এই প্রকৃতি
কবি শঙ্খ ঘোষ
প্রমথনাথ বিশী ও ডঃ তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কাব্য বিতান” ( ১৯৬৬ ) কবিতা
সংকলন থেকে নেওয়া |


ঘুরে ঘুরে এই প্রকৃতি কী কথা কয় ?
সে বলে যার প্রেমের মতন আর কিছু নয় !

এই যে ভালবাসছি আমি সাতসাগরা ধরিত্রীকে,
এই যে স্নেহের সুধা, সুধায় ছড়িয়ে দিলুম শরীরটিকে—
স্নিগ্ধ সবুজ ললাট মেলে সেই যেখানে দিগন্তে সে
আপন মনে তাকিয়ে থেকে একটুখানি স্বপ্নে মেশে---
তার বুকে যে শ্রান্তিবিহীন তৃপ্তিবিহীন জ্বলছে প্রণয়
কেই জানো তা ! সে শুধু কয়, প্রেমের মতো আর কিছু নয় |

এখন তখন যখন যাকে দেখছি মনে হচ্ছে চেনা,
হাত বাড়িয়ে ডাকছে তারা ‘দে না রে ভাই হৃদয় দে না’ |
দুচোখ ভরা স্নেহের প্লাবন শূন্যে নাচে প্রাণের মুঠো,
বাঁধনহারা কাঁপন তোলে উদাসী দিনরাত্রি দুটো—
সবাই মিলে তারা আমায় গুণগুনিয়ে কেবল শোনায়,
তোমরা শোনো প্রেমের মতো আর কিছু নয় আর কিছু নয় |

সে তো কেবল এই কথাটাই গুনগুনিয়ে নৃত্যে ফেরে,
‘দে তোরা দে, আমার বুকে স্নেহের আগুন জ্বালিয়ে দে রে |’
আকাশ ভরা নীল টলেছে মাটির ভরা-বুকের টানে,
একূল ওকূল দুকূল ভেঙ্গে জল ছুটে যায় কী সন্ধানে,
গাছ কেঁপে যায় ফুল তোলে মুখ, সন্ধ্যা ভোরের আলোর বিনয়—
সবাই মিলে গান তুলেছে, প্রেমের মতো আর কিছু নয় |

.                         ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতা
setstats
*
বিকল্প
কবি শঙ্খ ঘোষ
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী প্রকাশিত  “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” ( ২০০৭ ) থেকে
নেওয়া |


নিশান দল হলো হঠাৎ সকালে
ধ্বনি শুধু থেকে গেল, থেকে গেল বাণী
আমি যা ছিলাম তাই থেকে গেছি আজও
একইমতো থেকে যায় গ্রাম রাজধানী

কোনো মাথা নামে আর কোনো মাথা ওঠে
কথা ছুঁড়ে দিয়ে যায় সারসের ঠোঁটে |

আমার গাঁয়েই না কি এসেছিল রাজা
কখনও দেখিনি এত শালু বা আতর
নিচু হয়ে আঁজলায় চেয়েছি বাতাস
রাজা হেসে বলে যায় : ভালো হোক তোর |

কথা তবু থেকে যায় কথার মনেই
কঠোর বিকল্পের পরিশ্রম নেই !

.                   ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
আপাতত শান্তিকল্যাণ
কবি শঙ্খ ঘোষ
ছাত্রসংগ্রাম  প্রকাশনী প্রকাশিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” ( ২০০৭ ) থেকে
নেওয়া |


পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি
কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি
.                এখন সবই শান্ত, সবই ভালো |
তরল আগুন ভরে পাকস্থলী
যে-কথাটাই বলাতে চাও বলি
.                সত্য এবার হয়েছে জমকালো |

গলায় যদি ঝুলিয়ে দাও পাথর
হালকা হাওয়ার গন্ধ সে তো আতর
.                তাই নিয়ে যাই অবাধ জলস্রোতে—
সবাই বলে, হা হা রে রঙ্গিলা
জলের উপর ভাসে কেমন শিলা
.                শূন্যে দেখো নৌকো ভেসে ওঠে |

এখন সবই শান্ত ,বই ভালো
সত্য এবার হয়েছে জমকালো
.                বজ্র থেকে পাঁজর গেছে খুলে
এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন
আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন
.                আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে |

.                   ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
অন্ধবিলাপ
কবি শঙ্খ ঘোষ
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী  প্রকাশিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” ( ২০০৭ ) থেকে
নেওয়া |


.                ধৃতরাষ্ট্র বললেন

ধর্মক্ষেত্রে রণক্ষেত্রে সমবেত লোকজনেরা
সবাই মিলে কী করল তা বলো আমায় হে সঞ্জয়

অন্ধ আমি দেখতে পাই না, আমিই তবু রাজ্যশিরে
কাজেই কোথায় কী ঘটছে তা সবই আমায় জানতে হবে

সবই আমায় বুঝতে হবে কার হাতে কোন্ অস্ত্র মজুত
কিংবা কে কোন্ লড়াই ধাঁচে আড়াল থেকে ঘাপ্ টি মারে

অন্ধ আমি, দেখতে পাই না, আমিই তবু রাজ্যশিরে
এবং লোকে বলে এ দেশ যে তিমিরে সেই তিমিরে

কারা এসব রটিয়ে বেড়ায় বলো আমায় হে সঞ্জয়
অন্ধ আমি, কিন্তু তবু এসব আমায় জানতে হবে

তেমন-তেমন তম্বি করলে বাঁচবে না একজনার পিঠও
জানিয়ে দিয়ো খুবই শক্ত বল্গাতে এই রাষ্ট্র ধৃত

অসম্ভবের কুলায় আমার পালক দিয়ে বুলিয়ে যাবে
সেই আশাতে ঘর বাঁধিনি, দুর্যোধনরা তৈরি আছে

এবং যত বারী আছে তাদের মগজ চিবিয়ে খাবে
খাচ্ছে কি না সেই কথাটি জানাও আমায় হে সঞ্জয়

সামান্য এক ছটাক জমি ছাড়বে কেন আমার ছেলে
আমার সঙ্গে ভূমিসেনা আমার সঙ্গে ভূস্বামীরা

আমার সঙ্গে দ্রোণ বা কৃপ আমার সঙ্গে ভীষ্মবিদুর
যেদিক থেকে দেখতে গেলে ধর্মরাজ্য এমন কী দূর

দুষ্টে বলে, মনে মনে তারা আমার কেউ না কি নয়
সেটাও যদি সত্য হয় তো একাই একশো আমার ছেলে

তারাই জানে শমনদমন, ধ্বংস দিনে ধ্বংস রাতে
ছড়িয়ে যাবে ঘটল যা সব আরওয়ালে কানসারাতে

যে যা করে তাকে তো তার নিশ্চিত ফল ভুগতে হবে
কোথায় যাবে পালিয়ে, দেখো সামনে আমার সৈন্যব্যুহ

তিনদিকে তিন দেয়াল ঘেরা সাতান্ন রাউণ্ড গান্ধী মাঠে
ভিজল মাটি ভিজল মাটি ভিজুক মাটি রক্তপাতে

অধর্ম ? কে ধর্ম মানে ? আমার ধর্ম শত্রুনাশন
নিরস্ত্রকে মারব না তো সবসময় কি মানতে পারি ?

মারব না কি নির্ভূমিকে ? নিরন্নকে  নিরস্ত্রকে
অবশ্য কেউ মেরেছিল সেটাই বা কে প্রমাণ করে ?

এখন আমার মনে পড়ে বেদব্যাস যা বলেছিলেন
সৈন্য অস্ত্র ছুঁড়ছে তা নয়--- কোষ থেকে তা আপ্ নি ছোটে

মাঝেমাঝেই ছুটবে এমন ----ব্যাস তো জানেন আমার দশা
এই যে আমার একশো ছেলে ---কেউ বশে নয় আমার

এইরকমই অন্ধ আমি, আমিই তবু রাজ্যশিরে
---কিন্তু কারা শপথ নিল নিজেরই হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে ?

ধানজমিতে খাসজমিতে সমবেত লোকজনেরা
ধেয়ে আসছে সামন্তদের --- কেন এ দুস্বপ্ন দেখি ?

পূব থেকে পশ্চিমের থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে কে
অক্ষৌহিণী ঘিরবে বলে ফন্দি করে আসছে ঝেঁপে ?

লোহার বর্মে সাজিয়ে রাখি কেউ যেন না জাপটে ধরে
স্বপ্নে তবু এগিয়ে আসে নারাচ ভল্ল খড়গ ভোমর –

এখন আমার মনে পড়ে বেদব্যাস যা বলেছিলেন
নিদেনকালে সমস্তদিক নাশকচিহ্ন ছড়িয়ে যাবে

সন্ধ্যাকাশে দুই পাশে দুই শাদালালের প্রান্ত নিয়ে
কৃষ্ণগ্রীব মেঘ ঘুরবে বিদ্যুদ্দামমন্ডিত

বাজশকুনে হাড়গিলেতে ভরবে উঁচু গাছের চূড়ো
তাকিয়ে থাকবে লোহার ঠোঁটে খুবলে খাবে মাংস কখন

মেঘ ঝরাবে ধূলো, মেঘেই মাংসকণা ছড়িয়ে যাবে
হাতির পিঠে লাফিয়ে যাবে বেলেহাঁস আর হাজার ফড়িং

কাজেই বলো, হে সঞ্জয়, কোন্ দিকে কার পাল্লা ভারি ?
জিতব ? না কি নিদেনকালের জাঁতায় পিষে মরব এবার ?

সর্বনাশে সমুৎপন্নে অর্ধেক কি ছাড়তে হবে ?
টুকরো টুকরো করব কি দেশ পিছিয়ে গিয়ে সগৌরবে ?

যে যাই বলুক এটাই ধ্রুব---আমার দিকেই ভিড়ছে যুব
তবুও শুধু ব্যাস যা বলেন সেটাই কি সব ফলবে তবে ?

ফলুক, তবু শেষ দেখে যাই, ন্যাংটার নেই বাটপাড়ে ভয়
ইঙ্গিতে-বা বলছে লোকে আমার না কি মরণদশা

বাজশকুনে হাড়গিলেতে তাকিয়ে আছে লোহার ঠোঁটে—
ধানজমিতে খাসজমিতে জমছে লোকে কোন্ শপথে

কিসের ধ্বনি জাগায় দূরে দিকে এবং দিগন্তরে
দেবদত্ত পাঞ্চজন্য মণিপুষ্পক পৌন্ড্র সুঘোষ

শেষের সে-রোষ ভয়ংকরী সেই কথাটা বুঝতে পারি
কিন্তু তবু অন্ধ আমি, ব্যাসকে তো তা বলেইছিলাম

বলেছিলাম এটাই গতি, ভবিতব্য এটাই আমার
আমার পাপেই উশকে উঠবে হয়তো বা সব ক্ষেত বা খামার

উশকে উঠুক উশকে উঠুক মহেশ্বরের প্রলয়পিনাক
সর্বনাশের সীমায় সবাই যায় যদি তো শেষ হয়ে যাক

কোন্ খেতে বা কোন্ খামারে সমবেত লোকজনেরা
জমছে এসে শস্ত্রপাণি বলো আমায় হে সঞ্জয়

সমবেত লোকজনেরা কোথায় কখন কী করছে তা
শোনাও আমায়, অন্ধ আমি, শোনাও আমায় হে সঞ্জয়

শোনাও আমায় শোনাও আমায় শেষের সেদিন হে সঞ্জয় |

.                      ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
লজ্জা
কবি শঙ্খ ঘোষ
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী  প্রকাশিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” ( ২০০৭ ) থেকে
নেওয়া |


বাবুদের          লজ্জা হলো
আমি যে         কুড়িয়ে খাব
সেটা ঠিক        সইল না আর
আজ তাই        ধর্মাবতার
আমি এই         জেল হাজতে
দেখে নিই         শাঠ্যে শঠে |

বাবুদের          কাঁচের ঘরে
কত-না           সাহেবসুবো
আসে,আর        দেশবিদেশে
উড়ে যায়         পাখির মতো—
সেখানে            মাছির ডানায়
বাবুদের           লজ্জা করে !

আমি তা          বুঝেও এমন
বেহায়া            শরমখাকী
খুঁটে খাই          যখন যা পাই
সুবোদের         পায়ের তলায় |
খেতে তো         হবেই বাবা
না খেয়ে           মরব না কি !

বেঁধেছ             বেশ করেছ |
কী এমন           মস্ত ক্ষতি !
গারদে             বয়েস গেল
তা ছাড়া           গতরখানাও
বাবুদের           কব্জা হলো---
হলো তো          বেশ, তাতে কি
বাবুদের            লজ্জা হলো ?

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
মন্ত্রীমশাই
কবি শঙ্খ ঘোষ
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে
নেওয়া |


মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ বিকেলবেলায় |  সকাল থেকে
অনেকরকম বাদ্যিবাদন, পুলিশবাহার | আমরাও সব যে-যার মতো জাপটে আছি
ঘরখোয়ানো পথের কোনা |
মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ, তখন তাঁকে
একটি কথা বলব আমি |
বলব যে এই যুক্তিটা খুব বুঝতে পারি
সবাইকে পথ দেবার জন্য কয়েকজনকে সরতে হবে
তেমন-তেমন সময় এলে হয়তো আমায় মরতে হবে |
বুঝতে পারি |
এ-যুক্তিতেই ভিটেমাটির ঊর্ণা ছেড়ে বেরিয়েছিলাম
অনেক আগের রাতদুপুরে ঘোরের মতো
কন্ঠাবধি আড়িয়ালের ঝাপটালাগা থামিয়েছিলাম
কম্বুরেখায় অন্ধরেখায় মানিয়েছিলাম
ছাড়তে হবে
সবার জন্য কয়েকজনকে ছাড়তে হবে |
কিন্তু সবাই বলল সেদিন, হা কাপুরুষ হদ্দ কাঙাল
চোরের মতো ছাড়লি নিজের জন্মভূমি !
জন্মভূমি ? কোথায় আমার জন্মভূমি খুঁজতে খুঁজতে জীবন গেল |
দিন কেটেছে চোরের মতো দিনভিখারির ঘোরের মতো
জাগতে গিয়ে স্পষ্ট হলো
সবার পথে সবার সঙ্গে চলার পথে
আমরা শুধু উপলবাধা |
আমরা বাধা ? জীবন জুড়ে এই করেছি ?
দেশটাকে যে নষ্ট করে দিলাম ভেবে কষ্ট হলো |
এখান থেকে ওখানে যাই এ-কোণ থেকে ওই কোনাতে
একটা শুধু পুরোনো জল জমতে থাকে
চোখের পাশে
আনিয়ালের কিনার ঘেঁষে, কিন্তু তবু বুঝতে পারি
সবার জন্য এই আমাদের কয়েকজনকে মরতে হবে |
একটা কেবল মুশকিল যে, মন্ত্রীমশাই
ওদের মতো সবার মতো এই ভুবনের বিকেলবেলায়
জন্মভূমি পায়ের কাছে সন্ধ্যা নেমে আসার মতো
মাঝেমধ্যে আমারও খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে—
তার কী করা ?

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
বাবুমশাই
কবি শঙ্খ ঘোষ
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে
নেওয়া |


.                    সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা |
.                    বেঁচে ছিলাম বলেই সবার কিনেছিলাম মাথা
আর                তাছাড়া ভাই

আর                 তাছাড়া ভাই, আমরা সবাই ভেবেছিলাম হবে
.                     নতুন সমাজ, চোখের সামনে বিপ্লবে বিপ্লবে
যাবে                খোল-নলিচা

যাবে                 খোল-নলিচা পালটে, বিচার করবে নীচুজনে,
.                      ---কিন্তু সেদিন খুব কাছে নয় জানেন সেটা মনে
মিত্র                  বাবুমশয়

মিত্র                  বাবুমশয় বিষয়-আশয় বাড়িয়ে যান তাই,
.                     মাঝেমধ্যে ভাবেন তাদের নুন আনতে পান্তাই
নিত্য                ফুরোয় যাদের

নিত্য                ফুরোয় যাদের সাধ-আহ্লাদের শেষ তলানিটুকু
.                      চিরকাল রাখবে তাদের পায়ের তলায় কুকুর
সেটা                  হয় না বাবা

সেটা                 হয় না বাবা বলেই থাবা বাড়ান যতেক বাবু
.                      কার ভাগে কী কম পড়ে যায় ভাবতে থাকেন ভাবুক
অমনি                দু’চোখ বেয়ে

অমনি                দু’চোখ বেয়ে অলপ্পেয়ে ঝরে জলের ধারা
.                      ভাবেন বাবু হা বিপ্লবের সব মাটি সাহারা
কুমির                 কাঁদতে থাকে

কুমির                কাঁদতে থাকে আর আমাকে নামা নামা বলে
.                      কিন্তু বাপু আর যাব না চড়াতে জঙ্গলে
আমরা               ঢের বুঝেছি

আমরা               ঢের বুঝেছি খেঁদি পেঁচি নামের এসব আদর
.                      সামনে পেলেই ভরবে মুখে প্রাণ ভরে তাই সাধো
তুমি                 সে বন্ধু না

তুমি                সে বন্ধু না যে ধূপধূনা জ্বলে হাজার চেখে
.                    দেখতে পাবে তাকে সেকি যেমন তেমন লোকে
তাই                সব আমাত্য

তাই                সব আমাত্য পাত্র-মিত্র এই বিলাপেই খুশি
.                    হাঁড়িখানাই আসল সত্য আর’ত সবই ভুষি
ছিছি                হায় বেচারা

ছিছি                হায় বেচারা শুনুন যারা মস্ত পরিত্রাতা
.                     এ কলকাতার মধ্যে আছে আর একটা কলকাতা
হেঁটে                 দেখতে শিখুন

হেঁটে                দেখতে শিখুন ঝরছে কী খুন দিনের রাতের মাথায়
.                     আরেকটা কলকাতায় সাহেব, আরেকটা কলকাতায়
.                     সাহেব বাবুমশাই |

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
জন্মভূমি
কবি শঙ্খ ঘোষ
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে
নেওয়া |


মেঘনায় মধ্যরাত, ডেকের উপরে একা তুমি—
তোমারই দুচোখভরা আমার নিরালা জন্মভূমি |

তুমি সেই দেশ তুমি আমার সর্বংসহা দেশ
উদাসীন যাকে খুব সহজেই ভুলে যেতে পারি
তবু তুমি ধরে রাখো আমার পায়ের কাছে মাটি
ঘাটে ঘাটে জ্বেলে রাখো আকাশপ্রদীপ সারি সারি
যে-কোনো ভাটির টানে মোহানায় ছুটে যেতে যেতে
তোমার কথা যে আমি কখনো ভাবিনি এক তিলও
সেকথা জেনেও তবু থেকেছ আমারই পাশে পাশে
কী-বা আসে যায় হাতে কে কোথায় দিল বা না-দিল !
শিয়রে ভয়াল ঘোর পটভূমি করেছে বিকাশ
হাজার হাজার চোখে তারাদের তবুও পাহারা
দুধারে সজল চুপ, তার মাঝখানে তুমি একা
দাঁড়াও, দাঁড়িয়ে থাকো | ঘুমোক, ঘুমাতে চায় যারা |

আবারও জেগেছে ঢেউ, ডেকের উপরে জাগো তুমি
তোমাকেই জানি আজ আমার বিষাদজন্মভূমি |

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
পিকনিক
কবি শঙ্খ ঘোষ
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে
নেওয়া |


মনে পড়ে আমাদের ডায়মন্ডহারবারে পিকনিক

বৃষ্টিভরা মেঘগুলি জমে ছিল নদীর ওপারে
এপারে গম্ভীর ছিল বসতির মধ্যে ভাঙা চার্চ
মাঝখানে ভাসমান নৌকো নিয়ে মগ্ন ছিল জাল |

মনে পড়ে সকলের ব্যস্ত যৌবনের তাপ থেকে
অগোচরে ঘুরে যাওয়া পাতাময় শীতল ভিতরে
যেখানে দাঁড়িয়ে আছো সনাতন ক্রস, কন্ ফেশন |

কিন্তু কোন্ কন্ ফেশন ? ভয় হয় | চলো ফিরে যাই |
ওইপার থেকে মেঘ এপারে আসেনি এতদিনে ?
শরীরে মাটির গন্ধ মেঘে নেওয়া হয়ে গেছে শেষ |

আমাকে নেয়নি কেউ, আমাদের, তাই সারি সারি
বসেছি মেঘের দল, কিন্তু কোনো বৃষ্টি নেই বুকে
অবাধ ভাতের স্বাদে ফিরে আসে সাবেক আহ্লাদ |

হঠাৎ ঝাঁপিয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে, বৃষ্টি নয় ঠিক
ভুক্তাবশেষের দিকে লুব্ধ কাক, ইতর শিশুরা,
ঢেউ লেগে নৌকোগুলি চলে যায় নদীর ওপারে |

তারপর উঠে আসি, শরীরে সজল প্রবণতা |
শোনা যায় আমাদের ডায়মন্ডহারবারে পিকনিকে
ফিরে আসবার পথে কারা যেন পাথর ছুঁড়েছে |

পাথর ছুঁড়েছে ? কিন্তু কন্ ফেশন ?  চলো ফিরে যাই |

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
কোন্ টা আমি
কবি শঙ্খ ঘোষ
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে
নেওয়া |


‘আমার আছে পদ্মানদী’ ‘আমার আছে গঙ্গা’
‘আমার আছে খুলনা-যশোর’ ‘আমার আছে বনগাঁ’
‘আমার আছে রূপসা’ ‘আমার রূপনারায়ণ নেই’ ?
‘শিলাইদহ আমার’ ‘আর আমার আছে সেই
ভুবনডাঙার মাঠের পাশে শান্তিনিকেতন---
না থাকলে তা জীবনকথা জানতি কোথা মন ?’

‘আমার আছে সাগরদাঁড়ি’ ‘বীরসিংহ আমার’
‘আমার বুকে খালবিল সব’ ‘আমারও খেতখামার’
‘আমার আছে কক্সবাজার আর নয় সে বেশি দূরও’
‘আমার কি নেই মাথার ওপর দার্জিলিঙের চূড়ো ?’
তর্কটা তাই এইখানে ভাই ক্ষান্ত করে দে—
কোন্ টা যে ঠিক আমার আমি --- বল্ তো আমি কে ?

.                ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*