কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্তর কবিতা
*
আমি
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে সম্পাদিত “কৃত্তিবাস” পত্রিকার দ্বাবিংশ সংকলন মে ১৯৬৬ এর
কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


বলো কোন ক্রটি ছিল অতিথিসংকারে।
আমি তো বুকের বাঁ দিক ইণ্ডিয়াগেটের মতন
খুলে দাঁড়িয়েছিলাম, ওখানে হৃদয় থাকে, ওখানে নিশ্বাসে
ভারতবর্ষের আবহাওয়া সুম্পষ্ট হয়। আমি
গর্ভের ভিতর দশমাস এবং বাইরে একুনে একত্রিশ বছর আমার .
.                                জন্মের কারণ খুঁজে বেড়ালাম,
ক্ষুধায় পেলাম অন্ন, খুব বেশি খুশি হলে কলকাতার অস্ককার
.                                কাঁপিয়ে প্রচণ্ড হাসলাম ;
নদীর সামনে ভুল কবিতার জন্য কাঁদতে গিয়ে মনে হলো
সে খামোকা কয়েকটি কুটুম নক্ষত্র তার গতি
বোঝাবার জন্য উর্ধ্বে স্থির টাঙিয়ে রেখেছে---যারা
ছন্দের আদেশ না পেলে নিকটে আসেনি কখনো।
প্রায়ই এখনো আমি তাদের প্রিয়ার (প্লেটোনিক) চোখ হতে
সাহায্যের চেষ্টা করে থাকি। বছরের পর বছর তাদের জন্য প্রাণপণ কিছু
নতুন উপমা স্মাগ্‌ল করার চেষ্টায় এলার্ট থাকতে হয়।
.                                        আমি প্রকৃতির কাছ থেকে
মানুষের কাছে গিয়ে প্রেমের বদলে চেয়েছিলাম শান্তিই।

কিন্তু আজ যেন আমায় কিছুই মানাচ্ছে না ; দেখ
করতলে চাপ চাপ রক্ত অথচ কেউই (কী আশ্চর্য!) হত্যাকারী
.                        বলছে না, মাথা থেকে পা অবধি এত
কাহন কাহন ভালোবাসা অথচ প্রেমিক নই।

আজও পাগলের মতো বছর বছর ভারতবর্ষের অন্ধকার এবং
রৌদ্রের সটিক ইতিহাস বা ভূগোলে
আমার বিগত জন্ম, মৃত্যু, কিংবা প্রাদেশিক প্রাণ ছিল কিনা
.                                                        খুঁজতে যাই।
( এইখানে লক্ষ্য করুন যে 'আমি' বা 'আমার' প্রায় সমার্থক শব্দ
এ-কবিতায় প্রায়ই ব্যবহার করতে হচ্ছে ; ) হয়তো এ-কারণেই আমি
এই সেদিনও পারিনি ট্রেনের ডেমোক্রাট থার্ডক্লাসে, পাশে
যথেষ্ট জায়গা খালি থাকলেও বিহারী জনৈক ভদ্রলৌককে বসতে দিতে।
আমার বিশ্বাস নেই, সততা নেই, তবু

কি করে যে শব্দগুলি সং সাজতে আসে।
আমি কুকুরের মতো তাদের তাড়িয়ে দিয়ে পাকা তিনমাস
দরজা বন্ধ রাখবার পরেও দেখেছি তারা ক্ষুধায় বা যৌনকাতরতায়
পালিয়ে না গিয়ে, তখনো
প্রভৃতক্তির তাড়নে বাইরে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে, তাদের
ভগবান নাকি আমি, কিন্তু আমার তো নিজেরই কোনো ভগবান নেই।
খুঁজে দেখি ভেবে মন্দিরের ভিতরে গিয়েও শুনলাম
.                ঘণ্টাধ্বনি মানুষকে পাপপুণ্য শেখাচ্ছে, তাছাড়া
আমার বিশ্বাস, ভক্তি নেই দেখে ভীষণ বিরক্ত পুরোহিত
গলাধাক্কা দিয়ে প্রায় হরিজনের সমান বের করে দিলেও, কেবল
গান্ধীজির জন্য তাকে বলিনি কিছুই ;
আমাদের তিনি অহিংসা ও শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট শিখিয়ে গেছেন।
কিন্ত দু-পাঁচটা ফাল্গুন ধর্মঘট করে কাটিয়ে দেবার পরেও যখন ঈশ্বর
বাইরে এলেন না, তখন বিজ্ঞান
.                        অর্থাৎ চরকার দিক থেকে এটমের দিকে
শরীরের প্রায় ছ'ফুট উচ্চতা নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলাম।
অথচ ক্রমেই ছায়া বড়ো হলো ক্রমশই মনে হলো শরীরের কোনে
.                                                                স্বাদ নেই,
বারুদ ফুরিয়ে গেছে বলে চুম্বনও স্পার্কহীন!

আজ বারবার মনে পড়ছে স্পেনের অদ্ভুত সেই মানুষটির কথাই,
পৃথিবীতে যে-নাকি প্রথম হাইড্রোজেন বোমাকে
“কি রে, ঈশ্বরের কাছে হেরে গেলি?”---এমন ভঙ্গিতে
নিজেরই অজান্তে লাথি মেরে, ফিরে এসে
.                                দুধের সমান স্বাদু আত্মজাত শিশুটিকে
চুম্বন করেছিল ; যে হাইড্রোজেন বোমাগুলি এরোপ্লেন সংঘর্ষের পরে
সোঁ সোঁ নেমে মাটিতে পড়েও ফাটলো না ; তাদের মিলিত
.                                        এটমপুঞ্জের শোক আজ
মানুষটির ক্রমশ মৃত্যু-অপেক্ষার মধ্যে যেন
আমাদের অপরাধী হতে ডাকে। জানি না শিশুটি

যৌবনে পৌঁছবে কিনা ; পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম স্তবে কোনোদিন
ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অটোমেশান শাসিত নরকে মনুষ্যত্বের ওপর একাকী
পতাকার দৈর্ঘ্যে দাঁড়িয়ে, বুঝবে কিনা সন্ত ভোরের বাতাস
কেন ভিন্ন হতে চেয়েছিল পাখির সাহসে। হয়তো সেদিন
সূর্যের লাইব্রেরী থেকে শতশত কবিদের কবিতার পুনর্জন্মগুলি
শেখাবে শুদ্ধির গান, শেখাবে রমণী।
আমি থাকব না সেদিন, এখনো কি আছি? একে কি
বাঁচা বলে, শব্দকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, নারীকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে
দু'পংক্তি বেদনা লেখা,
.                তাও সেই একই পয়ার অথবা ব্যস্ত পাঁচমাত্রা বা ছ'মাত্রা।
বুকে বড়ো মাত্রাহীন নিশ্বাস এখনো
ফুরোয় না, কিছুতেই যেন ফুরোতে চায় না ; মরে গেলে কেউ
কাঁদবার আছে কি না সঠিক জানি না
না হলে আত্মহত্যাও করে দেখা যেত দুঃখকে বাঁচানো যায় কি না!
আসলে কিছুই আর করার নেই বলো শেষ
খুলে দিয়েছিলাম ইণ্ডিয়া গেটের মতন
ফুসফুসের যমজ জানালা ; হে অতিথি জীবন,
বলো কোন্‌ ক্রটি ছিল তোমার সৎকারে?

.       
    ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ম্যাজিক
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে সম্পাদিত “কৃত্তিবাস” পত্রিকার চতুর্বিংশ সংকলন ১৯৬৭ এর কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


মাননীয় ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমোহোদয়গণ :
ভালো করে দেখুন আমার দু হাতে কি?
ইস্কাবন, রুহিতন, চিড়িতন আর . . . না না হরতন নয়
[ হরতন মানেই বয়সদোষ, ভালোবাসাবাসির শরিক, শড়কিও বলা যায়। ]
ওটা আমার নিজেরই বড় প্রিয় মুণ্ড---টেরাকোটা।
নাক বা কানে মানুষই, শুধুমাত্র দু চোখ মানুষ
হতে গিয়েও হঠাৎ মধ্যপথে মূ্র্তি হয়ে আছে

এবার লাগান তাল ওয়ান, টু,---থ্রির আগেই দেখুন
মুণ্ডু আমি উড়িয়ে দিলাম
আপনাদের জ্যান্ত চোখের মধ্যেই ছড়িয়ে নিলাম ;
নিয়ে স্কন্ধকাটা আমি ভূত বা ভবিষ্যৎ? ভাবতে গিয়েই যাব্বাবা
শুনি আমারই হাতের এতদিনকার
ইস্কাবন
.        রুহিতন
.                চিড়িতন
সব ধর্মযাজকের বেশে স্টেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
তিন লাইন
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে সম্পাদিত “কৃত্তিবাস” পত্রিকার চতুর্বিংশ সংকলন ১৯৬৭ এর কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।

আমার ধুতি নাও, তোমার পাগড়ি দাও মুকুট করে পরি।
আজ ধর্ম মানে ভারতবর্ষ, যার সূর্য মাটি অন্নজলে
দেবতারাও বেঁচে থাকেন : বেঁচে আছেন নানক গুরু এৰং হরি।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ঠিকানা
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে সম্পাদিত “কৃত্তিবাস” পত্রিকার পঞ্চবিংশ সংকলন ১৯৬৮ এর কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


অন্যের বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থেকে মধ্যরাত্রে আমাকে নামিয়ে দিয়ে, বল্লে
“বাড়ি যাও রাত হয়েছে”
.                        দেয়ালে তেত্রিশ নম্বর ;
কিন্তু আমার তো অতো নম্বর নয়!
আমি একজন হয়ে বেরুই, দুজন হয়ে ফিরি ;
স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, ফুসফুসের মধ্যে হুড়মুড় ঢুকে গেলে
ভালোবাসা রেফিউজির মতন এককোণে সরে যায় ;
আমি আমাকে অনেক কষ্টে শরীরে জোগাড় করে
দোভাষী দরজার কাছে গিয়ে চিৎকার কয়ে বলি “চিচিং ফাঁক* ; আর
নিজের নিয়তি খুলে যায়,
.                শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এসে বলেন, “সমর এলি?
আমি যে কখন থেকে তোর জন্যে বসে আছি। এত রাত করতে হয় রে?”
খুবই লজ্জিত এবং বিনীত গলায় বলি, “একটু বেড়াতে বেরিয়েছিলাম।”
তিনি তৎক্ষণাৎ, “তুই তো তোর শরীরেও বেড়াতেই এসেছিস বেড়ানোই জীবন
.                তা বলে এতটা রাত করতে হয়!
এত রাতে যে সপ্তর্ষিমণ্ডলীর ঋষিরাও জাগতে পারেন না।*

তারপর গুরুদেব, আমার অনিদ্র একমাত্র মানুষ দেবতা, মাথার ওপরে
হাত রাখলে আমি শিশুর সমান কেঁদে উঠে প্রত্যেক রাত্রির মতন আরেকবার
আন্তরিক আর্দ্র অজুহাতে বলে উঠি,
“আপনি রোজই কেন এত কষ্ট করে জেগে বসে থাকেন ;
.                আমি যে গৃহপ্রত্যাবর্তনের পথ
ঈশ্বরের ভয়ে আর চিনতে চাই না।”

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
সোপান
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়
১৯৪১-১৯৮৫”, ২য় খণ্ড-এর কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


স্পষ্ট এক বারান্দায় কার মুখে নির্জনতা স্মরণীয় আলো।
আমি বহুদিন কোনো তেমন উজ্জ্বল দৃশ্য দাঁড়াতে দেখিনি,
যে-সব প্রতীক্ষা মৃত দ্রুতবেগ পিপাসার অসম্ভব ভুলে
তার দাহ অন্তহীন বুকের অধীন কোনো বিশাল দিঘির
ছন্দের সোপানে বসে আছে। শুধু অধিকার নেই
জলে ছায়া শুদ্ধ করে একবার দৃপ্ত ফিরে এসে
মহার্ঘ নীলিমা ঘিরে মেঘে-মেঘে সাজাতে শুভ্রতা।

যাকে অভিজ্ঞতা ভাবি সে কি সহজাত এই দৃশ্যের করুণা
কিংবা নিদ্রাহীন স্বপ্নে চিরকাল লজ্জিত খেলায়
চন্দ্রাহত হরিণীর বেগান্ধ জ্যোত্স্নার পিছে সময় হারানো!
হে সময়! হে পশ্চাদ্ধাবনরত স্মৃতিহীন শোক
তুমি কি কখনো আর প্রতিদ্বন্দ্বী অন্ধকার ফিরিয়ে নেবেনা।
দেখো ভরে উঠছি আমি লক্ষছিদ্র আকীর্ণ বিরহে
অবিরাম রক্তপাত, এই রক্ত কোনোদিন সূর্যাস্ত দেখিনি ;
আর উচ্চারণ একা মৃত্যুর দক্ষিণ কর্ণে শুধু বলে যাওয়া
---একদিন তুমি ছিলে, কোনোদিন তুমি ছিলে, তুমি
দুঃখের মতন তীব্র এক অভিমানে তবু বেচে ছিলে।

আজ মুখ নেই, আজ একাকার প্রেমের শরীরে

দেখি না শব্দের শোভা যৌবনবয়সী কোনো ধ্বনিময় নারী।
বারান্দা নির্জন দেখো নিস্তব্ধ বারান্দা জুড়ে কোনো মুখ নেই
যেখানে সমস্ত পথ দুপায়ের ধূলো ভুলে থমকে যেতে পারে।
যে-সব প্রতীক্ষা গেছে দ্রতবেগ পিপাসায় অসম্ভব ভুলে

তার দাহ অন্তহীন ছন্দের সোপানে একা ম্লান বসে আছে।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
উপাখ্যান
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
২০০৩ সালে প্রকাশিত, শামসুর রাহমান ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “দুই বাংলার
প্রেমের কবিতা” কাব্য সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


সাবিত্রী! তোমাকে দেখলাম কাল বহুদিন পরে।
সূর্য সবেমাত্র শেষ, চৌরঙ্গির অন্ধকারে
জীবনবীমার ঘড়ি জ্বলে ওঠেনি তখনও
দেশী মানুষের হাতে অনেক বিদেশ ঘুরে
ফিরে আসা জাহাজের গোপন সম্ভার, দেখলে মনে হয়
বড় সুসময়! তুমি দু'চোখে ভ্রমর নিয়ে
একা, একা নও একাকিনী, অন্যমনস্ক, দাঁড়িয়েছিলে
কিন্তু দেখছিলে না কিছুই! (প্রথমে লিখলাম 'একা'
তারপর ওই নিঃসঙ্গ শব্দকে না কেটেই লিখলাম
'একাকিনী'। কেন না আমার মনে হল তুমি নির্বাসিত, শুধু,
জনকনন্দিনী নও, রাক্ষস শহর তোমাকে প্রকাশ্যে
দাঁড় করিয়ে রেখেছে সূর্যের নিবন্ত অবেলায়!)

কবে, কতদিন আগে এই চোখ থেমেছিল তোমার দু-চোখে,
হাত ছুঁয়েছিল আষাঢ়মেঘের মতো আর্দ্র কেশপাশ, শুধু
শরীর ছোঁয়নি, কেন-না তখন অকালবর্ষণে বড় ভয়
মনে হত শস্য নষ্ট, হয়ে যাবে। তুমি ধাক্কা দিয়েছিলে
যেমন ঝড়ের আগে ধাক্কা মারে ঈশান বাতাস,
বাসাবাড়ি কেঁপে ওঠে, দরজা জানলা শান্তিতে সন্ত্রস্ত হয়,
তুমি গোপন মণির মতো আমার অক্ষর নিয়ে তেমনই মাতাল
সহমরণের শাস্তি দিতে চেয়ে খুলে দেখিয়েছিলে তাজমহল
অমন সমাধি ঊরু, ভাঁজে উড়ে এসে বসেছিল
হাজার মৌমাছি, তুমি দুষ্ট বালিকার ফুল ছেঁড়ার সমান হিংসায়
ওষ্ঠ থেকে ছিঁড়ে নিয়েছিলে প্রথম পুরুষ ভাষা ;
চিৎকার করে বলেছিলাম, “সাবিত্রী ওখানে শরীর নেই
কেন সত্যবান কবিতার সম্ভাব্য শরীর।"

সেইদিন থেকে আমি বন্দী, সেই থেকে আমি অসম্পূর্ণ
যবন মহিষ ছত্রাকার মাংস ধ্বংস করে কেবলই ভেবেছি
মৃত্যু মানেই পুনর্জন্ম, তবু বুকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি ভাষাকে!
সাবিত্রী, সব নদী সাগরে যায় না, সব পাথর
আকাশের বিরুদ্ধ উত্থানে হিমালয় হয়ে উঠে
সূর্যকে থামিয়ে শেষ জিজ্ঞাসা করে না
বল, পৃথিবী কেমন দেখলে?

সন্ধ্যার কলকাতা বড় প্রতারক, নক্ষত্রের নিচে সে-সময়
জ্বলে ওঠে চতুর নিয়ন, জীবনবীমার ঘড়ি
নতুন শিশুর মতো নিজস্ব চিৎকার করে জীবনীসন্ধানী?
সাবিত্রী, নিশ্বাস একবারই শরীরের দুঃখ থেকে মুক্তি পায়
এখন নারী ও পুরুষচিহ্নের হাড়-মাংস পড়ে থাকে, তাই
তোমাকে ভিড়ের মধ্যে ডাকি নি, তোমাকে পুরুষ চিলের মতো
ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে বলি নি এবার শরীরের নিচে এসে
মুক্তি দিয়ে যাও, আমার সমস্ত কবিতার পক্ষপাত
পুড়ে ছারখার হয়ে যাক শ্মশান উৎসবে।

সাবিত্রী! তোমাকে দেখলাম কাল, একা, একা নও, একাকিনী,
বহুদিন পর।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
অবিবাহ
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
২০০৩ সালে প্রকাশিত, অনুপকুমার মহাপাত্র সম্পাদিত “সহজ পাঠের কবিতা” কাব্য
সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


কে তোমাকে বিবাহ করাবে?
এ বংশপরম্পরার পুরোহিততো মন্ত্রের অর্থই জানে না!
মন্ত্র মানে একধরণের প্রতিশ্রতি---কোনোদিন কেউ যা রাখে না
মন্ত্র মানে সম্মান, পুরুষ অথবা নারী
কেউ কাউকে যেন অপমান করেনা কখনো।
কে তোমাকে বিবাহ করাবে!
জীবনের সুন্দর গরিষ্ঠ দিন অকসঙ্গে থাকা
ইচ্ছে হলে চাঁদে, মাঝে মধ্যে সমুদ্রমুদ্রায়
উৎসঙ্গ ভাসিয়ে ভেসে যাওয়া, পর্বতের শিখরের দিকে
সমতল থেকে কিছু উপমাকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারা
দেয়ালের সাক্ষীগোপালে
লিঙ্গকে বিবাহ করা নিশ্চিন্ত যোনির . . .

তারপর একদিন প্রচ্ছন্ন প্রদোষে যখন কেউই কারো
মুখ দেখতেই পারছিল না অথচ
ছন্দের বুদবুদে ভরে উঠছিল সসাগরা বসন্তপৃথিবী
বুকের সমস্ত রক্ত মুখে উঠে এসে
যখন অন্ধকারেও একটি নীরব মুখ
মুখর হয়েছে স্পষ্ট আলেয়া আলোয়,
আমি তোমাকে স্পর্শ না করেই বলেছি
বোধহয় একেই বিবাহ বলে, বলে না লেখা কবিতা . . .

তারপর কতবার ফুল-সাক্ষী গন্ধর্ব হয়েছে
পরিণয় করাতে নিচে নেমে এসেছে নীলাকাশ
তবু কেন মন্ত্রের অবাধ্য কোনো বিবাহ হলো না।
শুধু চন্দ্রের যুগ্মবিবাহ হলো অরুন্ধতি ও স্বাতীর কন্যা-আলোয়!
সূর্য বিবাহ না পাওয়ার দুঃখে পূব আর পশ্চিমের চেনা রৌদ্রপথে
অট্টোরোল লালে জ্বালালো চোখের দিবস অবকাশ,
বিবাহকে তাই প্রকৃতপ্রস্তাবে আজো বোঝাই গেলোনা
বোঝা গেলনা বিবাহের জন্য কেন
একজন পুরুষ আর একজন রমণী ছাড়াও
সংস্কৃতহাবা এক পুরোহিতও লাগে!

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
এছে দাঁড়িয়েছে
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
১৯৯১ সালে প্রকাশিত, উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা”
কাব্য সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


পার্ক স্টীটে এসে দাঁড়িয়েছে এক কিশোর ভিক্ষুক ;
নোংরা, অশালীন জামাকাপড়ের উপরে
.        বয়ঃসন্ধির আগের রহস্যময় দু’চোখ, নিয়নে
তার প্রার্থী চোখ উজ্জ্বল। সে মানুয দেখছে, ছোট-বড় কাপড়ের
নিচে দেখছে মেয়ে-পুরুষ। শুনছে পানশালার দরজা ঠেলে
সন্তপ্ত বেরিয়ে আস বাবুর পিছন-পিছন ছোটা
কপিলার কণ্ঠের শৃঙ্গার, অর্থাৎ গান
এবং টুং টাং পিয়ানো যা কিনা তার
গেঁয়ো নদীটির মতো।

ভিক্ষুকের আগে কিশোর শব্দটি মানায় না। অথচ আমাকে
পকেটের কনিষ্ঠ মুদ্রাটি তার বাড়ানো কৌটায়
দিতে গিয়ে দেখতে হল নোংরা কাপড়-জামার উপরে দুচোখ
অন্যমনস্ক, একাদিকে হাত অন্যদিকে মাথা, সে তাকিয়ে দেখছে
তার সমান বয়স্ক এক টেডিবালককে,
মূর্তি যার উজ্জ্বল ধাতুর মতো, প্রোটিনের ব্যবহারে আতরিক্ত উঁচু,
কিশোর তাকিয়ে ভাবছে---কি ভাবছিল? জানিনা। কেবল
টংকৃত মুদ্রার শব্দে তাকিয়ে একবার
দেখল আমাকে ;
.                আমি, অর্থৎ পানশালায়-পানশালায় নদী খুঁজতে গিয়ে
বারবার হেরে-ফিরে-আসা এক কাঙাল প্রমত্ত।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
শালগ্রাম
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
২০০৭ সালে প্রকাশিত, আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত “বাংলা কবিতার
ভুবন” কাব্য সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।


জীবাশ্মও পাথর হয়ে যেতে পারে!
যেমন হিন্দুর শালগ্রাম শিলা পড়লাম বাংলা অক্ষরে
শিলা-বিষয়ক একমাত্র প্রামাণ্য বই
---লেখক অশোক রায়। একসময় যা পর্বত ছিল, সেখানেই
কালীগণ্ডকী নদীর জল, মুক্তিনাথের পথের রাস্তায়
এই কালো-জল নদীটির দেখা পাওয়া যায়!

অ্যামোনয়ডিয়া গোষ্ঠীর জমে যাওয়া জীবাশ্মই হলো
হিন্দুর পবিত্র শিলা শালগ্রাম শিলার জননী
তাকে যুক্তিহীন ভক্তি কি শুধু ধর্মের নিগূঢ় অছিলা!
পোকা কবে বোকা হিন্দু হলো, ধর্মের বাজনা
বাজালো, তার অধিকাংশ তথ্য---সত্য এখনো অজানা!
কেননা সংস্কৃত বা বাংলা---কোনো অভিধানেই
শালগ্রামের উল্লেখ নেই।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
দিনযাপন
কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
২০০৭ সালে প্রকাশিত, আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত “বাংলা কবিতার
ভুবন” কাব্য সংকলনের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশকাল - ২৮.১২.২০২০।

'মহানুভবতা' তুমি কোনো কোনো মানুষে পৌঁছাও,
একজন লিপিকুশল মানুষ
মহানুভবতাকে করতে পারে গোপন মুখোশ। হুঁশ
করে নির্নিমেষ না তাকালে বোঝাই যাবে না তার সেই
.                                                সাজার পন্থাও!
এত মানুষ আর অমানুষ পাশাপাশি রয়েছে জীবনে
এদের মৃত্যুর পর কিছু কিছু মানব থেকেই যাবে, এই সত্য মনে মনে
মেনে নিয়েও দেখেছি মানবেরাও নিজের সম্মান চায়
.                                                প্রাথমিকভাবে
আমি সৎ সাধ্যের অভাবে
সব কিছু ছেড়ে যাই নিজের কালির কাছে
কাগজের যতটুকু সাদা আজও স্থির জেগে আছে
সেখানে কলম নিয়ে শব্দের ভাঙা গড়া খেলি,
প্রতিবারই আকাশ আসে না, আসে না ভোরের ফুলকলি
কখনো যখন আসে
বিস্ময়ে তাকিয়ে ভাবি এ কার মহান শব্দ? আশেপাশে
কেউইতো নেই! কে তবে আমাকে দিয়ে এমন লেখায়
সেকি মহানুভবতা! দিন যায়, দিন কিছু না রেখেই
.                                                চলে যায়।

.           ****************          
.                                                                        
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর