কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
*
জীবন-বিধাতা আজি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


জীবন-বিধাতা আজি বিদ্রোহীর লহ নমস্কার !
লহ এই প্রীতিহীন প্রণিপাতখানি |

.        ক্রীতদাস মানবের মৃত্যু-পুর হ’তে
.        আজি কমণ্ডলু ভরি’
.        আনিয়াছি স্বেদ ও শোণিত,
.                         --পূত পূজা-বারি |
.        
.        আনিয়াছি পুঞ্জিত কালিমা
.                লেপিতে ললাটে তব চন্দন বিহনে,--
.                        পূজা তব আজি বিপরীত !
.        বিশ্বজোড়া হাহাকারে বাজে আজ নব-স্ত্রোত তব,
.                        অভিনব স্তুতি ;
চিতাগ্নিতে অপরূপ আরতি তোমার,
.                        ভস্মশেষে নৈবেদ্য নূতন |

নশ্বর মৃত্তিকা গেহে,
জর্জ্জর তৃষিত দীন, যত নরনারী,
ধূলির মলিন অঙ্কে ধূলিসম শেষে,
বিদায় লইয়া গেল
গোপনে ফেলিয়া অশ্রুবারি ;
তাহাদের সব ব্যথা, সব গ্লানি, জ্বালা, অভিশাপ,
পাপ, তাপ, লজ্জা, ভয়, কুন্ঠা ও ক্রন্দন,
প্রতি ক্ষুদ্র দিবস-রাত্রির ঘৃণিত জীবন-যাত্রা,--
কলঙ্ক হতাশা আর কদর্য্য কলুষ,

.        সযতনে করিয়া চয়ন,
.        এ মোর প্রণামখানি করিনু বয়ন |
.                        সেই নমস্কার,
তোমারে অর্পিনু আজি হে জীবন-বিধাতা আমার !

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেবতার জন্ম হ’ল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


দেবতার জন্ম হ’ল |
দেবতার জন্ম হল সুপবিত্র সুন্দর প্রভাতে
মাটির কোলের পরে—
মার বুকে,
বিধাতার আশীর্ব্বাদ লয়ে |

এমনি আমার ভগবান
বার বার জন্ম ল’ন মার বুকে
সুপবিত্র ধরণীর কোলে |
তার পর চেয়ে দেখি –
কোথা মোর ভগবান ?
জীর্ণ গৃহ, আবর্জ্জনা চারিদিকে,
তার মাঝে আলোহীন বায়ুহীন কক্ষে,
ছিন্ন শয্যা পরে শুয়ে
রোগ-রুক্ষ ক্ষুধা-ক্ষীণ দেহ লয়ে
দেবতা আমার
ফেলে দীর্ঘশ্বাস !
আলোকের দেবতার আলো নাহি মিলে,
মিলে না ক’ বায়ু |
রজনীর লক্ষ্য তারা চেয়ে চেয়ে খোঁজে আর কাঁদে—
দেবতারে খুঁজে নাহি পায় |

কিম্বা দেখি—
চিনিতে না পারি ;
আমার দেবতা এ কি ?
কলুষ-বীভত্স মুখ,
দৃষ্টিভরা পাপে,
অঙ্গে অঙ্গে চিহ্ন কলঙ্কের—
---মার কোলে জন্ম যার
জন্ম যার এ পবিত্র মৃত্তিকার ‘পরে

কার পাপ নিজেরে শুধাই—
মোর ভগবান হল অন্নের কাঙ্গাল,
বিকৃত কুৎসিত আর আত্মায় বামন,
রুদ্ধ-বৃদ্ধি বুভুক্ষিত কদাকার প্রাণ !
কার পাপ ?

