দেবতার জন্ম হ’ল কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
দেবতার জন্ম হ’ল | দেবতার জন্ম হল সুপবিত্র সুন্দর প্রভাতে মাটির কোলের পরে— মার বুকে, বিধাতার আশীর্ব্বাদ লয়ে |
এমনি আমার ভগবান বার বার জন্ম ল’ন মার বুকে সুপবিত্র ধরণীর কোলে | তার পর চেয়ে দেখি – কোথা মোর ভগবান ? জীর্ণ গৃহ, আবর্জ্জনা চারিদিকে, তার মাঝে আলোহীন বায়ুহীন কক্ষে, ছিন্ন শয্যা পরে শুয়ে রোগ-রুক্ষ ক্ষুধা-ক্ষীণ দেহ লয়ে দেবতা আমার ফেলে দীর্ঘশ্বাস ! আলোকের দেবতার আলো নাহি মিলে, মিলে না ক’ বায়ু | রজনীর লক্ষ্য তারা চেয়ে চেয়ে খোঁজে আর কাঁদে— দেবতারে খুঁজে নাহি পায় |
কিম্বা দেখি— চিনিতে না পারি ; আমার দেবতা এ কি ? কলুষ-বীভত্স মুখ, দৃষ্টিভরা পাপে, অঙ্গে অঙ্গে চিহ্ন কলঙ্কের— ---মার কোলে জন্ম যার জন্ম যার এ পবিত্র মৃত্তিকার ‘পরে
এ আমার, এ তোমার, এ যে সর্ব্ব মানবের পাপ দেবতার আলো করি চুরি, অন্ন রাখি কেড়ে, শাস্তি তাই যায় বেড়ে বেড়ে দিনে দিনে | যত জন্ম ব্যর্থ করি দেবতার, যত প্রাণ পুষ্টি বিনা মরে, মানবের যাত্রা পথে, তত জমে সুবিপুল বাধা আবর্জ্জনা |
দেবতার ব্যর্থ জন্ম ! ---সেই অশ্রু জমে আর জমে বিধাতার নেত্রকোণে ; যত গ্লানি মানবের হতেছে সঞ্চয় সেই অশ্রু-প্লাবনের ভাঙ্গন ধারায় মুছে যাবে কোন্ দিন | সেই দিন হব শুচি |
. আজ . বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী মোর ভগবান কাঁদে, . কাঁদে কোটি মার কোলে অন্নহীন ভগবান মোর ; . আর কাঁদে পাতকীর বুকে . ভগবান প্রেমের কাঙ্গাল ! ---এক দিন মার কোলে জন্ম লয়ে, শিরে লয়ে মার স্নেহাশিস, আর দিন সুন্দর আমার স্বার্থে লোভে ক্রূরতায়, হিংসায় প্রচণ্ড লালসায় কুৎসিত, জঘন্য, ভয়ঙ্কর মানবের পুরী হতে, পঙ্কমাখা, শীর্ণ, ক্ষীণ, হিংসায় বিক্ষত, কদাকার, লালসা-জর্জ্জর, বিদায় লইয়া যান, একটি করুণ শুধু রাখি দীর্ঘশ্বাস |
মানুষের মানে চাই কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
. মানুষের মানে চাই— . ----গোটা মানুষের মানে ! . রক্ত, মাংস, হাড়, মেদ, মজ্জা, . ক্ষুধা, তৃষ্ণা, লোভ, কাম, হিংসা সমেত--- . গোটা মানুষের মানে চাই | . মানুষ সব-কিছুর মানে খুঁজে হয়রান হ’ল— এবার চাই মানুষের মানে--- নইলে যে সৃষ্টির ব্যাখ্যা হয় না ! এই নিখিল-রচনার অর্থ মানুষের অর্থকে . আশ্রয় করে’ আছে যে-- ! . তাই, তোমারও মানে চাই আর আমার | দূর নীহারিকায় নব নক্ষত্র যে জন্মলাভ করছে . সেই অর্থের ভরসায় ! . সে অর্থ কি মাটিতে লুটিয়ে চলে ? মানুষের মানে কি কাফ্রী-ক্রীতদাস ? ---হারেমের খোজা ? মানুষের মুখ চেয়ে যে পৃথিবীর এই অক্লান্ত আবর্ত্তন ! তার অর্থ কি হিংস্র নখরাঘাতে সৃষ্টি বিদারণ করে’ চলে . রক্ত লোলুপতার অভিযানে ? মানুষের মানে কি ল্যাংড়া তৈমুর ?---হূণ আত্তিলা ? . মানুষের মানে কি শুধু বুদ্ধ ? – শুধু খৃষ্ট ? . তবু কাফ্রী-ক্রীতদাসও ত মানুষ— মানবীর গর্ভ হতেই তৈমুরের জন্ম, বুদ্ধ খৃষ্ট দেবতা ছিলেন না | মানুষ কি তাঁর সৃষ্টির মাঝে বিধাতার নিজের জিজ্ঞাসা ? তাই কি মহাকালের পাতায় তার অর্থ কেবলি লেখা আর . মোছা চলছে ? . *************************** . সূচীতে . . .
মনে করি ভাল বাসব কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
মনে করি ভাল বাসব | শপথ করি এ জীবন হবে প্রেমের তপস্যা | প্রভাতের আলোকে চোখ থেকে বুকে নিমন্ত্রণ করি | মানুষের কোলাহল চলাচল ভালো লাগে | ---দূর আকাশে চিলগুলি অদ়ৃশ্য বৃত্ত রচনা করে, ছোট নদীটির ঘোলাটে জল তার অজস্র জঞ্জাল নিয়ে বয়ে যায়, গরু ও মোষের গাড়ীগুলি মন্থর ভাবে যাতায়াত করে ; কাকের কোলাহল, ফেরিওয়ালার হাঁক, দুটি দুরন্ত ছেলের ঝগড়া, পাখীর ডানার শব্দ শুনতে পাই | আমায় ঘিরে জীবনের স্রোত বয় এবং আমি সেই স্রোতের স্পর্শ হৃদয়ে সানন্দে অনুভব করি | আসুক দুর্দ্দিন, মনে করি শপথ রক্ষা হবে | প্রিয়ার দৃষ্টি আছে সম্বল, আছে বন্ধুর প্রেম, কত জননীর অযাচিত স্নেহ ! কত দেশে কত অজানা মানুষের চোখে যে দেবতাকে দেখলাম | বিদ্রোহ আমি করব না, জীবনকে আমি তিক্তমুখে . অভিশাপ দেব না, যে শেষ নিশ্বাসটি পৃথিবীকে দিয়ে যাব তাতে বিষ থাকবে না, থাকবে শুধু চিরকালের নব সূর্য্যোদয়ের জন্যে চিরন্তন প্রণতি, ভ্রূণ ভবিষ্যতের জন্যে শ্বাশত আশীর্ব্বাদ | তারপর একদিন জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখি আকাশ অন্ধ হয়ে গেছে ; মত্যু-পথ-যাত্রী প্রিয়া শীর্ণ দুর্ব্বল শিথিল বাহু দিয়ে . আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করে বলে, “আমি তোমায় ছেড়ে যাব না, আমায় রাখ |” অসহায় বন্ধু বলে, “অন্ধকারে তোমার হাত খুঁজে পাচ্ছি না বন্ধু | ভাঙ্গা দেওয়ালের ফাটলে একটি ঘাসের গুছি অনেক দিন জীবনের জন্য যুঝেছিল— প্রতিদিন দেখতাম কী তার প্রাণান্ত প্রয়াস একটি পুষ্পিত প্রশাখা প্রসারিত করবার জন্যে, একদিন বুঝি একটি ফিকে বেগুনি রঙের ছোট্ট ফুল ফুটেছিল, কিন্তু মূল তখন দেউলে হয়ে গেছে ;-- সব শুকিয়ে হলুদ হয়ে গেল | পথ দিয়ে আসতে আসতে দেখি নির্ম্মল শিশুর দল ক’টা ইঁদুরছানা ধরে তাদের বলি দিয়ে উল্লাস করছে—কি সরল পৈশাচিকতা ! সৃষ্টির মূলেই যে নির্ব্বিকার নির্ম্মমতা | দেখি মৃত্যুর শিয়রে নেওয়া চিত্র-বিলাপের শপথ শাপ হয়ে ওঠে, শুনি বৃদ্ধ তার যৌবনের প্রেম নিয়ে পরিহাস করছে | --জীবনকে কি ঘিরে আছে একটি বিপুল প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ ?
