মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
কবি শঙ্খ ঘোষ
মেঘ বসু সংকলিত ও সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” ( ২০০৭ ) থেকে
নেওয়া |


একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
.                তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে |

একটা দুটো সহজ কথা
.                বলব ভাবি চোখের আড়ে
জৌলুশে তা ঝলসে ওঠে
বিজ্ঞাপনে, রংবাহারে

কে কাকে ঠিক কেমন দেখে
.                বুঝতে পারা শক্ত খুবই
হা রে আমার বাড়িয়ে বলা
হা রে আমার জন্মভূমি !

বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া
.                তোমার সঙ্গে ওতপ্রোত
নিওন আলোয় পণ্য হলো
যা-কিছু আজ ব্যক্তিগত |

মুখের কথা একলা হয়ে
.                রইল পড়ে গলির কোণে
ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু
ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতা
setstats
*
বয়স
কবি শঙ্খ ঘোষ
গোপাল হালদার ও মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার শারদীয়, ভাদ্র
১৩৭২ ( সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ ) সংখ্যায় প্রকাশিত |


বৃষ্টিপ্রতিহত ফুল হাতে নিতে নেই, হাতে নিলে
.        বালক বয়স ঝরে পড়ে !
সড়কে তুমুল বৃষ্টি –-শতবর্ষ গাছগুলি দেশ দেশান্তর
.        মুড়ে রেখে দেয়
.                সাঙ্গ করো মেলা
জানি না কখন সব জানাজানি হয়ে যায়
.        ভূটান সীমায়
.                সাঙ্গ করো মেলা
হায়, ওই দেখা যায় পড়ে আছে ইতস্তত ভেজা বকুলের মতো
.        আমাদের দিন
.                পথিকবিহীন !

এই ভারি ঝড়জলে সীমান্তে প্রহরী নেই কোনো |
.        এসো, যাও---চকিতে পালাও |
বৃষ্টিপ্রতিহত ফুল ছুঁলে কেন আঙুলশিখরে
.        সকল বয়স ঝরে পড়ে !

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
বিকেলবেলা
কবি শঙ্খ ঘোষ
দীপেন্দনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল  সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার শারদীয়, ভাদ্র-
আশ্বিন ১৩৭৮ ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর  ১৯৭১ )সংখ্যায় প্রকাশিত |


সারা দিনের পর অবসন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি আজ বিকেলবেলা
আজ স্বপ্ন দেখেছি যে-স্বপ্ন দেখার কোনো কথা ছিল না আমার
যে, একটা নয় দুটো নয় তিন-তিনটে রুপোলি গোলক ঝকঝক
.                                                     করছে ঢালু আকাশে
তার নিশ্বাস যতদূর পৌঁছয় ততোদূর টলে পড়েছে মানুষ

সবার মুখ তাই থমথমে আমি জিজ্ঞেস করি ওখানে কী, কী হয়েছে ওখানে
একজন বলে ও কিছু নয় মা বলল জলের রঙে আগুন
অনেকদিন আগে এ-রকমই হয়েছিল একবার, ঘরদুয়োর সব বন্ধ ক’রে দাও
সেবার আর বাঁচে নি কেউ মড়কে ছেয়ে গিয়েছিল দেশ

রূপোলি আলো পারদের মতো ঘন হয়ে এগিয়ে আসে আমার মুখের ওপর
যেন জল থেকে গাঢ়তর জলে ডুবে যায় সমস্ত শরীর
কাগজে তৈরি আমার ভাইয়ের মুখ ঝুলে পড়ে কার্নিশ থেকে বাইরের
.                                                                      হাওয়ায়
আর দেখতে দেখতে অবেলার ঘুম ভেঙে যায়, দুচোখ ভার |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
ধর্ম
কবি শঙ্খ ঘোষ
দীপেন্দনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল  সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার শারদীয়, ভাদ্র-
আশ্বিন ১৩৮০ ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর  ১৯৭৩ )সংখ্যায় প্রকাশিত |


শুয়ে আছি শ্মশানে |  ওদের বলো
চিতা সাজাবার সময়ে
এত বেশি হল্লা ভালো নয় |

মাথার উপর পায়ের নিচে হাতের পাশে ওরা
সবাই তোমার বান্দা
ওদের বলো

বলো যে এই শূন্য আমার বুকের উপর দাঁড়াক
খুলুক তার গুল্ ফ-ছোঁয়া চুল
মুকুট-ভরা জলে উঠুক তারা |  ওরা পালাক

আর, নাম-না-জানা মুণ্ডমালা থেকে
ঝ’রে পড়ুক, ধর্ম ক’রে পড়ুক
ঠাণ্ডা মুখে, আমার ঠাণ্ডা বুকে, ঠাণ্ডা !

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
কেউ কারো মতো নয়
কবি শঙ্খ ঘোষ
দীপেন্দনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল  সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার , বৈশাখ-আষাঢ়  
১৩৮১ ( মে- জুলাই  ১৯৭৪ )সংখ্যায় প্রকাশিত |


কেউ কারো মত নয়, সমস্ত নিঃশব্দ নিজে আলো |

যা ছিল তা নেই আর, যা হবে তা হবার মতো না
যা আছে তা ধরে আছে গহনে ফলসারঙা মেঘ

যাও চলে যাও, যাও যতদূরে যেতে পারো যাও
সুপুরিবনের সারি যেখানে চলেছে অবেলায়

কেউ কারো মতো নয়, একা একা বসেছ সকলে
এভাবে থাকার মানে আমারই নিঃশব্দে ফিরে আসা

তাই আমি ফিরে আসি, যতদূর চোখ যায় দেখি
যা আছে তা ধ’রে আছে ঝড় নয়, কিছু কবুতর |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
দাবি
কবি শঙ্খ ঘোষ
দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮৮ ( মে-জুলাই  ১৯৮১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে মনে রেখো পিছনে কী ছিল |
দায়িত্ব সুন্দর, প্রতি মুহূর্ত বাড়িয়ে দেয় হাত
সম্পর্কে আনন্দে দূর্বাজলে |
হয়তো সে নিজেই দেয় না, নিজে তুলে নিতে হয় তাকে
আধেক গড়নে কোনো অভিমানী প্রতিমাবলয় |
অবসাদে ভরে আসে চোখ ?
হোক, তবু তুমি তো সমস্তখানি নও
ততটা নিজস্ব পাবে যতখানি ছেড়ে দিতে পারো |
কেউ এসে বসেছিল, কেউ উঠে চলে গেল, কেউ কথা বলেনি কখনো
মন তার চিহ্ন রাখে সবই |
কুঠুরিতে কুঠুরিতে আর্ত স্বরে ভয় পেয়ে উড়ে যায় কবুতরদল
গলার শিকলচিহ্ন লাল হয়ে জ্বলে থাকে দুরূহ রশ্মির চাপা টানে
মন তার চিহ্ন রেখে দেয় |
তবু তুমি ভুলে যেতে পারো না কখনো এরই দায়ে
জীবন তোমার কাছে দাবি করেছিল যেন প্রত্যেক মুহূর্তে তুমি কবি |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
পাংশু
কবি শঙ্খ ঘোষ
দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার  বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮৮ ( মে -জুলাই  ১৯৮১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


আমাকে ফিরিয়ে দেয় শ্মশানে বা রাজদ্বার থেকে
যেন আর যোগ্য নই পথের পাথেয় বইবার
পতনে উন্মুখ কোনো পিছল পাথর ঝুঁকে আছি
অভিভূত করে আছি ছড়ানো কাজল পরিবেশ
স্তূপ দিয়ে, খণ্ড দিয়ে, শারীরিকতার জাল দিয়ে |
কোন্ কাজে লাগি তবে ?  কার কাজে ?  কতটুকু কাজে
খসে যাওয়া পাংশু ইট দুয়ারবিহীন মন্দিরের
কাঁটাগুল্মে পড়ে থাকে, আর যারা দুর্ভিক্ষে ব্যসনে
রৌদ্রাহত নির্মলতা তুলে নেয় মুখের কিনারে
তাদের সবার থেকে দূরে এই ছায়াতলগত
গহ্বরের কানে এসে প্রহর প্রহর প্রশ্ন করে
ঠোঁটের আঘাত নিয়ে পুরোনো খাঁচার পোষা তোতা
মূঢ়, আজ সবাইকে ধ্বসের অতলে নিতে চাও
তুমি কি অন্যের কথা ভাবো, না কি ভাবো না কখনো ?

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
শহর
কবি শঙ্খ ঘোষ
দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার  বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮৮ ( মে -জুলাই  ১৯৮১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


অলিন্দের থেকে ভাঙা থামের উপরে বসে দেখি
চত্বরের মাঝখানে স্থগিত শবের চারপাশে
শরিকেরা অন্ধকারে আসাড় মুদিত হয়ে আসে
ধুনিগুলি জ্বেলে নিয়ে তৃতীয় চোখের দিব্যতায় |
পরতে পরতে খোলে ভারহীন মরীচিকা, আর
গলায় লাফিয়ে ওঠা অলীক ধ্বনির পিণ্ডগুলি
মাটি থেকে উঠে গিয়ে শূন্যে ঝুলে থাকে বোধহারা
যুবতী লুটিয়ে থাকে বাঁকানো সিঁড়িতে মুখে ফেনা—
ইড়াপিঙ্গলার স্রোতে নিবিড় সুড়ঙ্গরেখা বেয়ে
শহর সুষুমা ভরে নিয়েছে হাশিশ মাব়্যয়ানা |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
ছন্দ
কবি শঙ্খ ঘোষ
দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার  বৈশাখ-আষাঢ়১৩৮৮ ( মে -জুলাই  ১৯৮১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


কোথায় সে পদক্ষেপ ?  হারিয়ে গিয়েছে পর্বগুলি –
পাথরের গায়ে কোনো জলের ঝাপট্ নেই আর
নিশ্বাস রেখেছে বেঁধে নিশুতরাতের প্লাটফর্ম
প্রান্তর পেরিয়ে ক্ষীণ খোলের কাকুতি শুধু ভাসে
আর সব চুপ যেন আরো কিছু ঘটবার নেই
আর সবই মেনে নেওয়া আর সবই সহাবস্থান
খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষামলিন রাত জেগে
মন্থর ভোরের হাতে আড়ষ্ট চোখের শান্তি পাওয়া |
এই শান্তি ভালো ? তবে অযাচিত শান্তি বলে কাকে ?
ঘূর্ণি হাওয়া ভুলে গেলে পথের ধ্বনির বৃত্তগুলি
মাঝে মাঝে দেখি শুধু পর্বগুলি দীর্ঘ করে নিয়ে
সে যখন শোয় তার ছন্দও পয়ারে শুয়ে থাকে

তার পদক্ষেপ আর সঙ্গী করে ডাকে না আমাকে !

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
মুহূর্ত
কবি শঙ্খ ঘোষ
দেবেশ রায় সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার  বৈশাখ-আষাঢ়১৩৮৮ ( মে -জুলাই  ১৯৮১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


মেঘ ঘোরাফেরা করে চেতনার অগ্নিসন্ধি ঘিরে
মাথা থেকে পা অবধি ধীর হয়ে আছে ঘনজল
হাঁসের ডানার ভারে চোখের পাতায় কোমলাভা
দিকচক্রবাল থেকে ধূসরতা কেন্দ্রে নিয়ে আসে
শিরায় ফোয়ারা হয়ে উঠে আসে বায়বীয় স্রোত
ঈথারে মিলিয়ে দেয় বেঁচে থাকবার আলো, ছটা—
তারপরে নুয়ে পড়ে মাটির উপরে, নুয়ে পড়ে
চিকণ ঘাসের মূলে বহমান চারণের পায়ে
এবং সমস্ত সত্তা ধারণে ধরিত্রী হয়ে ওঠে
---কবিতা মুহূর্ত চায়, শিকড়ে সর্পিল স্বাধীনতা |

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*