কবর কবি শঙ্খ ঘোষ উত্তম দাশ, মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা” ( ১৯৯১ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বসহা লজ্জা লুকোই কাঁচা মাটির তলে – গোপন রক্ত যা-কিছুটুক আছে আমার শরীরে, তার সবটুকুতে শস্য যেন ফলে | কঠিন মাটির ছোঁয়া বাতাস পেয়েছি এই সমস্ত দিন--- নিচে কি তার একটুও নয় ভিজে ? ছাড়িয়ে দেব দুহাতে তার প্রাণাঞ্জলি বসুন্ধরা, যেটুকু পাই প্রাণের দিশা নিজে |
ক্ষীণায়ু এই জীবন আমার ছিল কেবল আগলে রাখা তোমার কোন কাজেই লাগে নি তা— পথের কোণে ভরসাহারা পড়ে ছিলাম সারাটা দিন ; আজ আমাকে গ্রহণ করো মিতা ! আর কিছু নয় তোমার সূর্য আলো তোমার তোমারই থাক আমায় শুধু একটু কবর দিয়ো চাইনে আমি সবুজ ঘাসের ভরা নিবিড় ঢাকনাটুকু মরাঘাসেই মিলুক উত্তরীয় |
লজ্জা ব্যথা অপমানে উপেক্ষাতে ভরা আকাশ ভেঙেছে কোন্ জীবনপাত্রখানি--- এ যদি হয় দুঃখ আমার, তোমায় নয়তো এ অভিযোগ মর্মে আমার দীর্ঘ বোঝা টানি | সেদিন গেছে যখন আমি বোবা চোখে চেয়েছিলাম সীমাহীন ওই নির্মমতার দিকে— অভিশাপ যে নয় এ বরং নির্মমতাই আশীর্বাদ হে বসুধা, আজ তা শেখে নি কে |
রক্তভরা বীভত্সতায় ভরেছে তার শীর্ণ মাটি রিক্ত শুধু আমাদের এই গা-টা টানা টানা চক্ষু ছিঁড়ে উপচে পড়ে শুকনো কাঁদা থামল না আর মরুবালুর হাঁটা | যে পথ দিয়ে সূর্য গেল ছায়াপথও তার পেছনে হারিয়ে যায় লুকিয়ে যায় মিশে ঘোড়ার ক্ষুরে থিঁতাল বুক অলজ্জ সে আলোর ধারা দীপ্ত দাহ ভরেছে চোখ কিসে !
কুন্ডলিত রাত্রিটা আজ শেষ প্রহরে ভাসাল স্বর ‘তুমিই শুধু বীর্যহারার দলে, ঋজু কঠিন সব পৃথিবী হাড়ে হাড়ের ঘষা লেগে অক্ষমতা তোমার চোখের পলে !’ নিবেই যখন গেলাম আমি, নিবতে দিয়ো হে পৃথিবী আমার হাড়ে পাহাড় করো জমা— মাটি আকাশ বাতাস যখন তুলবে দুহাত, আমার হাড়ে অস্ত্র গোড়ো, আমায় কোরো ক্ষমা |
বলো তারে, ‘শান্তি শান্তি’ কবি শঙ্খ ঘোষ উত্তম দাশ, মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা” ( ১৯৯১ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
১ মাগো, আমার মা— তুমি আমার দৃষ্টি ছেড়ে কোথাও যেয়ো না |
এই যে ভালো ধুলোয় ধুলোয় জড়িয়ে আছে দুয়ারহারা পথ এই যে স্নেহের সুরে---আলোয় বাতাস আমার ঘর দিলরে দিল— আকাশ দুটি কাঁকন বাঁধে, বলে, আমার সন্ধ্যা আমার ভোর সোনায় বাঁধা---ভুলে যা তুই ভুলে যা তোর মৃত্যু মনোরথ | সেই কথা এই গাছ বলেছে, সেই কথা এই জলের বুকে ছিল, সেই কথা এই তৃণের ঠোঁটে ---ভুলে যা তুই, দুঃখরে ভোল তোর, ধুলোতে তুই লগ্ন হলে আনন্দে এই শূন্য খোলে জট |
তুমি, আমার মা— শান্তি তোমার ঘট ভরেছে, দুঃখ তোমার পল্লবে কি গাঁথা তুমি আমার চক্ষু ছেড়ে কোথাও যেয়োও না |
২ আকাশ বলে বাতাস বলে ব্যথা | ব্যথার তুলি পলাশলাল মেঘে | ভাঙলে তুমি প্রেমের নীরবতা দুঃখ আমার টলবে বুকে লেগে |
দুঃখ আমার বুকের টলোমলো জলের বুকে সন্ধ্যা দিল এঁকে – ব্যথায় লেগে বন-বনানী হলো আমার মতো, আমার মতো কে কে ?
আমার মতো বাতাস জানে ডানা, আমার মতো সূর্য জানে ফুল, তোমার চোখে নিদ্রা হলো টানা মরণমুখী সূর্য আর জাগনলোভী চাঁদে আকাশ পরে স্নিগ্ধ দুটি দুল |
৩ মাগো, আমার মা— তুমি আমার এ ঘর ছেড়ে কোথাও যেয়ো না |
মৃত্যু তোমায় ভয় পেয়েছে, রাত্রি এল অন্তদীঘির পারে, যেখানে এই চোখ মেলেছে সেই খানে কার শান্তি কেঁদে মরে ? নিশুতি রাত ঝুমঝুমিয়ে আর্তনাদের বর্শা এল ছুটে— যেখানে যাও সেখানে নেই শান্তি তোমার সেখানে নেই আর | দিন ছুটেছে রৌদ্ররথে শহরগ্রামে সাগরে বন্দরে যেখানে যাও সেখানে চাপরক্ত পাবে শীর্ণ করপুটে— আকাশ-ডাঙা বন-বনানী শান্তি বাঁধে শান্তি বাঁধে কার !
তুমি আমার মা— শান্তি তোমার ঘট ভরেছে, রক্তে ঘটের সিঁদুর হবে টানা তুমি আমার ঘর ছেড়ে মা কোথাও যেয়ো না |
নিদ্রা কবি শঙ্খ ঘোষ উত্তম দাশ, মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা” ( ১৯৯১ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
তা পারে অগ্রজ | কিন্তু আমরা কি পুরো গোলাপের কথা জানি ! আমরা তো বেজে উঠি প্রতিটি পাপড়ি তার অবকাশে তারো বেশি বর্ণ ও বিন্যাস | সেই প্রাতঃকাল যোজন যোজন সেই রৌদ্রময়—যত বেশি রৌদ্রময় তত অচিহ্নিত অনুত্তর উল্লোল বারতা | অর্থাৎ গোলাপ, সমগ্র গোলাপ, তুমি বলো একটি গোলাপ ! অর্থাৎ অনবচ্ছিন্ন জেগে-থাকা | তা পারে অগ্রজ | আজো পারে ? আজো কোনোখানে প্রাতঃকাল যোজন যোজন প্রাতঃকাল ! ওই দেখ পূত জাগরণে বৃক্ষ, পূত জাগরণে স্রোতস্বিনী ---ওরা সাযুজ্য জেনেছে ওরা জেনেছে তামস মৌন এককতা, অখন্ড নিস্তর কত সর্বাঙ্গীণ নিদ্রা ! বলো, আমরা কি অনিদ্রাবিলাসী ?
পথ কবি শঙ্খ ঘোষ আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত “বাংলা কবিতার ভুবন” ( ২০০৭ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
‘পথের বিলাস যায় পথে পথে বিলাতে বিলাতে’--- উদ্ বৃত্ত থাকে না কিছু---এ বড়ো আশ্চর্য লাগে সখী | যত ছন্দ বাজে, যত তৃপ্তি দেখো স্ফটিকে নীলাতে তাতে খুঁজে দেখো, প্রশ্ন করে দেখো, ‘আছো কি আছো কি’--- থাকে না সে কিছুতেই, মেলে না যা কিছু মেলে না, ঘরে যাকে পেতে চাও সে পালায়. পথে পথে ঘুরে | স্ফটিকে নীলায় যাকে পাও, প্রাণভরণের দেনা তাতেও মেটে না তাই ছুটে চলি আরো আরো দূরে |
এ কেমন মন্দ নয় তবুও পথেই বাসা ভরা— দৃষ্টিতে মেলেনি যাকে সৃষ্টি ভ’রে তাই অনুভব | মন্দ নয় গিয়ে বসা জমায়েতে, নির্দয়-অক্ষরা প্রকৃতির কথা শোনা, দূরাদয়শ্চক্রনিভ সব গোল হয়ে ঘুরে যাওয়া মরীচিকাবৎ চোখে চোখে, ফুল ছোঁড়া রং ছোঁড়া প্রাণহীন স্থবির ভিলাতে | যে বিলাস অন্তহীন ধূলাগত পলাশে অশোকে পথের সে প্রেম যাক পথে পথে বিলাতে বিলাতে |