আজ এই রাস্তায় গান গাইব কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
আজ এই রাস্তায় গান গাইব, --- এই নগরের শিরা উপশিরার এই রাস্তার ধূলির গান ! ---তার কাঁকর, তার খোয়া তার পাথরের— আজ কিছু তুচ্ছ নয় | ভাঙ্গা পেরেক ; ঘোড়ার খুরের নাল, ছেঁড়া কাগজ, কাঠি, পাতা কিছু তুচ্ছ নয় ! আজ এই রাস্তায় গান গাইব, যে রাস্তা গেছে আমার ঘরের পাশ দিয়ে— তার দিনের জনস্রোতের তার নিশীথের নির্জ্জনতার, তার বৈচিত্র্যের, তার চাঞ্চল্যের, তার অবসাদের, তার একঘেয়েমির ! তার গ্যাসের বাতির কাঁচে প্রভাতে যে আলোটি চুম্বন করে, তার টেলিগ্রামের তারে বসে যে শালিকটি দোলা খায়, যে বৃদ্ধ মুটেটি ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে তার ধূলির ওপর দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মোট বয়ে নিয়ে যায়, যে দুরন্ত শিশুটি তার ধূলি জমা ক’রে খেলা করে, পথিকদের বিরক্ত করে ও তাদের তিরস্কারে হাসে, সন্ধ্যা ও সকালে যে শ্রমিকের দল আনাগোনা করে, তার কিনারায় একটি জীর্ণ ঘরে যে পীরিত বৃদ্ধ সারাদিন তার জলের কলে যে সব কুলী যুবতীরা জল নেয়, ঝগড়া করে, কৌতুক করে, কুটিল দৃষ্টি হানে আর উচ্চ হাস্য করে | সমস্ত দিন ও রাত্রি ধরে যত পথিক যত কথা কয়ে যায়, তার কারখানা থেকে যত কোলাহল শব্দ ওঠে যত ধূর্ম ওঠে তার কারখানা-কলের আকাশস্পর্শী চিম্ নি থেকে,-- সব কিছুর ! যত কিছুর ! এ জীবন ধরে এই পথটিতে যা কিছু দেখেছি, শুনেছি, ভালবেসেছি, -- সব কিছুর গান গাইব | তার সঙ্গে গান গাইব মানুষের যে মানুষ পথ সৃষ্টি করেছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবার পথ ! অরণ্যে পথ আছে | শ্বাপদেরা যে পথ দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ তৈরী করেছে বন মাড়িয়ে মাড়িয়ে শিকারের চেষ্টায় আর জলের অন্বেষণে ---মৃত তৃণের পথ ! সে পথ হিংসার, সে পথ ক্ষুধার, সে পথ কামের | মানুষ প্রথম মৃত লতা-গুল্ম-তৃণের একটি অবিচ্ছিন্ন রেখা সৃষ্টি করেছিল – কবে ? –-কেন ? আমি বলি প্রীতিতে | মানুষ প্রথম পথ সৃষ্টি করেছিল মানুষের সঙ্গে মেলাবার জন্যে তাকে নমস্কার ! সে পথ আরো বিস্তৃত হোক, যে পথ মানুষকে বৃহৎ করেছে |
সমস্ত পথের গান গাইব, সোজা ও বাঁকা, সরু আর চওড়া—অশেষ অসীম, কারণ সব পথের মোহানায় যে আমার আসন, সব পথ এসে মিলেছে এই আমার মেলায়, যে পথ গেছে উত্তর মেরুতে আর যে পথ গেছে দক্ষিণ মেরুতে, যে পথ গেছে সাহারায়, আর যে পথ গেছে কাঞ্চনজঙ্ঘায় ! যে পথ গেছে প্রিয়ার হৃদয়ে – আর যে পথ মানুষের দুর্দ্ধর্ষ দুরাশার— আর অসম্ভব কল্পনার ! আমি পথ সৃষ্টি করি— সব পথই আমার | আমি সেই নবসৃষ্টির গান গাইব | আমি শুধু শিলা দিয়ে রাস্তা বানাই না— শুধু লোহা ও লকড়ি দিয়ে নয়, শুধু পেশীর বল আর শ্রমের ঘর্ম্ম দিয়ে নয়— আমি