কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
*
কালো দীঘি জল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


কালো দীঘি জল, তারি সুশীতল মায়া তব দুটি চোখে ;
.                     ও দেহে শ্রাবন-মেঘেছায়া ফেলিল কে !
.                                তুমি যেন শর্ব্বরী,
.                                তারকার স্নেহ হরি’
.                      নেমেছ আসিয়া নীরবে হৃদয়-তীরে,
দূর দিগন্তে নভোসীমন্তে আঁকি শশী লেখাটিরে |

কুমারী কোরক যে আলোকে জাগে, স্মিতমুখে তব ক্ষরে ;
.                        পাখীরা ঘুমায় স্নিগ্ধ তোমার স্বরে |
.                                তনুর লাবণী সনে,
.                                দেখিয়াছি পড়ে মনে,
.                        হরিৎ-ধান্য-ব্যাকুল গ্রামের সীমা,
কানন-কন্ঠ-লগ্না নদীর মনোহর ভঙ্গিমা |

ধুধু প্রান্তর তোমার প্রণয়ে হ’ল ছোট প্রাঙ্গন ;
.                    দীপ হতে করে, বহ্নি আকিঞ্চন |
.                                তব মমতায় ঘিরে,
.                                অসীম আকাশ-তীরে,
.                     সীমার ধরণী গড়ি মোরা অক্ষয় |
তুমি আছ তাই গৃহদীপ সনে তারকারা কথা কয় |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তৃতীয় প্রহরে চাঁদ উঠেছিল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


তৃতীয় প্রহরে চাঁদ উঠেছিল নগর-শিখর ছুঁয়ে ;
.                     তুমি তারি মত মোর পরে ছিলে নুয়ে,
.                                কহ নাই কোন কথা |
.                             বাণীহীন ব্যাকুলতা,
.                      কেঁপেছিল শুধু নত আঁখি-পল্লবে
কৃশ শশাঙ্ক-লেখা সম যবে দেখা দিল মোর নভে !

সেদিন যে-কথা কহিতে পারনি, আজ কেন বৃথা মন
.                          তাহারি অর্থ খুঁজে মরে অকারণ !
.                               কেন মিছে ভাবি বসি,
.                                শুখায়েছে যে সরসি
.    তারি কমলের কি ছিল মর্ম্ম-কোষে !
প্রভাতী তারার ইসারা খুঁজিতে কেন চাহি এ প্রদোষে !

জ্যোত্স্নাধারায় আকাশের চোখে আজো যে লেগেছে নেশা ;
.                            কুয়াশায় আজ স্মৃতি ও স্বপ্ন মেশা |
.                                 থাকে যদি মনে থাক,
.                                একটি সজল দাগ,
.                   হারানো রাতের এক ফোঁটা অশ্রুর |
নূতন আঁখির দ্যুতিতে তোমার স্মৃতি হোক সুমধুর |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আর বরষের পথিক-পাখীর
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


আর বরষের পথিক-পাখীর পায়ের চিহ্নখানি,
.                নূতন পলিতে ঢাকা পড়িয়াছে জানি,
.                               তোমার মনের চরে ;
.                        জানি কভু ক্ষণতরে,
.                স্মৃতির জোয়ার সরাবে না আবরণ |
তোমার আকাশে আমার পাখার বিদায় চিরন্তন |

উড়ো মেঘে কবে ছায়া করেছিল আমার দগ্ধ মরু,
.                            বাড়াল একটি শাখা মুমূর্ষু তরু ;
.            আজো তারি পথ চাহি,
.            জানি বৃথা দিন বাহি ;
.            স্খলিত পরাগ পুষ্প লবে না তুলি |
বিদ্যুল্লতা ছুঁয়েছে যে তার ভস্ম বাসনাগুলি !

তবুও মনের বাতায়নে মোর রাখিলাম দীপ জ্বালি ;
.                    জীবন নিঙাড়ি স্নেহরস তাহে ঢালি
.                                   চাহিনাক সান্ত্বনা,
.                                অশ্রুতে ভিজাব না,
.                    মনের তৃষিত মরুর দারুণ দাহ |
তব পথ-চাওয়া-দীপ-শিখা সনে মোর শেষ উদ্বাহ |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল বন-হংসের প্রেমে,
.               আকাশ-পথের কোন্ সীমান্তে থেমে ;
.                            সে কবে আমার মনে,
.                                  ডুবেছে বিস্মরণে |
.                 আজি শুধু তার শূন্য নীড়টি ঘিরি,
হতাশ আশার উদাস অলস মৌমাছি মরে ফিরি |

বেদিয়ার মেয়ে মরু ছেড়ে হ’ল, মোতি-মহলের বাঁদী,
.             চঞ্চল চোখ বোরখাতে দিল বাঁধি ;
.                        সে কবে আমার মনে,
.                             ডুবেছে বিস্মরণে ;
.              আজি শুধু তার ত্যক্ত জীর্ণ ঘরে,
পুরানো স্মৃতির শ্রীহীন শুকানো পল্লব কেঁদে মরে |

শুক্ নো চড়ায় সারাদিন করে শুক্ নিরা কলরব,
.                    ঘাটে ভেসে লাগে শেফালি শিশুর শব |
.                                আমার পরানে আজি,
.                                উত্সব বেশে সাজি,
.                      হৃদয়ের পথে কঙ্কালগুলি চলে |
বাসর-রাতের দীপ নিভে গেছে বিধবা-নয়ন-জলে |

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এই ভুবনের মধুর দিনের পথিক যত
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


এই ভুবনের মধুর দিনের পথিক যত,
.        আস্ ল যারা
.        হাস্ ল যারা
ক্ষণেক ভাল বাসল যারা,
আজকে তারা সন্ধ্যা তোমার
.        পাকা সোনার
.        গলার হারে,
.        গগন পারে
যে-কথাটি গেল থুয়ে,
.        কপোল ছুঁয়ে
.        গেল চলে
.        যাহা বলে,
হায়রে হায়,
হারিয়ে যায়
সকল কথা আসন্ন ঐ অন্ধকারে !

.        আর যারা সব
.                বইল বোঝা, সইল ব্যথা,
.                মনের কথা কইল না ;
ফুলের তরী বাইল শুধু, ফলের কড়ি চাইল না ;
নীড়েতে পাখ্ পুড়্ল যাদের, আকাশে হায় উড়ল না—
.                        ঘুরল না ;
.                তাদেরও আজ দিবা শেষে
.                        ভালবেসে,
.                জড়িয়ে বুকে মুছিয়ে আঁখি
.                অশ্রু-জলে অধর রাখি,
.                                ডাক্ বে না কেউ হায়রে হায় !
জানি, জানি, সন্ধ্যারাণী, দিনের বানী সব বৃথায় !

.                ধূলা সে যে ধূলাই শুধু
.                পরশ-পাথর নাইরে নাই,
.                মিথ্যা বোঝা, মিথ্যা খোঁজা
.                বৃথা ওরে সব বোঝা-ই ;
.                মরমে যে মার খেয়েছে
.                মিথ্যা যে তার সব ওঝাই !
.        বুকের ভিতর যা থাকে থাক্,
.                        ঢেকেই তা রাখ্ |
ওষ্ঠে প্রিয়ার ভণ্ডামি নাই, নাই পেয়ালায় বুজরুকি,
পরকালের পুঁথি ফেলে, আয়রে হতাশ, আয় দুখী !
.                        আয় রে আয়
.                        দিন যে যায় !
.                   উপবাসী প্রাণ যে চায়
.                   বিপুল নিদারুণ ক্ষুধায় |

