১ মাঝে মাঝে, সন্ধ্যার জলস্রোতে অলস সূর্য দেয় এঁকে গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ, আর আগুন লাগে জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনার | সেই উজ্জ্বল স্তব্ধতার ধোঁয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস ঘুরে ফিরে ঘরে আসে শীতের দুঃস্বপ্নের মতো | অনেক অনেক দূরে আছে মেঘ-মদির মহু.য়ার দেশ, সমস্তক্ষণ সেখানে পথের দুধারে ছায়া ফেলে দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য, আর দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে | আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল, নামুক মহুয়ার গন্ধ |
২ এখানে অসহ্য, নিবিড় অন্ধকারে মাঝে মাঝে শুনি----- মহুয়া বনের ধারে কয়লার খনির গভীর, বিশাল শব্দ, আর শিশিরে-ভেজা সবুজ সকালে, অবসন্ন মানুষের শরীরে দেখি ধূলোর কলঙ্ক ধূমহীন তাদের চোখে হানা দেয় কিসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন |
১ আমার চোখে ঘুম নেই ; যখনি ক্লান্ত চোখ বুজি চারদিকে ঘেরে দীর্ঘ ছন্দে সুদীর্ঘ অন্ধকার | আমার চোখে ঘুম নেই, স্পন্দমান দিনগুলি আমার দুঃস্বপ্ন |
দিন নেই, রাত নেই, বারে বারে চমকে উঠি ; শুধু মনে পড়ে কঠিন অন্ধকারে অবরুদ্ধ বাতাস দেওয়ালের উপরে বিষণ্ণ ছায়া, আর তোমার পাশে রাত্রি-জাগরণ-ক্লান্ত আমার দীর্ঘশ্বাস |
রাত নেই, দিন নেই, বারে বারে চমকে উঠি, আমার মনে শান্তি নেই, আমার চোখে ঘুম নেই, স্পন্দমান দিনগুলি আমার দুঃস্বপ্ন |
২ হেমন্তের সোনালী আলো সবুজ ঘাসে | তারপরে, ফাঁকা মাঠের নিঃশব্দ, গভীর রাত্রি, আর নীড়হারা পাখির শব্দ নিঃসঙ্গ আকাশে | মাঝরাতে ঘুমের মতো তোমার কালো চুল আমার মুখের উপর নামল : সেই চুল, সেই গভীর চোখ, নরম শরীরে সেই পুরোনো মরুভূমির ব্যাকুলতা ; আজ কেন জানি রক্তে অনুভব করি আকাশের বিস্তীর্ণ মুক্তিস্রোত, গহন অন্ধকারে দীপ্ত সূর্য যখন হানা দেয় ক্লান্ত রাত্রিকে |
৩ অন্ধকারের স্তব্ধতা ভেঙে কে যেন বলল : ‘জানো, কাল রাত্রে মিলির বিয়ে হয়ে গেছে ?’ অন্ধকারের দীঘিতে সে শব্দ পাথরের মতো | ‘ও কিছুই নয় ; কদিনই বা মনে থাকবে ; তবে হয়তো কোনো রাত্রে রতিবিহারের সময় হঠাৎ তোমাকে মনে পড়বে, আর সেদিন সমস্তরাত চোখে ঘুম আসবে না |’
অন্ধকারে ওর দাঁত হাসিতে ঝকঝক ক’রে উঠল |
কিছুই নয়, শুধু আকাশের মহাশূন্য, ঝরাপাতার ক্লান্তি, আর হাওয়ায় নামহীন ফুলের অদ্ভুত চাপা গন্ধ মুহূর্তগুলির নিঃশব্দ কান্নার মতো ; আর বসন্তের কোনো রাত্রে পদ্মদীঘির জলে যখন ছায়া গভীর হবে, তখন বাসনায় ক্লান্ত দেহ, কার নিঃসঙ্গ, অদৃশ্য মূর্তি চকিতে আসবে নিমীলিত চোখের অন্ধকারে ----- আর সে রাত্রে পৃথিবীর সমস্ত ঘুমে দুঃস্বপ্ন |
৪ তারপরে আমি গেলাম অনেক দূরে, অনেক দূরের সেই দেশে, যেখানে রাত্রে স্বপ্ন আসে সবুজ পাতায় ম্লান পাখির মতো ; আর আমি ভাবলাম--- একটি মানুষকে ভুলতে কতোদিনই আর লাগে, কতোদিনই বা লাগে শরীর থেকে মুছে ফেলতে আর একজনের শরীর-সর্বস্ব আলিঙ্গন ; মধ্যবিত্ত আত্মার বিকৃত বিলাস, স্যাকারিনের মতো মিষ্টি একটি মেয়ের প্রেম !
এখানে শিগগিরই বসন্ত নামবে সবুজ উদ্দাম বসন্ত !
কিন্তু সাইকেলে-ফেরা কেরানীর ক্লান্তিতে দিনের পর দিন ঘড়ির কাঁটায় মন্থর মুহূর্তগুলি মরে; ডাস্টবিনের সামনে মরা কুকুরের মুখের যন্ত্রণায় সময় এখানে কাটে ; এখানে কি কোনদিন বসন্ত নামবে সবুজ উদ্দাম বসন্ত ! আর কোনোদিন কি মুছে যাবে স্যাকারিনের মতো মিষ্টি একটি মেয়ের প্রেম !
মাঝে মাঝে তোমার চোখে দেখেছি বাসনার বিষণ্ণ দুঃস্বপ্ন ; তার অদৃশ্য অন্ধকার প্রতি মুহূর্তে আমার রক্তে হানা দেয়; আমার দিনের জীবনে তোমার সেই দুঃস্বপ্ন এনেছে পারহীন অন্ধকার |
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায় মধ্যরাত্রে | বাইরে এসে দেখি তারায় ছেয়েছে বর্ণহীন আকাশ আর হাওয়া দিয়েছে বিপুল শূন্যতা থেকে; সে হাওয়ায় শুধু যেন শুনি, কান পেতে শুনি , কোন সুদূর দিগন্তের কান্না ; সে কান্না যেন আমার ক্লান্তি, আর তোমার চোখের বিষণ্ণ অন্ধকার |
অন্ধকারের মতো ভারি তোমার দুঃস্বপ্ন, তোমার দুঃস্বপ্ন অন্ধকারের মতো ভারি |