পথ বানাই মর্ম্ম দিয়ে---প্রাণ দিয়ে— আমি পথ বানালাম পাহাড় চিরে, আমি নদী ডিঙিয়ে গেলাম,-- আমি সাগর বেঁধে দিলাম, বাতাস জিনে নিলাম, আমি যুগ থেকে যুগান্তরে দেশ থেকে দেশান্তরে মনের সড়ক তৈরী করলাম, আমার তবু থামা হবে না | পথই যে আমার প্রাণ—আমার অসীম পথের পিপাসা | শিশু পৃথিবীর কোন্ অনতিগভীর কবোষ্ণ সাগরে আমার প্রথম ক্ষীণ পদচিহ্ন পাবে, অসীম সাগরের বালুকার পারে, তারপর ধরণীর প্রতি স্তরের ধাপে ধাপে আমি উঠে এলাম,--- অসীম অমর জীবান্ত | . নিখিলের বিস্ময় | . দূরতম নক্ষত্রের পথ আমি খুঁজি আজ |
. সব পথ-সৃষ্টির একই প্রেরণা | যে পথে পুষ্পের সুগন্ধ মৌমাছিদের নিমন্ত্রণ করতে বেরোয় ; . আর যে পথে মহাজনদের সওদা আসে নগরের হাটে ; . যে পথে যাযার হংসবলাকা আসে আকাশকে . শুভ্র পক্ষের কল হাস্যে সচকিত করে ; . আর যে পথে পৃথিবীর অন্ধকার জঠর হ’তে . মজুরেরা কয়লা তুলে আনে, . আর ধাতু আর হীরক -----সে প্রেরণা জীবন . এই পথ সৃষ্টিতেই জীবনের সার্থকতা ! এই পথ জীবনকে বৃহৎ করে বৃহত্তর ঘনিষ্ঠতার বন্ধনে ; . নিশ্চিত হতে অনিশ্চিতে, নীড় হতে আকাশে . তার অশেষ অভিযানে | . এই পথ জীবনকে মুক্তি দেয়—অসমাপ্ত অসীমতায় | . এই পথে জীবনের বন্ধনের ছন্দ | . এই পথে জীবনের মুক্তির আনন্দ |
পায়ের শব্দ শুনতে পাও কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |
পায়ের শব্দ শুনতে পাও ? . নিযুত নগ্ন পায়ের মহাসঙ্গীত | . মলিন কোর্ত্তাপরা কারখানার কুলি আসছে আজ অসঙ্কোচে . আর রাস্তার মূর্খ মজুর, . জাহাজের খালাসী আর পথের মুটে— . বিশ্ব-মানবের মিছিলে আজ মিল্ ল এসে . এ কোন্ অপ্রত্যাশিত পূত বন্যা ! . পঙ্কিল বলে ঘৃণা কর্ বে আজ কে ? . কলুষিত ব’লে কে নাসিকা কুঞ্চিত করবে ? . তফাৎ যাও ! . জরাজর্জ্জর দেহে তাজা রক্তের স্রোত বইল ; . বদ্ধজলে মৃত্যুর জীবাণু বংশ বিস্তার ক’রছিল, . আজ প্রাণের বিপুল বেগে সাফ হ’য়ে গেল . বনেদি জঞ্জাল, সনাতন ধাপ্পাবাজি ; রাজ্ পথের ধূলি আজ তাদের নগ্ন সবল চরণ আলিঙ্গন করে . ধন্য হ’ল | . কলের কুলি আর মাঠের চাষা, রাস্তার মুটে . আর কারখানার মজুর--- . পাল্কি চড়ে চড়ে কার পা পঙ্গু হয়ে গেছে,-- . আজ ওই নগ্ন সবল পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে চল | . মাথায় পা দিয়ে দিয়ে কার পা ভারী হ’ল . পাপের ভারে— . ওই পুণ্য পথের ধূলায় নামাও সে ভার | . আজ পাঁওদল, চলে নবজাগ্রত ভয়মুক্ত মানবের দল, . তার সাথে পাঁওদল, চলেছেন মানবের দেবতা |
. আজ যদি চোখে জল আসে . সে কি দুর্ব্বলতা ? . ওই কালিমাখা শ্রম-কঠোর ঘর্ম্মাক্ত দেহখানি . আলিঙ্গনের লোভে . বাহু যদি আপনা হ’তে প্রসারিত হয় . সে কি লজ্জার কথা ! . দেবতা যে পাঁওদল চলেছেন ওই— . নগ্ন পদ কুলিদের সাথে ভাই--- . তিনি যে আজ আহ্বান করেছেন ওই পথের ধূলায় –