যখের কড়ি আগ্ লে আছিস্ মোক্ষ-আশায় মূর্খ কে ?
.                        অর্ঘ্য দে !
.                এই দেহ তোর দেবতা শুধু,
.                দিন দুয়েকের স্বর্গ রে !
.                        অর্ঘ্য দে |
.     মর-দেহের চেয়ে মূর্খ, মোক্ষ নয় মহার্ঘ রে !
.                        অর্ঘ্য দে |
.                মৃত্যু শাসায়, শুনতে কি পাস্ ?
.                দেখতে কি পাস্, শ্মশান পাতা সকল ঠাঁই,
বিশ্বজুড়ে চিরটাকাল কালের হাতের নেই কামাই !
.                ওরে অন্ধ, ওরে হতাশ !
.                লুট করে নে যেথায় যা পাস্ ;
.                        আকাশ বাতাস,
.                        প্রেমের প্রকাশ,
.                  নারীর দেহে রূপের বিকাশ,
.                        যেথায় যা পাস্ |

.                  ভিখারী তুই আছিস্ ভুখা,
.                  শিকারী সুখ নেয় লুটে,
.                  এ কি রে তোর মনের বিকার—
.                  রইবি খুশী চিরকুটে ?
.                         হাঁক উঠে
.                         মুখ ফুটে
.                  মোক্ষ-মোহের ডোর টুটে’,
.                   “এই জীবন মোর সাধন
.                   স্বর্গ মোর এই ভুবন” !

.
.        দুখ যে চায়,         দুখ যে পায়,
.        আর যে সুখের পিছনে ধায় |
.        দিনের শেষে সব সমান, সব সমান !
.        পুঁথির পাতায় ধাপ্বাবাজি, পরকালের সব প্রমাণ |

.                ডাকছে কবি—আয় য়ে আয়
.                তিলে তিলে, প্রাণ পেয়ালায়
.                        চুমুক দেবার সময় যে যায় !
সময় যে যায় --- সময় যে যায়, বাজ্ ছে কালের ডঙ্কারে,
.                সকল সুখের পাছে আছে সমাপ্তির-ই শঙ্কারে !
.                শিবের সাথে শ্বস্ ছে রে শব,
.                সৃষ্টি সাথে ধ্বংসোত্সব
.                        কাল-ভৈরব হুঙ্কারে |

যৌবনের ও মউ-বনে সব মউ-মাছিদের মর্ম্মরে
.     শুন্ ছি বাজায় বিসর্জ্জনী কঙ্কালেরা পঞ্জরে ;
.                বাজায় ফুলে বাজায় পাতায়
.                পাখীর পাখায় লাজুক লতায়,
.                মুখে, আশায়, ভালবাসায়
.                        সব ভরসায়
.                বাজায় বাজায় কেবল বাজায় !
.                       ---বসন্তেরি রঙিন্ খাতায়
রঙের সাথে কালো কালি-ই লিখছে শমন পাতায় পাতায় |

.                        ওরে তাই---
.                চোখের জলের সময় যে নাই !
.                রূপের মেয়াদ দু’দিন মোটে
.                দু’দিন মেয়াদ যৌবনের ;
.                প্রিয়ার ঠোঁটের গুল্ বাগে ভাই
.                ইজারা যে দুই দিনের !
.                ঠিকানা নেই   ঠিকানা নেই
.                আশার ফানুষ কখন ফাঁসে ;
.                জীবন স্বপন ভাঙরে তোর
.                মহাকালের অট্টহাসে !
.        ভাব্ বি কি আর, করবি বিচার
.                বৃথা কি আর খাটবি বেগার ?
.                কালকে প্রিয়ার মুখে পাবি
.                হয়ত চিহ্ন বলি-রেখার !

.                আজ দরজায়
.                তাই ত কবি ডাক দিয়ে যায়—
.                                ফাগুন ফুরায়—
.                                আগুন জুড়ায়---
মধু-মাসের মহোত্সবে দস্যু হয়ে লুটবি কে আয় |
.                 ছিনিয়ে নেবার সাহস যে চাই—
.                 বিনিয়ে কাঁদিস্ কার ভরসায় ?

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নমো নমো নমো
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |

.                নমো নমো নমো !
.                      অপরূপ অনির্ব্বচনীয় !
.                নমো নমো নমো !

