সব অর্থ ডুবে যায় আনন্দের অতল সাগরে – . শুধু অহৈতুক . অর্থহীন . নমো নমো নমো | . দুর্ব্বোধ প্রাণের ভাষা . বাণীর আরতি ! চেতনা হারায়ে যায় আনন্দের অপার পাথারে . সেথা হতে ওঠে শুধু . বান্ময় অর্চ্চনা, . নমো নমো নমো পরিপূর্ণ জীবনের প্রস্ফুটিত পদ্ম হ’তে ওঠে গন্ধসম . নমো নমো নমো !
. কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহে নাক সীমা ; আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মত ; . বিরাটের তীরে তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে— . নমো নমো নমো !
. নমো নমো নমো ! . প্রণামের বিরাট আকাশে সব গান ডুবে আছে, মিলে আছে সব পূজা, . হারাইয়া আছে স্তুতি, সকল আরতি, . সমস্ত সাধনা, . কোটি কোটি তারকার মত | . মহা নীলাকাশ সম . মূর্ত্তিমান সীমাহীন . নমো নমো নমো !
এ সুন্দর পৃথিবীরে আমি ভালবাসি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র বিজয়চন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত বঙ্গবাণী পত্রিকার ভাদ্র ১৩৩৩ ( সেপ্টেম্বর ১৯২৬ ) সংখ্যায় প্রকাশিত |
ভালবাসি | ভালবাসি এ সুন্দরী পৃথিবীরে আমি ভালোবাসি . সর্ব্ব দেহ মন প্রাণ দিয়ে তাই তার তুচ্ছতম জীর্ণ পাতাটি’র . ছেড়ে নাহি যেতে সরে মন . বুক দিয়া আঁকড়িয়া থাকি নিশিদিন তার প্রতি অকিঞ্চিৎ বাণী . লিখে রাখি মর্ম্মের পাতায় |
কোথা মোর গ্রন্থি বাঁধা . তার সনে, কেহ নাহি জানে গোপন মরম তলে . কোন্ গূঢ় অন্তরঙ্গ ডোরে ! তাই দুজনার বুক একসাথে . কাঁপে দুরু দুরু তাই আর নির্নিমেষ নয়নের . পড়েনা নিমেষ ছেড়ে যেতে অশান্ত ক্রন্দন তাই |
. তবু— জানি আমি একদিন . স্তিমিত চোখের শেষ . অশ্রুভরা দৃষ্টিটুকু রেখে . ছেড়ে যেতে হবে | . শিথিল হাতের মুঠি . যাবে খুলে . এই পরিচয় শেষ হবে, . এত চেনা এত জানাজানি . কানে-কানে কওয়া কত চুপিচুপি কথা . বুকে বুকে বয়ে যাওয়া বাসনার বেগ . সব লয়ে চলে যেতে হবে |
বুঝি সেই বিদায়ের দিনটিরে স্মরি’ . আজি পৃথিবীর চোখ . গোপন অশ্রুর ভারে করে ছলছল তাই নিত্য আনন্দ উত্সব মাঝে . বিদায়ের সুর হাসিটিরে করে সুমধুর,---সকরুণ | . তাই আরো কাছে সরে যেতে চাই . ইচ্ছা করে সব বাধা ঘুচে যাক্ . তাহার ধূলার সাথে ধুলি হয়ে . আলো হয়ে তার আলো সাথে . মগ্ন হয়ে রই শুধু . অপূর্ব্ব আনন্দ-চেতনায়-- !
ফাল্গুনের গন্ধভরা ছায়ামাখা . আবেশে বিহ্বল দু পহরে— মনে পড়ে অকস্মাৎ, ছেড়ে যেতে হবে সেই বার্ত্তা আসে যেন ঝরে’—পড়া মলিন পাতায় . জীবনের অবশেষ গানে | মনে হয় – আজও আমি ‘ভালো করে’ . তাহারে যে চিনি নাই জানি নাই পাই নাই তাহারে যে প্রাণ ভরি’ . কেমনে এ অসমাপ্ত পরিচয় ফেলে রেখে . যাব চলি নিরুত্তর বিস্মৃতির মাঝে--- ? আজও বাকি সব কথা . অসম্পূর্ণ আজও সব গান রহস্য গুন্ঠন খুলি আজও প্রিয়া ভালো করি . দেখায়নি মুখ . আজো তারে বুঝি নাই !
অশ্রুসাগরের দুই পারে . অন্তহীন বিরহের যুগ যুগান্তর . কাটাতে হবে কি লয়ে . এই শুধু অসম্পূর্ণ পরিচয়টুকু ? . এক পারে প্রিয়া মোর . দুদণ্ডের জানা . আর পারে আমি— . অশেষ বিরহী ! জীবনের দেবতারে কহি . এই যাওয়া এত সত্য যদি . তবে কেন দিলে ভালবাসা . প্রিয়ারে পাঠালে কেন . দু দণ্ডের তরে, . ভঙ্গুর এ খেলাঘরে মিছে— | . কেন কন্ঠে গান দিলে . বুকে প্রাণ . চক্ষে দিলে আলো . কেন প্রেম দিলে ? . কিন্তু বুঝি এই নয়— . বুঝি আমি বার বার আসিয়াছি . পৃথিবীর বুকে . বারে বারে ভাল বাসিয়াছি জন্ম মৃত্যু এরা যেন দিন আর রাত্রি . প্রাণ মম তার মাঝে যাত্রী যেন . চির অভিসারে |
. প্রিয়া বুঝি চলে সাথে সাথে . শুধু যবে অন্ধকারে . চিনিতে না পারি . কেঁদে কই--- এই বুঝি শেষ |
. বুঝি মোর চেনা হলো . তার সাথে বারেবারে নূতন করিয়া . বারে বারে পাই তারে পুনঃ ছেড়ে যাই . আবার নূতন করে’ চাই . নূতন জীবনে | . তারে মোর হলোনাক চেনা . বুঝি এই অন্তহীন আনাগোনা হলোনাক . তাই পুরাতন !
শস্য-প্রশস্তি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য-সংকলনে ( জানুয়ারী ১৯৬৩ ) প্রকাশিত |
মাঠের শস্য গৃহে এল— তার স্তোত্র রচনা করো কবি |
মানুষ ও পশু, আনন্দের বোঝার ভারে নত হ’য়ে এল গৃহে ফিরে, মরাই বোঝাই হ’ল |
ভূমি উত্কতাপের
মানুষ আরেকবার মৃত্তিকাকে দোহন করলে, পূর্বে ও পশ্চিমে, উত্তরে ও দক্ষিণে, ভারতে,---ফ্রান্সে,----নীল নদীর তীরে,----কানাডায়---
মৃত্তিকা মানুষকে অর্ঘ্য দিলে | কেউ দিলে মমতায় মাতার মতো আপনা হ’তে, কেউ অনিচ্ছায় কৃপণের মতো দিলে মানুষের পীড়নে, সলজ্জ প্রিয়ার মতো কেউ নিজেকে গোপন রেখেছিলো . এতটুকু ইঙ্গিতের অপেক্ষায় |
তবু সব মৃত্তিকাই দান করল ;-- মরুপ্রান্তরে নির্মম বালুকা-ভূমি আর উচ্ছলিত-সুধা নদী-কূল-ভূমি, গিরিবেষ্টিত উপত্যকা আর সমতল প্রান্তর, কালো ও রাঙা মাটি, কঠিন ও কোমল, যুবতী ও বৃদ্ধা |
মাটি ও আকাশ জীবন-রসের, কবে ধরণীর লজ্জা দূর হ’ল স্নিগ্ধ শ্যামলতার আবরণে, আর আবার কবে মানুষ ধরিত্রীকে নিঃস্ব নগ্ন ক’রে রেখে গেল |
মাঠ থেকে শস্য এল গৃহে ---ধান্য ও যব, গম ও ভুট্টা, জোয়ারি— মৃত্তিকা ও মেঘ, সূর্য ও বায়ুর মিলন সার্থক হ’ল |
আকাশের আলো স্তিমিত হ’য়ে এল শ্রান্ত মানুষ ও পশুর সঙ্গে আনন্দের অবসাদে | সর্বস্ব রিক্ত প্রান্তরের নিঃস্ব হাহাকারের ওপর রাত্রি বুলালে অন্ধকারের সান্ত্বনা | কাল পৃথিবীতে ব্যস্ততা জাগবে, শস্য বহনের আর বিতরণের আর হায়, লোভের সংগ্রাম | আজ শান্তি !
মাঠের শস্য গৃহে এল, এল মানুষের শক্তি ও যৌবন, এল নারীর রূপ ও করুণা, পুরুষের পৌরুষ, ভবিষ্যৎ মানব-যাত্রীর পাথেয় | সমস্ত ভাবীকালের ইতিহাসে, মানবের কীর্তি-কাহিনীর তলায় অদৃশ্য অক্ষরে এই শস্যের আগমনী লেখা থাকবে নাকি ?
শহর কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য-সংকলনে ( জানুয়ারী ১৯৬৩ ) প্রকাশিত |
আমার শহর নয়কো তেমন বুড়ো ; অতীত কালের অস্থি মুদ্রা চৈত্য বিহার কিছু পাবে না তার কোথাও মাটি খুঁড়ে | হঠাৎ কখন নদীর ধারে ব্যাপারীদের নায়ে আমার শহর নেমেছিলো কাদামাখা পায়ে এই তো সেদিন নারকেল আর খেজুর গাছের ঝোপে
এই তো সেদিন, তবু যেন অনেক অনেক দূর অনেক শিশির ঝ’রে গেছে, তাতিয়ে গেছে কত-না রোদ্দুর |
অনেক ধুলোয় মলিন পা তার অনেক ধোঁয়ায় ঝাপসা দুটি চোখ | আমার শহর ভুলে গেছে তার জীবনের আদি পরম শ্লোক |
তবু হঠাৎ আসে যখন পাতা ঝরার দিন দমকা হাওয়া থেকে-থেকে ছাদ ছাড়ানো গাছের মাথায় লাগে আমার শহর খানিক বুঝি ঝিমিয়ে পড়া তন্দ্রা থেকে জাগে |
চিমনি তোলা ঊর্দ্ধমুখে আকাশ পানে চেয়ে কি ভাবে সে-ই জানে ! ভেবে-ভেবে পায় কি নিজের মানে ? পোল বেঁধেছে কল ফেঁদেছে বসিয়ে বাজার হাট রাস্তা পেতে মেলেছে ঢের রং-বেরং-এর ঠাট ; তবু যেন জংলা আদিম জলা জুড়ে আছে আজো বুকের তলা ||