু অনুভূতি নয় . জীবনের লাভ আর ক্ষতির হিসাবে | এক পিঠে এ সত্তার সময় বাহিত . উদয়াস্ত ইতিহাস চলে, অন্য পিঠে খুঁজে ফিরি . নিজেকেই নিজের অতলে |
শত বর্ষ পরে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ডঃ ঝুমা রায়চৌধুরী সম্পাদিত “প্রিয় কবিতা ২” কবিতা সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
শত বর্ষ পরে, কে তোমার কবিতা পড়বে, . তাই করতে চেয়েছিলে কল্পনা, সে কল্পনা হয়ত তোমার ভুল |
বাতায়নে বসে সেই ভাবীকালের কোনো তরুণী তোমার কবিতার পাতা হয়ত ওল্টাবে না . অলস কৌতূহলে সময় বড় উদাসীন, বড় অচেতন | মেহগিনির মঞ্চ ‘পরে . পঞ্চ কি পঞ্চাশ হাজার . পুরানো পুঁথির স্তূপে তোমার সব মুদ্রিত রচনা . হয়তো শুধু হয়ে থাকবে . পণ্ডিত গবেষকদের প্রলোভন | . থাক্ না তাই | শুধু ছাপানো অক্ষরের বন্ধনে . পাঠ্য হবার পরমায়ু তোমার নয় |
শত বর্ষ পরেও তুমি থাকবে আকাশের নীলের আরেকটু গাঢ়তা হয়ে | . থাকবে, আমাদের কন্ঠের সুর . আর আমাদের ভাষার আনন্দদান ঝংকারে | যৌবনের চোখে তুমি তখন . অদম্য দিগন্ত-তৃষ্ণা, চির বিপ্লবের উত্তেজনা তার ধমনীর স্পন্দনে | সব অসাম্যের বিরুদ্ধে . তুমি এক শাশ্বত বজ্রকঠিন শপথ, অখণ্ড মানবতার দিশারী . এক প্রসন্ন উদার প্রশান্তি |