এ আমার, এ তোমার, এ যে সর্ব্ব মানবের পাপ
দেবতার আলো করি চুরি,
অন্ন রাখি কেড়ে,
শাস্তি তাই যায় বেড়ে বেড়ে দিনে দিনে |
যত জন্ম ব্যর্থ করি দেবতার,
যত প্রাণ পুষ্টি বিনা মরে,
মানবের যাত্রা পথে,
তত জমে সুবিপুল বাধা আবর্জ্জনা |

দেবতার ব্যর্থ জন্ম !
---সেই অশ্রু জমে আর জমে
বিধাতার নেত্রকোণে ;
যত গ্লানি মানবের হতেছে সঞ্চয়
সেই অশ্রু-প্লাবনের ভাঙ্গন ধারায়
মুছে যাবে কোন্ দিন |
সেই দিন হব শুচি |

.        আজ
.        বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী মোর ভগবান কাঁদে,
.        কাঁদে কোটি মার কোলে অন্নহীন ভগবান মোর ;
.        আর কাঁদে পাতকীর বুকে
.        ভগবান প্রেমের কাঙ্গাল !
---এক দিন মার কোলে জন্ম লয়ে, শিরে লয়ে মার স্নেহাশিস,
আর দিন সুন্দর আমার
স্বার্থে লোভে ক্রূরতায়, হিংসায় প্রচণ্ড লালসায়
কুৎসিত, জঘন্য, ভয়ঙ্কর মানবের পুরী হতে,
পঙ্কমাখা, শীর্ণ, ক্ষীণ, হিংসায় বিক্ষত,
কদাকার, লালসা-জর্জ্জর,
বিদায় লইয়া যান,
একটি করুণ শুধু রাখি দীর্ঘশ্বাস |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবন-মহাদেবের নৃত্য
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস্, শুনিস্ কিরে কানে ?
.                মুগ্ধ কবি মগ্ন মোহের গানে !
বত্সহারা কোন্ সাহারা হাহা করে, কোথায় হাহা করে,
কোন্ সাগরে ঝড় উঠেছে, মেঘ-গরুড়ে আকাশ আড়াল করে ;
.                    আবার কোথায় অন্ কি ওড়ে বন্ধ নালার জলে,
.                    চড়ুই দুটি বাঁধ্ ছে বাসা কড়িকাঠের তলে !
বিসুবিয়াস্ বিষ খেয়ে কে উগ্ রে তোলে আগুন উগ্ রে তোলে,
গ্রহ-তারার ঘূর্ণিপাকে মাথা ঘুরে উল্কা পড়ে টলে ;
.                     আবার কোথায় মাকড়শাতে বুন্ ছে বসে জাল,
.                      মহুয়া-বন মাৎ করে ওই মৌমাছিদের পাল !

জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস্ , শুনিস্ কিরে কানে ?
.                        মুগ্ধ কবি মগ্ন মোহর গানে !
পুচ্ছে-বাঁধা অনল-জ্বালায় ধূমকেতু কে ছট্ ফটিয়ে ছোটে,
প্রবসব্যথায় কাঁদিয়ে আঁধার, আকাশ ফেটে নতুন তারা ফোটে ;
.                    আবার কোথায় মৌটুস্ কি টুস্ কি মারে ফুলে,
.                    প্রজাপতি হলুদ-ক্ষেতে বেড়ায় দুলে দুলে !
তেপান্তরে লাগ্ ল আগুন—ছুব্ লে আকাশ খুব্ লে নিলে আঁখি,
সৃষ্টিখানার ঝুঁটি ধরে কোন্ সে দানো দিচ্ছে কোথা ঝাঁকি ;
.        আবার কোথায় রোদ উঁকি দেয় পাতায় চিকের ফাঁকে,
.        কাঠবেরালির চমক্ লাগে বনশালিকের ডাকে |

জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস্, শুনিস্ কিরে কানে ?
.                মুগ্ধ কবি মগ্ন মোহের গানে !
বাঁজা ডাঙ্গায় লড়াই বাধে, হাজার দাঁতে কাম্ ড়ে ছেঁড়ে টুঁটি
লক্ষ খুনীর খুন চেপেছে, কবন্ধ ধড় খাচ্ছে লুটোপুটি ;
.                 আবার কোথায় নিশীথ রাতে প্রদীপ মিটমিটি,
.                 রুদ্ধ-নিশাস পড়ছে বধূ প্রিয়তমের চিঠি |
বোল্ হাঙ্গরের লাগল গাঁদি, জাহাজ ডোবে ডুবো পাহাড় লেগে,
কোন্ দেশেতে লাগল মড়ক, ভাগাড় আঁধার শুক্ নি-ঝাঁকের মেঘে,
.                  আবার কোথায় হাঁস চরে ওই শ্যাওলা-দীঘির ঘাটে
.                    ঝিউড়ি মেয়ে ঘস্ তেছে পা খেজুর-গুঁড়ির পাটে

জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস, শুনিস্ কিরে কানে ?
.                মুগ্ধ কবি মগ্ন মোহের গানে !
তাতা থিয়া, তাতা থিয়া---ঠোকাঠুকি নীহারিকার মালায়,
তাতা থিয়া,---সিন্ধু নাচে বক্ষে জ্বালা বাড়বানল-জ্বালায়
.                  তারি সাথে যুগে যুগে দোলে, দোলে, দোলে,
.                 নটরাজের নাচন্ চির-নারী-মাতার কোলে |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দ্বার খোল, খোল দ্বার
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


“দ্বার খোল, খোল দ্বার, রাত্রির প্রহরী !”
---কেঁদে কয় হতভাগ্য নিঃস্বন্বল মানবের দল,
কেঁদে কয় দিকে দিকে নিযুত জীবন |

অন্নে যে ভরে না বুক,
তৃষা যে অতৃপ্ত থেকে যায়,
প্রাণ আলো চায় !
শূন্য ক্ষণগুলি
অকাজের সহস্র জঞ্জালে ভরিয়া তুলিতে নারি,
আর ভালো নাহি লাগে |
দ্বার খোলো হে প্রহরী,
আনো নব ঊষালোক,
সঞ্জীবিত কর আজ নূতন অমৃতে,
নব-সৃষ্টি-গুঞ্জন-মুখর, ধরাতলে জন্ম দাও |

মোর মাঝে কোন্ প্রাণ-মহানন্দ
ছুটিয়াছে অন্তহীন অসীমের লাগি,
তাহারে চিনাও |
আবর্ত্তে ঘুরিয়া মরে অন্ধ মোর বন্ধ প্রাণধারা,
বেদনায় সারা,
তাহারে দেখাও পথ—
দ্বার খোল, খোল রাত্রির প্রহরী !
শুনেছ কি, শুনেছ কি অন্ধকার রন্ধ্র করি’
আলোকের আর্ত্তস্বর, কাঁদে প্রতি তারকায়
কাঁদে সারানিশি !
তারে মুক্তি দাও |

যাহা আছে তাহা আছে ঢাকি,
যাহা পাই ভার হয়ে থাকে—
সত্যেরে চিনিব কোন্ ফাঁকে ?
হে প্রহরী, হানো অসি নিশার মরমে,---
যুগ যুগান্তের এই সঞ্চিত আঁধার কেটে যাক্
বেদনার উষ্ণ রক্তধারে ;
রক্ত-পারাবার হতে উদ্বোধন হোক্ আজ নূতন ঊষার |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সার্সীতে জল-সারেঙ বাজে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


সার্সীতে জল-সারেঙ বাজে,
.        পথ আজি নির্জ্জন :
বাদলা-পোকার ফুর্ত্তি নিয়ে
.        জাপানি লন্ঠন !

কদম্বে আজ শিথিল রেণু
.        সুবাসে ভুর-ভুর,
বর্ষাশেষের বাদল বাজায়
.        আজ বেহায়া সুর !

ঘরের কোণে ঝাপ্ সা আলোয়
.        জমকালো মজলিস
চেঁচিয়ে কথা কইতে বাধে
.        ---আট-ফোটা ফিস্ ফিস্ |

ঘাঘ্ রী বিনা কাজরী নাহি
.        নেইক কাজল কালো,
দুটি প্রাণীর মজ্ লিসই আজ
.        সবার চেয়ে ভালো |

বীণার তারে মর্ চে-ধরা
.        কাজ কি পাড়াপাড়ি ;
আজকে নীরব ঠোঁটের সাথে
.        ঠোঁটের কাড়াকাড়ি !

মেঘলা-মোহ ধরে যে আজ
.        কপোত-কূজনে,
বর্ষাশেষের বেহায়া রেশ
.        শুন্ ছি দুজনে !

চিকুর চেয়ে চম্ কে দেবে
.        করো না চিক্ ফাঁক,
আজ দেওয়ানা দেয়ার শোন
.        দিল-দরদী ডাক !

দরিয়াতে আজ কই দাদুরি—
.        হয়রান সব চুপ ;
মেঘলা দিন আজ দাঁড় ফেলে যায়
.        আঁধারে ঝুপ ঝুপ !

বাদলা-পোকার পাত্লা পাখা
.        পড়ছে খসে খসে,
সার্সিতে জল সারেঙ বাজে
.        শুন্ ছি বসে বসে |--

হাল্ কা বেণীর বন্ধনী আজ
.        আল্ গা করেই রাখ,
শুধু শীতল অধর দিয়ে
.        নীরব চুমা আঁকা |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এস নারী
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


.        এস নারী,
.        আজ তব কানে কানে,
.        কই কথা প্রাণে প্রাণে ;---
.        সৃজন-রহস্য-কথা
.  ----নিখিলের আদিম বারতা |

.                যৌবনের মায়ালোকে
অনাদি ক্ষুধার সেই অনির্ব্বাণ জ্বালা নিয়ে চোখে
.            এস নারী, আরো কাছে এস
বুকে বুক রেখে শুধু ক্ষণিকের তরে মোহ ভরে ভালোবেসো |

.                  চুপে চুপে যে কথাটি
.                  শিখাইছে মাটি
.                  প্রতি নবাঙ্কুরে,
ইঙ্গিতে যে কথাটিরে গ্রহতারা বলে ঘুরে ঘুরে
.                   আলোকের অর্দ্ধস্ফুট সুরে,
.                   সৃষ্টির প্রথম-প্রাতে বিধাতার মনে
.                   যে-কথাটি ছিল সঙ্গোপনে,
.                   সে গোপন বারতাটি করিব প্রকাশ,
এস নারী, এল আজ জীবনের দখিনা-বাতাস |

.                    মুখে নয়, শুধু বুকে বুক দিয়ে নয়,
.                ব্যাঞ্জনা-ব্যাকুল সর্ব্ব অঙ্গ মোর মন প্রাণ দিয়ে
.                শিখাইব সে রহস্য প্রিয়ে !
.                জানিবার দুরন্ত আগ্রহে
তোমারও দেহের মাঝে শোণিতের বন্যাবেগ বহে !
যৌবন-সুষমা তব, এ যে সেই বাসনার ভাষা !
এরি মাঝে জেগে আছে নিখিলের অনির্ব্বাণ আশা |

.                এই তব হেঁয়ালি ভাষায়
.        সৃষ্টির কামনাখানি নবরূপে ফুটে পুনরায় |
.                        ভয়ঙ্কর ভুখে,
এস নারী অই তব তনুলতা নিষ্পেষিয়া বুকে
.                   কই মোর রহস্য-বারতা ;
জন্মে জন্মে এ দেহের প্রতি অণু-পরমাণু মাঝে বহিয়া
.                                                 এনেছি যেই কথা,
সে বাণী সুগন্ধ করিয়া অগণন ফাল্গুনের সুরভি নিঃশ্বাসে,
রঞ্জিয়া বিচিত্র বর্ণে, সিক্ত করি সঙ্গীতের আনন্দ নির্য্যাসে,
.                      রূপে রসে অপরূপ করি’
কই ধীরে, --- দেহমন এ জীবন --- উঠুক শিহরি !

.                    হে প্রিয়া আমার—
.    তবু যদি আরো কিছু রয়ে যায় বাকি,
.                    অসমাপ্ত যায় কিছু থাকি,
হাস্যে তব, লাস্যে তব, ছলনায় কৌশলে কলায়,
সৌন্দর্য্যের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ করি’ দুলাইয়া আবেগ দোলায়
ধাঁধিয়া কটাক্ষপাতে, বাঁধিয়া অচ্ছেদ্য মায়া-ফাঁসে,
সমস্ত চেতনা হরি’ মগ্ন করি’ আলিঙ্গনে, কুহক বিলাসে
.                    উদ্ ভ্রান্ত করিয়া মোরে করিয়া বিহ্বল,
.                        লুটে নিও সকল সম্বল |

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানে চাই
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


.        মানুষের মানে চাই—
.        ----গোটা মানুষের মানে !
.        রক্ত, মাংস, হাড়, মেদ, মজ্জা,
.        ক্ষুধা, তৃষ্ণা, লোভ, কাম, হিংসা সমেত---
.        গোটা মানুষের মানে চাই |
.        মানুষ সব-কিছুর মানে খুঁজে হয়রান হ’ল—
এবার চাই মানুষের মানে--- নইলে যে সৃষ্টির ব্যাখ্যা হয় না !
এই নিখিল-রচনার অর্থ মানুষের অর্থকে
.                                        আশ্রয় করে’ আছে যে-- !
.        তাই, তোমারও মানে চাই আর আমার |
দূর নীহারিকায় নব নক্ষত্র যে জন্মলাভ করছে
.                                        সেই অর্থের ভরসায় !
.                সে অর্থ কি মাটিতে লুটিয়ে চলে ?
মানুষের মানে কি কাফ্রী-ক্রীতদাস ? ---হারেমের খোজা ?
মানুষের মুখ চেয়ে যে পৃথিবীর এই অক্লান্ত আবর্ত্তন !
তার অর্থ কি হিংস্র নখরাঘাতে সৃষ্টি বিদারণ করে’ চলে
.                   রক্ত লোলুপতার অভিযানে ?
মানুষের মানে কি ল্যাংড়া তৈমুর ?---হূণ আত্তিলা ?
.                মানুষের মানে কি শুধু বুদ্ধ ? – শুধু খৃষ্ট ?
.                তবু কাফ্রী-ক্রীতদাসও ত মানুষ—
মানবীর গর্ভ হতেই তৈমুরের জন্ম, বুদ্ধ খৃষ্ট দেবতা ছিলেন না |
মানুষ কি তাঁর সৃষ্টির মাঝে বিধাতার নিজের জিজ্ঞাসা ?
তাই কি মহাকালের পাতায় তার অর্থ কেবলি লেখা আর
.                                             মোছা চলছে ?
.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মনে করি ভাল বাসব
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