দেহের বীণাতে ওঠে ঝঙ্কারিয়া সুরের প্রণতি
.                নমো নমো নমো !
নয় বাণী, নয় স্তুতি, নহেক প্রার্থনা ;
.                গান নয়, নয় আরাধনা,
শুধু দেহ-দীপ হতে ওঠে শিখা সম
.                নমো নমো নমো !

সব অর্থ ডুবে যায় আনন্দের অতল সাগরে –
.                শুধু অহৈতুক
.                অর্থহীন
.                নমো নমো নমো |
.                দুর্ব্বোধ প্রাণের ভাষা
.                বাণীর আরতি !
চেতনা হারায়ে যায় আনন্দের অপার পাথারে
.                সেথা হতে ওঠে শুধু
.                  বান্ময় অর্চ্চনা,
.                নমো নমো নমো
পরিপূর্ণ জীবনের প্রস্ফুটিত পদ্ম হ’তে ওঠে গন্ধসম
.                নমো নমো নমো !

.   কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহে নাক সীমা ;
আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মত ;
.      বিরাটের তীরে তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে—
.                   নমো নমো নমো !

.                   নমো নমো নমো !
.                  প্রণামের বিরাট আকাশে
সব গান ডুবে আছে,       মিলে আছে সব পূজা,
.      হারাইয়া আছে স্তুতি, সকল আরতি,
.                   সমস্ত সাধনা,
.            কোটি কোটি তারকার মত |
.                মহা নীলাকাশ সম
.                মূর্ত্তিমান সীমাহীন
.                নমো নমো নমো !

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজি এই প্রভাতের
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


আজি এই প্রভাতের আশীর্ব্বাদ খানি,
,                লও তব মাথে,
.                হে নগরী,
লও তব ধূলি-ধূম-ধূম্র-জটা-বিভূষিত, শিরে,
.        তব লৌহ-কাষ্ঠ-শিলা কারাগার হতে,
.           রক্তমসী-কলঙ্কিত, যন্ত্র-জর্জ্জরিত তব
.                    কর দুটি জুড়ি
.            আজি এই প্রভাতেরে কর নমস্কার |
মোহের দুঃস্বপ্নজাল বারেক ছিঁড়িয়া দুই হাতে
.                        ঊর্দ্ধে চাহ অভিশপ্তা
.             ওই নীল আকাশের পানে,
পূরব সীমান্তে যেথা দিবসের মাঙ্গলিক বাজে
.                               আলোকের সুরে |

.              তোমার ব্যথিত বক্ষে
.                 অন্ধকারে যেথা
অনির্ব্বাণ অগ্নিকুণ্ড জ্বলে দিকে দিকে,
.              হারায় কঙ্কাল-পথ
.              বিকারের পয়োনালী মাঝে,
লুকায় সুড়ঙ্গ লাজভরে মৃত্তিকার তলে,
.                   লোভ হিংসা ফেরে ছদ্মবেশে
.                   অন্ধকারে নিঃশব্দ লোলুপ,--
সেথা আজ ডেকে আন প্রভাত আলোরে ;
.                    তার সাথে আন শান্তি,
.                    লোভ দীর্ণ তব ক্ষুব্ধ বুকে,--
.                লালসার দৈন্য যাক ঘুচে |

যন্ত্রের চক্রান্ত ভাঙি,
ভেদ করি ষড়যন্ত্র লৌহে আর লোভে
আসুক প্রভাতখানি,
.   ---সৌম্য-শুচি কুমার সন্ন্যাসী
.    হে পতিতা তোমার আলয়ে |
পুঞ্জীভূত সমস্ত কালিমা,
.     সমস্ত সঞ্চিত ব্যথা, লজ্জা গ্লানি পাপ,
.                মনস্তাপ বহু মানবের
.               ব্যাধি ও বিকার
.                সযত্নে লালিত,
---দূর হোক সব আবর্জ্জনা,
.           আলোকের কল্যাণ ধারায় |

