এই প্রকৃতি কবি শঙ্খ ঘোষ প্রমথনাথ বিশী ও ডঃ তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কাব্য বিতান” ( ১৯৬৬ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
ঘুরে ঘুরে এই প্রকৃতি কী কথা কয় ? সে বলে যার প্রেমের মতন আর কিছু নয় !
এই যে ভালবাসছি আমি সাতসাগরা ধরিত্রীকে, এই যে স্নেহের সুধা, সুধায় ছড়িয়ে দিলুম শরীরটিকে— স্নিগ্ধ সবুজ ললাট মেলে সেই যেখানে দিগন্তে সে আপন মনে তাকিয়ে থেকে একটুখানি স্বপ্নে মেশে--- তার বুকে যে শ্রান্তিবিহীন তৃপ্তিবিহীন জ্বলছে প্রণয় কেই জানো তা ! সে শুধু কয়, প্রেমের মতো আর কিছু নয় |
এখন তখন যখন যাকে দেখছি মনে হচ্ছে চেনা, হাত বাড়িয়ে ডাকছে তারা ‘দে না রে ভাই হৃদয় দে না’ | দুচোখ ভরা স্নেহের প্লাবন শূন্যে নাচে প্রাণের মুঠো, বাঁধনহারা কাঁপন তোলে উদাসী দিনরাত্রি দুটো— সবাই মিলে তারা আমায় গুণগুনিয়ে কেবল শোনায়, তোমরা শোনো প্রেমের মতো আর কিছু নয় আর কিছু নয় |
সে তো কেবল এই কথাটাই গুনগুনিয়ে নৃত্যে ফেরে, ‘দে তোরা দে, আমার বুকে স্নেহের আগুন জ্বালিয়ে দে রে |’ আকাশ ভরা নীল টলেছে মাটির ভরা-বুকের টানে, একূল ওকূল দুকূল ভেঙ্গে জল ছুটে যায় কী সন্ধানে, গাছ কেঁপে যায় ফুল তোলে মুখ, সন্ধ্যা ভোরের আলোর বিনয়— সবাই মিলে গান তুলেছে, প্রেমের মতো আর কিছু নয় |
আপাতত শান্তিকল্যাণ কবি শঙ্খ ঘোষ ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী প্রকাশিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” ( ২০০৭ ) থেকে নেওয়া |
পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি . এখন সবই শান্ত, সবই ভালো | তরল আগুন ভরে পাকস্থলী যে-কথাটাই বলাতে চাও বলি . সত্য এবার হয়েছে জমকালো |
গলায় যদি ঝুলিয়ে দাও পাথর হালকা হাওয়ার গন্ধ সে তো আতর . তাই নিয়ে যাই অবাধ জলস্রোতে— সবাই বলে, হা হা রে রঙ্গিলা জলের উপর ভাসে কেমন শিলা . শূন্যে দেখো নৌকো ভেসে ওঠে |
এখন সবই শান্ত ,বই ভালো সত্য এবার হয়েছে জমকালো . বজ্র থেকে পাঁজর গেছে খুলে এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন . আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে |
মন্ত্রীমশাই কবি শঙ্খ ঘোষ পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে নেওয়া |
মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ বিকেলবেলায় | সকাল থেকে অনেকরকম বাদ্যিবাদন, পুলিশবাহার | আমরাও সব যে-যার মতো জাপটে আছি ঘরখোয়ানো পথের কোনা | মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ, তখন তাঁকে একটি কথা বলব আমি | বলব যে এই যুক্তিটা খুব বুঝতে পারি সবাইকে পথ দেবার জন্য কয়েকজনকে সরতে হবে তেমন-তেমন সময় এলে হয়তো আমায় মরতে হবে | বুঝতে পারি | এ-যুক্তিতেই ভিটেমাটির ঊর্ণা ছেড়ে বেরিয়েছিলাম অনেক আগের রাতদুপুরে ঘোরের মতো কন্ঠাবধি আড়িয়ালের ঝাপটালাগা থামিয়েছিলাম কম্বুরেখায় অন্ধরেখায় মানিয়েছিলাম ছাড়তে হবে সবার জন্য কয়েকজনকে ছাড়তে হবে | কিন্তু সবাই বলল সেদিন, হা কাপুরুষ হদ্দ কাঙাল চোরের মতো ছাড়লি নিজের জন্মভূমি ! জন্মভূমি ? কোথায় আমার জন্মভূমি খুঁজতে খুঁজতে জীবন গেল | দিন কেটেছে চোরের মতো দিনভিখারির ঘোরের মতো জাগতে গিয়ে স্পষ্ট হলো সবার পথে সবার সঙ্গে চলার পথে আমরা শুধু উপলবাধা | আমরা বাধা ? জীবন জুড়ে এই করেছি ? দেশটাকে যে নষ্ট করে দিলাম ভেবে কষ্ট হলো | এখান থেকে ওখানে যাই এ-কোণ থেকে ওই কোনাতে একটা শুধু পুরোনো জল জমতে থাকে চোখের পাশে আনিয়ালের কিনার ঘেঁষে, কিন্তু তবু বুঝতে পারি সবার জন্য এই আমাদের কয়েকজনকে মরতে হবে | একটা কেবল মুশকিল যে, মন্ত্রীমশাই ওদের মতো সবার মতো এই ভুবনের বিকেলবেলায় জন্মভূমি পায়ের কাছে সন্ধ্যা নেমে আসার মতো মাঝেমধ্যে আমারও খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে— তার কী করা ?
জন্মভূমি কবি শঙ্খ ঘোষ পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে নেওয়া |
মেঘনায় মধ্যরাত, ডেকের উপরে একা তুমি— তোমারই দুচোখভরা আমার নিরালা জন্মভূমি |
তুমি সেই দেশ তুমি আমার সর্বংসহা দেশ উদাসীন যাকে খুব সহজেই ভুলে যেতে পারি তবু তুমি ধরে রাখো আমার পায়ের কাছে মাটি ঘাটে ঘাটে জ্বেলে রাখো আকাশপ্রদীপ সারি সারি যে-কোনো ভাটির টানে মোহানায় ছুটে যেতে যেতে তোমার কথা যে আমি কখনো ভাবিনি এক তিলও সেকথা জেনেও তবু থেকেছ আমারই পাশে পাশে কী-বা আসে যায় হাতে কে কোথায় দিল বা না-দিল ! শিয়রে ভয়াল ঘোর পটভূমি করেছে বিকাশ হাজার হাজার চোখে তারাদের তবুও পাহারা দুধারে সজল চুপ, তার মাঝখানে তুমি একা দাঁড়াও, দাঁড়িয়ে থাকো | ঘুমোক, ঘুমাতে চায় যারা |
আবারও জেগেছে ঢেউ, ডেকের উপরে জাগো তুমি তোমাকেই জানি আজ আমার বিষাদজন্মভূমি |
কোন্ টা আমি কবি শঙ্খ ঘোষ পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র ” ( ২০১২ ) থেকে নেওয়া |
‘আমার আছে পদ্মানদী’ ‘আমার আছে গঙ্গা’ ‘আমার আছে খুলনা-যশোর’ ‘আমার আছে বনগাঁ’ ‘আমার আছে রূপসা’ ‘আমার রূপনারায়ণ নেই’ ? ‘শিলাইদহ আমার’ ‘আর আমার আছে সেই ভুবনডাঙার মাঠের পাশে শান্তিনিকেতন--- না থাকলে তা জীবনকথা জানতি কোথা মন ?’
‘আমার আছে সাগরদাঁড়ি’ ‘বীরসিংহ আমার’ ‘আমার বুকে খালবিল সব’ ‘আমারও খেতখামার’ ‘আমার আছে কক্সবাজার আর নয় সে বেশি দূরও’ ‘আমার কি নেই মাথার ওপর দার্জিলিঙের চূড়ো ?’ তর্কটা তাই এইখানে ভাই ক্ষান্ত করে দে— কোন্ টা যে ঠিক আমার আমি --- বল্ তো আমি কে ?