কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র - ছদ্মনাম কৃত্তিবাস ভদ্র। এই প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও
চলচিত্রকার জন্মগ্রহণ করেন কাশী বা বেনারস-এ। পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন রেলের অফিসার। কবির
জন্ম তাঁর কর্মক্ষেত্রেই হয়। মাতা সুহাসিনী দেবী কবির শৈশবেই পরলোক গমন করলে, তাঁর শৈশব কাটে
মির্জাপুরে তাঁর মাতুলালয়ে। তাঁদের বাড়ী ছিল ২৪পরগণা জেলার ( অধুনা দক্ষিণ ২৪পরগণা ) রাজপুরে।

১৯২০ সালে কবি কলকাতার ভবানীপুরে অবস্থিত সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এর
পর কলকাতা ও ঢাকার কয়েকটি কলেজে ভর্তি হলেও বাঁধাধরা শিক্ষার মধ্যে তিনি থাকেন নি।

কর্মজীবন শুরু করেন দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ
অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। পরে
সুভাষচন্দ্র বসুর “বাংলার কথা” পত্রিকা, “ফরওয়ার্ড” পত্রিকা, “বঙ্গশ্রী”
পত্রিকা ও “বেঙ্গল ইউনিটিতে” বিজ্ঞাপনের কপি-লেখক হিসেবে কাজ করেন।

একটি ফিল্ম কোম্পানির পাবলিসিটি অফিসার থাকা কালীন তাঁর পরিচয় হয় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে।
প্রখ্যাত অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়ার অনুরোধে তিনি “রিক্তা” ছবির চিত্রনাট্য লেখেন। কিছুকাল চিত্রনাট্য
রচনা তাঁর পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছিলেন। প্রায় ৭০টি চিত্রনাট্য তিনি রচনা করে গিয়েছেন। তিনি ১৪টি
ছায়াছবির পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি “সমাধান” খ্যাতি অর্জন করে।
তাঁর পরিচালিত “সাগর সঙ্গমে” রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারে ভূষিত হয়। তাঁর “ময়লা কাগজ” ছবিটিও বিশেষ
উল্লেখযোগ্য।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড়শতাধিক। ১৫-১৬ বছর বয়সে লেখা তাঁর “পাঁক” উপন্যাস
বিপিনচন্দ্র পালের
শ্রমজীবীদের পত্রিকা, সংহতিতে ১৯২৭ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে
রয়েছে “বাঁকা লেখা” (১৯২৭), “উপনয়ন” (১৯৩৩), “আগামীকাল” (১৯৩৬), “প্রতিশোধ” (১৯৪১) প্রভৃতি।   

১৯২৪ সালে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প “শুধু কেরানী”। তিনি ছোটগল্পকার
হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে “বেনামী বন্দর” (১৯৩০),
“পুতুল ও প্রতিমা” (১৯৩২), “পোনাঘাট পেরিয়ে”, “সাগর সঙ্গম”, “পুন্নাম”, “তেলেনাপোতা আবিষ্কার”, “হয়তো”,
“স্টোভ” প্রভৃতি। “ঘনাদা”-কে নিয়ে তাঁর প্রথম গল্প “মশা” প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। পরে তিনি সৃষ্টি করেন
আরও তিনটে চরিত্র বিজ্ঞান গবেষক “মামাবাবু”, ডিটেকটিভ “পরাশর বর্মা” ওবং ভুত শিকারী “মেজোকর্তা”


তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার মধ্যে রয়েছে “রঙমশাল” (১৯৩১),
কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সঙ্গে
“নিরুক্ত”,
কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে “কবিতা” (১৯৩৫) এবং “কালিকলম”, “নবশক্তি” (১৯৩৬), “পক্ষিরাজ”
প্রভৃতি।

গীতিকার হিসেবেও তিনি নাম রেখে গিয়েছেন। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের অনুরোধে তিনি প্রথম গান লেখেন
“আকাশরূপী হে মহাকাল”। ১৯৪৩  সালে, যোগাযোগ সিনেমার জন্য লেখা, কানন দেবীর কণ্ঠে তাঁর “যদি
ভালো না লাগে তো দিয়োনা মন” গানটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। “নাবিক আমার নোঙর ফেল”, “হাওয়া নয় ও
তো হাওয়া নয়” সহ আরও বহু গান লোকের মুখে মুখে ফিরেছে।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাঁর প্রখ্যাত কবিতা “বেনামী বন্দর”, উত্তরা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে
কল্লোল পত্রিকায় কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে
রয়েছে “প্রথমা” (১৯৩২), “সম্রাট” (১৯৪০), “ফেরারী ফৌজ” (১৯৪৮), “সাগর থেকে ফেরা” (১৯৫৬) প্রভৃতি।  

কর্মজীবনের শেষ দিকে তিনি আকাশবাণীর সাহিত্য-সলাকার ও পরে উপদেষ্টা হয়েছিলেন। “সাগর থেকে
ফেরা” কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৫৭ সালে আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৯৫৮ সালে
রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৬১ সালে তিনি ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন এবং
১৯৮৬ সালে বিশ্বভারতী থেকে দেশিকোত্তম উপাধিতেও ভূষিত হন।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান ও কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
এই প্রচেষ্টাকে সার্থক বলে মনে করবো।




উত্স -
শিশিরকুমার দাশ সম্পাদিত সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী, ২০০৩।
.         অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাবিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, ২০০১।



কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    



আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-   
মিলনসাগর       
srimilansengupta@yahoo.co.in      



এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২০০৫
পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৬.১২.২০১৬

পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৮.০১.২০১৭


.