শক্তির সাধনে মাতি,
.     হে উন্মত্তা নারী-কাপালিক,
.          অগণন জীবনের আশার শ্মশানে
.                আনন্দের শবাসনে বসি,
.    সুন্দরেরে গিয়াছিলে ভুলি ;

সীমাহীন আকাশের সুনীল বিস্ময়
.        রাত্রির রহস্য আর আলো গন্ধ রূপ,
.                ভুলেছিল সহজ প্রাণেরে |
সেই স্বেচ্ছা-নির্ব্বাসন হয়ে যাক শেষ |

আজ তব
.     শক্তি-সুরা-রক্ত-নেত্রে ভ্রূকুটির তলে
.                বিহঙ্গেরা বাঁধে নাই নীড় ;
.      প্রস্তর-নিষেধ-প্রান্তে জাগিছে সভয়ে
.                শীর্ণ তৃণ, বিবর্ণ কুসুম,
.                ----সঙ্কুচিত দুর্ব্বল কাতর |
.           যন্ত্রের জটিল পথে
.                বিকলাঙ্গ জীবনের
.                  হেরি শুধু ব্যঙ্গ-সমারোহ

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ সুন্দর পৃথিবীরে আমি ভালবাসি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বিজয়চন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত বঙ্গবাণী পত্রিকার ভাদ্র ১৩৩৩ ( সেপ্টেম্বর ১৯২৬
) সংখ্যায় প্রকাশিত |


ভালবাসি |   ভালবাসি
এ সুন্দরী পৃথিবীরে আমি ভালোবাসি
.        সর্ব্ব দেহ মন প্রাণ দিয়ে
তাই তার তুচ্ছতম জীর্ণ পাতাটি’র
.        ছেড়ে নাহি যেতে সরে মন
.        বুক দিয়া আঁকড়িয়া থাকি
নিশিদিন তার প্রতি অকিঞ্চিৎ বাণী
.        লিখে রাখি মর্ম্মের পাতায় |

কোথা মোর গ্রন্থি বাঁধা
.        তার সনে, কেহ নাহি জানে
গোপন মরম তলে
.        কোন্ গূঢ় অন্তরঙ্গ ডোরে !
তাই দুজনার বুক একসাথে
.        কাঁপে দুরু দুরু
তাই আর নির্নিমেষ নয়নের
.        পড়েনা নিমেষ
ছেড়ে যেতে অশান্ত ক্রন্দন তাই |

.         তবু—
জানি আমি একদিন
.    স্তিমিত চোখের শেষ
.         অশ্রুভরা দৃষ্টিটুকু রেখে
.              ছেড়ে যেতে হবে |
.     শিথিল হাতের মুঠি
.                     যাবে খুলে
.               এই পরিচয় শেষ হবে,
.      এত চেনা এত জানাজানি
.        কানে-কানে কওয়া কত চুপিচুপি কথা
.           বুকে বুকে বয়ে যাওয়া বাসনার বেগ
.                সব লয়ে চলে যেতে হবে |

বুঝি সেই বিদায়ের দিনটিরে স্মরি’
.        আজি পৃথিবীর চোখ
.            গোপন অশ্রুর ভারে করে ছলছল
তাই নিত্য আনন্দ উত্সব মাঝে
.                বিদায়ের সুর
হাসিটিরে করে সুমধুর,---সকরুণ |
.         তাই
আরো কাছে সরে যেতে চাই
.   ইচ্ছা করে সব বাধা ঘুচে যাক্
.         তাহার ধূলার সাথে ধুলি হয়ে
.            আলো হয়ে তার আলো সাথে
.              মগ্ন হয়ে রই শুধু
.                 অপূর্ব্ব আনন্দ-চেতনায়-- !

