হঠাৎ যদি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “সেরা আবৃত্তির কবিতা সংগ্রহ” কবিতা সংকলন (২০১৫) থেকে নেওয়া |
আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা, করি গোটাকয়েক আইন জারি দু’এক জনায় খুব ক’ষে দিই সাজা |
মেঘগুলোকে করি হুকুম সব ছুটি তোদের, আজকে মহোত্সব | বৃষ্টি-ফোঁটার ফেলি চিকন চিক্ ঝুলিয়ে ঝালর ঢাকি চতুর্দিক, দিল্ দরিয়া মেজাজ ক’রে কই, বাজগুলো সব স্ফূর্তি ক’রে বাজা আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |
হাওয়ায় বলি, হল্লা ক’রে চল তারার বাতি নিভিয়ে দলে-দল, অন্ধকারে সত্যি কথার শেষে রাজকন্যা পদ্মাবতীর দেশে | ঘুমের পুরীর সেপাইগুলো পেলে, তাদের ধ’রে খুব ক’রে ক’ষে দিই সাজা | আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |
ওলট-পালট করি বিশ্বখানা ভাঙি যেথায় যত নিষেধ মানা ; মনের মতো কানুন করি ক’টা রাজা হওয়ার খুব ক’রে নিই ঘটা | সত্য তা সে যতই বড় হোক কঠোর হলে দিই তাদের সাজা | আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |
বইটই কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “সেরা আবৃত্তির কবিতা সংগ্রহ” কবিতা সংকলন (২০০৯) থেকে নেওয়া |
বই’ত পড়ো, টই পড়ো কি ? তাই’ত কাটি ছড়া | বই পড়া সব মিছেই যদি না হলো টই পড়া | টই পাওয়া যায় পড়তে কোথায় ? বলছি তবে শোনো বই-এর মাঝে-ই লুকিয়ে থাকে টই সে কোনো কোনো | আর পাবে টই, সকালবেলা বই থেকে মুখ তুলে হঠাৎ যদি বাইরে চেয়ে মনটা ওঠে দুলে | টই থাকে সব রোদ-ছোপানো গাছের ডালে পাতায় ; টই থাকে আর আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠের খাতায় | টই চমকায় বিজলি হয়ে আঁধার করা মেঘে ; খই হয়ে টই ফোটে দিঘির জলে বৃষ্টি লেগে | টই কাঁপে সব ছোট্ট পাখির রং বেরং-এর পাখায় ; খোকা খুকুর মুখে আবার মিষ্টি হাসি মাখায় | বই পড়ো খুব, যত পারো, সঙ্গে পড়ো টই ; টই নইলে থাকত কোথায় এতরকম বই |
কাক ডাকে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা ” কবিতা সংকলন (১৯৪০) থেকে নেওয়া |
খাঁখাঁ রোদ, নিস্তব্ধ দুপুর ; আকাশ উপুর ক’রে ঢেলে-দেওয়া . অসীম শূন্যতা, পৃথিবীর মাঠে আর মনে— তারই মাঝে শুনি ডাকে . শুষ্ককন্ঠ কাক ! গান নয়, সুর নয়, প্রেম, হিংসা, ক্ষুধা---কিছু নয়, ---সীমাহীন শূন্যতার শব্দমূর্তি শুধু |
মানুষের কথা বুঝি শুনেছি সকলই ; মনের অরণ্যে যত হাওয়া তোলে কথার মর্মর, ---বেদনা ও ভালোবাসা উদ্দীপনা, আশা ও আক্রোশ, জেনেছি সমস্ত দোলা | সব ঝড় পার হয়ে, আছে এক শব্দের নীলিমা, অন্তহীন, নিষ্কম্প্র, নির্মল |
কোথায় কাদের ছাদে সমস্ত দুপুর কাক ডাকে, শুনি | বোঝা আর বোঝাবার প্রাণান্ত ক্লান্তির শেষে অকস্মাৎ খুলে যায় আশ্চর্য কবাট | কাক ডাকে, আর, সে-শব্দের ধুধু-করা অপার বিস্তার হৃদয়ে ছড়ায় সব শব্দের অতীত ধ্যান-গাঢ় প্রশান্তির মতো |
আবার বিকেল হবে, রোদ যাবে প’ড়ে মানুষ মুখর হবে মাঠে আর ঘরে | বোঝাপড়া লেনদেন প্রত্যহের প্রসঙ্গ প্রচুর মন জুড়ে রবে | ক্ষণে-ক্ষণে তবু সব সুর কেটে দিতে পারে এক কাক-ডাকা গহন দুপুর | সমস্ত অর্থের গ্রন্থি ধীরে ধীরে খুলে, প্রত্যহের ভাষা তার সব ভার ভুলে, উত্তরিতে পারে এক নিষ্কম্প্র নিথর নভোনীল অপার বিস্ময়ে |
সে কি শুধু লোভ, শুধু ভোগীর লালসা | স্ফীতদন্ত অক্ষমের ? এ-সবের কিছু বুঝি নয় | দানবীর দুর্বলতা, দেবতার দুর্বোধ বিস্ময় !
সীতারে পারো না ছুঁতে ! ছলবল সমস্ত কৌশল নিজেই বিফল করে | শেষ তার সম্মতি-ভিক্ষায় ! হৃদয়ের এ সম্মানে রামায়ণ অন্য দীপ্তি পায় |
ছোট ভীরু হাত দিয়ে জীবনের মাপ নিয়ে যারা নীড় বেঁধে নিরাপদ সঞ্চয়ের কড়ি কটা গোনে | ঈর্ষায় হিংসায় তোমার বিশাল মূর্তি তারা চিরদিন পঙ্কলিপ্ত করে তো করুক | এ-সবের বহু ঊর্দ্ধে তুমি অন্য আকাশে উন্মুখ | শুধু এক দিক চিনে জীবনেরে ক’রো না খণ্ডিত, দশদিক হ’তে আলো অসংকোচে করো অন্বেযণ . তুমি তাই সত্য দশানন |
তার পরে চাই তোমার নয়নে, তুমিও চেও ; . ---ঘরের বাতিটি জ্বালা হয় নাই, আধো আঁধার | যা দেখিব তার রাশ যেন সেথা কি রয়েছেও, . মনে হবে যেন চোখের সাগর, সেও অপার |
যদি খুশি হয়, কাছে সরে এসো, বাড়ায়ে হাত . হাতটি ধরিও, আর মাথাটিরে হেলায়ে দিও ; সুবাসিত চুল, সেই হবে মোর গহন রাত, . কপালের টিপে পাব প্রিয়তম তারকাটিও |
নিকট পৃথিবী ঘিরে থাক, আর যা কিছু চেনা, . তাই দিয়ে রাখি শূন্য আকাশ আড়াল করি ; মুহূর্তগুলি মন্থন করি উঠে যে ফেনা . তাহারি নেশায় সব সংশয় রব পাশরি’ |
সীমাহীন ধাধা ধূ-ধূ করে সখী উপরে নীচে, . রচ নীরন্ধ্র গাঢ় চেতনার ক্ষণিক নীড় ; স্বপ্নহরণ মহাকাশ হোথা নিঃশ্বসিছে, . এই ক্ষণ-সুখ-প্রত্যয় তাই হোক নিবিড় |
ছাদে যেওনাক, সেখানে আকাশ অনেক বড়, . সীমানা-হীন | তারাদের চোখে এত জিজ্ঞাসা,---স্বপন সব . হবে বিলীন ||
একটি ইটের ব্যবধান রেখে পাশাপাশি থাকি শুয়ে ; এ ছাতের জল ও ছাতে গড়ায় ভিৎ গাড়া একই ভূঁয়ে | ওইখানে শেষ ; তার পরে আঁটা জানালা কবাট দুটি | . ভাড়াটে কুঠি ||
শুধু কোনো দিন সঙ্গবিহীন বিদ্রোহ করে প্রাণ ; কঠিন দেয়ালে করাঘাত করে ঘুচাইতে ব্যবধান | ঘোচে না আড়াল, ব্যাকুল হৃদয় মিছে মরে মাথা কুটি ! . ভাড়াটে কুঠি ||
বিরাট সেতু সে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
বিরাট সেতু সে এধারের সাথে ওধার জুড়িতে চায়, . সে সেতু হয়েছ পার ? এ-ধারে তাহার আলো জ্বলে না ক’ ওধারে অন্ধকার ; . --- সেতু সে বৃহদাকার !
এধারে যাহার মাটির দম্ভ, ওধারে মাটির মায়া, . পদতলে যার অশ্রুর মত জল, সে সেতু নহে ক’ বিবাহ দেয়নি এপারে ওপারে ভাই, . রাখিবন্ধন নহে, শুধু শৃঙ্খল ; এধারে ওধারে জুড়ে দিতে চায় কঠিন বাঁধনে ভাই— . সেতু সে বিপুল-বল !
. ফুল হ’তে ফলে যে গোপন সেতু --- . জানি রহস্য তার ; . তারা হ’তে তারা’ যে সেতু উতরে . লঙ্ঘি অন্ধকার, . তারা সন্ধান মেলে কিছু কিছু --- . নিশীথ রাত্র ভরি ; . শুধু এ সেতুর হেতু জানি না কো . উতরিতে ভয়ে মরি |
সব কিছু সে যে পার হয়ে চলে তবু কোথা নাহি পার, . তীর নাহি মিলে সেতু সে নিরুদ্দেশ ! কঠিন বাঁধনে সব কিছু বাঁধে তবু লাগে না ক’ জোড়া, . যোজনার মাঝে বেদনার রহে রেশ ! সূর্য্যের পানে উদ্ধত তার যাত্রার শুরু ভাই, . অতল আঁধারে উৎরাই তার শেষ !
বিরাট সেতু সে লঙ্ঘিতে চায় শিশির-কণিকাটিরে . সে সেতু হয়েছ পার ? এধারে তাহার বন্ধ্যা ধরণী, অন্ধ আকাশ শিরে, . ----সেতু সে ব্যর্থতার ?