মনে করি ভাল বাসব |
শপথ করি এ জীবন হবে প্রেমের তপস্যা |
প্রভাতের আলোকে চোখ থেকে বুকে নিমন্ত্রণ করি |
মানুষের কোলাহল চলাচল ভালো লাগে |
---দূর আকাশে চিলগুলি অদ়ৃশ্য বৃত্ত রচনা করে,
ছোট নদীটির ঘোলাটে জল তার অজস্র জঞ্জাল নিয়ে বয়ে যায়,
গরু ও মোষের গাড়ীগুলি মন্থর ভাবে যাতায়াত করে ;
কাকের কোলাহল, ফেরিওয়ালার হাঁক, দুটি দুরন্ত ছেলের ঝগড়া,
পাখীর ডানার শব্দ শুনতে পাই |
আমায় ঘিরে জীবনের স্রোত বয় এবং আমি সেই
স্রোতের স্পর্শ হৃদয়ে সানন্দে অনুভব করি |
আসুক দুর্দ্দিন, মনে করি শপথ রক্ষা হবে |
প্রিয়ার দৃষ্টি আছে সম্বল, আছে বন্ধুর প্রেম,
কত জননীর অযাচিত স্নেহ !
কত দেশে কত অজানা মানুষের চোখে যে দেবতাকে দেখলাম |
বিদ্রোহ আমি করব না, জীবনকে আমি তিক্তমুখে
.                                                অভিশাপ দেব না,
যে শেষ নিশ্বাসটি পৃথিবীকে দিয়ে যাব তাতে বিষ থাকবে না,
থাকবে শুধু চিরকালের নব সূর্য্যোদয়ের জন্যে চিরন্তন প্রণতি,
ভ্রূণ ভবিষ্যতের জন্যে শ্বাশত আশীর্ব্বাদ |
তারপর একদিন জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখি
আকাশ অন্ধ হয়ে গেছে ;
মত্যু-পথ-যাত্রী প্রিয়া শীর্ণ দুর্ব্বল শিথিল বাহু দিয়ে
.                                        আঁকড়ে ধরবার
চেষ্টা করে বলে, “আমি তোমায় ছেড়ে যাব না, আমায় রাখ |”
অসহায় বন্ধু বলে, “অন্ধকারে তোমার হাত খুঁজে পাচ্ছি না বন্ধু |
ভাঙ্গা দেওয়ালের ফাটলে একটি ঘাসের গুছি
অনেক দিন জীবনের জন্য যুঝেছিল—
প্রতিদিন দেখতাম কী তার প্রাণান্ত প্রয়াস
একটি পুষ্পিত প্রশাখা প্রসারিত করবার জন্যে,
একদিন বুঝি একটি ফিকে বেগুনি রঙের ছোট্ট ফুল ফুটেছিল,
কিন্তু মূল তখন দেউলে হয়ে গেছে ;--
সব শুকিয়ে হলুদ হয়ে গেল |
পথ দিয়ে আসতে আসতে দেখি নির্ম্মল শিশুর দল
ক’টা ইঁদুরছানা ধরে
তাদের বলি দিয়ে উল্লাস করছে—কি সরল পৈশাচিকতা !
সৃষ্টির মূলেই যে নির্ব্বিকার নির্ম্মমতা |
দেখি মৃত্যুর শিয়রে নেওয়া চিত্র-বিলাপের শপথ শাপ হয়ে ওঠে,
শুনি বৃদ্ধ তার যৌবনের প্রেম নিয়ে পরিহাস করছে |
--জীবনকে কি ঘিরে আছে একটি বিপুল প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ ?

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজ এই রাস্তায় গান গাইব
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


আজ এই রাস্তায় গান গাইব, --- এই নগরের শিরা উপশিরার
এই রাস্তার ধূলির গান !
---তার কাঁকর, তার খোয়া তার পাথরের—
আজ কিছু তুচ্ছ নয় |
ভাঙ্গা পেরেক ; ঘোড়ার খুরের নাল,
ছেঁড়া কাগজ, কাঠি, পাতা কিছু তুচ্ছ নয় !
আজ এই রাস্তায় গান গাইব,
যে রাস্তা গেছে আমার ঘরের পাশ দিয়ে—
তার দিনের জনস্রোতের তার নিশীথের নির্জ্জনতার,
তার বৈচিত্র্যের, তার চাঞ্চল্যের,
তার অবসাদের, তার একঘেয়েমির !
তার গ্যাসের বাতির কাঁচে প্রভাতে যে আলোটি চুম্বন করে,
তার টেলিগ্রামের তারে বসে যে শালিকটি দোলা খায়,
যে বৃদ্ধ মুটেটি ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে
তার ধূলির ওপর দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মোট বয়ে নিয়ে যায়,
যে দুরন্ত শিশুটি তার ধূলি জমা ক’রে খেলা করে,
পথিকদের বিরক্ত করে ও তাদের তিরস্কারে হাসে,
সন্ধ্যা ও সকালে যে শ্রমিকের দল আনাগোনা করে,
তার কিনারায় একটি জীর্ণ ঘরে
যে পীরিত বৃদ্ধ সারাদিন
তার জলের কলে যে সব কুলী যুবতীরা
জল নেয়, ঝগড়া করে, কৌতুক করে,
কুটিল দৃষ্টি হানে আর উচ্চ হাস্য করে |
সমস্ত দিন ও রাত্রি ধরে যত পথিক
যত কথা কয়ে যায়,
তার কারখানা থেকে যত কোলাহল শব্দ ওঠে
যত ধূর্ম ওঠে তার কারখানা-কলের
আকাশস্পর্শী চিম্ নি থেকে,--
সব কিছুর ! যত কিছুর !
এ জীবন ধরে এই পথটিতে যা কিছু দেখেছি,
শুনেছি, ভালবেসেছি, -- সব কিছুর গান গাইব |
তার সঙ্গে গান গাইব মানুষের
যে মানুষ পথ সৃষ্টি করেছে,
মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবার পথ !
অরণ্যে পথ আছে |
শ্বাপদেরা যে পথ দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ
তৈরী করেছে বন মাড়িয়ে মাড়িয়ে
শিকারের চেষ্টায় আর জলের অন্বেষণে
---মৃত তৃণের পথ !
সে পথ হিংসার, সে পথ ক্ষুধার, সে পথ কামের |
মানুষ প্রথম মৃত লতা-গুল্ম-তৃণের একটি
অবিচ্ছিন্ন রেখা সৃষ্টি করেছিল – কবে ? –-কেন ?
আমি বলি প্রীতিতে |
মানুষ প্রথম পথ সৃষ্টি করেছিল মানুষের সঙ্গে মেলাবার জন্যে
তাকে নমস্কার !
সে পথ আরো বিস্তৃত হোক,
যে পথ মানুষকে বৃহৎ করেছে |

সমস্ত পথের গান গাইব,
সোজা ও বাঁকা, সরু আর চওড়া—অশেষ অসীম,
কারণ সব পথের মোহানায় যে আমার আসন,
সব পথ এসে মিলেছে এই আমার মেলায়,
যে পথ গেছে উত্তর মেরুতে আর যে পথ গেছে
দক্ষিণ মেরুতে, যে পথ গেছে সাহারায়,
আর যে পথ গেছে কাঞ্চনজঙ্ঘায় !
যে পথ গেছে প্রিয়ার হৃদয়ে –
আর যে পথ মানুষের দুর্দ্ধর্ষ দুরাশার—
আর অসম্ভব কল্পনার !
আমি পথ সৃষ্টি করি—
সব পথই আমার |
আমি সেই নবসৃষ্টির গান গাইব |
আমি শুধু শিলা দিয়ে রাস্তা বানাই না—
শুধু লোহা ও লকড়ি দিয়ে নয়,
শুধু পেশীর বল আর শ্রমের ঘর্ম্ম দিয়ে নয়—
আমি পথ বানাই মর্ম্ম দিয়ে---প্রাণ দিয়ে—
আমি পথ বানালাম পাহাড় চিরে,
আমি নদী ডিঙিয়ে গেলাম,-- আমি সাগর বেঁধে দিলাম,
বাতাস জিনে নিলাম,
আমি যুগ থেকে যুগান্তরে দেশ থেকে দেশান্তরে
মনের সড়ক তৈরী করলাম,
আমার তবু থামা হবে না |
পথই যে আমার প্রাণ—আমার অসীম পথের পিপাসা |
শিশু পৃথিবীর কোন্ অনতিগভীর কবোষ্ণ সাগরে
আমার প্রথম ক্ষীণ পদচিহ্ন পাবে,
অসীম সাগরের বালুকার পারে,
তারপর ধরণীর প্রতি স্তরের ধাপে ধাপে আমি
উঠে এলাম,--- অসীম অমর জীবান্ত |
.        নিখিলের বিস্ময় |
.        দূরতম নক্ষত্রের পথ আমি খুঁজি আজ |

.        সব পথ-সৃষ্টির একই প্রেরণা |
যে পথে পুষ্পের সুগন্ধ মৌমাছিদের নিমন্ত্রণ করতে বেরোয় ;
.        আর যে পথে মহাজনদের সওদা আসে নগরের হাটে ;
.        যে পথে যাযার হংসবলাকা আসে আকাশকে
.        শুভ্র পক্ষের কল হাস্যে সচকিত করে ;
.        আর যে পথে পৃথিবীর অন্ধকার জঠর হ’তে
.        মজুরেরা কয়লা তুলে আনে,
.        আর ধাতু আর হীরক -----সে প্রেরণা জীবন
.        এই পথ সৃষ্টিতেই জীবনের সার্থকতা !
এই পথ জীবনকে বৃহৎ করে বৃহত্তর ঘনিষ্ঠতার বন্ধনে ;
.        নিশ্চিত হতে অনিশ্চিতে, নীড় হতে আকাশে
.        তার অশেষ অভিযানে |
.        এই পথ জীবনকে মুক্তি দেয়—অসমাপ্ত অসীমতায় |
.                এই পথে জীবনের বন্ধনের ছন্দ |
.                এই পথে জীবনের মুক্তির আনন্দ |

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পায়ের শব্দ শুনতে পাও
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


পায়ের শব্দ শুনতে পাও ?
.                নিযুত নগ্ন পায়ের মহাসঙ্গীত |
.        মলিন কোর্ত্তাপরা কারখানার কুলি আসছে আজ অসঙ্কোচে
.                আর রাস্তার মূর্খ মজুর,
.                জাহাজের খালাসী আর পথের মুটে—
.                বিশ্ব-মানবের মিছিলে আজ মিল্ ল এসে
.                এ কোন্ অপ্রত্যাশিত পূত বন্যা !
.                পঙ্কিল বলে ঘৃণা কর্ বে আজ কে ?
.                কলুষিত ব’লে কে নাসিকা কুঞ্চিত করবে ?
.                তফাৎ যাও !
.        জরাজর্জ্জর দেহে তাজা রক্তের স্রোত বইল ;
.        বদ্ধজলে মৃত্যুর জীবাণু বংশ বিস্তার ক’রছিল,
.        আজ প্রাণের বিপুল বেগে সাফ হ’য়ে গেল
.                বনেদি জঞ্জাল, সনাতন ধাপ্পাবাজি ;
রাজ্ পথের ধূলি আজ তাদের নগ্ন সবল চরণ আলিঙ্গন করে
.                                                          ধন্য হ’ল |
.        কলের কুলি আর মাঠের চাষা, রাস্তার মুটে
.                আর কারখানার মজুর---
.                পাল্কি চড়ে চড়ে কার পা পঙ্গু হয়ে গেছে,--
.                আজ ওই নগ্ন সবল পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে চল |
.                মাথায় পা দিয়ে দিয়ে কার পা ভারী হ’ল
.                পাপের ভারে—
.                ওই পুণ্য পথের ধূলায় নামাও সে ভার |
.        আজ পাঁওদল, চলে নবজাগ্রত ভয়মুক্ত মানবের দল,
.                তার সাথে পাঁওদল, চলেছেন মানবের দেবতা |

.                আজ যদি চোখে জল আসে
.                সে কি দুর্ব্বলতা ?
.        ওই কালিমাখা শ্রম-কঠোর ঘর্ম্মাক্ত দেহখানি
.                আলিঙ্গনের লোভে
.                বাহু যদি আপনা হ’তে প্রসারিত হয়
.                সে কি লজ্জার কথা !
.                দেবতা যে পাঁওদল চলেছেন ওই—
.                নগ্ন পদ কুলিদের সাথে ভাই---
.                তিনি যে আজ আহ্বান করেছেন ওই পথের ধূলায় –

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর