কবি রাজেশ দত্তর গান ও কবিতা
*
মাগো, আমার মা
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও
সিডি ও ক্যাসেটে সংকলিত।

শিল্পী: সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডির এই গানটির ইউটিউবে  
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


মাগো, আমার মা,
গরিব বাপের ভিটায় আর আদর জোটে না।
বাপ গিয়েছে চাষের খেতে
বাবুর জমি লাঙল দিতে।
মা গিয়েছে মজুর খাটতে পাহাড়তলির গাঁ॥

ওগো সোনার মেয়ে,
পুতুল খেলার বয়স তোর যায়নি পেরিয়ে।
কাঠের পুতুল গেছে ভেঙে,
পা দুটো তোর আলতা রঙে
রাঙিয়ে দিয়ে মা দিয়েছে গিন্নি সাজিয়ে।
আমার মেয়ে, সোনা মেয়ে॥

হায় অভাগীর বেটি,
বানের জলে ভেসে গেছে বাপের ভিটেমাটি।
দেনার উপর বাড়ে দেনা,
পেটেতে নাই ভাতের দানা।
মহাজনের কাছে বাঁধা পড়ল ঘটিবাটি॥

মাগো, আমার মা
শ্বশুর ঘরে মরল দিদি পুড়িয়ে সোনার গা।
বোন গিয়েছে বানের টানে
গেল বছর ভর শ্রাবণে।
কোলের ভাইটা ছয় পেরিয়ে সাতে দিল পা॥

মাগো, আমার মা,
বাসন মেজে জলে হেজে গিয়েছে হাত-পা।
ভাই চলে যায় পাঠশালাতে,
ঘর ছেড়ে মন চায় পালাতে।
ঘরের দোরে আগল তুলে কাজে বেরোয় মা॥

মাগো, আমার মা,
নেতাবাবু বললে, তোদের ভাবনা রবে না।
বাবুরা সব যুক্তি করে
ঠিক করেছে ঘরে ঘরে
শিক্ষা দিয়ে তুলবে গড়ে শিশুকন্যা।
পোড়া কপাল মা, বছর গেল ঘুরে,
বাবুর দেখা মেলে না॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
কোনও গণসংগীত সংস্থা বা শিল্পী, এই কবির এই গানগুলি অথবা তাঁর অন্যান্য গানের সুর ও স্বরলিপি পেতে আগ্রহী
হলে নীচের চলভাষে যোগাযোগ করতে পারেন -
চলভাষ - ৯৪৩৪৫১৬৮৯৮ / ৯৩৩০৪৬২৬২০ / ৯৪৩৩৫৬৬৩০২
অথবা ই-মেল করুন-
rajeshdattain@yahoo.com / rajeshdattain@gmail.com    
অথবা এই ওয়েব-সাইটে মেল করুন -
srimilansengupta@yahoo.co.in     
*
আলাদিন
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: ১৯৯৭

কবিকণ্ঠে, সাইণ্ডক্লাউডে এই গানটির  
ডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


নিঝুম দুপুর, ঠা ঠা রোদ্দুর।
পিচগলা রাস্তা।
ছোটো আলাদিন ঘাঁটে ডাস্টবিন
কাঁধে নিয়ে বস্তা।

সেই ভোররাতে কাগজ কুড়োতে
বেরিয়েছে ঘুম চোখে।
প্লাস্টিক-টিন, ভাঙা পলিথিন
বস্তার পেটে ঢোকে।

আস্তাকুঁড়ে ঘুরে ঘুরে
ময়লা ঘেঁটে ঘেঁটে,
একটি-দুটি শুকনো রুটি
জুটল ভুখা পেটে।

দুপুর গড়িয়ে আগুন ছড়িয়ে
ফুরিয়ে এসেছে দিন,
ক্লান্ত শরীরে ঘরে যাবে ফিরে
বস্তির আলাদিন।

বসে সারাদিন ভাবে আলাদিন,
হাজার আরব রজনী
যদি হত সত্যি, প্রদীপের দত্যি
লুকিয়ে কোথায় না জানি!

কাটে রাতদিন, আসে না তো জিন্‌।
স্বপ্ন ধুলোয় মেশে।
কুড়িয়ে কাগজ, কাটে হররোজ
বছরের বারোমাসে।

রাতের পিদিম জ্বলে টিমটিম,
তেল ফুরিয়েছে ঘরে।
আধপেটা ভাত খেয়ে কাটে রাত
নিশুত অন্ধকারে।

বলে মন্ত্রীমশাই, শিক্ষাটা চাই
বস্তিতে ফুটপাতে।
হবে সাক্ষরতা, স্লেট, বই-খাতা
পেনসিল ধর হাতে।

সরকারি গাড়ি করে
খাতা আসে থরে থরে।
মিটিং-মিছিলে বাজে চোঙা।
আলাদিন মনে মনে
পাতার হিসেব গোনে,
কতটা কাগজে হবে কত কেজি ঠোঙা॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
ভাল্লাগে না
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল : ১ সেপ্টেম্বর, ২০০২

কবিকণ্ঠে ইউটিউবে গানটির
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .    
কবিকণ্ঠে, সাইণ্ডক্লাউডে এই গানটির  
অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


রোববার কেন যায় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে?
বয়সটা কেন যায় রাতারাতি বুড়িয়ে?
সন্ধেটা কেন হয় বিকেলটা গড়িয়ে?
ভাল্লাগে না ছাই, ভাল্লাগে না।

ফেলে আসা দিনগুলো আসে না ফিরে।
কত স্মৃতি মুছে যায় কাজের ভিড়ে।
চেনা চেনা কত মুখ হয় অচেনা।
ভাল্লাগে না ছাই, ভাল্লাগে না।

হারিয়েছে রঙ-তুলি ড্রইং খাতা,
বইয়ের ভাঁজে রাখা অশথ্‌ পাতা।
হারাল শৈশবের সোনাদানা।
ভাল্লাগে না ছাই, ভাল্লাগে না।

জিরো ক্লাসে হিস্ট্রি নৃপেন স্যারের,
বৃষ্টির দিনে আলো-অন্ধকারে
বন্ধ ঘরে কত দস্যিপনা।
ফিরে তো আসে না, তাই ভাল্লাগে না।

কলেজ কেটে গঙ্গাতে পাড়ি,
ব্যান্ডেল চার্চ থেকে ইমামবাড়ি।
কোথাও হারিয়ে যেতে ছিল না মানা।
ভাল্লাগে না ছাই, ভাল্লাগে না।

যত পাড়ার ছেলেপুলে জুটে দল বেঁধে
নাটকের মহলা বুবানদিদের ছাদে।
কত কথা, কত গান, কত কল্পনা --
হারাল কোথায়? দূর ভাল্লাগে না।

হারিয়েছে বীজ-মাটি, হারাল শেকড়।
কোথায় হারাল সবুজ কৈশোর?
দু’চোখে স্বপ্ন ঘিরে হাসি-কান্না --
ফিরে কি পাব আবার? ভাল্লাগে না।

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
সাগরের ছিল গভীরতা
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: মার্চ, ২০০২
২০০২ সালে গুজরাটে গণহত্যার নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষিতে রচিত। ২০০৭ সালের
জানুয়ারিতে প্রকাশিত সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডি
ও ক্যাসেটে সংকলিত।

শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডির, এই গানটির
ইউটিউবে  
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


সাগরের ছিল গভীরতা।
মানুষের ছিল মানবতা।
সাগর আজও গভীর,
শুধু মানুষ রইল না।
তাই ফিরি আজ গানে গানে
মানুষেরই সন্ধানে।
বন্ধু, হবে কি আমার সঙ্গী?
চলো, মানুষ খুঁজে বেড়াই॥

আকাশের ছিল অসীমতা।
মানুষের ছিল মানবতা।
আকাশ আজও অসীম,
শুধু মানুষ রইল না।
তাই ফিরি আজ গানে গানে
মানুষেরই সন্ধানে।
বন্ধু, হবে কি আমার সঙ্গী?
চলো, মানুষ খুঁজে বেড়াই॥

পাহাড়ের ছিল বিশালতা।
মানুষের ছিল মানবতা।
পাহাড় আজও বিশাল,
শুধু মানুষ রইল না।
তাই ফিরি আজ গানে গানে
মানুষেরই সন্ধানে।
বন্ধু, হবে কি আমার সঙ্গী?
এসো, মানুষ খুঁজে বেড়াই॥

বনানীর ছিল নিবিড়তা।
মানুষের ছিল মানবতা।
অরণ্য আজও নিবিড়,
শুধু মানুষ রইল না।
তাই ফিরি আজ গানে গানে
মানুষেরই সন্ধানে।
বন্ধু, হবে কি আমার সঙ্গী?
এসো, মানুষ খুঁজে বেড়াই॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
গুজব
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: ২৫ ডিসেম্বর, ২০০২
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’
অডিও সিডি ও ক্যাসেটে সংকলিত।

শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডির, এই গানটির
ইউটিউবে  
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


বলছে সবাই, শুনছে কে?
শোনার জন্যে কান চাই।
কান নিয়ে গেছে চিলে,
সব কাজ রেখে ফেলে
চিলের পেছনে দেখো ছুটছে সবাই।
গুজব -- গুজব -- গুজবের দুনিয়াটা আজব!
গুজব -- শুধু গুজব -- দেখো, গুজবের দুনিয়াটা আজব!

চাইছে সবাই, দেখছে কে?
দেখার জন্যে চোখ চাই।
চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনে
কে দেবে আলো অন্ধজনে?
অন্ধের মতো তাই হাতড়ে বেড়াই।
গুজব -- তাই গুজব -- দেখো, গুজবের দুনিয়াটা আজব!

এপাড়ার রুবি, কি ওপাড়ার বাবলি
রোজ মেখে ল্যাক্‌মে, কি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি,
পারল না রঙ-রূপে জেল্লাটা ফেরাতে,
‘কালো’ বলে ‘বদনাম’ ঘোচাতে পাড়াতে।
‘কৃষ্ণকলি’ কেউ বলেনি তো কখনো,
ফেয়ারনেস ক্রিম মেখে মিছে দেখে স্বপ্ন।
তাই গুজব -- শুধু গুজব -- দেখো গুজবের দুনিয়াটা আজব!

ছোট্টো খোকা বলে, এ বি সি --
চাই তার কোকাকোলা, চাই পেপ্‌সি।
ছোট্টো খুকি বলে, ওয়ান টু থ্রি --
তিনটে লাক্স সাবানে একটা ফ্রি।
খোকা বলে, “আই অ্যাম এ কমপ্ল্যান বয়!”
তেরোয় পা দিয়ে খুকি ‘সুস্মিতা’ হয়।
খোকার বাবা খোঁজেন মাস্টার প্ল্যান,
চান রেমন্ডস্‌ স্যুটিং-এ হতে ‘কমপ্লিট ম্যান’।
খুকির মা করেন ‘অ্যামওয়ে’-র ফিরি,
হতে চান মলাটের ‘সানন্দা’ নারী।
তাই গুজব -- শুধু গুজব -- দেখো, গুজবের দুনিয়াটা আজব!

চলছে সবাই, পায়ে হাঁটছে কে?
হাঁটার জন্যে পথ চাই।
গোলকধাঁধার পথে
ঘুরে মরি দিনে-রাতে।
চোরাপথের বাঁকে পথ যে হারাই।

বিজ্ঞাপনেই আজ শুধু পথ হাঁটা,
পায়ে দিয়ে শ্রীলেদার্স কিংবা বাটা।
ভালোবাসা মানে আজ মারুতিতে লিফট্‌,
ভ্যালেন্টাইনস্‌ ডে-তে আর্চির গিফট্‌।
এশিয়ান স্কাই শপ দেয় হাতছানি --
হাত বাড়ালেই নামিদামি কোম্পানি।

মাল্টিন্যাশনাল অন্নপূর্ণা!
ঈশ্বরী পাটনী করে প্রার্থনা,
মন ভরে না তো মা, ভাতে আর দুধে,
আমার সন্তান যেন থাকে ফাস্ট ফুড-এ।
তাই গুজব -- শুধু গুজব -- দেখো, গুজবের দুনিয়াটা আজব!

ভালোবাসা খুঁজি, ভালোবাসছে কে?
বাসার জন্যে মন চাই।
হাটের সওদা মন
খোঁজে ‘সুখী গৃহকোণ’।
মনের মানুষ বলো কোথায় যে পাই?
তাই গুজব -- আজ গুজব -- গুজবের দুনিয়াটা আজব!
গুজব -- শুধু গুজব -- দেখো, গুজবের দুনিয়াটা আজব!

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
আমার গানের ভাষা বাংলা
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল : নব্বই দশকের শেষার্ধে উগ্র প্রাদেশিকতার জিগির তুলে মহারাষ্ট্র থেকে
বাঙলাভাষীদের বলপূর্বক বিতাড়নের রাজনৈতিক চক্রান্ত ও অপচেষ্টার প্রতিবাদে এই
গানটি রচিত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে
‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডি ও ক্যাসেটে গানটি সংকলিত হয়।

শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডির, এই গানটির
ইউটিউবে  
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


আমার গানের ভাষা বাংলা।
আমার প্রাণের ভাষা বাংলা।
অভিমানের ভাষা বাংলা॥

আমার সাধের ভাষা বাংলা।
আহ্লাদের ভাষা বাংলা।
প্রতিবাদের ভাষা বাংলা॥

মাগো, তোমায় ঠোঁটে ছুঁয়ে প্রথম কথা বলতে শিখি.
তোমার শরীর ছুঁয়ে প্রথম স্লেটে আঁকিবুঁকি।
প্রথম চেনা বর্ণমালা বর্ণপরিচয়ে,
‘ডাকঘর’-এর ‘অমল’ সেজে প্রথম অভিনয়।

তোমায় ঘিরে থাকা আমার শৈশব দিনগুলি,
স্কুলের ব্যাগে লুকিয়ে রাখা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’।
ব্যাকরণের বইয়ের ফাঁকে গল্পের টুনটুনি,
সন্ধি-সমাস-বানান ভুলে দিদির বকুনি।

আমার স্মৃতির ভাষা বাংলা।
বিস্মৃতির ভাষা বাংলা।
পীরিতির ভাষা বাংলা॥

মাগো, তোমায় ছন্দে বেঁধে আমার প্রথম কবিতা।
প্রথম প্রেমের চিঠি, প্রথম ভালোবাসার কথা।
প্রথম চলা মিছিলেতে, প্রথম বলা স্লোগান।
তোমায় ভালোবেসে লেখা প্রথম বাংলা গান।

প্রথম শোনা হেমাঙ্গের “আমরা করব জয়” --
পিট সিগারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
প্রথম শোনা ভাটিয়ালি, প্রথম শোনা বাউল।
প্রথম পড়া রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, নজরুল।
শৈশবেতে কথা দিলে, কৈশোরেতে ধুন,
যৌবনেতে জ্বালিয়ে দিলে প্রাণের আগুন।

আমার ঘৃণার ভাষা বাংলা।
প্রেরণার ভাষা বাংলা।
চেতনার ভাষা বাংলা॥

তোমার বুকে কান পেতে আজ শুনি --
বিশ্ব জুড়ে মানবতার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি।
তোমার বুকে মিশল এসে দুনিয়ার সব ভাষা,
মানুষের যন্ত্রণা আর মানুষের আশা।

আমার ক্রোধের ভাষা বাংলা।
বোধের ভাষা বাংলা।
প্রতিরোধের ভাষা বাংলা॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
গুড়িয়া, ক্ষমা করিস
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল : ৩ জানুয়ারি, ২০০৬
সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি মর্মান্তিক সত্য ঘটনা অবলম্বনে গানটি রচিত হয়।  পুরুষতান্ত্রিক
সমাজের নির্মম শোষণ ও শাসনের শিকার ‘গুড়িয়া’ নামে একটি অসহায়  মুসলিম মেয়ের জীবনের
হৃদয়বিদারক গাথা। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা
স্রোতের গান’ অডিও সিডি ও ক্যাসেটে গানটি সংকলিত হয়।

শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পাল্টা স্রোতের গান’ অডিও সিডির, এই গানটির ইউটিউবে  
ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


শরীর, শুধু শরীর ছিল,
ছিল কি তোর মন?
সেই শরীরে মাটি ছড়াই,
ঘুমা আমার বোন।

তোর দুঃখে পাহাড় ফাটে,
আকুল দরিয়া।
শিশির ভেজা মাটির বুকে
ঘুমায় গুড়িয়া।
গুড়িয়া রে, গুড়িয়া রে
গুড়িয়া রে, আমার বোন।

কে রাখে তোর গুড়িয়া নাম
সোহাগ করে মেয়ে?
আদর সোহাগ গেল ঘুচে
শ্বশুরঘরে গিয়ে।

মেহেন্দি রঙ না মুছতেই
যুদ্ধে গেল বর।
খবর এল নিখোঁজ আরিফ,
ভাঙে সুখের ঘর।

শোহর ছাড়া সোমত্থ মেয়ে
যায় না ঘরে রাখা!
দেনমোহরে বিকিয়ে বেটির
আবার হল নিকা।

তৌফিক তার ভালোবাসায়
ভরিয়ে দিল মন।
প্রাণের ছোঁয়ায় উঠল মেতে
জীবন যৌবন।

চারটি বছর গেল সুখে,
হঠাৎ এল ঝড় --
বন্দিশিবির থেকে ফিরে
আরিফ এল ঘর।

ফিরতে হবে স্বামীর ভিটেয়,
মিলল ফতোয়া।
পোড়া দেশের জমির মতোই
টুকরো গুড়িয়া।

শরীর, শুধু শরীর তোর
গেল মিঞার কাছে।
তৌফিকের ভালোবাসার
বীজ শরীরে বাঁচে।

নয়টি মাসের গোপন সুখে
স্বপ্ন মিছে গড়া,
নবান্ন আর এল না, হায়
শুকিয়ে গেল চারা।

বৃন্ত থেকে পড়ল ঝরে
ফুলের মতো মেয়ে।
পাথর চোখে সমাজ শুধু
দেখল চেয়ে চেয়ে।

পুতুলনাচের এই সমাজে
বাজিকরের হাতে
জীবন্ত মেয়ে বদলে যায়
খেলার গুড়িয়াতে।

হোক না কেন রক্তমাসের,
মেয়ে বৈ তো নয়,
মেয়ের এত সাধটা কীসের?
সমাজপতি কয়।

ভালোবাসা! ইনশাল্লাহ্‌!
জাহান্নামে যাক --
নারীর দেহ, নারীর হৃদয়
পুরুষ ছিঁড়ে খাক।

ক্ষমা করিস, তোর জানাজায়
মুখ লুকিয়ে কাঁদি।
পুরুষ হয়ে জন্মেছি, বোন
আমিও অপরাধী।

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
নতুন নতুন সবুজ অবুঝ প্রাণে
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: ১৯৯৩

কবিকণ্ঠে এই গানটির সাউণ্ডক্লাউডে  
ডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .   


নতুন নতুন সবুজ অবুঝ প্রাণে
উঠল তুফান, ছিঁড়ল বাঁধন, সুর তোলে জীবনে।
মানবতার গানে॥

ভাগ্য নয়, কপাল নয়
যুক্তি দিয়ে করব জয়।
আসুক না ঘোর দুঃসময়,
লড়াই করেই বাঁচতে হয়।
এসো, আজ সবে মাতি উৎসবে লড়াইয়ের মাতনে।
মানবতার গানে॥

আমরা নবীন সূর্যসেনা,
জড়ো করে আনি রৌদ্রকণা।
ধর্মমোহের আবর্জনা
জ্বালিয়ে গড়ব সুচেতনা।
যাক পুরাতন, আসুক নূতন চৈত্র অবসানে।
মানবতার গানে॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
রাজায় বানাইলো বোমা
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: ১৯৯৮
(অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপির জোট প্রথম এনডিএ সরকারের শাসনকালে
উগ্র “দেশপ্রেমে”র জিগির তুলে পোখরানে মারণ পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরীক্ষা
ঘটানোর প্রতিবাদে এই গণসংগীতটি লেখা হয়।  গানটি প্রচলিত ঝুমুর গানের সুরে ও
আঙ্গিকে রচিত।)


রাজায় বানাইলো বোমা,
আহ্লাদের নাই সীমা।
প্যাটে দানা নাই, পানি নাই
পরনেতে নাই জামা॥

যুদ্ধখাতে বারো আনা,
শিক্ষাখাতে ছাই।
অসুখ হলে হাসপাতালে
মেলে না দাওয়াই।
লাঙল জমিন দেনায় বিকায়,
বন্ধ কারখানা॥

খাদ্যে ভেজাল, বাতাসে বিষ
জলে আর্সেনিক।
মরছে মানুষ, নাই কোনও হুঁশ
দ্যাশের বৈজ্ঞানিক।
মগজ বিকায় কোটি টাকায়,
বেঁচে মৃত্যু পরোয়ানা॥

নুন আনতে পান্তা ফুরায়,
বাজারে আগুন।
অপুষ্টিতে ভুগছে শিশু,
হচ্ছে কত খুন।
তবু পেপ্‌সি আছে, কেবল্‌ আছে
আছে ডিস্‌কো অ্যান্টেনা॥

‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ খেলছে রাজা,
অস্ত্র কেনার ফিকির।
পাক-জুজুর ভয় দ্যাখায়ে
খাচ্ছে লাভের ক্ষীর।
দ্যাশ মানে আজ মানুষ তো নয়,
কাঁটাতারের সীমানা॥

বুদ্ধ তো নয়, অটল হাসেন
হাসেন ক্লিন্টন।
দ্যাশপ্রেমের সুড়সুড়িতে
হাসেন জনগণ।
বাবু গো, খিদের জ্বালায় কান্না আসে,
হাসতে পারি না॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর     
*
বুকের মধ্যে বান্ধে বাসা
কথা ও সুর - কবি রাজেশ দত্ত
রচনাকাল: ১৯৯৭
বিগত বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পণ্য-ব্যবসায়ীদের সাথে সরকারের অশুভ আঁতাতে তাদের
মুনাফার স্বার্থে ‘কলকাতা বইমেলা’কে অবাধে ‘পণ্যের হাটবাজার’-এ পরিণত করার অনিবার্য
পরিণতিতে এবং মেলাপ্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাব ও চূড়ান্ত অব্যবস্থায় ১৯৯৭ সালে বইমেলা
আগুনে ভস্মীভূত হয়। নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন বই-বিক্রেতারা। শুধু তাই নয়, এই দুর্ঘটনায় প্রাণ
হারান এক প্রবীণ পুস্তকপ্রেমী। অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরেও ছোটো ছোটো পাবলিশার্স, বই-বিক্রেতা,
লিটল ম্যাগাজিনকর্মী ও শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের অদম্য উদ্যম ও অক্লান্ত
প্রচেষ্টায় পুড়ে যাওয়া মেলাপ্রাঙ্গণেই আবার শুরু হয় বইমেলা। ফিনিক্স পাখির মতোই জেগে ওঠে
বইমেলার প্রাণ। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গানটি রচিত হয়।


বুকের মধ্যে বান্ধে বাসা রূপকথার এক পাখি।
পোড়ালেও পোড়ে না সে, আগুনকে দেয় ফাঁকি।
ও পাখি ফিরে আসে, উড়ে আসে
জাগায় ঘুমভাঙানি গানে।
বইমেলা তাই উঠল জেগে কোলকাতা ময়দানে॥

মোদের প্রাণে আগুন, মনে আগুন, আগুন সর্ব অঙ্গে।
আগুন নিয়ে খেলার ছলে হেলায় মাতি রঙ্গে।
শীতের রাতে ঘর ছেড়েছি আগুনের সন্ধানে।
বইমেলা তাই উঠল জেগে কোলকাতা ময়দানে॥

তোদের পণ্য কাগজ, পণ্য মগজ, পণ্য বইমেলা।
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে উদারনীতির খেলা।
বই পোড়ে না, পণ্য পোড়ে, বই তো বাঁচে প্রাণে।
বইমেলা তাই উঠল জেগে কোলকাতা ময়দানে॥

মোদের পেটে জ্বলে খিদের আগুন, চোখে আগুন ক্রোধের।
চেতনাতে জ্বলে আগুন আদিম প্রতিশোধের।
বাবুদের সংস্কৃতি যাক পুড়ে যাক ক্রোধের অগ্নিবাণে।
বইমেলা তাই উঠল জেগে কোলকাতা ময়দানে॥

আগুনেতে কাগজ পোড়ে, পোড়ে না তো বই।
ছাপার আখর পুড়তে পারে, আবেগ পড়ে কই?
হাতের কলম আগুন ঝরায়, আগুন তুলির টানে।
বইমেলা তাই উঠল জেগে কোলকাতা ময়দানে॥

.    ***************************                    
.                                                                                     
উপরে      


মিলনসাগর