ফাল্গুনের গন্ধভরা ছায়ামাখা
.        আবেশে বিহ্বল দু পহরে—
মনে পড়ে অকস্মাৎ, ছেড়ে যেতে হবে
সেই বার্ত্তা আসে যেন ঝরে’—পড়া মলিন পাতায়
.               জীবনের অবশেষ গানে |
মনে হয় – আজও আমি ‘ভালো করে’
.                তাহারে যে চিনি নাই
জানি নাই পাই নাই তাহারে যে প্রাণ ভরি’
.  কেমনে এ অসমাপ্ত পরিচয় ফেলে রেখে
.     যাব চলি নিরুত্তর বিস্মৃতির মাঝে--- ?
আজও বাকি সব কথা
.         অসম্পূর্ণ আজও সব গান
রহস্য গুন্ঠন খুলি আজও প্রিয়া ভালো করি
.                          দেখায়নি মুখ
.          আজো তারে বুঝি নাই !

অশ্রুসাগরের দুই পারে
.    অন্তহীন বিরহের যুগ যুগান্তর
.        কাটাতে হবে কি লয়ে
.     এই শুধু অসম্পূর্ণ পরিচয়টুকু ?
.     এক পারে প্রিয়া মোর
.                   দুদণ্ডের জানা
.      আর পারে আমি—
.                  অশেষ বিরহী !
জীবনের দেবতারে কহি
.        এই যাওয়া এত সত্য যদি
.   তবে কেন দিলে ভালবাসা
.          প্রিয়ারে পাঠালে কেন
.            দু দণ্ডের তরে,
.             ভঙ্গুর এ খেলাঘরে মিছে— |
.      কেন কন্ঠে গান দিলে
.          বুকে প্রাণ
.             চক্ষে দিলে আলো
.                কেন প্রেম দিলে ?
.        কিন্তু বুঝি এই নয়—
.           বুঝি আমি বার বার আসিয়াছি
.                     পৃথিবীর বুকে
.            বারে বারে ভাল বাসিয়াছি
জন্ম মৃত্যু এরা যেন দিন আর রাত্রি
.    প্রাণ মম তার মাঝে যাত্রী যেন
.                            চির অভিসারে |

.      প্রিয়া বুঝি চলে সাথে সাথে
.             শুধু যবে অন্ধকারে
.             চিনিতে না পারি
.      কেঁদে কই--- এই বুঝি শেষ |

.    বুঝি মোর চেনা হলো
.           তার সাথে বারেবারে নূতন করিয়া
.     বারে বারে পাই তারে পুনঃ ছেড়ে যাই
.            আবার নূতন করে’ চাই
.                        নূতন জীবনে |
.         তারে মোর হলোনাক চেনা
.      বুঝি এই অন্তহীন আনাগোনা হলোনাক
.                         তাই পুরাতন !

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শস্য-প্রশস্তি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য-সংকলনে ( জানুয়ারী ১৯৬৩ ) প্রকাশিত |


মাঠের শস্য গৃহে এল—
তার স্তোত্র রচনা করো কবি |

মানুষ ও পশু, আনন্দের বোঝার ভারে নত হ’য়ে এল
গৃহে ফিরে,
মরাই বোঝাই হ’ল |

ভূমি উত্কতাপের

মানুষ আরেকবার মৃত্তিকাকে দোহন করলে,
পূর্বে ও পশ্চিমে, উত্তরে ও দক্ষিণে,
ভারতে,---ফ্রান্সে,----নীল নদীর তীরে,----কানাডায়---

মৃত্তিকা মানুষকে অর্ঘ্য দিলে |
কেউ দিলে মমতায় মাতার মতো আপনা হ’তে,
কেউ অনিচ্ছায় কৃপণের মতো দিলে মানুষের পীড়নে,
সলজ্জ প্রিয়ার মতো কেউ নিজেকে গোপন রেখেছিলো
.                                   এতটুকু ইঙ্গিতের অপেক্ষায় |

তবু সব মৃত্তিকাই দান করল ;--
মরুপ্রান্তরে নির্মম বালুকা-ভূমি আর উচ্ছলিত-সুধা নদী-কূল-ভূমি,
গিরিবেষ্টিত উপত্যকা আর সমতল প্রান্তর,
কালো ও রাঙা মাটি,
কঠিন ও কোমল,
যুবতী ও বৃদ্ধা |

শস্যের চির-নূতন জাতকের পুনরাবৃত্তি করো কবি |
---সবল পেশী ও শানিত লৌহফলকের মিলিত প্রয়াসে
মৃত্তিকা বিদীর্ণ হ’ল কবে,
ভূগর্ভের অন্ধকারে বীজের কারা বিদীর্ণ ক’রে
কবে শিশু-তরু বাহু বাড়ালো আকাশের সন্ধানে,
কবে মেঘ দিলে বৃষ্টির আশীর্বাদ, সূর্য আলোকের আর উত্তাপের ;

মাটি ও আকাশ জীবন-রসের,
কবে ধরণীর লজ্জা দূর হ’ল স্নিগ্ধ শ্যামলতার আবরণে,
আর আবার কবে মানুষ ধরিত্রীকে নিঃস্ব নগ্ন ক’রে রেখে গেল |

মাঠ থেকে শস্য এল গৃহে ---ধান্য ও যব, গম ও ভুট্টা, জোয়ারি—
মৃত্তিকা ও মেঘ, সূর্য ও বায়ুর মিলন সার্থক হ’ল |

আকাশের আলো স্তিমিত হ’য়ে এল শ্রান্ত মানুষ ও পশুর সঙ্গে
আনন্দের অবসাদে |
সর্বস্ব রিক্ত প্রান্তরের নিঃস্ব হাহাকারের ওপর
রাত্রি বুলালে অন্ধকারের সান্ত্বনা |
কাল পৃথিবীতে ব্যস্ততা জাগবে, শস্য বহনের আর বিতরণের
আর হায়, লোভের সংগ্রাম |
আজ শান্তি !

মাঠের শস্য গৃহে এল,
এল মানুষের শক্তি ও যৌবন,
এল নারীর রূপ ও করুণা,
পুরুষের পৌরুষ,
ভবিষ্যৎ মানব-যাত্রীর পাথেয় |
সমস্ত ভাবীকালের ইতিহাসে, মানবের কীর্তি-কাহিনীর তলায়
অদৃশ্য অক্ষরে
এই শস্যের আগমনী লেখা থাকবে নাকি ?

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শহর
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য-সংকলনে ( জানুয়ারী ১৯৬৩ ) প্রকাশিত |


আমার শহর নয়কো তেমন বুড়ো ;
অতীত কালের অস্থি মুদ্রা চৈত্য বিহার কিছু
পাবে না তার কোথাও মাটি খুঁড়ে |
হঠাৎ কখন নদীর ধারে ব্যাপারীদের নায়ে
আমার শহর নেমেছিলো কাদামাখা পায়ে
এই তো সেদিন নারকেল আর খেজুর গাছের ঝোপে

এই তো সেদিন, তবু যেন অনেক অনেক দূর
অনেক শিশির ঝ’রে গেছে,
তাতিয়ে গেছে কত-না রোদ্দুর |

অনেক ধুলোয় মলিন পা তার
অনেক ধোঁয়ায় ঝাপসা দুটি চোখ |
আমার শহর ভুলে গেছে
তার জীবনের আদি পরম শ্লোক |

তবু হঠাৎ আসে যখন পাতা ঝরার দিন
দমকা হাওয়া থেকে-থেকে
ছাদ ছাড়ানো গাছের মাথায় লাগে
আমার শহর খানিক বুঝি
ঝিমিয়ে পড়া তন্দ্রা থেকে জাগে |

চিমনি তোলা ঊর্দ্ধমুখে আকাশ পানে চেয়ে
কি ভাবে সে-ই জানে !
ভেবে-ভেবে পায় কি নিজের মানে ?
পোল বেঁধেছে কল ফেঁদেছে
বসিয়ে বাজার হাট
রাস্তা পেতে মেলেছে ঢের রং-বেরং-এর ঠাট ;
তবু যেন জংলা আদিম জলা
জুড়ে আছে আজো বুকের তলা ||

.                   ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর