কবি সমর সেনের কবিতা
*
বসন্ত
কবি সমর সেন

বসন্তের বজ্রধ্বনি অদৃশ্য পাহাড়ে |
আজ বর্ষশেষে
পিঙ্গল মরুভূমি প্রান্ত হতে
ক্লান্ত চোখে ধানের সবুজ অগ্নিরেখা দেখি
সুদূর প্রান্তরে |


.           ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
স্তোত্র
কবি সমর সেন

আদিদেব একা সাজে পুরুষ প্রকৃতি |
মহাজন চাষি তিনি সবাকার গতি ||
কৃষ্ণকালো বড়ো মেঘ জুড়েছে আকাশ |
শ্যামবর্ণ মূর্তি তার চাষির আশ্বাস |
ধান দেখে মহাজন বলেছে সাবাস ||
আকাশে শুনেছি আজ মেঘের বিষাণ |
ঘরে-ঘরে বুঝি আজ রাসলীলা গান ||
সাপ যত বসে আছে শিকারের তালে |
রাত্রি এল, মৃত্যু লেখা ব্যাঙের কপালে ||
মহাজন গান গায় নদারৎ ধান |
অন্ধকার প্রেতলোকে ভাবে ভগবান ||
অক্ষম এ রায়বার ঈশ্বর কথনে |
প্রভুর বন্দনা শুনি বেনের ভবনে ||


.           ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
নচিকেতা
কবি সমর সেন

"কে এসেছে কালরাত্রে কৃতান্তনগরে?
এখন হাটের বেলা, এখানে মজার খেলা,
সারি-সারি শবদেহ সাজানো বাজারে |
বজ্রনখ উলূক রাত্রির কালো গানে
দেশভক্ত বিভীষণ, মত্সবন্ধু বকধার্মিকের
কাঁধে হাত রেখে, দেখ, চলে,
মহম্মদী বেগ্ খর খড়্গ শানায়,
বাজার ভরেছে আজ হন্তারক দলে |
দুঃসাহসে তুষ্ট আমি | আশীর্বাদ করি,
পৃথিবীতে জন্ম যেন না হয় তোমার |"

"রক্তজবা সূর্য ওঠে পর্বত শিখরে,
বৃষ্টিবিন্দু দাও দেব বটের শিকড়ে |
অনাবৃষ্টির আকাশ হোক অন্যরূপী
তিন কুল ভ'রে দাও জনে ধনে জনে সুখী |"


.           ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিকলন
কবি সমর সেন

তোমাকে দেখেছি দেবী লোহিত সকালে,
মাইকেলী মেঘনাদে, বিদ্যাসাগরের
বজ্রগর্ভ করুণায়, বিপ্লবী আরাবে |
আজ বিলাপের কাল! আনন্দ আকাশে
জুটেছএ অন্যান্য জীব, হননের মন্ত্র মুখে |
পোড়ামুখ ভুলে যাও, হে জননী, এ ঘোর দুর্দিনে ;
রজকের কি বা লাভ উলঙ্গের কাছে!
বিফলে গভীর রাত্রে চাঁদ ওঠে |
অতীতের ঐশ্বর্যমহিমা চেতনার প্রান্তে আজ
বিভীষিকা মূর্তি ধরে, পদ্দার উদ্দাম গান
মাত্রারিক্ত! করাল জোয়ার! আমার সোনার ধানে
পরিচিত হাত রাখে শত্রুর দালাল |
দিগন্তে ধূসর মাঠে গতপত্র বট
মাথা নাড়ে প্রবীণ ক্লান্তিতে | সে কি জানে
যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়সে কাঙালি
দিনগত পাপক্ষয়ে মূঢ় ভ্রান্তমতি
লোকায়ত কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন বিধুর
মধ্যবিত্ত মানসের বিড়ম্বিত গ্লানি?


.           ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
মহুয়ার দেশ
কবি সমর সেন

              ১
মাঝে মাঝে, সন্ধ্যার জলস্রোতে
অলস সূর্য দেয় এঁকে
গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ,
আর আগুন লাগে জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনার |
সেই উজ্জ্বল স্তব্ধতার
ধোঁয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস ঘুরে ফিরে ঘরে আসে
শীতের দুঃস্বপ্নের মতো |
অনেক অনেক দূরে আছে মেঘ-মদির মহু.য়ার দেশ,
সমস্তক্ষণ সেখানে পথের দুধারে ছায়া ফেলে
দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য,
আর দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস
রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে |
আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,
নামুক মহুয়ার গন্ধ |


                ২
এখানে অসহ্য, নিবিড় অন্ধকারে
মাঝে মাঝে শুনি-----
মহুয়া বনের ধারে কয়লার খনির
গভীর, বিশাল শব্দ,
আর শিশিরে-ভেজা সবুজ সকালে,
অবসন্ন মানুষের শরীরে দেখি ধূলোর কলঙ্ক
ধূমহীন তাদের চোখে হানা দেয়
কিসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন |

.           ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
পাঁচমিশেলী
কবি সমর সেন

|| ১ ||

বাস্ থেকে দেখি বিরস গাছ,
কিন্তু কী সবুজ ঘাস !
ডিজেল্ তেলের পোড়াটে স্বাদ |
খালি মনে পড়ে তোমার ঠান্ডা হাত,
গুমোট গরমে পান্তা ভাত,
লঙ্কা, কাসুন্দী, পেঁয়াজ ;
বারে বারে বেহাত্ হওয়া কি তোমার রেওয়াজ ?

|| ২ ||

কারো কারো চোখে দেখি
আলোর কুহেলিকা,
ভুরুর রেখা
নদীর ওপারে বলাকা,
দেহ-মদির কবিতা
খোঁয়ারির ভোরে লেখা |

|| ৩ ||

ফিকে জ্যোত্স্না ছড়ায়
জোলো, বাসি দুধের রং|
কাকেরা ফিরেছে বর্ষার গাছে
মেয়েটি ভিজে ফুটপাথে ;
ভ্রূণসার শিশু তার পাশে
হয়ত দুধের স্বপ্ন দেখে হাসে |
ট্রেনের না স্টীমারের গুমোট ডাকে
যশোদা-পৃথিবীর আবেশ কাটে |

.       ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
ইতিহাস
কবি সমর সেন

খুচুকে

রাত্রি ওড়ায় নক্ষত্র-খচিত ওড়না |
একা গাছে কালপেঁচা বিজ্ঞের গাম্ভীর্যে জাগে |
আকাশের মধ্যপথে দলেভারি মেঘেরা চলে,
যেন বিরাট বাদুড় ডানা মেলে দুর্গম যাত্রায়,
জানি না অন্তহীন বৃত্তে কি কম্বুরেখায় |
স্তব্ধতা সংহত হয় গুমোট প্রতীক্ষায় |
অস্পষ্ট কানাকানি শুনি :
এসেছি অন্ধকার থেকে, যাত্রা শেষ হবে অন্ধকারে |
মনে কি পড়ে জন্মক্ষণে আমাদের প্রথম কান্না,
সে তো শিশুর প্রথম প্রতিবাদ : কেন এখানে আসা,
কেন শৈশবের নির্বোধ হাসি, কৈশোরের নিরুদ্দেশ আবেশ,
আর যৌবনের যন্ত্রণা আর বার্ধক্যের আসক্ত অনুতাপ ?
একের জীবনে খোঁজে সভ্যতার ইতিহাস |

হঠাৎ সূর্য ওঠে, বলিষ্ঠ প্রহারে
কুয়াশায় নদীর জল ঝলকায়--- শাণিত হাতিয়ার !
মাঝে মাঝে বালুচর, কাদাখোঁচা জলে নামে,
ধানক্ষেতে কাস্তে হাতে কিষাণ,
হাতুড়ি বাজে কামারশালে,
সবুজ আগুন জ্বলে অনেক মাঠে |

.       ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
চার অধ্যায়
কবি সমর সেন


আমার চোখে ঘুম নেই ;
যখনি ক্লান্ত চোখ বুজি
চারদিকে ঘেরে দীর্ঘ ছন্দে
সুদীর্ঘ অন্ধকার |
আমার চোখে ঘুম নেই,
স্পন্দমান দিনগুলি আমার দুঃস্বপ্ন |

দিন নেই, রাত নেই, বারে বারে চমকে উঠি ;
শুধু মনে পড়ে
কঠিন অন্ধকারে অবরুদ্ধ বাতাস
দেওয়ালের উপরে বিষণ্ণ ছায়া,
আর তোমার পাশে
রাত্রি-জাগরণ-ক্লান্ত আমার দীর্ঘশ্বাস |

রাত নেই, দিন নেই, বারে বারে চমকে উঠি,
আমার মনে শান্তি নেই, আমার চোখে ঘুম নেই,
স্পন্দমান দিনগুলি আমার দুঃস্বপ্ন |


হেমন্তের সোনালী আলো সবুজ ঘাসে |
তারপরে,
ফাঁকা মাঠের নিঃশব্দ, গভীর রাত্রি,
আর নীড়হারা পাখির শব্দ নিঃসঙ্গ আকাশে |
মাঝরাতে ঘুমের মতো তোমার কালো চুল
আমার মুখের উপর নামল :
সেই চুল, সেই গভীর চোখ, নরম শরীরে
সেই পুরোনো মরুভূমির ব্যাকুলতা ;
আজ কেন জানি রক্তে অনুভব করি
আকাশের বিস্তীর্ণ মুক্তিস্রোত,
গহন অন্ধকারে দীপ্ত সূর্য যখন
হানা দেয় ক্লান্ত রাত্রিকে |


অন্ধকারের স্তব্ধতা ভেঙে কে যেন বলল :
‘জানো, কাল  রাত্রে মিলির বিয়ে হয়ে গেছে ?’
অন্ধকারের দীঘিতে সে শব্দ পাথরের মতো |
‘ও কিছুই নয় ; কদিনই বা মনে থাকবে ;
তবে হয়তো কোনো রাত্রে রতিবিহারের সময়
হঠাৎ তোমাকে মনে পড়বে,
আর সেদিন সমস্তরাত
চোখে ঘুম আসবে না |’

অন্ধকারে ওর দাঁত হাসিতে ঝকঝক ক’রে উঠল |

কিছুই নয়, শুধু আকাশের মহাশূন্য, ঝরাপাতার ক্লান্তি,
আর হাওয়ায়
নামহীন ফুলের অদ্ভুত চাপা গন্ধ
মুহূর্তগুলির নিঃশব্দ কান্নার মতো ;
আর বসন্তের কোনো রাত্রে
পদ্মদীঘির জলে যখন ছায়া গভীর হবে,
তখন বাসনায় ক্লান্ত দেহ,
কার নিঃসঙ্গ, অদৃশ্য মূর্তি চকিতে আসবে
নিমীলিত চোখের অন্ধকারে -----
আর সে রাত্রে পৃথিবীর সমস্ত ঘুমে দুঃস্বপ্ন |


তারপরে আমি গেলাম অনেক দূরে,
অনেক দূরের সেই দেশে,
যেখানে রাত্রে স্বপ্ন আসে
সবুজ পাতায় ম্লান পাখির মতো ;
আর আমি ভাবলাম---
একটি মানুষকে ভুলতে কতোদিনই আর লাগে,
কতোদিনই বা লাগে শরীর থেকে মুছে ফেলতে
আর একজনের শরীর-সর্বস্ব আলিঙ্গন ;
মধ্যবিত্ত আত্মার বিকৃত বিলাস,
স্যাকারিনের মতো মিষ্টি
একটি মেয়ের প্রেম !

এখানে শিগগিরই বসন্ত নামবে
সবুজ উদ্দাম বসন্ত !

কিন্তু সাইকেলে-ফেরা কেরানীর ক্লান্তিতে
দিনের পর দিন
ঘড়ির কাঁটায় মন্থর মুহূর্তগুলি মরে;
ডাস্টবিনের সামনে
মরা কুকুরের মুখের যন্ত্রণায়
সময় এখানে কাটে ;
এখানে কি কোনদিন বসন্ত নামবে
সবুজ উদ্দাম বসন্ত !
আর কোনোদিন কি মুছে যাবে
স্যাকারিনের মতো মিষ্টি একটি মেয়ের প্রেম !

উজ্জ্বল, ক্ষুধিত জাগুয়ার যেন
এপ্রিলের বসন্ত আজ |

.       ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
নাগরিকা
কবি সমর সেন

যে পথে নিঃশব্দ অন্ধকার উঠেছে ঘন হয়ে
ক্লান্ত স্তব্ধতার মতো,
সে পথে দক্ষিণ হতে হঠাৎ হাহাকার এল |

শীতের আকাশে তীক্ষ্ণতায় তারাগুলি আঁকা,
হঠাৎ চাঁদ উঠে এল
কঠিন পায়ে;
কালো পাথরের মতো মসৃণ শরীর,
মেয়েটি চোখ মেলল বাইরের আকাশে—
সে চোখে নেই নীলার আভাস, নেই সমুদ্রের গভীরতা,
শুধু কিসের ক্ষুধার্ত দীপ্তি, কঠিন ইশারা,
কিসের হিংস্র হাহাকার সে চোখে |

.       ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*
দুঃস্বপ্ন
কবি সমর সেন

মাঝে মাঝে তোমার চোখে দেখেছি
বাসনার বিষণ্ণ দুঃস্বপ্ন ;
তার অদৃশ্য অন্ধকার প্রতি মুহূর্তে
আমার রক্তে হানা দেয়;
আমার দিনের জীবনে তোমার সেই দুঃস্বপ্ন
এনেছে পারহীন অন্ধকার |

মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়
মধ্যরাত্রে |
বাইরে এসে দেখি
তারায় ছেয়েছে বর্ণহীন আকাশ
আর হাওয়া দিয়েছে বিপুল শূন্যতা থেকে;
সে হাওয়ায় শুধু যেন শুনি,
কান পেতে শুনি ,
কোন সুদূর দিগন্তের কান্না ;
সে কান্না যেন আমার ক্লান্তি,
আর তোমার চোখের বিষণ্ণ অন্ধকার |

অন্ধকারের মতো ভারি তোমার দুঃস্বপ্ন,
তোমার দুঃস্বপ্ন অন্ধকারের মতো ভারি |

.       ******************     
.                                                                              
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
*